আমি স্যারকে ফোন করলাম, ‘স্যার, আমি আসি। আপনি বইটাতে অটোগ্রাফ দিয়ে দেন।’

না না, উৎসর্গ করা বইতে অটোগ্রাফ দিতে হয় না।

আচ্ছা দিয়েন না। নিউইয়র্কে আপনার বই পাঠাব আপনার ভীষণ ভক্ত আমার এক বন্ধুকে। সেটাতে দিয়েন।

আচ্ছা আসো।

দখিন হাওয়ায় সেই আমার প্রথম যাওয়া। দুপুরবেলা স্যারের বাসায় আমি হাজির। সঙ্গে দুই প্যাকেট মিষ্টি। স্যারের দুটো বই। স্যার আমাকে বললেন, ‘তোমার পত্রিকার লেখা আমি নিয়মিত পড়ি। গত সংখ্যায় এইটা নিয়ে লিখেছ। ঠিক কি না? আমাকেও দেখি তুমি মাঝেমধ্যে কোট করো। “ব্যাচেলর” দেখেছি, ভালো হয়েছে।’

আমি বললাম, ‘“ব্যাচেলর”-এর কৃতিত্ব আমার না স্যার। সরয়ার ফারুকীর।’

তিনি বললেন, ‘তুমি স্ক্রিনপ্লে লিখে দিয়েছ তো।’

আমি বললাম, ‘জি। সরয়ারের কাহিনি অনুসারে।’

তোমাকে কেন বই উৎসর্গ করেছি, জানো তো? তোমার সম্পর্কে একজন আমাকে একটা ভুল খবর দিয়েছিল। আমি জেনেছি, ওটা ভুল ছিল।

আমি বললাম, থাক স্যার সেই কথা…

এরপর স্যারের সঙ্গে আবারও দেখা হয়েছে। সাগর ভাইয়ের বাড়িতে, ওস্তাদ আকবর আলী খানের সেতার বাদনের অনুষ্ঠানে। দেখা হলে স্যার বলেছেন, ‘আনিস, কাছে আসো। আনিস লেখক। ও ব্যাপারটা বুঝবে।’ বলে তিনি আমাকে কাছে টেনে নিয়েছেন এবং যে বিষয়টা নিয়ে আলাপ হচ্ছে, সেটাতে আমাকে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আসলে পাত্তা দিয়েছেন অন্যদের সামনে।

লেখকদের সঙ্গে লেখকদের কোথাও একটা এই রকমের আত্মীয়তার সংযোগ থাকেই। এক লেখক হয়তো আরেক লেখকের বেদনা বুঝতে পারেন।

দখিন হাওয়ার দক্ষিণ দিকের বারান্দায় স্যার। আলো আসছে সেই বারান্দাপথে। স্যার সেই আলোর মধ্যে বসে আছেন। দৃশ্যটার মধ্যে একটা অপার্থিবতা আছে। মানুষটা আমাদের বেড়ে ওঠার আনন্দের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িত। আমরা বড় হয়েছি তাঁর বই পড়ে। ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস পড়ে।

আমি একদিন এই রকম একটা দাওয়াতের আসরে স্যারের পাশে বসে আছি। স্যার একটার পর একটা সিগারেট খাচ্ছেন। আমি বলি, ‘স্যার, আপনার না হার্টের অপারেশন হয়েছে। এত সিগারেট খান কেন?’

স্যার বলেন, ‘আনিস, আমার জীবনের দাম কী! এই শহরে আমার মেয়েরা আছে, তাদের সঙ্গে আমার দেখা হয় না কত বছর, তুমি জানো।’

আমি বলি, ‘স্যার, আপনার দুঃখটা জেনুইন, কিন্তু আপনার সিগারেট খাওয়ার কারণ এটা নয়। আপনি আগেও সিগারেট খেতেন। এখন এটাকে কারণ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছেন।’

default-image

বহু বছর আগের কথা। হুমায়ূন আহমেদ স্যারকে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে নেত্রকোনায়। হাসান আজিজুল হক প্রধান অতিথি। আমি অন্যতম বক্তা। হাসান স্যারের সঙ্গে মাইক্রোবাসে আমরা নেত্রকোনায় গিয়েছিলাম। রাতে খাওয়ার টেবিলে হুমায়ূন স্যার আমাদের খোঁজখবর করছিলেন। আমি বললাম, ‘স্যার, অনুষ্ঠানের পর সাধারণত উদ্যোক্তারা আর খোঁজখবর রাখেন না। এর আগে একবার নেত্রকোনায় এসেছিলাম কবি হেলাল হাফিজ ভাইয়ের সংবর্ধনায়। আসার সময় মাইক্রোবাসে এলাম। ফেরার সময় মাইক্রোবাসের ড্রাইভার হারিয়ে গেল। শেষে পরের দিন বাসে ফিরতে হলো। কী হয়েছিল শোনেন’… আমি প্রসঙ্গটা পাড়ছিলাম স্যারের সঙ্গে একটা হাসির অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার জন্য, ‘পরের দিন ভোরবেলা প্রথম বাসটাতে উঠিনি বাসস্ট্যান্ডের চায়ের লোভে। দ্বিতীয় বাসটা ধরে খানিকক্ষণ আসার পর দেখি, প্রথম বাসটা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে। ওই বাস থেকে যাত্রীরা নামছেন, প্রত্যেকের নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে। কুয়াশার মধ্যে সামনের গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে ওই বাস তার প্রত্যেক যাত্রীর নাক কেটে যাত্রাভঙ্গ করেছে। এক কাপ চা আমার নাক বাঁচিয়ে দিয়েছে।’ কিন্তু স্যার হাসছিলেন না। তাঁর চোখমুখ শক্ত হতে শুরু করল। নেত্রকোনায় অতিথিকে ঠিকভাবে খাতির-যত্ন করা হয়নি নাকি? স্যার রেগে যাচ্ছেন। আমি কিছুতেই আর পরিবেশ লঘু করতে পারি না।

এতক্ষণ লেখার পর মনে হচ্ছে, এই লেখায় এখন পর্যন্ত আমি যা লিখেছি, তার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত আছে, দেখো, হুমায়ূন আহমেদ স্যার আমাকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন, আমি তাঁর কত কাছাকাছি হতে পেরেছিলাম।

আমি এতক্ষণ এটা সজ্ঞান করিনি, লেখার তোড়ে করেছি। এখন আমি সজ্ঞান বলতে চাই, হুমায়ূন আহমেদ হচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের সেই পুরুষ, যাঁর সঙ্গে ‘আমার কথা হয়, আমার যোগাযোগ আছে’ এই রকম বলতে পারা যেকোনো তরুণ লেখকের জন্য অনেক বড় গৌরবের ব্যাপার। আমার জন্য তো বটেই।

হুমায়ূন আহমেদ স্যারের পাশে একই টেবিলে বসেছিলাম আরও একবার। বইমেলায়। সেটা ১৯৮৭-৮৮ সালের কথা। জাতীয় কবিতা উৎসব তখন সবে শুরু হয়েছে। বইমেলায় তখন বাংলা একাডেমির ভেতরেই চায়ের স্টল থাকত। সেই স্টলে লেখকেরা মেলা রাত পর্যন্ত আড্ডা দিতেন। হুমায়ূন আহমেদ আর শামসুর রাহমান এসেছিলেন। আমি তখন কবি মহাদেব সাহার সঙ্গে একজন কবিযশপ্রার্থী হিসেবে একটা টেবিলে বসে আছি। সেই টেবিলেই এসে হুমায়ূন আহমেদ আর শামসুর রাহমান বসলেন। আমার বয়স তখন বাইশ বছর। আমি বুয়েটে পড়ি। কবিতা লেখার চেষ্টা করি। কবি ফেরদৌস নাহার এসে বললেন, ‘মিটুন, তুমি তো দেখি বড়দের দলে যোগ দিয়ে ফেলেছ।’ খুব লজ্জা পেয়েছিলাম।

তখনো হুমায়ূন আহমেদ স্যার বইমেলায় আসতে পারতেন। চায়ের স্টলে আড্ডা দিতে পারতেন। এরপর তিনি এত জনপ্রিয় হয়ে গেলেন যে আর একা একা বইমেলায় আসতে পারেন না। রাত আটটার পর হঠাৎ একদিন আসেন। তখন এমন ভিড় হয় যে পুলিশ ডাকতে হয়। একবার এক মহাপরিচালক গিয়ে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন, বইমেলার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার স্বার্থে দয়া করে আপনি বইমেলা ছেড়ে চলে যান। স্যার আহত হয়েছিলেন।

default-image

আজকে আমি দখিন হাওয়ায় যাচ্ছি স্যারকে শুভেচ্ছা জানাতে, তাঁর আরোগ্য কামনা করতে। দুপুরবেলা। স্যার লুঙ্গি পরে খালি গায়ে বারান্দায় বসে আছেন। আমি আর আলীম আজিজ সালাম দিলাম। স্যার বললেন, ‘দেখতে এসেছ, ভালো কথা। ভিড় করার দরকার নাই। যাও।’

আমি বললাম, ‘স্যার, ভালোভাবে যান, নিউইয়র্ক থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন। আপনাকে আমাদের সাহিত্যের, প্রকাশনার, বইমেলার আরও অন্তত বিশ বছর দরকার।’

স্যার বললেন, ‘শোনো, তুমি যদি চাও তো মাত্র বিশ বছর চাচ্ছ কেন? বেশি করে চাও। এক শ বছর চাও। এক হাজার বছর চাও।’

আমি হেসে ফেললাম।

স্যার হচ্ছেন জন্মরসিক। নিজের অসুখ নিয়ে তিনি নিষ্ঠুর রসিকতা করবেন। আশপাশের লোকদের অসহায়ত্ব দেখে আনন্দ পাবেন। আর তাঁকে ঘিরে লোকজন যে অকৃত্রিম কিংবা কৃত্রিম অভিব্যক্তি চোখেমুখে সংলাপে ফুটিয়ে তুলবে, তা লক্ষ করে মজা পাবেন এবং মজা করবেন। এই ধরনের মানুষকে ক্যানসার পরাজিত করতে পারবে না। মৃত্যু তাঁর কাছ থেকে এক শ হাত দূরে থাকতে বাধ্য।

দখিন হাওয়ার দক্ষিণ দিকের বারান্দায় স্যার। আলো আসছে সেই বারান্দাপথে। স্যার সেই আলোর মধ্যে বসে আছেন। দৃশ্যটার মধ্যে একটা অপার্থিবতা আছে। মানুষটা আমাদের বেড়ে ওঠার আনন্দের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি জড়িত। আমরা বড় হয়েছি তাঁর বই পড়ে। ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস পড়ে। তাঁর ‘নন্দিত নরকে’ সেদিন কে যেন ফেসবুকে তুলে দিয়েছে। আশ্চর্য, অতি অল্প বয়সে এই রকমের দরদমাখা ভাষা, এই রকম মায়াভরা গল্প, এই রকম নিজস্বতা একজন তরুণ অর্জন করেছিলেন কীভাবে! তিনি আর কারও মতো নন। তিনি তাঁর নিজের মতো। তিনি লেখেন পূর্ব বাংলার ভাষায়। সেই ভাষা সরল, কিন্তু নিরাভরণ নয়। তিনি বর্ণনা এড়িয়ে যান না, কিন্তু সেই বর্ণনা পাঠককে নিমজ্জিত করে, দূরে ঠেলে দেয় না। তিনি টেলিভিশনের জন্য নাটক লিখলেন এবং পাল্টে দিলেন আমাদের টেলিভিশন নাটককে। ‘আপনার যাওয়া লাগবে না’, হুমায়ুন ফরীদিকে বলা ছোট্ট মেয়েটির সেই সংলাপ আমি ভুলতে পারি না। সংলাপ যে মুখের ভাষায় লিখতে হয়, সেটা তিনিই আমাদের শিখিয়েছেন। কী সব নাটকই না হতো আশি আর নব্বইয়ের দশকে আমাদের টেলিভিশনে। হুমায়ূন আহমেদের নাটক মানে সেই রাতটা আমাদের উৎসবের রাত। আলুচচ্চরি খাওয়া পরিবারে ওই রাত যেন পোলাও–কোরমার রাত। তাঁর ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ আমাদের দিয়েছে দল বেঁধে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার আনন্দ।

আমাদের দিবস–রজনীগুলোকে আনন্দপূর্ণ অর্থময়তা দিয়েছেন এই খালি–গা লোকটা, তাঁর এই ডান হাতটা দিয়ে লিখে, এখন বসে আছেন আলোঝলমলে বারান্দায়।

আমি স্যারের কাছে গেলাম। তাঁর ডান হাতটা দুই হাতে চেপে ধরলাম, বেস্ট অব লাক স্যার। গেট ওয়েল সুন।

default-image

স্যার বললেন, ‘শোনো, তোমার লেখা কিন্তু আমি পড়ি। এই সপ্তাহের গদ্যকার্টুনে তো সব পুরোনো জোকস দিয়েছ।’

আমি কী বলি, আর স্যার কী বলেন।

হুমায়ূন আহমেদ নামের এই লোকটা অন্য ধাতুতে গড়া। শামসুর রাহমানের ৫০তম জন্মদিনে সৈয়দ শামসুল হক একটা কবিতা লিখেছিলেন। ‘শামসুর রাহমান, আপনি দীর্ঘজীবী হোন, ত্বরান্বিত হোক আমাদের স্বপ্নসমূহের অনুবাদ।’

সৈয়দ শামসুল হকই আরেকবার, বহু বছর আগে, হাসপাতালে অসুস্থ হুমায়ূন আহমেদকে দেখতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘হুমায়ূন, তোমাকে সুস্থ হয়ে উঠতে হবে। কারণ, তোমার ডান হাতে পাঁচ আঙুল নয়, ছয় আঙুল। ষষ্ঠ আঙুল হলো তোমার কলম। তোমাকে সুস্থ হয়ে উঠতে হবে, কারণ, তুমি ছয় আঙুল নিয়ে জন্মেছ।’

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁর নোবেল পুরস্কার ভাষণে এক বিপরীত ইউটোপিয়া নির্মাণের কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, যুদ্ধ, বন্যা, মহামারি সত্ত্বেও আমার উত্তর হচ্ছে জীবন। পারমাণবিক যুদ্ধে ধ্বংস আসন্ন জেনেও লেখকদের কর্তব্য হচ্ছে বিপরীত একটা ইউটোপিয়া নির্মাণ করা।

বাংলাদেশের লেখকেরা এই দায় নিয়ে জন্মেছেন। ১৬ কোটি মানুষের দুঃস্বপ্নতাড়িত বাস্তবতার বিপরীতে এক স্বপ্নজগৎ নির্মাণ করা, যেখানে জ্বলজ্বল করবে জীবন, আশা, আনন্দ।

হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সেই আশা, আনন্দ ও স্বপ্নলোকের প্রধান নির্মাতা। সৈয়দ শামসুল হকের মতো করে বলি, ‘হুমায়ূন আহমেদ, আপনি দীর্ঘজীবী হোন, ত্বরান্বিত হোক আমাদের স্বপ্নসমূহের অনুবাদ।’

আমি হুমায়ূন স্যারের ডান হাত দুই হাতে ধরে আছি, মুহূর্ত কয়েকের জন্য। দখিন হাওয়া বাড়ির দক্ষিণের বারান্দায় তখন অনেক আলো।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন