বিশ্ব চলে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে, কিন্তু বিভিন্ন জাতির রয়েছে নিজস্ব সাল গণনার রীতি বা পঞ্জিকা। একদিকে আছে জাগতিক তাগিদ অনুসারে চলা, অন্যদিকে প্রাণের আরাম, আত্মার শান্তি খুঁজে ফেরা। রাষ্ট্রের সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতির বিকাশের অভিঘাতও প্রবল হয়ে ওঠে।
চীনা নববর্ষ চান্দ্র-সৌরপঞ্জিকা অনুসারে স্থির হয়, জানুয়ারির শেষাশেষি থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধের কোনো একটি দিন চীনারা নববর্ষকে আবাহন করে। এর অঙ্গাঙ্গি অংশ লন্ঠন উৎসব বা আলোর উদ্ভাসন। তবে চীনা নববর্ষ ঘিরে যে বিশাল বাণিজ্য পরিচালিত হয়, ধনবান চীন দেশের সেই নববাণিজ্যের অভিঘাত দুনিয়াজুড়ে অনুভূত হয় এবং বিশ্ববাসী এখন জানে ও চেনে চীনা নববর্ষ। একদা কমিউনিস্ট চীন এই নববর্ষ উদ্যাপন করেছে, বর্তমান চীনের ধর্মানুসারী বিভিন্ন গোষ্ঠী কিংবা ধর্ম-উদাসীন নাগরিক সবাই সমভাবে নববর্ষ উদ্যাপন করে। কনফুসিয়ান, বৌদ্ধ, তাওবাদী বা অন্য ধর্মানুসারী সবাই পালন করে উত্সব। ধনবান চীনের এক বিশালসংখ্যক নাগরিক নববর্ষের দীর্ঘ ছুটি উপলক্ষে বেরিয়ে পড়ে দেশ-বিদেশ ভ্রমণে। ফলে পাশ্চাত্যের বড় শহরগুলোয় পসরা সাজিয়ে বিক্রেতারা অপেক্ষায় থাকে চীনা ট্যুরিস্টদের আগমনের। তাঁরা ভালোভাবে জানে চীনা নববর্ষের দিনক্ষণ। ইউনেসকো চীনা নববর্ষ নতুন বছরকে স্বীকৃতি দিয়েছে মানবজাতির অমূর্ত ঐতিহ্য হিসেবে।
আমাদের সৌভাগ্য যে বাঙালির আছে নিজস্ব বর্ষগণনার রীতি, ইতিহাসের পরম্পরায় যা বাঙালি জীবনের অঙ্গাঙ্গি অংশ হয়ে রয়েছে। চীনা নববর্ষের মতো বাংলা সাল গণনাও ফসল কাটার মৌসুমের সঙ্গে জড়িত। মোগল সম্রাট আকবর রাজজ্যোতিষীদের সাহায্য নিয়ে বঙ্গাব্দের পঞ্জিকা প্রবর্তন করেন। এখানেও চীনাদের মতো চান্দ্র ও সৌরপঞ্জিকা একত্র করে পঞ্জিকা তৈরি করা হয় ইসলামি-হিন্দুয়ানির মিলনে। চীনের মতোই বাংলায় বিভিন্ন ধর্মানুসারীরা তাদের অভিন্ন জাতিসত্তার উত্সব হিসেবে নববর্ষ পালন করে। সেই সঙ্গে ভিন্ন জাতিসত্তার সদস্যরা উদ্যাপন করে নিজ নিজ উত্সব—বিহু, সাংক্রাইন ও অন্যান্য।
তিন হাজার বছরের ধারাবাহিক সভ্যতার উত্তরাধিকারী পারস্য বা ইরানের ক্ষেত্রে নববর্ষ উদ্যাপন একইভাবে সর্বজনীন ও আনন্দমুখর। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে দিনটি পালন করা হয়, যা ইউনেসকোর মানবজাতির অমূর্ত ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। নওরোজ উত্সব পালন ফারসি ভাষা, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে এর প্রাচীনত্ব ইতিহাসের আরও গভীরে। জরথুস্ত্রবাদের অনুসারী পারসিক জাতি—যারা অগ্নি-উপাসক হিসেবে পরিচিত—তারাই এই উত্সবের প্রবর্তক। তারপর নওরোজ উদ্যাপনে নানা পরিবর্তন ঘটেছে, তবে নতুন বছরকে আবাহন এবং নতুন জীবন বরণ করার তাগিদ একই মানবিক অনুভূতি হিসেবে রয়ে গেছে। নওরোজ উত্সবের সময় তেহরানসহ ইরানের প্রধান নগরগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। লম্বা ছুটিতে শহরবাসীরা গ্রামে তাদের শিকড়ের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করে। নতুন পোশাক ও ভোজপর্ব ছাড়াও এই দিনে তাঁরা পিতৃপুরুষদের সমাধিস্থলে প্রার্থনা নিবেদন করে। উত্সবের আরও নানা অনুষঙ্গের মধ্যে, বিশেষভাবে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হলো আগুন নিয়ে খেলা, যা নওরোজের জরথুস্ত্রবাদী উৎসের কথা মনে করিয়ে দেয়, তবে ধর্মাচার এখানে ইতিহাসের ধারা ও জাতির আকুতি প্রকাশের তাগিদ থেকে ধর্মনিরপেক্ষ আনন্দ উদ্যাপনের রূপ নিয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জাতীয় উত্সব নওরোজ বা নিজস্ব নববর্ষ পালনে কোনো সমস্যা হয়নি কিংবা ধর্ম ও উত্সব মুখোমুখি অবস্থান নেয়নি।
উৎসব, বিশেষভাবে সর্বজনীন জাতীয় উত্সব, যা চরিত্রগতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ, মানুষের সঙ্গে মানুষের সেতুবন্ধন রচনা করে, সমাজে তার প্রভাব অন্তঃসলিলা ও সুদূরপ্রসারী। আজকের বিশ্ববাস্তবতায় যখন ইরানকে ধ্বংসের জন্য বর্বর সামরিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, তখন ইরান যে বিস্ময়কর প্রতিরোধ ও প্রত্যাঘাতের সবলতা প্রদর্শন করেছে, তা পারসিক সভ্যতার শক্তিময়তা প্রকাশ করে। ইরানের প্রতিরোধ শুধু তার মিসাইল ও ড্রোনের কার্যকারিতা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। বাহ্যিকভাবে যে মোল্লাতন্ত্রের শাসন, সেখানেও এই ঐতিহ্য তারা কখনো ক্ষুণ্ন হতে দেয়নি। অগ্নি-উপাসনা কিংবা পৌত্তলিকতার জের যেমন সংস্কৃতিতে বিদ্যমান, সেটা ইরানে ধর্মীয় নয়, হয়ে উঠেছে রূপ-রূপান্তরের ভেতর দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ সাংস্কৃতিক উপাদান।
নওরোজ বা নববর্ষ পালনের ইরানি রীতি একবিংশ শতকেও বিলীন বা বাতিল হয় না, বরং হয়ে ওঠে আনন্দ প্রকাশের অবলম্বন, যেখানে আমরা সভ্যতার শক্তির উত্স শনাক্ত করতে পারি। আর তাই আজকের ইরানে, জায়নবাদী ধর্মান্ধ উগ্রবাদী ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অমন শক্ত অবস্থানের পরও দেখা যায়, সংখ্যায় ক্ষুদ্র হলেও রয়েছে পারসিক ইহুদিদের অবস্থান। তারা ধর্মে ইহুদি, তবে জাতি হিসেবে ইরানি। ইরানের মোল্লাশাসিত পার্লামেন্টে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদেরও প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। তেহরানে নির্বিচার বোমা হামলা করে বেসামরিক স্থাপনা ও সাধারণজনকে যেভাবে ধ্বংস ও রক্তাক্ত করা হয়েছে, সেই খবরগুলো আমাদের বিচলিত ও ক্ষুব্ধ করেছে সংগত কারণেই। এ হামলার বার্তার মধ্যে একটি ঘটনা সংবাদ হিসেবে বড় জায়গা না পেলেও বিশেষ দৃষ্টি দাবি করে। ইরানি বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, ইসরায়েলি বোমা হামলায় তেহরানে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে ইহুদি উপাসনালয় বা সিনাগগ। এরপর আমরা দেখি ইসরায়েল এ জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। তারা বলেছে, ভুলক্রমে এটা ঘটেছে।
ঘটনাটি আমাদের সামনে ইরানি সভ্যতার সৌন্দর্য মেলে ধরে। নওরোজ উত্সবে যে সৌন্দর্য প্রকাশ পায়, আমরা এখানে তার বাস্তব ভিত্তি দেখি। এমন সমন্বয়বাদী সমাজ গঠনই তো সভ্যতার উদ্দিষ্ট, যেখানে জাতির ছায়াতলে নানা ধর্মের মানুষ সম্প্রীতিতে বাস করে। ইরানের সভ্যতার সেই শক্তির প্রকাশ আমরা দেখেছি জায়নবাদী ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তার প্রতিরোধে, কোনো ইরানি এই যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেও তেহরানের ইহুদি সিনাগগ ধ্বংস করতে উদ্যত হয়নি, সেই ভাবনাও তাদের মনে আসেনি। কেননা শত সমস্যা সত্ত্বেও তারা সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করেন। এর বিপরীতে শুনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুংকার, এক রাতে তিনি গুঁড়িয়ে দিতে পারেন ইরানি সভ্যতা। মোল্লাশাসন নয়, রেজিম নয়, তিনি দিয়েছেন ইরানের সভ্যতা গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি। সভ্যতা ধ্বংসের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে ইরানের সভ্যতার শক্তির স্বীকৃতি দিলেন, আবার নিজেদের বর্বরতারও প্রকাশ ঘটালেন।
আমরা যখন বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করি তখন ইরানি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ হয়েও বাংলার সভ্যতাকে আলিঙ্গন করি এবং ইতিহাসের পরম্পরায় নিজেদের স্থাপন করি। পারস্য ও বাংলাদেশের এই মিল কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। ইতিহাস এখানে সমাজের সভ্যতার সম্মিলন তৈরি করেছে। মধ্যযুগের বাংলায় ফারসি যেমন রাজভাষায় পরিণত হয়েছিল, তেমনি সুলতানি শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে নতুন জোয়ার জেগে উঠেছিল। ফারসি পুরাণ, লোককাহিনি, উদারবাদী সুফি জীবনদর্শন বাংলার মাটিতে ও জনচিত্তে পেয়েছিল আশ্রয়, বাংলা বরণ করেছিল পারস্যের কবি হাফেজকে। ফারসিচর্চার মধ্য দিয়ে হাফেজ বাঙালি মানসে কোন স্থান করে নিয়েছিলেন, তার পরিচয় পাওয়া যায় পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উক্তিতে। পিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘উপনিষদ তাহার ক্ষুধা মিটাইত এবং হাফেজ তাহার তৃষ্ণা।’ বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন হাফেজ-অনুরক্ত। পল্টন-জীবনের ইতি টেনে তরুণ নজরুল ইসলাম যখন করাচি থেকে ফিরে এলেন বাংলায়, তখন তাঁর ঝুলিতে ছিল দুটি বই, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলি আর হাফেজের দিওয়ান।
বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন নওরাজের আলোকে বিচার করলে আমরা নিজেদের দুর্ভাগ্য আরও নিবিড়ভাবে বুঝতে পারব। হাজার বছরের পরম্পরা ধারণ করে বাংলা নববর্ষ পথ চলতে পারেনি, যেমন পেরেছে নওরোজ। ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বাংলা ও বাঙালির জীবন যেমন কোণঠাসা করে ফেলেছিল, তেমনি ঘটেছিল বাংলা নববর্ষের ক্ষেত্রে। নগর থেকে নির্বাসিত হয়েছিল বৈশাখ, টিকে ছিল গ্রামীণ জীবনে, লোকাচারে, মেলায়, খাজনার হিসেবে। মেলা রচনা করে মিলনক্ষেত্র, বাতাসা-মুড়ি-মুড়কির খাদ্যোত্সব, গার্হস্থ্য উপকরণ কেনাবেচা, তার সঙ্গে গান-বাজনা, পাতার বাঁশি, কাঠের বাক্সের বায়োস্কোপে দুনিয়া দেখার আনন্দ আয়োজন।
শহরে ছিল হালখাতা উত্সব, লেনদেন চুকিয়ে নতুনভাবে হিসাব খোলা, নতুন জীবন শুরু করা। প্রায় হারিয়ে যাওয়া বৈশাখ নবপ্রাণ পেল পাকিস্তানি জমানায়, বাঙালির জাতিসত্তা ও জাতীয় অধিকার যখন পিষ্ট হচ্ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসন-শোষণের জাঁতাকলে। এই শাসন ছিল ঔপনিবেশিক ধাঁচের, যে কারণে পদানত জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও জাতিগত অধিকার অস্বীকৃত হয়েছিল গোড়া থেকেই, যার প্রতিফলন ঘটেছিল বহুমাত্রিক বহুভাষিক পাকিস্তান রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষার অধিকার পদদলিত করার প্রয়াসে। এই মানসিকতা বাঙালিত্বের যেকোনো প্রকাশকে সন্দেহের চোখে দেখে, গণ্য করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাব ও ইসলাম-বৈরিতা হিসেবে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, যা জাতীয় প্রতিরোধের রূপ নেয় এবং ক্রমান্বয়ে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে পরিপুষ্টি জুগিয়ে স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রাম তথা মুক্তিযুদ্ধকে সফল করে তোলে। জাতীয় এই জাগরণে বাংলা নববর্ষ আবার ফিরে আসে নগরজীবনে, মূলত ছায়ানটের প্রভাতি বর্ষবরণের সংগীতায়োজন ঘিরে, নতুন এক সর্বজনীন রূপ নিয়ে।
বাংলা নববর্ষ পালন নওরাজের আলোকে বিচার করলে আমরা নিজেদের দুর্ভাগ্য আরও নিবিড়ভাবে বুঝতে পারব। হাজার বছরের পরম্পরা ধারণ করে বাংলা নববর্ষ পথ চলতে পারেনি, যেমন পেরেছে নওরোজ।
ঐতিহ্যের নবায়ন ঘটে যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে সেটা কূপমণ্ডূক কলুষমনা মানসিকতা দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল বারবার। ধর্মের দোহাই দিয়ে ঐতিহ্য অস্বীকারের চেষ্টা যেমন প্রকাশ পেয়েছে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষ উদ্যাপন বাতিল করার প্রয়াসে, তেমনি সংগীতময় প্রভাতি পয়লা বৈশাখকে হিন্দুয়ানি সূর্যবন্দনার প্রকাশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন কেউ কেউ। এসবই জাতি হিসেবে আমাদের বিভ্রম ও হতবিহ্বল অবস্থার প্রতিফলন ঘটায়, যা সম্প্রতি নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রা ঘিরে প্রায় এক কমেডি নাটকের জন্ম দিয়েছে। এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের কাতার থেকে উঠে আসা নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও শিক্ষার্থীরা সূচনা করেছিলেন মঙ্গল শোভাযাত্রার, যা ঐতিহ্যের নবায়নের অনুপম উদাহরণ হয়ে উঠেছে। শোভাযাত্রায় শিল্পিত বিভিন্ন প্রতীক নিয়ে ঢাক-ঢোল-বাদ্যসহযোগে যে আনন্দময় অংশগ্রহণ, তা বহু মানুষকে আলোকিত করে এবং দ্রুতই বর্ষবরণের এই সর্বজনীন ও আনন্দময় উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ে নানা স্থানে নানাভাবে। কিন্তু সমাজে অন্ধতা ও কূপমণ্ডূকতা লালন করতে যারা তত্পর, ইসলামকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারে যারা পারঙ্গম, তাদের অস্বস্তি ছিল এমন সেক্যুলার-জাতীয় উদ্যোগ নিয়ে। বাহ্যিকভাবে ঝকঝকে আধুনিক মানুষদের নিয়ে গঠিত বিগত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার মতো বিষয়ে মনোযোগী হলেও এ ক্ষেত্রে পশ্চাত্পদ চিন্তার পরিচয় দিলেন, ধর্মকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করে যারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চেষ্টা করে তাদের কাছে নত হয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পাল্টে করলেন আনন্দ শোভাযাত্রা। কেননা তাদের বিচারে ‘মঙ্গল’ শব্দটি হিন্দুয়ানি, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশে এমন নামোচ্চারণ ধর্মের বরখেলাপ। শোভাযাত্রার ধর্মসিদ্ধ প্রতীকের খোঁজে তারা মধ্য এশিয়া থেকে আহরণ করেছেন গাধার পিঠে উল্টোভাবে বসা নাসিরউদ্দিন হোজ্জাকে, যিনি তাঁর সারল্য নিয়ে সমাজপতি ও মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সর্বদা ছিলেন সোচ্চার। বাংলাদেশি মোল্লাতন্ত্র তাদের বুদ্ধিহীনতায় নিজেরাই বুঝি এভাবে গাধার পিঠে সওয়ারি। নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার বিভ্রম ঘোচাতে ঘোষণা করেছিলেন মঙ্গল শোভাযাত্রা নামটি পুনর্বহাল হবে, তবে অল্প কিছুকাল পরে সেখান থেকে সরে এসে জানালেন, শোভাযাত্রার নাম হবে বৈশাখী শোভাযাত্রা।
বাংলাদেশে ক্রমপ্রসারমাণ মোল্লাতন্ত্রের আক্রমণে জাতির সুকৃতি ও সম্ভাবনা নানাভাবে বিনষ্ট হচ্ছে। ধর্মের অপব্যাখ্যাজাত এই প্রবণতার পটভূমিকায় স্মরণ করতে পারি কাজী নজরুল ইসলামের পঙ্ক্তি, ‘তোমার বাণীরে করিনি গ্রহণ ক্ষমা কর হজরত।/ …ভিন্ ধর্মীর পূজা-মন্দির, ভাঙিতে আদেশ দাওনি, হে বীর,/ প্রভু আমরা আজিকে সহ্য করিতে পারিনে’ক পর-মত।’
লেখক: প্রাবন্ধিক ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি