তানজিনা হোসেনের লেখাটি তথ্যবহুল, অনুসন্ধানী। তিনি লিখেছেনও চমৎকার, পেশায় তিনি ডায়াবেটিস-বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ফলে জীবনানন্দ দাশের ট্রাম দুর্ঘটনা, অন্যমনস্কতা, তাঁর ডায়বেটিস রোগ ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং হাসপাতালে মৃত্যু নিয়ে তাঁর লেখাটি প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক। কিন্তু লেখাটি শেষ পর্যন্ত বিষয়-গভীরে যেতেই পারল না। কিছু মানুষ বিখ্যাত হয়ে গেলে তাঁকে নিয়ে নানারকম মিথ ও গল্প চালু হয়ে যায়, যার বেশির ভাগই শোনা ও অদেখা। জীবনানন্দও এই মিথের নায়ক হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন। 

১৪ অক্টোবর বিকেলে কবির জীবনে কী ঘটেছিল, এর প্রমাণে তানজিনা বেশ কিছু সূত্র ব্যবহার করেছেন। সেসব সত্য, তবে প্রাথমিক ও ভাসা ভাসা। এই সূত্রগুলো পুরো লেখাটির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।

ট্রামের ক্যাচার থেকে যিনি জীবনানন্দকে টেনে বের করেছিলেন, তিনি চুনিলাল দেব নন, দে। সেদিন ‘জলখাবার’ দোকানের সামনের পরিবেশটা কেমন ছিল, আলো ও অন্ধকারের রং কীভাবে পড়েছিল, আমি তার কিছুটা অনুসন্ধান করেছি। জীবনানন্দ বাড়িতে ফিরছেন, দুহাতে ডাব; বাড়িতে ফিরে তিনি আবার হাঁটতে বেরোবেন তাঁর সান্ধ্যভ্রমণসঙ্গী সুবোধ রায়ের সঙ্গে; কিছুক্ষণ আগেই বাড়ি থেকে বেরোবার মুখে কথা হয়ে গেছে। সুবোধ ১৮৩ থেকে কয়েকটা বাড়ি পরেই নিজের বাড়ি গেলেন, খানিক পরেই এসে পড়বেন; এই ফাঁকে জীবনানন্দ একাই বেরিয়েছিলেন, ফিরছেন; রাস্তার উল্টো দিকে দেশপ্রিয় পার্ক, তার উল্টোদিকে বাড়ি। রাস্তা পেরোতে গিয়েই সব তছনছ হয়ে গেল। 

ঘটনা এটুকুই। তানজিনার উল্লেখকৃত সূত্র অভ্রান্ত। কিন্তু সেই বিকেলের ঘটনা নিয়ে জীবনানন্দ দাশের নিজের কী ভাষ্য ছিল? ‘জীবনধারণপ্রক্রিয়ায় ব্যতিব্যস্ত, অচরিতার্থ দাম্পত্যের গ্লানিতে বিপর্যস্ত, মৃত্যুচিন্তা যাঁর কবিতায় সতত উৎসারিত আত্মহত্যা, অন্যমনস্কতা, মগ্নস্বভাবের মতো বিষয়গুলো প্রথমে আমাদের মাথায় আসে।’ তানজিনা লিখছেন। হাঁটতে গিয়ে রক্তের শর্করা কমে যাওয়ার কথাও বলেছেন। তিনি তো ছোটবেলা থেকেই হাঁটতেন, ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পরে হয়েছিলেন নিয়মিত। বাস্তবে এসব ব্যাপার একদমই কবিকে ট্রামের তলায় নিয়ে যায়নি। বরং ওই বছরের শুরুতে কবি রাইটার্স বিল্ডিংয়ে গিয়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলেন, সেই প্রসঙ্গ তিনি পাড়তে পারতেন। স্বেচ্ছায় বা উদাসীনতায় ট্রামের তলায় পড়ার কোনো কারণ তাঁর ছিল না। 

হাসপাতালের বেডে শুয়ে দুর্ঘটনার কথা জীবনানন্দ তাঁর কলেজের সহকর্মী অজিতবাবুকে বলছেন ‘জানেন, ভেবেছিলাম, ট্রামটা জলখাবারের সামনে স্টপেজে দাঁড়াবে। আমি ইতিমধ্যে পার হয়ে যাব। কিন্তু তা আর হলো না। মরেই যেতাম, কিন্তু কেন যেন বেঁচে উঠলাম। জানি না, কত দিন শুয়ে থাকতে হবে।’

মাসউদ আহমাদ

মগবাজার, ঢাকা ১২১৭।