কাইয়ুমের অমর হস্তাক্ষর

>
কাইয়ুম চৌধুরী (৯ মার্চ ১৯৩২—৩০ নভেম্বর ২০১৪)। ছবি: অন্য আলো
কাইয়ুম চৌধুরী (৯ মার্চ ১৯৩২—৩০ নভেম্বর ২০১৪)। ছবি: অন্য আলো
আসছে ৯ মার্চ শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর জন্মদিন। চিত্রকলা ছাড়িয়ে আরও বহু ক্ষেত্র তাঁর অবদানে সিক্ত হয়েছে। জীবনের শেষ পর্যায়ে বাংলা ক্যালিগ্রাফিক হরফ নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছিলেন দেশবরেণ্য এই চিত্রকর। কাজটি তিনি অনেক দূর করেছিলেনও। এ কাজে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ায় প্রথম আলো। কাইয়ুমের মৃত্যুর পর এ নিবন্ধের রচয়িতা টাইপ ডিজাইনার জেকব টমাস তাঁর কাজটি শেষ করেন। বর্তমানে প্রথম আলোতে এই ক্যালিগ্রাফিক হরফ ব্যবহার করা হচ্ছে। কাইয়ুম চৌধুরীর জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন এই টাইপ ডিজাইনার

কাইয়ুম চৌধুরী বেশির ভাগ মানুষের কাছে প্রাথমিকভাবে একজন চিত্রশিল্পী ও বইয়ের প্রচ্ছদশিল্পী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাংলা ক্যালিগ্রাফির জগতে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ও ভূমিকার বিষয়টি খুব কম জনই উপলব্ধি করতে পেরেছে। বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা একজন মার্কিন-সুইডিশ বংশোদ্ভূত ‘টাইপ ডিজাইনার’ হিসেবে আমার সারা জীবনই ক্যালিগ্রাফির প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল এবং আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কাইয়ুম চৌধুরীর হস্তাক্ষর সম্পর্কে আমি জানতে পারি ২০১৪ সালের নভেম্বরে তাঁর মৃত্যুর কয়েক বছর আগে।

বাঙালি অক্ষর–চিত্রণের মূল বৈশিষ্ট্য হলো বাঁকা ও অনিয়মিত মাত্রা। বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর বাংলা ক্যালিগ্রাফির একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। তবু আমাকে বলতেই হচ্ছে যে বইমেলায় বইয়ের প্রচ্ছদের অক্ষর চিত্রণের পর্যালোচনা কিছুটা হতাশার জন্ম দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠই অপেশাদার এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ক্যালিগ্রাফি কলাকৌশল, এর মূলনীতি ও ইতিহাস সম্পর্কে তাঁদের একধরনের অজ্ঞতা লক্ষ করা যায়। আদতে ‘নিম্নশ্রেণির’ প্রতীক আঁকিয়েরা সাধারণত ঢের আকর্ষণীয় ও উদ্ভাবনী বাংলা ক্যালিগ্রাফি সৃষ্টি করে থাকেন। কারণ, তাঁদের হাতে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। অবশ্য বাংলা ক্যালিগ্রাফিতে নিজের অভ্যস্ততার বিষয়ে কাইয়ুম চৌধুরী অতুলনীয় ছিলেন। বইয়ের প্রচ্ছদের কাজে বহু বছরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবাদে তিনি ক্যালিগ্রাফিতে একটি পরিণত রীতি তৈরি করেছিলেন, যা বাংলা লিপির নির্যাসকে প্রকাশ করেছে এবং আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত মনে হলেও এটি ছিল অনন্য।

বাংলা টাইপ ও অক্ষর চিত্রণের একটি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ইতিহাস আছে। বিশুদ্ধ বাংলা ফন্ট বলতে সবাই ‘সুতন্বীএমজে’ বা ‘সোলাইমানলিপি’ নামের ফন্টকে চেনে। কিন্তু এগুলো কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার জন্য ১৯৮১ সালে ফিওনা রসের অসাধারণ নকশায় তৈরি ফন্টের প্রায় অনুরূপ। ১৭৭০ সালে উইলকিনসের প্রথম বাংলা টাইপফেস থেকে শুরু করে বাংলা টাইপের বিস্তারিত ইতিহাস ফুটে উঠেছে ফিওনা রসের অসাধারণ গবেষণামূলক প্রবন্ধে। তাতে দেখা যায়, কীভাবে ব্যাপ্টিস্ট মিশনের ছাপাখানা থেকে বিবর্তিত হয়ে এটি বর্তমান সময়ের চেহারা নিয়েছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের রিডিং ইউনিভার্সিটিতে ড. রসের অধীনে একটি কোর্সে পড়াশোনা করাটা আমার জন্য খুব উপভোগ্য ছিল। সেখানে অ-লাতিন ঘরানার বর্ণমালা নকশার বিষয়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা দেওয়া হয়।

যেহেতু টাইপ ডিজাইনের প্রতি আমার প্রচণ্ড আসক্তি আছে, তাই কাইয়ুম চৌধুরীর অসময়ে চলে যাওয়ার বিষয়টি আমাকে তাঁর স্বাতন্ত্র্যসূচক ক্যালিগ্রাফিকে অমর করে রাখতে এবং সেটি ফন্টে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে প্রণোদিত করেছে। কাজটি অত্যন্ত কঠিন ছিল। কারণ, ভিন্ন ভিন্ন জোড়ার বর্ণের ক্ষেত্রে সুসংগঠিত বাঁকা মাত্রাগুলো ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে থাকে। কোনো বাংলা ফন্ট তখনো পর্যন্ত এই সংকটের সমাধান সফলভাবে করতে পারেনি। এ ছাড়া কাইয়ুমের স্বাতন্ত্র্যসূচক ‘ত’ সাধারণভাবে বেশ উন্নত হলেও, যখনই ‘উ’–কার বসে, তখন তা ভিন্নভাবে আঁকতে হয়। এভাবেই শব্দের শুরু, মধ্যে বা শেষে ব্যবহারের ভিন্নতায় অনেক বর্ণের আকার বিভিন্ন হয়। এ ধরনের জড়ানো ফন্টের ক্ষেত্রে নিখুঁত প্রোগ্রামিং করার জন্য একদিকে যেমন শত শত নমুনার গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন হয়, তেমনি অন্যদিকে একটি জটিল ‘ওপেনটাইপ’ প্রোগ্রামিং ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়। কয়েক মাস ধরে আমি বইয়ের দোকানগুলোতে নমুনা খুঁজেছি এবং শত শত নমুনার ছবি তুলেছি। কাইয়ুম চৌধুরীর ফন্টের আরও নমুনা সংগ্রহ করার প্রয়োজনেই আমি প্রথম আলোয় যাই। সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সূত্র
ধরেই প্রথম আলো পত্রিকার ‘টাইপফেস’ তৈরির কাজ আমরা শুরু করি, যা আংশিকভাবে কাইয়ুম চৌধুরীর ক্যালিগ্রাফি দিয়ে অনুপ্রাণিত।

কাইয়ুমের ক্যালিগ্রাফিক বাংলা হরফের নির্মাণ পর্যায়ের লে–আউট
কাইয়ুমের ক্যালিগ্রাফিক বাংলা হরফের নির্মাণ পর্যায়ের লে–আউট

এসব নমুনা জড়ো করার পর আমি আরবি নাসতালিক ও লাতিন বাঁকা ফন্টের বৈশিষ্ট্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করি। বাঁকা বাংলা ফন্টগুলোর প্রোগ্রামিং তৈরির জন্য একটি বিশেষ পদ্ধতিতে আরবি নাসতালিক ও লাতিন ফন্টগুলোর বৈশিষ্ট্য যোগ করা হয়। এই কাজ আগে কখনো হয়নি। বেশ কয়েক ডজন বাংলা ফন্ট এখনই আছে, যেগুলো হাতে লেখা বাংলার অনুকরণ মাত্র। কিন্তু তাতে মাত্রার সংযোগ প্রায় সময়ই বেমানান হয়, বর্ণগুলো প্রায়ই সাংঘর্ষিক হয়ে যায় এবং একসঙ্গে তা খুব একটা খাপ খায় না। এর বাইরে বর্ণগুলোর মধ্যে অনিয়মিত ব্যবধান তো আছেই। কিন্তু যে সমাধান আমরা করেছি, তাতে বর্ণগুলোর মধ্যে অবস্থানের ভিন্নতা সত্ত্বেও বাঁকা মাত্রাগুলোর স্বাভাবিকতা বজায় থাকে। এই অপরিহার্য বিষয়টি এক হাজারেরও বেশি স্বতন্ত্র ক্যারেক্টারের ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হয়েছিল, যা কিনা সংখ্যার দিক থেকে এখনকার যেকোনো বাংলা ফন্টের তুলনায় ঢের বেশি। আমি এই কারণে বেশ রোমাঞ্চিত যে প্রথম আলো এই উদ্ভাবনী নতুন ফন্ট তাদের প্রকাশনায় ব্যবহার করতে চলেছে।

বাংলায় ক্যালিগ্রাফিক উদ্ভাবনের এক নতুন দুয়ার আমার সামনে খুলে দিয়েছেন কাইয়ুম চৌধুরী। এখানে প্রায় ৬০ হাজার লাতিনীয় ফন্ট আছে। আমার ধারণা, বাংলা সংখ্যায় অবিকৃত ও সুন্দর ফন্ট এক শরও কম হবে। সেগুলোর মধ্যে আবার মাত্র কয়েক ডজনের মান খুব ভালো। এই ঘাটতির কারণ হচ্ছে, এসব ফন্ট যদিও গ্রাফিক ডিজাইনের উপাদানের মূল উৎস, তথাপি এগুলোর পাইরেসি হয়েছে প্রচুর এবং এখানে টাইপ ডিজাইনারদের খুব অল্প সম্মানী দেওয়া হয়। আমার লক্ষ্য হলো, সমন্বিতভাবে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যেখানে বাঙালি টাইপ ডিজাইনাররা ও টাইপ তৈরি করা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ফন্ট বিক্রি করতে পারবে এবং সেগুলোর উৎস সম্পর্কে একে অপরের সঙ্গে ধারণা বিনিময় করবে। মোদ্দাকথা, এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারবে। বাংলা টাইপ ডিজাইন নিয়ে আলোচনা আরও এগিয়ে নিতে আমি বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছি। সেগুলো আমার ওয়েবসাইটে (BanglaTypeFoundry.com) প্রকাশিত হয়েছে।

বর্তমানে চালু ধরন হলো, পাশ্চাত্য নকশা অনুসরণ করা এবং লাতিন ফন্ট ব্যবহার করা। তবে বাঙালি তরুণদের মধ্যে বর্ণ ও ফন্টগুলোর বিষয়ে আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। এতে আমি সত্যিই রোমাঞ্চিত। বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা একজন পশ্চিমা ব্যক্তি হিসেবে, উন্নতি ও উদ্ভাবনের সম্ভাবনার দিক থেকে পাশ্চাত্যের তুলনায় বাংলা লিপিকে আমার খুবই আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। বাংলা একটি সুন্দর ভাষা, যার একটি সুন্দর লিপি
আছে। এর নান্দনিক উন্নতিতে নিজের পুরো জীবন ব্যয় করাটাও উপভোগ্য।

অনুবাদ: অর্ণব সান্যাল