কোন দিকে হাঁটতে পারে এ বছরের সাহিত্য

২০২৪ সালে বিশ্বসাহিত্যের গতিপ্রকৃতি কোন পথে? পাঠকসহ কেমন হতে পারে লেখকদের প্রবণতা? বিভিন্ন গণমাধ্যম ঘেঁটে লিখেছেন মারুফ ইসলাম

কোলাজ: আপন েজায়াদ৴ার

শিল্প-সাহিত্য নিয়ে শতভাগ সঠিক পূর্বানুমান হয় না। কে বলতে পারে কোন দিকে মোড় নিতে পারে সাহিত্যের দুনিয়া? কোন জনরা দাপিয়ে বেড়াবে এ বছরের সাহিত্যের মাঠ! আদতে কেউই সুনির্দিষ্টভাবে এসব বিষয়ে বলতে পারে না।

তবু অতীত অভিজ্ঞতা, পাঠকের প্রবণতা, রুচির বদল, বই বিক্রির বাজার পরিসংখ্যান ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে খানিকটা পূর্বানুমান তো করাই যায়। যেমন সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর সাংবাদিক ও লেখক আরভিন সার্জো বলেন, বেস্টসেলার বই, আলোচিত-সমালোচিত বই ও বোদ্ধা-সমালোচকদের নজরে পড়া বইয়ের তালিকা দেখলে আগামীর সাহিত্যপ্রবণতার কিছুটা আন্দাজ করা যায়।

আজ থেকে এক যুগ আগে কিন্ডল ও ই-বুক মানুষের নজরে পড়তে শুরু করেছিল। তখনই বোঝা গিয়েছিল, কিন্ডল ও ই-বুক সামনের দিনে আরও জনপ্রিয় হবে। ২০২৪ সালের উঠানে পা দিয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ই-বুক ও কিন্ডল সত্যিই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

২০১৪ সালে ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। আর ২০১৬ সালে সাহিত্যের দুনিয়ায় আলোচনায় আসে অডিও বুক। সাহিত্যের এ দুটি উপকরণই এখন পাঠকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।

এরপর ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময়ে সাহিত্যের দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে ‘বুকটক’। জনপ্রিয় ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটকে বইকেন্দ্রিক আলোচনাকে বলা হয় বুকটক। যাঁরা এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাঁদের বলা হয় ‘বুকটকার’।

বুকটকের পর ২০২২ সালের শেষ থেকে আলোচনায় আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চ্যাটজিপিটি, যা পুরো ২০২৩ জুড়েই ছিল আলোচনায়।

এখন স্বাভাবিকভাবেই বইপ্রেমীদের মহলে প্রশ্ন উঠেছে, ২০২৪ সালে সাহিত্যের প্রবণতা কী হতে পারে?

বিগত কয়েক বছরের প্রবণতা লক্ষ করলে একটা বিষয় পরিষ্কার বোঝা যায়, সাহিত্যের প্রবণতাগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে প্রযুক্তি। যেমন গত তিন-চার বছরে টিকটক, ফেসবুক, ইউটিউবে যে বইগুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, সেই বইগুলোই উঠে এসেছে বেস্টসেলার তালিকায়। 

গত বছর থেকে তুমুল আলোচনায় রয়েছে চ্যাটজিপিটি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। বই লেখা ও অডিও বুক তৈরি করা থেকে শুরু করে বইয়ের প্রচার, বিপণন ও ব্যবসায়িক উন্নয়ন—সব ক্ষেত্রে এআই প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। এআই ও চ্যাটজিপিটির এ উত্থানে শঙ্কিত হয়ে রাস্তায় আন্দোলন পর্যন্ত করেছেন হলিউডের চিত্রনাট্যকারেরা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ২০২৪ সালে কি চ্যাটজিপিটি সাহিত্যের দুনিয়ায় আরও প্রভাববিস্তারী হয়ে উঠবে? আগের বছরের প্রবণতা থেকে অনুমান করা যায়, হ্যাঁ, প্রভাববিস্তারী হয়ে উঠতে পারে।

এবার একটু প্রযুক্তির বাইরে নজর দেওয়া যাক। আর কী কী বদল আসতে পারে সাহিত্যের দুনিয়ায়? 

উত্থান হবে ‘রোমান্টাসি’ ঘরানার বইয়ের

এ বছর রোমান্টিক ও ফ্যান্টাসি ঘরানার বইয়ের জনপ্রিয়তা বাড়বে বলে মনে করছেন সাহিত্যবোদ্ধারা। এ দুই জনরা বা ঘরানাকে একসঙ্গে বলা হচ্ছে ‘রোমান্টাসি’। উত্তর আমেরিকাভিত্তিক সাহিত্য ম্যাগাজিন বুক রায়ট-এর প্রধান নির্বাহী জেফ ও’নিল বলেন, এ বছর সাহিত্যের বাজারে প্রলয় ঘটাবে রোমান্টিক ও ফ্যান্টাসি উপন্যাস। বুকটকের প্রবণতা অন্তত সে রকমই আভাস দিচ্ছে।

কদর বাড়বে সহজবোধ্য রহস্যগল্পের

করোনা-উত্তর পৃথিবীতে সহজবোধ্য রহস্য ঘরানার উপন্যাসের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। খুব দ্রুত পাঠকদের প্রিয় হয়ে উঠেছে আর্সেনিক ও অ্যাডোবো এবং মোস্ট অ্যাগ্রিয়েবল মার্ডার-এর মতো সহজবোধ্য রহস্য উপন্যাসগুলো।

সহজবোধ্যতা এখন অন্যান্য জনরাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। যে উপন্যাস যত সহজ হচ্ছে, সেই উপন্যাস তত জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। বুক রায়ট–এর সম্পাদক ড্যানিকা এলিস বলেন, রহস্য, সাই-ফাই, ফ্যান্টাসি কিংবা সামাজিক উপন্যাস—সব জনরাতেই এখন সহজবোধ্যতা খোঁজে পাঠক। যে গল্প সহজে বোঝা যায়, সহজে পড়া যায়, মাথায় কোনো চাপ সৃষ্টি করে না, গভীর ও জটিল কোনো ভাবনায় ফেলে দেয় না, সেই গল্পই পাঠক লুফে নেয়। এই প্রবণতা করোনা–উত্তর সময়ে আরও প্রকট হয়েছে।

আধিপত্য ধরে রাখবে কল্পবিজ্ঞান ও থ্রিলার

থ্রিলার ঘরানার উপন্যাসের রমরমা এখন সারা দুনিয়ায়। এর সঙ্গে রয়েছে কল্পবিজ্ঞান। এ দুটি জনরা নতুন বছরেও পাঠকের পছন্দের তালিকায় থাকবে বলে মন করেন মার্কিন লেখক জুলিয়া রিটেনবার্গ। তিনি বলেন, থ্রিলার ও বিজ্ঞান কল্পকাহিনির চাহিদা সহসা ফুরোবে না। লেখক যদি কাহিনির মধ্যে চমৎকারিত্ব আনতে পারেন, তবে পাঠক সেই গল্প লুফে নেবেনই।

বই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোতে কাজ করেন অ্যালিসন হার্টফিল। তিনি বলেন, ‘আমি অনেক পাঠককে দেখেছি, যাঁরা আগে শুধু জটিল, ভারী আর গুরুগম্ভীর সাহিত্য পড়তেন, তাঁরা এখন তথাকথিত হালকা সাহিত্যের উপন্যাসের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। আমার মনে হয়, সারা বিশ্ব যে একটা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার প্রভাব পড়েছে পাঠকদের মনের ওপরেও। তাঁরা এখন আর গুরুগম্ভীর বিষয়বস্তু সানন্দচিত্তে গ্রহণ করতে পারছেন না।’

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উল্লম্ফন অব্যাহত থাকবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অব্যাহত জোয়ার ২০২৪ সালকেও প্লাবিত করবে বলেই ধারণা করা যায়। মার্কিন প্রকাশক নাওমি রোজেনব্ল্যাট বলেন, ‘নতুন বছরে আমরা অনেক বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠাতেই সম্ভবত “বইটি একজন মানবলেখক ও চ্যাটজিপিটির সহায়তায় রচিত” এমন লেখা দেখতে পাব।’

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন মার্কিন লেখক ক্লোই ব্রিটেন। তাঁর ভাষ্য, ‘নতুন বছরে সাহিত্যের দুনিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একটি বিশাল প্রবণতা হয়ে উঠবে। তবে ফিকশন লেখকদের জন্য একটু আশার কথা হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্ভবত ফিকশনের দুনিয়ায় খুব একটা আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে না। তার যাবতীয় জারিজুরি নন–ফিকশনের ক্ষেত্রে। ইতিমধ্যে অ্যামাজন প্ল্যাটফর্মে আমরা অনেক নন–ফিকশন বই বেস্টসেলার হতে দেখেছি, যেগুলো লেখা হয়েছে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে।’

কী হতে পারে লেখকদের প্রবণতা
পাঠকদের প্রবণতা সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়ার পর এ বছর বিশ্বজুড়ে লেখকদের প্রবণতা কী হতে পারে, সেদিকে একটু নজর দেওয়া যাক

স্ব-উদ্যোগে বই প্রকাশ বাড়বে

স্ব-উদ্যোগে ও স্ব-অর্থায়নে বই প্রকাশের প্রবণতা আগের চেয়ে বাড়বে। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘সেলফ পাবলিশিং’। বিপণনবিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ব্লার্ব জানিয়েছে, সেলফ পাবলিশিংয়ে বাজারটি প্রতিবছর গড়ে ১৭ শতাংশ বিকশিত হচ্ছে। অ্যামাজন প্ল্যাটফর্মে স্ব-উদ্যোগে লেখা বইয়ের লেখকদের সংখ্যা বাড়ছে। যাঁরা স্ব-উদ্যোগে বই প্রকাশ করেন, তাঁদের জন্য ‘কেডিপি’ নামের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিয়েছে অ্যামাজন। সেখানে বর্তমানে দুই হাজারের বেশি লেখক রয়েছেন। ২০২২ সালে কেডিপি থেকে লেখকেরা এক লাখ ডলারের বেশি উপার্জন করেছেন। আর শুধু উপার্জনই নয়, সম্মান ও স্বীকৃতিও মিলছে স্ব-উদ্যোগে প্রকাশিত বইয়ের লেখকদের।

স্ব-উদ্যোগে সবচেয়ে বেশি বই প্রকাশ করছেন নারী লেখকেরা। ব্লার্ব এক গবেষণায় দেখিয়েছে, স্ব-উদ্যোগে প্রকাশিত বইয়ের ৬৭ শতাংশই নারীদের লেখা।

লেখকদের এআই-নির্ভরশীলতা বাড়বে

‘দ্বার রুদ্ধ করে দিয়ে প্রযুক্তিটারে রুখি’ যেহেতু বলার উপায় নেই, সেহেতু লেখকেরা প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন—এটাই স্বাভাবিক। ফলে বানান সংশোধন, সম্পাদনা, তথ্য বিশ্লেষণ, তথ্য সংগ্রহ, গল্পের প্লট সংগ্রহ, বইয়ের বিপণন ও প্রচারের কাজে এ বছর থেকে আমরা লেখকদের আরও বেশি এআই ব্যবহার করতে দেখব বলে মনে হয়।

সংক্ষিপ্ত কনটেন্টের প্রতি ঝোঁক

মহামারি, যুদ্ধ, দ্রব্যমূল্যের হাঙ্গামা, প্রযুক্তির থাবা, বিনোদনের বিপুলতা, অডিও বুক, ই-বুক, পিডিএফ ইত্যাদি অস্থিরতার মধ্যে বাস করে গভীর অভিনিবেশে দীর্ঘ কলেবরে কিছু লেখা লেখকদের জন্য খুবই দুঃসাধ্য ব্যাপার। ফলে ছোট ছোট ধারাবাহিক গল্প, জেন গল্প ধরনের গল্প, ফেসবুক পোস্টের মতো ছোট আকারের লেখা কিংবা ফ্ল্যাশ ফিকশনের প্রতি লেখকেরা আরও বেশি আকৃষ্ট হবেন।

লেখকদের মার্কেটিং–প্রীতি

নীরবে-নিভৃতে বসে বসে শুধু লিখে যাওয়ার ধারণা থেকে লেখকেরা গত কয়েক বছরের মধ্যে বেরিয়ে এসেছেন। এখন প্রত্যেক লেখকের হাতের মুঠোয় ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, হোয়াটসঅ্যপ, ই–মেইল। এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে লেখকেরা এরই মধ্যে নিজেদের বই ও লেখালেখির মার্কেটিং করতে শুরু করেছেন। এ বছর বিশ্বজুড়ে প্রবণতাটি যে আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে, তা হলফ করেই বলা যায়।