আলতাফ: লেখালেখির শুরুর দিনগুলো সম্পর্কে বলুন।

আফসানা: একদিন নাদিন গোর্ডিমারের ‘দ্য আলটিমেট সাফারি’ গল্পটা পড়তে গিয়ে উদ্বাস্তু জীবনের কাহিনিতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার উদ্বাস্তুদের জীবন খুঁজে পেয়েছিলাম। ভাবনা এসেছিল, গল্পটাকে নিজের ভাষায় লিখলে কেমন হয়? তারপর অনুবাদ করতে করতেই লেখালেখি বিষয়টার সঙ্গে সম্পর্ক ঘটে গেল। এরপর অল্প সময়ের ব্যবধানে একদিন ছেলেকে পড়াতে বসিয়ে তার পুরোনো খাতার মধ্যে হুট করে একটা উপন্যাস লেখা শুরু করলাম।

বলতে গেলে, শুরুর সময় থেকেই অনুবাদ, উপন্যাস ও গল্প লেখা সমানভাবে চালিয়েছি। তখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছে অনুবাদের বই, পরপরই মৌলিক উপন্যাসিকা।

আলতাফ: আপনি বললেন, প্রবাসে থাকাকালে আপনার লেখালেখি এবং বই প্রকাশের সূচনা। দীর্ঘ বছর আপনি প্রবাসে কাটিয়েছেন। এ সময় এমন কোনো সংগ্রাম কি আপনার ছিল, দেশে থাকলে যা হয়তো আপনাকে করতে হতো না?

আফসানা: উপযুক্ত বই ও প্রয়োজনীয় তথ্যসমৃদ্ধ পত্রিকার অভাব ছিল। যেকোনো রচনার প্রস্তুতি বা সৃষ্টি পর্বে যে পাঠ জরুরি, তা সময়মতো করতে না পারা ছিল সবচেয়ে বড় সমস্যা। অন্তর্জাল কোনো ক্ষেত্রে সমস্যা সামান্য কমিয়েছিল। তবে বাস্তবে চেনা জনগোষ্ঠীর বাইরে থাকা, আবার তাদেরই বিষয়ে বিচিত্র ভাবনার আনাগোনা একরকমের মানসিক চাপ তৈরি করে, অতৃপ্তি থাকে, যেন ভাবনায় বা লেখায় তাদের ধরতে চাই কিন্তু প্রায়ই ঠিক ধরা পড়ে না।

মৌলিক রচনা ও অনুবাদ আমার কাছে একই রকমের সৃষ্টিশীল কাজ।

আলতাফ: আপনার গল্প-উপন্যাসে বিচিত্রভাবে ফিরে ফিরে আসে নারীর জগৎ। নারীর বাস্তব পৃথিবী শুধু নয়, বিশেষত তাঁর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়-আশয়গুলো যথাসম্ভব সবিস্তার বর্ণনা করতে দেখা যায়। আপনি কি ইচ্ছাকৃতভাবেই বারবার এমনটি করেন?

আফসানা: আমাদের সমাজ নারীবান্ধব নয়। সমাজে নারী ও কন্যাশিশুর মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপদগ্রস্ত থাকা, তাঁর প্রতি নির্যাতন বা সহিংসতা নিয়ে আমি প্রায়ই ভাবি। সমসাময়িক ঘটনাবলির কারণে ভাবতে বাধ্যও হই। ভাবনার ছাপ রচনায় আসা স্বাভাবিক। অন্যদিকে মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। মনোলগ বা ‘স্ট্রিম অব কনশাসনেস’ আমার প্রিয় প্রকাশের ধারা। তাই ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে নারীর জীবন ও মনোলগের মিলন ঘটে হয়তো।

আলতাফ: কোলাহল থামার পরে উপন্যাসে নারীর প্রতি সমাজ ও পুরুষের সহিংস দৃষ্টিভঙ্গি বেশ বড়ভাবে এসেছে। এসেছে এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের সংস্কৃতির পার্থক্য আর জীবনযাপনের ধরনগুলো। আর এসবই চিত্রায়িত হয়েছে মণি নামের এক নারীর চোখ দিয়ে। এই যে নারীকে কেন্দ্রে রেখে তাঁর সঙ্গে দেশীয় ও বৈশ্বিক ঘটনা-পরিস্থিতির তুলনা—এমন বর্ণিল ক্যানভাসে কেন উপন্যাসটি লিখলেন? এর সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কোনো যোগসূত্র আছে কী?

আফসানা: দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার কারণে নিজের ও প্রবাসের সংস্কৃতির পার্থক্যের বিষয়টি গভীরভাবে ভাবতাম। দৈনন্দিন জীবনে ছোট–বড় নানান পার্থক্য চোখে পড়ত। মানুষের ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি আর আচারের পার্থক্যের পেছনে তার বেড়ে ওঠা আর সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির সম্পর্ক অবাক হয়ে লক্ষ করতাম। পাশাপাশি উপলব্ধি করতাম, যত সভ্যই হোক না কেন, অনেক দেশই কমবেশি নারী বা শিশু নির্যাতনের বাইরে নেই, যেমন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ছয়জন নারীর মধ্যে একজন ধর্ষণের শিকার হন। আবার এ–ও বিশ্বাস করি, পৃথিবীজুড়ে ব্যাপক নারী নির্যাতন হয় বলে প্রত্যেক পুরুষ নির্যাতনকারী নন। এসব নিয়ে এলোমেলো ভাবনার কোনো এক পর্যায়ে উপন্যাসটি লিখতে শুরু করি। লিখতে গিয়ে বিচিত্র সংস্কৃতিকে ভেতর থেকে দেখার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাতে জুড়ে দিই বৈকি।

এ ছাড়া একদিন অচেনা একটি মেয়ে ফোন করে বলছিল, কৈশোরে বাড়িতে সে ঠিক এ রকম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। তারপর সবকিছু ছাপিয়ে একদিন জীবনে প্রতিষ্ঠিতও হয়। ওই মেয়ের ভোগান্তির বর্ণনা করা কান্নাভেজা কণ্ঠটি প্রায়ই মনে পড়ে।

আলতাফ: এই উপন্যাসের প্রকাশ থেকে শুরু করে প্রকাশ-পরবর্তী এমন কোনো ঘটনা কি আছে, যেটি আপনার মনে দাগ কেটেছে?

default-image

আফসানা: উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি তৈরির পরেও জানতাম না কোন প্রকাশনী থেকে প্রকাশ হতে পারে। এ রকম একটা সময়ে ঔপনিবেশিক শাসকের খেলা ক্রিকেট কী করে উপনিবেশের শোষিতের খেলা হয়ে উঠল, এ নিয়ে আমার একটি রচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম আলো সম্পাদক শ্রদ্ধেয় মতিউর রহমান—মতি ভাই আগ্রহ নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করেন। অত্যন্ত অপ্রত্যাশিতভাবে তিনি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি প্রথমা প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করার প্রস্তাব দেন। পূর্বপরিচয়বিহীন ও প্রায় নতুন লেখক হিসেবে এই সুযোগ আমার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও সৌভাগ্যের। এরপর প্রয়াত অরুণ বসুর সম্পাদনা ও শিল্পী মাসুক হেলালের প্রচ্ছদে বইটি প্রকাশিত হওয়া ছিল বড় ব্যাপার। তুলনামূলক নতুন লেখক হিসেবে উপন্যাসটির প্রকাশনাসংক্রান্ত পুরো ঘটনাটি এখনো আমার কাছে কল্পনার মতো সুন্দর স্মৃতি, যা কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করি।

আলতাফ: গল্প-উপন্যাসসহ আপনি যেমন মৌলিক লেখা লেখেন, তেমনি অনুবাদও করেন দেদার। দুটোই পরিশ্রমসাধ্য কাজ। তবে দুটি কাজের মধ্যে যদি তুলনা করতে বলা হয়, সে ক্ষেত্রে কী বলবেন?

আফসানা: মৌলিক রচনা ও অনুবাদ, দুটো কাজই আমি সমান উপভোগ করি। দুটোর জন্য আলাদাভাবে সময় নির্ধারণ করতে হয়, সেদিকে নজর রাখি। মৌলিক রচনা ও অনুবাদ আমার কাছে একই রকমের সৃষ্টিশীল কাজ। চিরায়ত সাহিত্য অনুবাদে লেখকের মনস্তত্ত্ব অনুসরণ করার সুযোগ ঘটে, যা আমাকে মৌলিক লেখায় সাহায্য করে।

আলতাফ: এখন কী লিখছেন? লেখালেখি নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

আফসানা: একটি উপন্যাসকে পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করছি। পাশাপাশি টুকটাক অনুবাদ করি, গল্প কিংবা সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে লিখি। আর লেখালেখি নিয়ে পরিকল্পনা হলো কেবল লিখে যাওয়া।

বইটি পাওয়া যাচ্ছে

prothoma.com এবং মানসম্মত বইয়ের দোকানে। দাম: ৩০০ টাকা।

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন