গত ৮ অক্টোবর বইটি প্রকাশ করেছে সাদারল্যান্ড হাউস বুকস। ইংরেজি ভাষায় লেখা ৩৬৮ পৃষ্ঠার ঢাউস এই বই প্রকাশের পরপরই ব্যাপক হইচই ও শোরগোল পড়ে যায়। পরে পাঠকচাহিদার তীব্র চাপে বিশ্বের আরও ২০টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে এই বই।

বইটিতে আছে মাঠের বাইরের নানা গল্প। সে গল্প হাসির, সে গল্প কান্নার, জটিল-কুটিল বৈশ্বিক রাজনীতিরও। ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের সময়কার একটি গল্প এমন—বুলগেরিয়া ও আর্জেন্টিনার মধ্যে খেলা হচ্ছে। কে জিতবে এই নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে বাজি ধরেছিলেন আলবেনিয়ার এক ব্যক্তি। তিনি বলেছিলেন, আর্জেন্টিনা যদি হেরে যায়, তিনি স্ত্রীকে ত্যাগ করবেন। সেই খেলায়  দুঃখজনকভাবে আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে বুলগেরিয়ার কাছে হেরেছিল। বাজিতে হেরে গিয়ে ওই ব্যক্তি স্ত্রীকে ত্যাগ করেছিলেন। গল্পটা অদ্ভুত হলেও শেষ পর্যন্ত করুণ ও কান্নার।

এরপর পেরিয়ে গেছে ১৬ বছর। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপ। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকার এক রেডিও স্টেশন ঘোষণা দিল, যিনি সর্বোচ্চ পাগলামি কর্মকাণ্ড করে দেখাতে পারবেন, তাঁকে দেওয়া হবে বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচের দুটি টিকিট। প্রিয় মানুষকে সঙ্গে নিয়ে তিনি যেন ফাইনাল ম্যাচ উপভোগ করতে পারেন।

অতি উৎসাহে অনেকেই নানা ধরনের পাগলামি কর্মকাণ্ড করলেন টিকিট জয়ের আশায়। কিন্তু বিচারকদের মনে ধরল অদ্ভুত এক ঘটনা। এক ব্যক্তি কুমিরে ভর্তি একটি নদীতে ঝাঁপ দিলেন টিকিট জয়ের জন্য। জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে মৃত্যুকে ‘কুছ পরোয়া নেহি’ বলে যিনি এমন কাণ্ড করতে পারেন, তাঁকে পুরস্কার না দিয়ে পারা যায়? রেডিও স্টেশনের কর্মকর্তারা ওই ব্যক্তির হাতেই বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১০–এর ফাইনাল ম্যাচের টিকিট ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

লেখক লুসিয়ানো ওয়ার্নিক তাঁর বইয়ে প্রতিটি বিশ্বকাপের জন্য একটি অধ্যায় লিখেছেন। বর্তমানে বইটির তৃতীয় সংস্করণ চলছে। ৫২ বছর বয়সী ওয়ার্নিক বলেছেন, এবারের বিশ্বকাপেও নিশ্চয়ই খেলার বাইরে অনেক আকর্ষণীয় ও অদ্ভুত ঘটনা ঘটবে। এসব ঘটনার সামাজিক গুরুত্ব রয়েছে।

২০ নভেম্বর শুরু হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপের ঝলমলে আসর। এদিন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওয়ার্নিক বলেছেন, ফুটবলকে ঘিরে ছোট ছোট গল্প আছে। এসব গল্প থেকে বোঝা যায়, ফুটবলের প্রতি মানুষের কী পরিমাণ আবেগ।

লুসিয়ানো ওয়ার্নিকের জন্ম আর্জেন্টিনার বুেয়নস এইরেসে তিনি সালভাদর ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক পাস করেছেন। ২০ বছর ধরে তিনি আর্জেন্টাইন ইউনিভার্সিটি অব এন্টারপ্রাইজ ও সার্কুলো দা পেরিওদিস্তাস দেপোর্টিভোস বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রীড়া সাংবাদিকতা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ান। এ ছাড়া আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, স্কটল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রবন্ধ লেখেন।

এ মাসের ৮ তারিখ—একই দিনে ওয়ার্কিনের আরও একটি বই প্রকাশ করেছে সাদারল্যান্ড হাউস বুকস। ডার্ক গোলস নামের এই বইয়ে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে কত রকম কুটিল রাজনীতি হয়, তার গবেষণালব্ধ তথ্য ও তত্ত্ব তুলে ধরেছেন লেখক। বইটি শুরুই হয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাস দিয়ে। এরপর ধীরে ধীরে ওয়ার্নিক দেখিয়েছেন, কীভাবে রাজনীতি, বাণিজ্য, পুঁজিবাদ গ্রাস করে নিয়েছে বিশ্বকাপকে।

দেখিয়েছেন মুসোলিনি, হিটলার, পেরন, পিনোচেট, এসকোবার কতটা ফুটবলপ্রেমী ছিলেন এবং কীভাবে খেলার সঙ্গে রাজনীতি মিশে গেছে। ইতালি ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপে কীভাবে হস্তক্ষেপ করেছিল, আছে সেই গল্পও। আর বইটির সবচেয়ে বড় যে অধ্যায়, ওয়ার্নিক সেটি লিখেছেন অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক নিয়ে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওয়ার্নিক বলেছেন, ফুটবল নিছক একটি খেলা নয়, খেলার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। আর বিশ্বকাপ শুধু একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়, তার চেয়ে অনেক বড় কিছু। তাবৎ পৃথিবীর রাজনীতিবিদ ও স্বৈরশাসকদের হস্তক্ষেপ থেকেই বোঝা যায়, বিশ্বকাপ ফুটবলের গুরুত্ব কতটা গুরুত্ববহ।

সূত্র: রয়টার্স, ওয়ার্ল্ড সকার টক, আমাজন ও দ্য হিন্দু