বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ ঘটে খুব আকস্মিকভাবে। তখন কলেজের পাটও শেষ প্রায়। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে বসে আছি। কবে ফল প্রকাশ হবে, তা দেখার আশায় তীব্র অপেক্ষা নিয়ে দিন কাটাচ্ছি। মেসেই থাকি। নানা জাতের বই পড়ি, ম্যাগাজিন পড়ি, পত্রিকা পড়ি।

এ রকম সময়ে, এক সুন্দর স্বর্ণালি সকালে মেসের এক বড় ভাই বললেন, ‘তুমি দেখি বিদ্যাধর গুণপ্রসাদ! বিস্তর বই পড়ো। তা হুমায়ূন আহমেদের “হিমু” পড়েছ?’
আমি বললাম, ‘না। হিমু কে?’
তিনি মনে হলো আকাশ থেকে ধপ করে মাটিতে পড়লেন, ‘বলো কী! হিমুকে চেনো না? তুমি হুমায়ূন স্যারের “হিমু সিরিজ” পড়োনি?’
তিনি ‘হুমায়ূন স্যার’ শব্দটা এতটাই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করলেন যে আমি সত্যিই বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকলাম এবং এত দিনেও হিমু সিরিজ না পড়ার জন্য সেই মুহূর্তে নিজেকে খুবই অপরাধী মনে হলো।

আমার অপরাধবোধ সম্ভবত চেহারায় ফুটে উঠেছিল। সেই বড় ভাই সেটা বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ নিজের ঘরে গেলেন এবং একটা বই এনে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন। ‘এটা পড়ো, ’ বললেন।

আমি দেখলাম, পাতলা চটি টাইপের একটা বই। ওপরে লেখা ‘ময়ূরাক্ষী’।
উপন্যাসটা দু–তিন ঘণ্টার মধ্যেই পড়ে শেষ করে ফেললাম। তারপর ওই বড় ভাইয়ের কাছে ছুটে গিয়ে বললাম, আপনার কাছে আর কোনো বই আছে হুমায়ূন আহমেদের?
এরপর আমি সারা বগুড়া শহর তোলপাড় করে হুমায়ূন আহমেদের বই খুঁজে খুঁজে এমনভাবে পড়া শুরু করলাম যে সেই পাঠযজ্ঞ ব্যাখ্যা করার জন্য যদি ‘গোগ্রাসে গেলা’ শব্দটা ব্যবহার করি, তবু তা যথেষ্ট হবে না। আরও কঠিন শব্দ খুঁজে বের করা দরকার।
শুধু হিমু নয়, একে একে মিসির আলী, শুভ্রসমগ্র, সায়েন্স ফিকশন, শিশুতোষ, আত্মজীবনী, ভ্রমণসাহিত্য, শ্রেষ্ঠ গল্প—সবই পড়লাম। বিরক্তি এল না একবারও। আশ্চর্য!

হুমায়ূন আহমেদ প্রতি প্যারায় প্যারায় পাঠককে চমকে দেন। চমকে দেওয়া লেখকদের অন্যতম গুণ। অনেক লেখক দেখা যায় দু–চার পাতা পর একটা চমক দেন। অনেক লেখক একটা অধ্যায়ের শেষে চমক রাখেন, যাতে পাঠক পরের অধ্যায় পড়তে আগ্রহ বোধ করেন। আর হুমায়ূন আহমেদ পাঠককে চমকে দেন ক্ষণে ক্ষণে। দু–চার-দশ লাইন পরপরই চমক থাকে। পাঠক চমকাতে চমকাতে একটা বিস্ময়কর ঘোরের মধ্যে চলে যায়।

তত দিনে খানিকটা বড় হয়ে গিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। সেকেন্ড ইয়ার, থার্ড ইয়ারে উঠে গেছি। শুধু পড়ার জন্য গল্প-উপন্যাস পড়ি না, বুঝেশুনে পড়ি। মাথা খাটানোর চেষ্টা করি। ভেবে বের করার চেষ্টা করলাম, হুমায়ূন আহমেদ পড়তে কেন এত ভালো লাগে?

হুমায়ূন আহমেদের গল্প বলার ধরনটাই আশ্চর্যজনক। উপস্থাপন কৌশলটা একেবারেই স্বতন্ত্র। পৃথিবীর আর কোনো লেখকের সঙ্গে এই কৌশল মেলে না। সবাই বলার চেষ্টা করেন, হুমায়ূন আহমেদ ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করেন এবং সহজ–সরল শব্দ ব্যবহার করেন, এ জন্য হুমায়ূন পড়তে এত ভালো লাগে। এটা একটা কারণ বটে, তবে একমাত্র কারণ নয়। আমার মনে হয়, শুধু এই এক কারণে হুমায়ূন আহমেদ ‘হুমায়ূন আহমেদ’ হয়ে ওঠেননি। সহজ–সরল শব্দে এবং ছোট ছোট বাক্যে আরও অনেকেই লিখেছেন (জহির রায়হানের কথা বলতে পারি), কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের অনন্যতা অন্যখানে।

হুমায়ূন আহমেদ প্রতি প্যারায় প্যারায় পাঠককে চমকে দেন। চমকে দেওয়া লেখকদের অন্যতম গুণ। অনেক লেখক দেখা যায় দু–চার পাতা পর একটা চমক দেন। অনেক লেখক একটা অধ্যায়ের শেষে চমক রাখেন, যাতে পাঠক পরের অধ্যায় পড়তে আগ্রহ বোধ করেন। আর হুমায়ূন আহমেদ পাঠককে চমকে দেন ক্ষণে ক্ষণে। দু–চার-দশ লাইন পরপরই চমক থাকে। পাঠক চমকাতে চমকাতে একটা বিস্ময়কর ঘোরের মধ্যে চলে যায়।

হুমায়ূনের দ্বিতীয় গুণ—সংলাপ। এত সাবলীল ও ইউনিক সংলাপ বাংলা সাহিত্যে আর আছে বলে মনে হয় না। তৃতীয় গুণ—উইট। তাঁর সংলাপগুলো হিউমারে ভরপুর। পাঠক পড়তে পড়তে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়েন। চতুর্থ গুণ—চরিত্র সৃষ্টি। যেকোনো উপন্যাসে অনেকগুলো চরিত্র থাকে। গল্পের প্রয়োজনেই চরিত্রগুলো আসে ও যায়। কিন্তু সব চরিত্র পাঠককে নাড়া দেয় না। এ ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদ ব্যতিক্রম। তিনি অল্প কথায় সংলাপের মাধ্যমে, ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে চরিত্র সৃষ্টি করেন এবং চরিত্রগুলো একটা সময় জীবন্ত হয়ে ওঠে। পাঠক তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যান। তাদের দুঃখে অশ্রুপাত করেন, হিউমারে হেসে কুটি কুটি হন। শুধু সংলাপ ও ছোট ছোট ঘটনার মধ্য দিয়ে জীবন্ত চরিত্র সৃষ্টি করার এমন ক্ষমতা আর কোনো লেখকের আছে কি? আমার জানা নেই।

হুমায়ূনের পঞ্চম গুণ—গল্পের প্লট। আহামরি কিছু নয়। খুবই সাধারণ। মধ্যবিত্ত, আটপৌরে জীবন। দেখবেন, তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোর কণ্ঠস্বর খুব অনুচ্চ। তারা খুব প্রতিবাদী নয়, বিপ্লবী নয়। না রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে, না সমাজের বিরুদ্ধে, না নিজের বিরুদ্ধে—কোথাও কেউ বিপ্লব করে না। সবাই আপস করে চলে। যে দু–একটি চরিত্র সামাজিক বিপ্লবের চেষ্টা করেছে, তারাও আপোসের মধ্য দিয়ে বিপ্লব করেছে। এই মানুষেরা আমাদের চারপাশেই ঘোরাফেরা করছে। আমাদের চোখে দেখা বাবা, চাচা, মামা, বড় ভাই, মা, বোন, খালা, ফুপু, খালু সাহেব—সবাই তো এ রকমই। মৃদু মানুষ। প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে আপস করে বেঁচে থাকছেন তাঁরা। এই মানুষেরা দৈনন্দিন বেঁচে থাকাই হুমায়ূন আহমেদের গল্পের প্লট। এমন প্লট মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে, এটাই তো স্বাভাবিক।

ষষ্ঠ গুণের কথা বলে আজকের লেখা শেষ করি। সেটা আবেগ। নজরুলের যেমন ছিল এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি আর হাতে রণতূর্য, তেমনি হুমায়ূনের এক হাতে ছিল উইট আরেক হাতে ইমোশন। দুটো যন্ত্রই তিনি সমানতালে বাজাতে পারতেন। এই এখনই পাঠককে হাসাতে হাসাতে পেটে খিল ধরিয়ে ফেলছেন তো পরক্ষণেই চোখে অশ্রু এনে দিচ্ছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, হুমায়ূন যে আবেগ সৃষ্টি করেন, সেই আবেগের কারণে হাউমাউ করে কান্না আসে না, একটা চাপা কান্না তৈরি হয়। গলার মধ্যে কিছু একটা আটকে থাকে। বুকের মধ্যে অসীম শূন্যতা তৈরি হয়।

প্রসঙ্গত মনে পড়ছে ‘পথের পাঁচালী’র কথা। ‘পথের পাঁচালী’র যে দৃশ্যে দুর্গা মারা যায়, সেই দৃশ্য পড়ার সময় প্রতিবার আমার হু হু করে কান্না আসে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের কোনো চরিত্রের জন্য হু হু করে কান্না আসে না। ‘বৃষ্টি ও মেঘমালা’ উপন্যাসে দুর্গার বয়সী এক কিশোরের মৃত্যুর ব্যাপার আছে, ‘অপেক্ষা’ উপন্যাসে এক কিশোরীর মৃত্যুদৃশ্য আছে, ‘সে আসে ধীরে’ উপন্যাসে এক বালকের মৃত্যুর ব্যাপার আছে। কিন্তু সেসব পড়ার সময় আমার হু হু করে কান্না আসেনি একবারও। প্রতিবার শুধু বিশাল শূন্যতা অনুভব করেছি। বুকের ভেতর হাহাকার অনুভব করেছি। বুক খামচে ধরা কষ্ট টের পেয়েছি।

এখানেই সম্ভবত হুমায়ূনের অনন্যতা যে তিনি একঝাঁক মৃদু মানুষের হাহাকার পাঠককূলের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিলেন। বাকের ভাই যতই মাস্তান হোক, তার জন্যও আমরা হাহাকার অনুভব করি, মুনার জন্য হাহাকার অনুভব করি, মুনার মামার জন্য কষ্ট পাই, বকুলের জন্য কষ্ট পাই, এমনকি রুক্ষ উকিলটার জন্যও মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়। আমাদের বদিউল আলমের জন্য হাহাকার লাগে, রাবুর জন্য হাহাকার লাগে, খোকার জন্য কষ্ট লাগে, আনিসের জন্য মন কেমন কেমন করে।

আজও রুপার থালার মতো প্রকাণ্ড চাঁদ ওঠে, প্রবল জোছনায় ভেসে যায় চরাচর, গৃহত্যাগী মন ছুটে বেরিয়ে যেতে চায় কিংবা প্রবল বর্ষণে ভেসে যায় পৃথিবী, একটা কদম ভিজতে ভিজতে একাকী মাথা দোলায় মৃদু বাতাসে, আর এসব দেখতে দেখতে আমাদের বুকের ভেতরটায় ‘আহা রে আহা রে’ করে ওঠে।
আহা রে! যে মানুষটা এসব চিনিয়েছেন, তিনি আজ নেই! ফিনিক ফোটা জোছনা বৃথাই আলো ছড়ায়। তিনি নেই!

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন