আলতাফ: কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ারও অনেক পরে ১৯৮২ সালে বের হলো আপনার প্রথম উপন্যাস ‘তৃষিতা’। বই প্রকাশে এত সময় নিয়েছিলেন কেন?

নোয়ারা: ভুলে গেলে চলবে না, আমি ছিলাম বিবাহিত একজন নারী। আমার স্বামী সৈয়দ শামসুল হক পুরোপুরিভাবে লেখক জীবন বেছে নেওয়ায় আমাকে সংসারের মূল দায়ভার কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল। মিথ্যা বলব না, আমিও খুশি মনে সেই দায় কাঁধে তুলে নিয়েছিলাম। আমি একজন চিকিৎসক। অন্যদিকে সৈয়দ হক ছিলেন একেবারে মুক্ত স্বাধীন। নির্দিষ্ট কোনো চাকরি তিনি করতেন না। আমাকেই সংসারের সবকিছু দেখতে হতো। সংসারে নিয়মিত উপার্জনের তাগিদেই সে সময় আমি নিজের চিকিৎসক ক্যারিয়ার গড়তে বেশি মনোযোগী হয়েছিলাম। ফলে আমার ক্ষেত্রে তখন কোথায় সাহিত্য, কোথায়ই–বা বই বের করা! তা ছাড়া আমার মতো লেখকের বই বের করতে কারই–বা তখন আগ্রহ ছিল? তাই স্বাধীনতার আগে আমার কোনো বই হয়নি। তবে ১৯৭৬ সালে আমি বিদেশে থাকতেই ছানার নানাবাড়ি নামে শিশুদের জন্য আমার একটি বই বেরিয়েছিল। বইটি অগ্রণী সাহিত্য পুরস্কারও পেয়েছিল।

সব সময়ই আমার ভেতরে নিজের লেখালেখি নিয়ে আত্মবিশ্বাস ছিল। ৬৯ বছর বয়সে যখন আমি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলাম, তার বহু আগে থেকেই আমি জানতাম, আমি ভালো লেখক। আমার নিজের পাঠক গোষ্ঠী ছিল। এর চেয়ে বেশি একজন লেখক আর কী চায়? অথচ আমার স্বামী বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন মাত্র ২৯ বছর বয়সে। তখনো তাঁর বিয়ে হয়নি। জীবনে কোনো পুরস্কার না পেলেও আমার আফসোস ছিল না, তবে বিস্ময় থেকে যেত। হয়তো মনে মনে ভাবতাম, আচ্ছা, কী রকম লিখলে মানুষ পুরস্কার পায়? 

আলতাফ: সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে একটা জীবন কাটালেন। স্বামী–স্ত্রী দুজনই আপনারা লেখক। সাধারণত লেখকদের তো এক ধরনের অহম থাকে, নিজস্ব জগৎ থাকে। এ ক্ষেত্রে পরস্পরের লেখালেখি নিয়ে আপনাদের মধ্যে কখনো ব্যক্তিত্বের সংঘাত হয়নি?

আনোয়ারা: এটা আমার কাছে আশ্চর্য একটি প্রশ্ন বলে মনে হয়। কিন্তু এ প্রশ্নের কী উত্তর দেব, তা বুঝতে পারি না। আমি একজন পরিশ্রমী লেখক—এ কথা আস্থার সঙ্গে বিশ্বাস করি। না, সৈয়দ হকের সঙ্গে লেখালেখি নিয়ে কখনো আমার কোনো সংঘাত বা ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব হয়নি। তাঁর লেখার হাত আর মেধাকে আমি খুবই উচ্চমার্গের বলে মনে করি। আজীবন আমার লক্ষ্যই ছিল সৈয়দ হককে লেখক হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। ফলে আমার কাছে নিজের লেখা ছিল গৌণ, তাঁর লেখাই ছিল মুখ্য। সৈয়দ হককে জীবনে পেয়ে আমি বড়ই সন্তুষ্ট ছিলাম। সে জন্য আমার দুঃখই–বা আর কি, হতাশাই বা কী। তিনি লিখতে বসলে আমি যেমন সতর্ক থাকতাম, তাঁকে যেন কোনোক্রমেই কেউ বিরক্ত না করে; তেমনি আমার ব্যাপারেও তিনি ততটাই সতর্ক থাকতেন। সৈয়দ হক আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছেন, যেভাবে যত্ন আর মায়ায় আগলে রেখেছেন, তা কখনো ভুলতে পারব না। আর লেখালেখির অবাধ স্বাধীনতা? সেটা তিনি যেমন আমাকে দিয়েছিলেন, আমিও তাঁকে। সে জন্য আমি একবার নয়, বারবারই সৈয়দ শামসুল হককে আমার জীবনে টেনে আনব।

এই জীবনের ঘাটে ঘাটে তো চ্যালেঞ্জ কম মোকাবিলা করতে হয়নি আমাকে। স্বামী, সংসার, ছেলেমেয়ে, ভাইবোন, দেবর–ননদ—কারও কাছ থেকে খুব একটা সাহায্য পাইনি। যা কিছু সাহায্য তা পেয়েছি হক সাহেবের কাছ থেকেই। একেবারে মৃত্যুর আগে আগে আমাকে তিনি বলেছিলেন, ‘এখন, এই বয়সে এসে দেখছি, আমার জন্য আছ তুমি, আর তোমার জন্য আছি আমি!’ এবং এটাই আমাদের মতো লেখক দম্পতির জীবনের মূলকথা।

আলতাফ: পেশাগতভাবে বাংলাদেশের প্রথম নারী মনোবিজ্ঞানী আপনি। পেশা কি আপনার লেখালেখির জন্য প্রতিবন্ধক, নাকি এটি আপনার সাহিত্যচর্চাকে প্রভাবিতও করেছে?

আনোয়ারা: আমি মনোবিজ্ঞানী নই, মানসিক ব্যাধি বিশেষজ্ঞ। মানসিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরুন সমাজের অনাচার, অবিচার, বিশেষত নারীর প্রতি সহিংসতা স্বচক্ষে দেখেছি আমি। এসব অভিজ্ঞতা অবশ্যই আমার সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু আমি সচেতনভাবেই এগুলো সাহিত্যে নিয়ে আসিনি। সামাজিকভাবে আমি মানুষকে যেভাবে অবলোকন করি, সেভাবে অবলোকন করার চেষ্টা করেছি। সেই সঙ্গে তাদের মনোজগৎটিকেও ধরার চেষ্টা করেছি। 

আলতাফ: প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘বাসিত জীবন’ আখ্যানে সৈয়দ হকের শেষ দিনগুলোর কথা লিখতে লিখতে আপনাদের দাম্পত্যের টুকরো টুকরো ছবিও ধরা পড়েছে। এই বই কেন লিখলেন?

আনোয়ারা: সৈয়দ হকের অন্তিম সময়ে আমার জীবনের সবকিছু ত্যাগ করে তাঁকে যে সঙ্গ দিয়েছিলাম, বাসিত জীবন হলো তার আলেখ্য। এ সময়টুকু আমরা দুজনে গভীরভাবে পরস্পরকে অনুভব করেছি, কেঁদেছি এবং ভালোবেসেছি। পরস্পরের সান্নিধ্যে সময় পার করেছি। তিনি জানতেন, তাঁর অনেক কথা আমি আমার নোটবইয়ে টুকে রাখি। হয়তো তাঁর মনে এ ধারণা ছিল, আমি তাঁর জীবনের এই শেষ সময়টুকু সাহিত্যে ধরে রাখব। অথবা জানতেন কি না, কে জানে! কত কথাই তো তিনি বেঁচে থাকলেও আমি জিজ্ঞেস করতে পারিনি! 

আমাদের নির্জন দ্বীপের মতো এই জীবনেও যে মানুষের প্রেম থাকে, ভালোবাসা থাকে, অতীতের স্মৃতি থাকে—সেইসব কথা ও দৃশ্যগুলোকে এই বইয়ে আমি ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। এটাই বইটি লেখার মূল কারণ। 

আলতাফ: এ মাসেই আপনি ৮২ পার করলেন। দীর্ঘ একটা জীবন কাটানোর উপলব্ধি কী?

আনোয়ারা: দীর্ঘ জীবনটি আমার কাছে এখন এত ছোট্ট বলে মনে হয়, এতটাই হ্রস্ব যে যেন একটি আংটির ভেতর দিয়ে ১২ হাত লম্বা মসলিন শাড়ির বের হয়ে যাওয়ার মতো! তবে যা–ই বলি না কেন, বয়স যে হয়েছে, তা তো অস্বীকার করতে পারব না। আসলে মানুষের ভালোবাসাই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। ভালোবাসার শক্তিতেই আমরা অবিরাম কাজ করে যাই। জীবনে এটাই আমার উপলব্ধি।