মাহবুব তালুকদারের সত্য বয়ান
২৪ আগস্ট প্রয়াত হয়েছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার, কবি ও কথাসাহিত্যক মাহবুব তালুকদার। তাঁকে শ্রদ্ধা
সাবেক নির্বাচন কমিশনার কিংবা আমলা নামের মধ্যে কি লেখক-কবি মাহবুব তালুকদার হারিয়ে গেলেন? বেশির ভাগ গণমাধ্যম সাবেক নির্বাচন কমিশনার হিসেবে তাঁর পরিচয় দিয়েছে।
অথচ মাহবুব তালুকদারের লেখালেখির বয়স ছয় দশকের বেশি। ষাটের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় মাহবুব তালুকদার লেখালেখি শুরু করেন। কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছেন। শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন।
১৯৭১ সালের মার্চে যখন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল, তখন তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনিও তাতে সক্রিয় অংশ নেন এবং মুজিবনগর সরকারের তথ্য বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালে তাঁর উপন্যাস ক্রীড়নক প্রকাশিত হয়। প্রথম কবিতার বই জন্মের দক্ষিণা বের হয় ১৯৭৩ সালে। এরপর তিনি নিয়মিত লিখেছেন গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, কবিতা, রসরচনা, স্মৃতিকথা। পত্রিকায় কলামও লিখতেন। তাঁর বইয়ের সংখ্যা ৪০টির বেশি।
নির্বাচন কমিশন থেকে বিদায় নেওয়ার পর কয়েকবারই তাঁর সঙ্গে আলাপ হয় লেখালেখি নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ১২০০ পৃষ্ঠার বই লিখেছেন নির্বাচননামা নামে। তাঁর মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল, জীবদ্দশায় বইটি প্রকাশ করা ঠিক হবে কি না। এরই মধ্যে গত বুধবার দুপুরে সংবাদ এল, মাহবুব তালুকদার আর নেই। বইটি তিনি দেখে যেতে পারলেন না।
স্বাধীনতার পর মাহবুব তালুকদার আর শিক্ষকতায় ফিরে যাননি, সরকারি চাকরিতেই স্থায়ী হয়ে গেলেন। তিন দশক আমলাতন্ত্রের ভেতর থাকলেও তিনি পুরোপুরি ‘আমলা’ হতে পারেননি। বহিরাগত থেকে গেছেন, যার অম্ল-মধুর বিবরণ আছে তাঁর লেখা আমলার আমলনামা বইয়ে।
মাহবুব তালুকদারের সরকারি চাকরিতে প্রবেশ অনেকটা আকস্মিকভাবে। তিনি একদিন বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন পুরোনো বন্ধু সৈয়দ শাহজাহানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে; যিনি তখন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের জনসংযোগ কর্মকর্তা। তিনি এই পদে থাকবেন না; রাজনীতি করবেন। বললেন, মাহবুব তালুকদার চাইলে পদটি নিতে পারেন।
১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে নিজের রাষ্ট্রপতি পদ ছেড়ে প্রধানমন্ত্রী হন। নতুন রাষ্ট্রপতি হন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তাঁর আগ্রহেই মাহবুব তালুকদার বঙ্গভবনে স্পেশাল অফিসার হিসেবে পদায়িত হন। সেই থেকে পাঁচ বছর তিনি বঙ্গভবনে ছিলেন—কখনো রাষ্ট্রপতির জনসংযোগ কর্মকর্তা, কখনো স্পেশাল অফিসার, কখনো উপপ্রেসসচিব, আবার কখনো ওএসডি হিসেবে।
মাহবুব তালুকদার বঙ্গভবনে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা বয়ান করেছেন বঙ্গভবনে পাঁচ বছর বইয়ে। এটি একটি অসাধারণ স্মৃতিচারণামূলক বই। এতে ক্ষমতার অন্দরমহলের অনেক অজানা ঘটনার পাশাপাশি সেই সময়ের ক্ষমতালিপ্সু ও সুবিধাবাদী রাজনীতিক, সামরিক–বেসামরিক আমলাদের চরিত্রও উন্মোচিত হয়েছে।
লেখক হিসেবে মাহবুব তালুকদার কারও সম্পর্কে কোনো কঠোর ভাষা ব্যবহার না করেও কঠিন কথাগুলো বলে দিয়েছেন। বঙ্গভবনে পাঁচজন রাষ্ট্রপতির অধীনে তিনি কাজ করেছিলেন—বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, মোহাম্মদ উল্লাহ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় পেয়েছিলেন আবু সাঈদ চৌধুরীকে। পেশাগত সম্পর্কের বাইরেও মাহবুব তালুকদারের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সখ্য গড়ে উঠেছিল।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক অনেক বিষয়ে তাঁদের বিরোধ ছিল। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিষয়েও তাঁর আপত্তি ছিল। মাহবুব তালকদার তাঁর বইয়ে কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন। একবার অনশনরত মাওলানা ভাসানীকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেও আবু সাঈদ চৌধুরী যেতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর সম্মতি না পাওয়ায়। ভাসানী ছিলেন আবু সাঈদ চৌধুরীর বাবার বন্ধু। এ ঘটনায় তিনি খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে সরকার পি-ও ৯ নামে যে অধ্যাদেশ জারি করে, তাতে আবু সাঈদ চৌধুরীর সায় ছিল না। তৎকালীন আইনমন্ত্রী তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন, অযথা কাউকে হয়রানি করা হবে না। কিন্তু পরে হয়রানি হয়েছে। ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে গাড়ি নিয়ে মধুর ঝগড়ার কথাও উল্লেখ করেছেন মাহবুব তালুকদার। বঙ্গভবন থেকে একটি সাদা ক্যাডিলাক গাড়ি বঙ্গবন্ধুকে দেওয়া হয়েছিল। ২৪ জানুয়ারি একটি ছোট গাড়িতে করে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে বিষয়টি তাঁর নজরে আসে। তিনি সাদা ক্যাডিলাক গাড়িটি রাষ্ট্রপতিকে ফেরত দেন। প্রত্যুত্তরে রাষ্ট্রপতি চিঠি লিখে গাড়িটি বঙ্গবন্ধুকে ব্যবহার করার জন্য অনুরোধ করেন। পরে তাঁরা কেউই সেটি ব্যবহার করেননি। এভাবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পরস্পরকে সম্মান করতেন। আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি পদে ইস্তফা দেন।
আবু সাঈদ চৌধুরীর পর রাষ্ট্রপতি হন মোহাম্মদ মাহমুদউল্লাহ। তাঁর সময়ে বঙ্গভবনে কর্মকর্তাদের তেমন কাজ ছিল না। বঙ্গবন্ধুর উপপ্রেসসচিব হিসেবে মাহবুব তালুকদার দায়িত্ব পালন করেন ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত। দাপ্তরিক কাজের বাইরে তিনি বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী লেখার কাজও করছিলেন। এই কাজে আরও যুক্ত ছিলেন প্রেসসচিব তোয়াব খান ও সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। বঙ্গবন্ধু বলতেন, তা রেকর্ড করা হতো। পরে মাহবুব তালুকদার সেটি অনুলিখন করতেন। তাঁর আফসোস, ১৪ আগস্ট পাণ্ডুলিপি গণভবনে রেখে বাসায় এসেছিলেন, পরে আর ফিরে পাননি।
১৫ আগস্ট–পূর্ববর্তী পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে মাহবুব তালুকদার লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লবের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করতে সমবেত হলো আবালবৃদ্ধবনিতা, রাজনীতিক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ক্রীড়াবিদ, কৃষক–শ্রমিকসহ সকল পেশাজীবী মানুষ। তারা মিছিল করে, নৃত্য করে, বাদ্য বাজিয়ে, উল্লাস করে বঙ্গবন্ধুকে অভিনন্দন জানালেন প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও। কিন্তু ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তারা ৩৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেলেন। অনেকেই নতুন সরকারের সঙ্গলাভে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।’
বঙ্গভবনে পাঁচ বছর বইয়ে মাহবুব তালুকদার নিজের কথা বেশি না বলে সেই সময়ের চরিত্রগুলোর ইতি-নেতি তুলে ধরেছেন ছোট ছোট ঘটনায়। বিশেষ করে ১৫ আগস্টের আগে ও পরে তাঁদের কে কী ভূমিকা রেখেছেন, কারা ৩৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছেন, তারও বর্ণনা আছে বইয়ে।
মোশতাক রাষ্ট্রপতি হওয়ার কয়েক দিন পর মাহবুব তালুকদার ওএসডি হন। ওএসডি শাস্তিরই অংশ। কিন্তু মোশতাকের শাসন টিকে ছিল মাত্র ৮৩ দিন। এরপর বঙ্গভবনে একাধিকবার ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, মাহবুব তালুকদার যার একজন নীরব দর্শকমাত্র।
লেখক ছিলেন বলেই মাহবুব তালুকদার সব সময় স্রোতে গা ভাসিয়ে দেননি। তিনি যখন নির্বাচন কমিশনে ছিলেন, অনেকবার মনোবেদনার কথা বলেছেন। শেষ দিকে তাঁর ভেতর ভীষণ অস্থিরতা লক্ষ করতাম। খুবই আবেগপ্রবণ মানুষ ছিলেন তিনি। অনেক সময় তাঁর বিরুদ্ধেও লিখেছি। তিনি টেলিফোন করে বলতেন, ‘আমি তো চেষ্টা করেছি। ওদের চরিত্র উন্মোচন করছি। এর চেয়ে বেশি কী করতে পারি?’
মাহবুব তালুকদার বাংলাদেশে সত্যিকার গণতন্ত্র দেখতে চেয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালের ১১ নভেম্বর দিনলিপির পাতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘গণতন্ত্র তুমি আজ কত দূরে।’ আজ ৪৬ বছর পরও সেই প্রশ্ন করা নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবে না। অগ্রজ লেখক-কবি মাহবুব তালুকদারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।