মাঠে তো বটেই, মাঠের বাইরেও ম্যারাডোনা ছিলেন অনন্য, অদ্বিতীয়। মাঠে যদি তিনি কবিতা হন, মাঠের বাইরে দুর্দান্ত এক থ্রিলার উপন্যাস বটেই, যার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চমকে ঠাসা। প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি অননুমেয়। উরুগুয়ের বিখ্যাত সাহিত্যিক এদুয়ার্দো গালিয়ানো বৈচিত্র্যময় ম্যারাডোনাকে নিয়ে বলেছিলেন, ‘নায়কেরা কি দেবতার মতো, যাঁদের নিজেদের খ্যাতির আগুনে পোড়ার শাস্তি দেওয়া হয়?’

এই ফুটবলারের শ্রেষ্ঠতম ‘সাহিত্যকর্মের’ কথা বললে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা শতাব্দীর সেরা গোলটির কথা বলতেই হয়। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে ছুটেছেন মাত্র ১১ সেকেন্ড আর পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে দেখেছে অমর এক কবিতার সৃষ্টিপ্রক্রিয়া। আমরা কবি-সাহিত্যিকদের মহান সৃষ্টিগুলোর জন্মের সাক্ষী হতে পারি না। তবে ম্যারাডোনার ওই সৃষ্টিকর্ম রচিত হয়েছে সবার সামনে। কোটি মানুষ সেদিন অমর এক কবিতাকে সবুজ গালিচায় জন্ম নিতে দেখেছে। সেদিনের সেই মুহূর্ত বিশেষ বটে, তবে একমাত্র অবশ্যই নয়। এমন অসংখ্য মহাকাব্যিক মুহূর্তের জন্ম দিয়ে ম্যারাডোনা হয়ে উঠেছেন অনেকের ঈশ্বরও। তবে সেই দেবত্বের ভার তিনি নিজেও পুরোপুরি বইতে পারেননি। নিজেকে রক্ত–মাংসের মানুষ প্রমাণ করতেই যেন তাল হারিয়েছেন বারবার।

বৈচিত্র্যময় সেই মানুষের বাঁ পা অবশ্য কখনো দেবত্ব হারায়নি। দেবতার দেওয়া উপহার হিসেবেই থেকে গেছে সব সময়। ম্যারাডোনার সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা গেলেও, তাঁর সেই বাঁ পা–কে উপেক্ষা করা যায় না। তাঁর ওই একটা পা নিয়েই লেখা হয়েছে অসামান্য সব স্তবগাথা। এই ফুটবল তারকার সতীর্থ হোর্হে ভালদানো একবার বলেছিলেন, ‘ম্যারাডোনার বাঁ পায়ে থাকার মতো সুন্দর অভিজ্ঞতা কোনো বলের আর কখনো হয়নি।’

জীবদ্দশায়ই রূপকথার গল্পে পরিণত হয়েছিলেন ম্যারাডোনা। ফুটবল সাহিত্যের কবি গালিয়ানো, যাঁর লেখা বই সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডোেক বলা হয় ক্রীড়াসাহিত্যে ‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’–এর জবাব। সেই গালিয়ানো বইটির ‘ম্যারাডোনা’ অংশের একজায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘নেপলসে (ইতালির একটি শহর) ম্যারাডোনা হয়ে ওঠেন সন্ত ম্যারাডোনা। কেবল তা–ই নয়, সত্যিকারের সন্ত সান গিন্নারোর ম্যারাডোনায়ন করে ছাড়েন নেপলসবাসীর।’ গালিয়ানোর ভাষায়, ‘সন্ত গিন্নারো হন সন্ত গিন্নারমান্দো। রাস্তায় তাঁরা এই হাফপ্যান্ট পরা দেবতার (ম্যারাডোনা) ছবি বিক্রি করতেন, যাঁকে আলোকিত করে রাখতেন মাতা মেরি।’

ম্যারাডোনাকে নিয়ে লেখা এসব কথাও অমূল্য যেকোনো সাহিত্যকীর্তির সমতুল্য। তবে হৃদয় এঁফোড়–ওফোঁড় হয়, যখন আমরা ভিলোরোর লেখায় পড়ি, ‘যখন তাঁর কাছে বল থাকত না, তখন তিনি মা দিবসে আদমের চেয়ে নিজেকে বেশি একা মনে করতেন।’ ম্যারাডোনাকে নিয়ে এর চেয়ে ভালো অভিব্যক্ত আর কী হতে পারে!

গালিয়ানো বা ভিলোরোই শুধু নন, ম্যারাডোনাকে নিয়ে আরও অনেক লেখক উচ্ছ্বাসে ভেসেছেন। বলতে পারি মারিও বার্গাস য়োসার কথাও। ম্যারাডোনায় মুগ্ধ পেরুর এই নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ‘ম্যারাডোনা অ্যান্ড দ্য হিরোস’ শিরোনামের এক লেখায় লিখেছিলেন, ‘ম্যারাডোনা এমন এক জীবন্ত দেবতা, যাঁকে পূজা করার জন্য মানুষ নিজেই সৃষ্টি করেছে।’ আর্জেন্টাইন লেখক হুয়ান সাস্তুরিয়ান বলেছেন, ‘সে একজন শিল্পী, যেখানে কিছুই ছিল না, সেখানেও সে কিছু একটা সৃষ্টি করেছে।’

ম্যারাডোনাকে নিয়ে নির্মিত এক প্রামাণ্যচিত্রে এই কিংবদন্তির ভাইয়ের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, ম্যারাডোনার সঙ্গে তাঁকে তুলনা করা যায় কি না। ভাইয়ের উত্তর ছিল, ‘সে অন্য এক গ্রহের মানুষ।’

অন্য গ্রহটি কেমন, আমরা জানি না। তবে এই গ্রহেই ম্যারাডোনা এক হাতে স্বর্গ এবং অন্য হাতে নরক নিয়ে ঘুরেছেন। তিনি ছিলেন প্রশংসা ও নিন্দার মাঝখানে ক্রুশবিদ্ধ হয়ে ঝুলতে থাকা এক ধাঁধা। আবার প্রশ্নাতীত ভালোবাসার নামও তো ছিলেন ম্যারাডোনা। তাঁর এই দ্বন্দ্বমুখর চরিত্র আরও স্পষ্ট হয় গালিয়ানোর ভাষ্যে, ‘ম্যারাডোনা বিশ্বের সেসব দ্বন্দ্বকে মূর্ত করে তোলেন, যা অন্য কেউ করতে পারে না। তবে তিনি সেই বিশেষ মানুষ, যার এটা প্রমাণ করার সামর্থ্য ছিল যে কল্পনাও কার্যকর হতে পারে। তা–ও এমন একটি পৃথিবীতে, যেখানে কল্পনার কোনো স্থান নেই। এইসব বিষয়ের জন্য সব ফুটবলপ্রেমী মানুষের তাঁর প্রতি অন্তহীন কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।’

এই ফুটবল কিংবদন্তির মৃত্যুর ঠিক দুই বছর পর আমরা এখন এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে, যখন একটি বিশ্বকাপ নতুন চ্যাম্পিয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে ডানা মেলছে। ম্যারাডোনা ছাড়া বিশ্বকাপ, এমন কিছু এত দ্রুত দেখার জন্য দুনিয়াও হয়তো প্রস্তুত ছিল না। তবু শো মাস্ট গো অন। অন্যলোকে বসে ক্রুইফ-গারিঞ্চাদের সঙ্গে হয়তো জমিয়ে খেলা দেখছেন ম্যারাডোনাও। তাঁর চোখও হয়তো ১৮ ডিসেম্বরের ফাইনালে। প্রথম ম্যাচ হেরে পিছিয়ে পড়া লিওনেল মেসির হাতে বিশ্বকাপ তুলে দিতে ওপর থেকে তিনি কি কলকাঠি নাড়বেন?