নিতুন কুন্ডুর নকশায় প্রথম স্বাধীনতা দিবসের ডাকটিকিট
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর, শিল্পী নিতুন কুন্ডুর ২০তম প্রয়াণ দিবস। চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্পপতি—সব ছাপিয়ে তিনি ছিলেন এক স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষ, যিনি শিল্পকে ভালোবেসেছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তিনি ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বাধীনতা দিবসের ডাকটিকিটের নকশাকার।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই তৎকালীন মুজিবনগর সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশের নামে ডাকটিকিট প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। এই লক্ষ্যে সরকার গঠিত ডাকটিকিট কমিটিতে পটুয়া কামরুল হাসানের পাশাপাশি নিতুন কুন্ডুকে অন্যতম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অবশ্য যুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটের মূল নকশাকার ছিলেন বিমান মল্লিক, যিনি ছিলেন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী একজন ভারতীয় বাঙালি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভারত সরকার স্বপ্রণোদিতভাবে একটি ডাকটিকিট নকশা ও মুদ্রণ করে বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে প্রদান করে।
এরপর ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ—বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে। এবারই প্রথম একজন সার্বভৌম ও স্বাধীন দেশের নাগরিক তথা প্রথিতযশা শিল্পী হিসেবে নিতুন কুন্ডুর ওপর অর্পিত হয় ডাকটিকিট নকশা করার গুরুদায়িত্ব।
বাংলাদেশ ডাক বিভাগের প্রথম মহাপরিচালক এ এম আহসান উল্লাহ তাঁর স্মৃতিচারণামূলক গ্রন্থ ‘বাংলাদেশের ডাকটিকেট আদি ইতিহাস ও কিছু প্রাসংগিক কথা’-তে লিখেছেন:
‘ ...শুরুতে ডাকটিকিট প্রকাশ নিয়ে বড়ই বিব্রত অবস্থায় পড়ি। কেননা কোন কিছুই আমাদের নেই। আর্টিস্ট, ডিজাইনার, সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস ইত্যাদির কোন কিছুরই হদিস নেই। এই সকল সমস্যা সমাধান একদিনে হবারও নয়। কাজেই ধাপে ধাপে এর সমাধান করার লক্ষ্যে প্রথমে একটি ডাকটিকিট উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করি এবং সেই পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করি একজন শীর্ষস্থানীয় শিল্পী, একজন ডাকটিকিট অনুরাগী সংসদ সদস্য, একজন চিন্তাবিদ এবং সেই সংগে ডাক বিভাগ প্রধান। শুরুতে তারা ছিলেন সর্বজনাব কামরুল হাসান, আশরাফ আলী চৌধুরী, ড. নীলিমা ইব্রাহীম, আব্দুস সালাম এবং আমি নিজে। জনাব কামরুল হাসানের সৌজন্যে আরও কিছু খ্যাতনামা শিল্পীর সহযোগিতা পাই এ ব্যাপারে যেমন জনাব কাইয়ুম চৌধুরী, নিতুন কুণ্ডু।...সবার মিলিত প্রচেষ্টায় ডাকটিকিট প্রকাশনার কাজ ধাপে ধাপে এগুতে থাকে।’
স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকী উপলক্ষে নিতুন কুন্ডু যে ডাকটিকিটটি প্রস্তুত করেন, তা ছিল মূলত পোস্টার ঢঙে আঁকা। এর মূল নকশায় ছিল সংগ্রামের অমর প্রতীক হিসেবে প্রজ্বলিত একটি মশাল। একই নকশা ব্যবহার করে তিনটি ভিন্ন রঙে ডাকটিকিটগুলো প্রকাশ করা হয়—লাল রঙের ২০ পয়সা, নীল রঙের ৬০ পয়সা এবং বেগুনি রঙের ৭৫ পয়সা মানের ডাকটিকিট। নিতুন কুন্ডুর মুক্তিযুদ্ধকালীন পোস্টারের সাথে এই ডাকটিকিটের নকশার এক অপূর্ব সামঞ্জস্য ছিল; মনে হতো যুদ্ধক্ষেত্রের সেই চেতনা যেন ডাকটিকিটের ফ্রেমে এসে নতুন স্বাধীন দেশের দিগন্ত উন্মোচন করছে।