default-image

বাংলাদেশে ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় সমান শক্তি আর দক্ষতা নিয়ে যাঁরা সাহিত্য রচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষে আছেন রাজিয়া খান (১৯৩৬—২০১১) । ‘শীর্ষে’ কথাটা একটু ভুল বলা হলো। কারণ, তাঁর আগে বা পরে তো আর কেউ নেই। মাত্র ২৩ বছর বয়সে বটতলার উপন্যাস লিখে তিনি সাড়া ফেলে দেন। একই বছর বেরোয় তাঁর অনুকল্প। এরপর সাহিত্য আলোচনায় তাঁর নামটি উচ্চারিত হতে থাকে ‘প্রথাবিরোধী’, ‘সাহসী’ ও ‘স্পষ্টভাষী’ লেখক হিসেবে। রাজিয়া খান অবশ্য এ রকম বর্ণনার সঙ্গে একমত হননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের কিছু শিক্ষার্থীর উদ্যোগে প্রকাশিত ম্যাগাজিন অর্কেস্ট্রাকে (১৯৬৯) দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেছিলেন, তিনি প্রথাকে ব্যক্তির দিকে, বিশেষ করে নারীর দিকে ফেরাতে চেয়েছেন; প্রথা মানবিক হোক, তা-ই চেয়েছেন। আর সাহসী ও স্পষ্টভাষী হওয়াটাকে তিনি ব্যতিক্রমী চর্চা হিসেবে দেখতে চাননি, বরং একজন লেখকের স্বাভাবিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হিসেবেই গণ্য করেছেন। তাঁর সঙ্গে আমরা দুজন—গল্পকার শান্তনু কায়সার ও আমি, একমত না হয়ে পারিনি। আমরা ছিলাম তাঁর ছাত্র, তিনি ছিলেন কঠোরে-কোমলে মেশানো অসাধারণ এক শিক্ষক, যিনি ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে সত্য বলার সাহস রাখতেন, অথচ বিপদে কেউ তাঁর দ্বারস্থ হলে পিঠে একটা হাত রেখে তাকে অভয় দিতেন। তাঁর ক্লাসে বসে মিলটনের কবিতা অথবা ড্রাইডেনের নাটক নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনতাম এবং ভাবতাম, পড়ানোটাও তাহলে একটা চারুকৃত্য। তাঁর প্রখর ব্যক্তিত্ব, পড়ানোর অভিনবত্ব, নাকি তাঁর বক্তৃতার বিষয়গুণ, কোনটা যে আমাদের টানত, বলা মুশকিল। হয়তো সেগুলোর যোগফল, কিন্তু তাঁর ক্লাসে আমরা সবাই হাজির থাকতাম।

বিজ্ঞাপন

অর্কেস্ট্রার সাক্ষাত্কারটি ছাপাখানা থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। হারিয়ে যাওয়ার গল্পটা রাজিয়া খানের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে নানাভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর শুরুর কাজগুলো, পত্রিকা-ম্যাগাজিনে ছাপা তাঁর অনেক লেখার—কবিতা-ছোটগল্পের—এখন কোনো হদিস নেই। তাঁর দুটি ইংরেজি কবিতার বই—ক্রুয়েল এপ্রিল ও আর্গাস আন্ডার অ্যানেসথেসিয়া এবং দুয়েকটি বাংলা বই আমার সংগ্রহে আছে, কিন্তু অনেক লেখা তাঁর পরিবারের কাছেও নেই। রাজিয়া খান লিখতেন লেখার একটা তাগিদ থেকে, সেগুলো ছাপতে হবে, তা তেমন ভাবেননি। অনেক অপ্রকাশিত লেখা তাই অগ্রন্থিত এবং অনুদ্ধারযোগ্যই রয়ে গেছে।

রাজিয়া খান : অমনিবাস এডিশন ঢাকা ২০২০ পৃষ্ঠা: ২৮৮ দাম: ৪০০ টাকা।

কিন্তু পরিবারের উদ্যোগে ফোরাম নামের ষাটের দশকের ইংরেজি ম্যাগাজিনে প্রকাশিত রাজিয়া খানের কিছু কলাম, অন্যত্র প্রকাশিত বাবা তমিজ উদ্দিন খানকে নিয়ে তাঁর স্মৃতিচারণা ও একটি নিবন্ধ এবং ডেইলি স্টার-এর সাহিত্য পাতায় ছাপা তাঁর চারটি গল্প নিয়ে একটি অমনিবাস প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত বছরের ডিসেম্বরে সেটি প্রকাশিত হয়। অমনিবাস-এ আরও যোগ করা হয় তাঁকে নিয়ে তাঁর এককালীন কয়েকজন ছাত্রের স্মৃতিকথা, যে ছাত্ররা পরে শিক্ষক, কবি, অনুবাদক, গল্পকার ও সাংবাদিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। অমনিবাসটির মুখবন্ধ লিখেছেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, যাতে তিনি রাজিয়া খানের সাহিত্যকৃতির একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণও উপহার দিয়েছেন।

ফোরাম-এর লেখাগুলোতে চল্লিশ থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত বাংলা কবিতা নিয়ে মূল্যবান আলোচনা আছে। অনেক আলোচনার শিরোনামে গ্রিক কিংবদন্তির চরিত্রদের নাম ব্যবহার করে রাজিয়া খান তাঁর বিষয়গুলোর একটি পরিচিতি দিয়েছেন। আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া সাক্ষাত্কারের শিরোনামে ‘ইকারুসের ডানার চিত্রকল্প দিয়ে শান্তনুও রাজিয়া খানের সৃষ্টিশীল কল্পনাকে বর্ণনা করতে চেয়েছিলেন। উড়াল দেওয়াটা লেখকের একটা কর্তব্য হিসেবে তিনি দেখতেন। কারণ, আকাশে না উড়লে তাঁর চারদিকে সমাজের তুলে দেওয়া দেয়ালটা যেমন টপকানো হবে না, তেমনি আকাশের বিশালতাটা তাঁর জানা হবে না।

বিজ্ঞাপন
বইপত্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন