ইতিহাসের আদার ব্যাপারী

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের ছবির ভেতরে লুকিয়ে আছে আমাদের ইতিহাসচর্চার এক অনালোচিত অস্বস্তি। আবার কি দেখবেন ছবিটি? হয়তো বিজয় দিবসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গিয়ে আপনার চোখে পড়ল ১৬ ডিসেম্বরের যুদ্ধ সমাপ্তির মুহূর্ত। টেবিলের এক পাশে পাকিস্তানের লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি। মুখে পরাজয়ের চাপা দুঃখ। অন্য পাশে ভারতের লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। বসার ভঙ্গি দেখে মনে হতে পারে, দুই পুরোনো সহপাঠী আবার মুখোমুখি। আসলেও তাই।

আমাদের ইতিহাসের শিকড়ে ধর্মের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে পার্টিশনের মধ্যে। নিয়াজি ও অরোরা দুজনই ব্রিটিশ আমলের একই সামরিক একাডেমির ছাত্র। দুজনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টে ব্রিটিশদের হয়ে লড়েছিলেন। পার্টিশনের পর একজন পাকিস্তানের, আরেকজন ভারতের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে তাঁরা প্রথমবারের মতো ছিলেন বিপরীত পক্ষে। ১৯৭১ সালের এই সাক্ষাৎ ছিল ১৯৪৭ সাল-পরবর্তী টানাপোড়েনের শেষ ধাপ।

নিয়াজি ও অরোরা দুজনই ব্রিটিশ আমলের একই সামরিক একাডেমির ছাত্র। দুজনই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টে ব্রিটিশদের হয়ে লড়েছিলেন। পার্টিশনের পর একজন পাকিস্তানের, আরেকজন ভারতের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।
নাঈম মোহায়মেন; লেখক, যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃশ্যকলা বিভাগের স্নাতক অধ্যয়ন পরিচালক

তবে এই বিখ্যাত আলোকচিত্রের মধ্যে এক টুকরো দৃষ্টিকটু ছায়া লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে জন্ম নিচ্ছে, অথচ টেবিলে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের কেউ নেই। সামরিক কর্মকর্তাদের ভিড়ের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার—সামরিক উর্দিতে নয়, সাধারণ পোশাকে। একেক আলোকচিত্রীর ছবিতে এ কে খন্দকারের অবস্থান বদলে বদলে গেছে। কোথাও তিনি ফ্রেমের কোনায়, কোথাও ছবির থেকে তাঁকে ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এ কে খন্দকার তাঁর মুক্তিযুদ্ধ–জীবনী ১৯৭১: ভেতরে বাইরে (প্রথমা প্রকাশন, ২০১৪)–তে লিখেছেন, ‘এমন ভিড় ছিল যে দাঁড়ানোই কঠিন ছিল।’ কিছুক্ষণ পরে যখন নিয়াজি ও অরোরা আত্মসর্পণ করা পাকিস্তানি সৈন্যদের পরিদর্শন করছেন, তখন তাঁদের পাশে হাঁটতে দেখা যায় বাংলাদেশি কর্মকর্তা মেজর হায়দারকে। শোনা যায়, জেনারেল এম এ জি ওসমানী আসছিলেন, কিন্তু নানা ঝামেলার কারণে পৌঁছাতে পারেননি। অনেকে মনে করেন, কৌশলে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের তাঁদের গৌরবের মুহূর্ত থেকে বাদ দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা ছিল।

আত্মসমর্পণের ছবির উৎস নিয়েও গন্ডগোলের শেষ নেই। কোথাও আলোকচিত্রীর নাম নেই। কোথাও আবার ভুল নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় উৎস হিসেবে লেখা হয়েছে, ‘সূত্র: ইন্টারনেট’। যেনবা দুনিয়ার সব ছবিই কোনো ভৌতিক আলোকচিত্রশিল্পী তুলে বেড়ান। বাংলাদেশে যে ছবিটা সবচেয়ে পরিচিত, সেটা সম্ভবত আফতাব আহমেদের তোলা। আরও আছে কিশোর পারেখ, রঘু রায়, আব্বাসের তোলা ছবি।

শোনা যায়, জেনারেল এম এ জি ওসমানী আসছিলেন, কিন্তু নানা ঝামেলার কারণে পৌঁছাতে পারেননি। অনেকে মনে করেন, কৌশলে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের তাঁদের গৌরবের মুহূর্ত থেকে বাদ দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা ছিল।

১৯৭১ সালের ছবির সঠিক ক্রম, উৎস, অবস্থান বের করতে গেলে সব গুলিয়ে যায়। এ কে খন্দকারের বইয়েও ছবি আছে, কিন্তু ক্যাপশন নেই। তিনি আমাকে একবার বলেছিলেন, অরোরা–পরিবারের সংগ্রহে একটা বিশেষ ছবি ছিল, যেখানে মাত্র পাঁচজন মানুষ দাঁড়ানো। তাঁদের মধ্যে তিনি একজন। পরে ভারতে অরোরা–পরিবারের কাছে খোঁজ নিয়ে সে ছবি আমি পাইনি। হয়তো হারিয়ে গেছে, হয়তো ভুল স্মৃতি ছিল। ইতিহাসের ভেতর এমন হারিয়ে যাওয়া আর্কাইভ অজস্র। এসব জটিলতা দেখে দৃকের প্রতিষ্ঠাতা শহিদুল আলম একদিন বলেছিলেন, ‘একই ঘটনা সবাই নিজের মতো করে দেখে। রাজনীতি বদলালে ছবি বদলায়, মানুষের চোখও বদলে যায়।’

বাংলায় প্রবাদ আছে, ‘আদার ব্যাপারীর আবার জাহাজের খবর।’ যার প্রতিদিনের হিসাব এক ঝুড়ি আদা, বিরাট জাহাজটা কোন দেশের, সেটা নিয়ে তার মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। ১৯৭১ সালের ইতিহাসচর্চাও অনেক সময় এমন হয়ে পড়েছে—যে নথি সামনে আছে, রাষ্ট্র যা সংরক্ষণ করেছে, গবেষকেরা কেবল সেটুকু অবলম্বন করেই লিখেছেন। ফলে আলো সব সময় পড়ে যায় নেতা, কমান্ডার আর রাষ্ট্রদূতদের ওপরে। মাঠের গল্প—মানুষের ভয়, ক্ষুধা ও আত্মরক্ষার কাহিনি—চোখে পড়ে সবচেয়ে কম। ব্যতিক্রম সামান্য—বহু বছর ধরে নিম্নবর্গের ইতিহাস লিখে যাওয়া আফসান চৌধুরী, গ্রামের একাত্তর (ইউপিএল, ২০১৯) বা নারীদের একাত্তর (ইউপিএল, ২০২২) ইত্যাদি কিছু কিছু উদাহরণ।

এ কে খন্দকারের আমাকে একবার বলেছিলেন, অরোরা–পরিবারের সংগ্রহে একটা বিশেষ ছবি ছিল, যেখানে মাত্র পাঁচজন মানুষ দাঁড়ানো। তাঁদের মধ্যে তিনি একজন। পরে ভারতে অরোরা–পরিবারের কাছে খোঁজ নিয়ে সে ছবি আমি পাইনি।
আত্মসমর্পণের দলিলে সই করছেন পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি (ডানে বসা)। পাশে বসা মিত্রবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১
ছবি: সংগৃহীত

বিগত কয়েক বছরে প্রকাশিত কিছু ইংরেজি বই দেখলে ব্যাপারটা আরও প্রকট হয়ে ধরা দেয়। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বই গ্যারি ব্যাসের ব্লাড টেলিগ্রাম (আলফ্রেড নফ, ২০১৩) এবং শ্রীনাথ রাঘবনের ১৯৭১: বাংলাদেশ সৃষ্টির বিশ্ব–ইতিহাস (হার্ভার্ড, ২০১৩)। দুটোই মূলত পরাশক্তি আর আঞ্চলিক কূটনীতির টানাপোড়েন নিয়ে লেখা বই। যুদ্ধের শেষ দিকে আমেরিকা–সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাশক্তি সমুদ্রে দাঁত-নখ বের করে দাঁড়িয়ে গেছে। কেউ সপ্তম নৌবহর পাঠাচ্ছে, কেউ ভ্লাদিভস্তক থেকে নিউক্লিয়ার জাহাজ। গবেষকেরা ওভাল অফিস, মস্কো আর দিল্লির যুদ্ধকক্ষ নিয়েই বেশি ব্যস্ত। বাংলাদেশ হয়ে পড়ে নিছক যুদ্ধের পটভূমি। সলিল ত্রিপাঠীর যে কর্নেল ভুল স্বীকার করল না (আলেফ, ২০১৪) নামের তৃতীয় বইটি বাংলাদেশের কথায় ফেরার চেষ্টা করে, কিন্তু সেখানেও অভিজাত–বয়ানের সম্ভাবনা রয়ে যায়। সবচেয়ে সাম্প্রতিক বই আনাম জাকারিয়ার ১৯৭১: বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের জনগণের ইতিহাস (পেঙ্গুইন, ২০২১)। রাঘবনের ‘বিশ্ব–ইতিহাস’–এর বদলে ‘জনগণের ইতিহাস’ প্রস্তাব করে জাকারিয়া তার আলাদা অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মার্কিন কূটনীতিক গ্যারি ব্যাসের বই ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’
ছবি: অ্যামাজন

গ্যারি ব্যাসের বই লেখা হয়েছে আর্চার ব্লাডকে কেন্দ্র করে। ঢাকার এই মার্কিন কূটনীতিক ১৯৭১ সালে নিজের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন। সেসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হোয়াইট হাউসের টেপ রেকর্ডিং, যেখানে নিক্সন–কিসিঞ্জারকে দেখা যায় খোলামেলা ভাষায় আলাপ করতে। এই টেপ যে কখনো জনগণের সামনে যেতে পারে, নিক্সন তা ভাবেননি। ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে যে ধরনের মন্তব্য তাঁরা করছিলেন, সেটা রাজনীতির ভদ্রতার মুখোশ খুলে দেয়। নিক্সন–কিসিঞ্জারের সেসব নাটকীয় কথাবার্তা এবং আর্চার ব্লাডের টেলিগ্রাম নৈতিক রূপকের একটি বৈপরীত্য তৈরি করে, ‘খারাপ আমেরিকান’ বনাম ‘ভালো আমেরিকান’। তবে এখানেও গল্পের কেন্দ্র যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশ আছে পটভূমিতে—কখনো উল্লেখে, কখনো পাদটীকায়।

১৯৭১ সালের ইতিহাসচর্চাও অনেক সময় এমন হয়ে পড়েছে—যে নথি সামনে আছে, রাষ্ট্র যা সংরক্ষণ করেছে, গবেষকেরা কেবল সেটুকু অবলম্বন করেই লিখেছেন। ফলে মাঠের গল্প—মানুষের ভয়, ক্ষুধা ও আত্মরক্ষার কাহিনি—চোখে পড়ে সবচেয়ে কম।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভারতীয় সেনাকর্মকর্তা শ্রীনাথ রাঘবনের বই ‘১৯৭১: বাংলাদেশ সৃষ্টির বিশ্ব–ইতিহাস’
ছবি: প্রথমা

রাঘবন নিজে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন, পরে যুদ্ধ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করেছেন। তাই তাঁর লেখায় পাওয়া যায় নিখুঁত খুঁটিনাটি—কোন দিন কে কোন বার্তা পাঠালেন, কোন রাষ্ট্র জাতিসংঘে কাদের নিয়ে জোট বানাল ইত্যাদি। এর সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সত্য হলো এর কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশকে ঘিরে বাইরের শক্তির গল্প। ভারত কখন যুদ্ধে নামল, কেন নামল, আগেই নামা উচিত ছিল কি না—এসবই হয়ে ওঠে প্রধান আলোচ্য। বাংলাদেশের নিজস্ব চাওয়া-পাওয়া সামনে আসে কম। ভারতীয় নথিগুলোতে বোঝা যায় দিল্লির মাথায় ছিল কাশ্মীরের টানাপোড়েন, নকশাল–আতঙ্ক, কলকাতায় লাখ লাখ শরণার্থীর চাপ। যুদ্ধক্ষেত্রের জলজ্যান্ত অভিজ্ঞতা—গ্রাম পুড়ছে, অসহায় মানুষ পালাচ্ছে, শহরজুড়ে আতঙ্ক—এসব ভারতীয় নথিতে জায়গা পায়নি।

রিচার্ড সিসন–লিও রোজের ওয়ার অ্যান্ড সেসেশন: পাকিস্তান, ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ১৯৯০) বইয়েও সেই একই সমস্যা। তাঁরা মাঠের বহু নেতাকে খুঁজে পাননি, কারণ ১৯৭৫ সাল থেকে ধারাবাহিক অভ্যুত্থানে অনেকে নিহত হয়েছিলেন।

রাঘবন যুদ্ধ বিশ্লেষণ করেন বিপুল আর্কাইভ নিয়ে, কিন্তু মূলতই ভারতীয় আর্কাইভ। মার্কিন আর্কাইভে নথি প্রচুর, ভারতের আর্কাইভেও তাই। পাকিস্তানের আর্কাইভ তালাবদ্ধ। বাংলাদেশের আর্কাইভ খোলা থাকলেও খণ্ডিত, অসম, বহু গুরুত্বপূর্ণ অংশ নেই। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেসব বই লেখা হয়, সেখানে বাংলাদেশের ভেতরের নানা সমীকরণ প্রায়ই গায়েব।

সাক্ষাৎকার–তালিকায় পাকিস্তান–ভারত–আমেরিকা যে গুরুত্ব নিয়ে আসে, বাংলাদেশ আসে ততটাই কম। ফলে যুদ্ধের গল্প বলা হয়; কিন্তু যাদের দেশটা পুড়ে ভস্মীভূত হলো, সেই মানুষদের কণ্ঠ থাকে কম। উৎসের ভারসাম্যহীনতা লক্ষণীয়। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত সিসন এবং রোজের বইটিতে আছে পাকিস্তান থেকে ৩২ জন, ভারত থেকে ৪৯ জন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৯ জন এবং বাংলাদেশ থেকে ১২ জনের সাক্ষাৎকার। আমি অন্যত্র উল্লেখ করেছি শর্মিলা বসুর বিতর্কিত ডেড রেকনিং (হার্স্ট, ২০১১) বইয়ে সাক্ষাৎকারের তালিকা প্রচণ্ড ভারসাম্যহীন। মনে হবে তিনি বাংলাদেশের কারও সঙ্গে কথা বলার কোনো প্রয়োজনই বোধ করেননি। শুধু উৎসের তালিকা ভবিষ্যতের গবেষণার পথ নির্দেশ করে না। বাংলাদেশি উৎস যদি কেবল অভিজাত অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণির সংহতি মুছে ফেলা হবে।

মার্কিন আর্কাইভে নথি প্রচুর, ভারতের আর্কাইভেও তাই। বাংলাদেশের আর্কাইভ খণ্ডিত, অসম, বহু গুরুত্বপূর্ণ অংশ নেই। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেসব বই লেখা হয়, সেখানে বাংলাদেশের ভেতরের নানা সমীকরণ প্রায়ই গায়েব।

সলিল ত্রিপাঠী তাঁর বইটি লেখার সময় অন্যভাবে হেঁটেছেন। তিনি শহর–গ্রাম ঘুরে—চট্টগ্রাম, খুলনা, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, বগুড়া, সিরাজগঞ্জে—মানুষের মুখে গল্প শুনেছেন। এই গল্পগুলো ছিল শক্তিশালী, কারণ যুদ্ধের এসব গল্প মানুষ অভিজ্ঞতা দিয়ে ধারণ করেছে।

তবু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। কাদের কণ্ঠ বইয়ে জায়গা পাচ্ছে? এটা তো শুধু লেখকের ইচ্ছাই নয়, এর মধ্যে জড়িয়ে থাকে ইতিহাস লেখার পুরো পরিমণ্ডল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বইয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু মানুষের সাক্ষাৎকারই বারবার আসে। ফলে তাঁদের কথাই বেশি গুরুত্ব পায়।

ত্রিপাঠীর সাক্ষাৎকার–তালিকায় আমি কিছু নাম লক্ষ করেছি। তাঁরা সবাই আমাদের চেনা বাংলাদেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বুদ্ধিবৃত্তিক–সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অতিপরিচিত মুখ। তাঁরা প্রত্যেকে মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় মাঠে থাকা অসংখ্য সাধারণ মানুষের গল্প রাষ্ট্র, একাডেমি বা গণমাধ্যমের বাইরেই থেকে যায়।

ইংরেজি ভাষায় মুক্তিযুদ্ধের বই পড়তে গেলে উঠে আসে কেবল শেখ মুজিব, ভুট্টো, ইয়াহিয়া, নিক্সন, কিসিঞ্জার, ইন্দিরার কথা। তাঁদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের নিচে ছিল ঢাকার উত্তাল রাস্তাঘাট, ছাত্রদের মিছিল, শ্রমিকদের ক্রোধ, গ্রামে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা। ইতিহাসের নথি অবলম্বন করে লিখতে যাওয়ার বড় বিপদ হলো, যা লেখা নেই, তা বাদ পড়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধে গ্রামের মানুষের জীবন, শরণার্থীর ভয়, মেয়েদের টিকে থাকার সংগ্রাম—এসবের তো কোনো নথিই ছিল না। কিন্তু যুদ্ধের আসল চালিকা শক্তি ছিল এই মানুষেরা। নথিতে থাকে না বলে ইতিহাসে যাঁরা কম আলো পান, যুদ্ধের গতিপথ বদলান প্রকৃতপক্ষে তাঁরাই।

এখন যদি দেখি কৃষক বা নিম্নবর্গের যে অগ্রগামী যোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সবচেয়ে সামনে ছিলেন, তাঁদের নাম-ঠিকানা সরকারি নথিতে অনুপস্থিত; তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, যাঁরা নথি রাখার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা কোন শ্রেণিটিকে মানানসই মনে করেননি?

গবেষক অঞ্জলি আরোন্ডেকার তাঁর ফর দ্য রেকর্ড: অন সেক্সুয়ালিটি অ্যান্ড দ্য কলোনিয়াল আর্কাইভ ইন ইন্ডিয়া (ডিউক, ২০০৯) বইয়ে লিখেছেন, আর্কাইভে যে বিশাল ফাঁকফোকর থাকে, সেগুলোই আসলে আমাদের শেখায় কীভাবে একটি ইতিহাস নির্মিত হয়েছে, আর কাদেরকে সেই নির্মাণের যোগ্য বলে ধরা হয়েছে। এখন যদি দেখি কৃষক বা নিম্নবর্গের যে অগ্রগামী যোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সবচেয়ে সামনে ছিলেন, তাঁদের নাম-ঠিকানা সরকারি নথিতে অনুপস্থিত; তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায়, যাঁরা নথি রাখার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের স্বপ্ন আসলে কী ছিল? তাঁরা কোন জাতীয় আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রাখতে চেয়েছিলেন? কোন শ্রেণিটিকে তাঁরা মানানসই মনে করেননি?

‘ইতিহাসের আদার ব্যাপারী’ বলতে আমি বোঝাতে চাই সাধারণ মানুষ এবং মাঠের লড়াকু মানুষগুলোকে, যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং লড়াই দুটোতেই যাঁরা কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু আমরা তাঁদের গুরুত্ব খুব কমই স্বীকার করি। ভবিষ্যতের গবেষকদের বড় কাজ হবে এই অনুপস্থিতির ভেতরে ঢুকে পড়া। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাতায় যে বিশাল শূন্যতা, যে নীরবতা, যে বাদ পড়া কাহিনি—সেগুলোর সঙ্গে কথোপকথন শুরু করা দরকার। ইতিহাসে যা লেখা আছে, শুধু তার দিকে নয়; যা লেখা নেই, তার দিকে তাকানোও অসম্ভব জরুরি।