ইটনের দৃষ্টিতে বাংলায় ইসলামের বিস্তার

বাংলার ইতিহাসে ইসলামের বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ব্যাখ্যা ও বিতর্ক চালু রয়েছে। বলপ্রয়োগে ধর্মান্তর, বর্ণবৈষম্য থেকে মুক্তির আকর্ষণ, শাসকের সুবিধা কিংবা বিদেশি মুসলিম অভিবাসীদের বংশধর—এমন কয়েকটি প্রচলিত তত্ত্ব দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড এম ইটন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার: ১২০৪–১৭৬০–এ দেখিয়েছেন, বাংলায় ইসলামের বিস্তার ছিল আরও জটিল ও বহুমাত্রিক একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, যার কেন্দ্রে ছিল কৃষি সম্প্রসারণ, সীমান্তভূমির সামাজিক রূপান্তর এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন ধর্মীয় ধারার মিথস্ক্রিয়া।

এই প্রভাবশালী গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ ইসলামের উত্থান ও বাংলা সীমান্ত: ১২০৪–১৭৬০ প্রকাশ উপলক্ষে অনুবাদক ফিরোজ আহমেদ তাঁর এই লেখায় তুলে ধরেছেন—কেন তিনি বইটি বাংলায় ভাষান্তর করার প্রয়োজন অনুভব করেছেন।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

মুসলমানরাই যে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়, ১৮৭২ সালে প্রথম যথাযথভাবে পরিচালিত আদমশুমারির আগে আসলে তা ব্রিটিশরাও খেয়াল করেনি! রাজধানীকেন্দ্রিক শাসক ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ শাসিতের মধ্যকার বিস্তর দূরত্বের একটা অনুমান এ থেকে করা সম্ভব। ইসলামকে এর আগপর্যন্ত প্রধানত নগরকেন্দ্রিক একটি ধর্ম হিসেবেই ধরে নেওয়া হতো। বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক কীভাবে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হলেন, এ বিষয়ে সেই আদমশুমারির পর থেকে আজ পর্যন্ত বিতর্ক চলছে, মোটামুটি চারটি প্রভাবশালী তত্ত্ব দিয়ে একে ব্যাখ্যা করা হয়। তত্ত্বগুলো যথাক্রমে হলো:

ক. শাসকেরা বল প্রয়োগ করে স্থানীয় অধিবাসীদের ধর্মান্তরিত করেছেন;
খ. ইসলামের সাম্যের আকর্ষণে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন;
গ. রাষ্ট্রীয় সুবিধার মোহে শাসকের ধর্মকে দেশীয়রা নিজেদের ধর্মে পরিণত করেছেন; এবং
ঘ. বাংলার মুসলমানরা ইয়েমেন-আরব-ইরান-মধ্য এশিয়া-আফগানিস্তান থেকে আসা অভিবাসীদের বংশধর।

এই তত্ত্বগুলো নিছকই তাৎপর্যশূন্য কতগুলো ভাবনা নয়, বরং এগুলোর প্রতিটির জনপ্রিয়তা ও বিপুল প্রচারের পেছনে ভূমিকা রেখেছে তাত্ত্বিক ও প্রচারকারীদের বিভিন্নমুখী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শ্রেণিগত কিংবা সাম্রাজ্যিক স্বার্থ ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব।

চারটি তত্ত্বেরই সীমাবদ্ধতা অধ্যাপক রিচার্ড এম ইটন দেখিয়েছেন তাঁর প্রভাবশালী কাজ দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার: ১২০৪-১৭৬০ গ্রন্থটিতে। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত গ্রন্থটি অধ্যাপক ইটন ও মূল প্রকাশকের অনুমতি নিয়ে বাংলায় অনুবাদ করেছিলাম, বইমেলা ২০২৬-এ সেটি প্রকাশ করেছে প্রকাশনা সংস্থা দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল), তরজমারূপে বইটির নাম ইসলামের উত্থান ও বাংলা সীমান্ত: ১২০৪-১৭৬০

দুই

‘ইসলামবিদ্বেষী’ প্রাচ্যবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ইসলামকে রক্তলোলুপ ও হিংস্র বলে চিহ্নিত করা। এর সূত্রপাত হয়েছিল ক্রুসেড এবং ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকায় আরব ও তুর্কিদের সাম্রাজ্য স্থাপনের পর্বটিতে। ইউরোপীয় জাতিগুলো মুসলমানদের মুখোমুখি হওয়ার পরিণতিতে জন্ম নেওয়া পারস্পরিক শত্রুতার বোধই দুনিয়াজুড়ে উপনিবেশ বিস্তার করা ইউরোপীয়দের মধ্যে নতুন করে রীতিমতো প্রবল হয়ে ওঠে উনিশ শতকে, এর মূলে ছিল বিদ্রোহী হয়ে ওঠা মুসলমান প্রজাদের নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত ইউরোপীয় মন।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের অনেকেই কয়েক শতক ধরে ইউরোপে চালু থাকা এই দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত ছিলেন, তরবারির জোরে ইসলাম প্রচারের তত্ত্বটিকে তারা ভারতবর্ষ এবং বাংলায় ইসলামের বিস্তারকে ব্যাখ্যায় প্রয়োগ করেন। হিন্দু জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিকদের কল্যাণে এই তত্ত্বটি স্থানীয়দের মধ্যেও বিপুল প্রচার পায়। দৃষ্টান্ত হিসেবে ইটন বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন স্যার ইউলিয়াম ম্যুর, ভাষাবিদ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এবং রমেশচন্দ্র মজুমদারের কথা।

বাংলা অঞ্চলে দীর্ঘকাল মুসলিম শাসনের রাজধানী থাকা পাণ্ডুয়া, মুর্শিদাবাদ বা ঢাকার চেয়ে ইসলামের বিস্তার বহু বেশি মিলল দূরবর্তী ও প্রত্যন্ত জেলাগুলোয়; বগুড়া-রাজশাহী-পাবনায় দেখা গেল ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান।

এই তত্ত্বটির সমস্যা হলো, মুসলমানদের তরবারির জোর যেসব অঞ্চলে প্রবলতর ছিল, অর্থাৎ দিল্লি বা আগ্রার মতো মুসলিম শাসনের কেন্দ্রগুলোর আশপাশে বরং মুসলমানের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। অন্যদিকে, পূর্ব বাংলা বা পশ্চিম পাঞ্জাবের মতো যে স্থানগুলো ছিল শাসনের কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী, সেখানেই মিলল বিপুলসংখ্যক মুসলমান। অথচ তরবারির জোর এসব এলাকায় তুলনামূলকভাবে ছিল দুর্বল।

একইভাবে বাংলা অঞ্চলে দীর্ঘকাল মুসলিম শাসনের রাজধানী থাকা পাণ্ডুয়া, মুর্শিদাবাদ বা ঢাকার চেয়ে ইসলামের বিস্তার বহু বেশি মিলল দূরবর্তী ও প্রত্যন্ত জেলাগুলোয়; বগুড়া-রাজশাহী-পাবনায় দেখা গেল ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ মুসলমান। অধ্যাপক ইটন বরং সংশয়াতীতভাবেই দেখিয়েছেন, মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতার মাত্রার সঙ্গে ইসলাম বিস্তারের প্রত্যক্ষ একটা বিপ্রতীপ সম্পর্ক রয়েছে!

তিন

ইসলামের সাম্যের আকর্ষণে এবং সুফি দরবেশদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণের তত্ত্বটিরও হুবহু একই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উপমহাদেশজুড়ে যে অঞ্চলে বর্ণপ্রথার বৈষম্য যত প্রবল ছিল, দেখা যাচ্ছে ইসলামের প্রসার সেখানে তত কম! অথচ এই তত্ত্ব সঠিক হলে, অর্থাৎ বর্ণপ্রথার প্রতিবাদে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করলে বর্ণপ্রথা যেখানে শক্তিশালী, সেখানেই বেশি মানুষের ইসলাম গ্রহণ করার কথা ছিল।

পঞ্চম-ষষ্ঠ শতকে রচিত বৌধায়ন ধর্মসূত্র আর্যদের শুদ্ধতার সাপেক্ষে তিনটি বৃত্ত কল্পনা করা হয়। এর কেন্দ্রীয় বলয়টি আর্যাবর্ত, এখনকার উত্তর-মধ্য ভারতের গঙ্গা-যমুনা-বিধৌত অঞ্চলটি শুদ্ধতম আর্যদের বসতি হিসেবে কথিত। মাঝখানেরটিতে মিশ্রিত জনগোষ্ঠীর বসতি, এটি এখনকার মালব, পূর্ব ও মধ্য বিহার, গুজরাট, দক্ষিণাত্য ও সিন্ধু। ঠিক এর বাইরের বৃত্তটিতে ‘অপরিচ্ছন্ন’ জাতিগুলোর বাস, এসব স্থানে ভ্রমণ করলে আর্যদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তৃতীয় বলয়ের বাসিন্দা হিসেবে যাদের কথা বলা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছে পাঞ্জাবের আরাট্টা, দক্ষিণ পাঞ্জাব আর সিন্ধুর সৌভির এবং উত্তরবঙ্গের পুণ্ড্র আর দক্ষিণবঙ্গের বঙ্গ জাতিসহ আরও কিছু জনগোষ্ঠীর কথা।

এই তৃতীয় বৃত্তের একটা বড় অংশেই দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ মুসলমানের বসতি এবং এই তৃতীয় বৃত্তটি ভুক্ত বড় দুটি অঞ্চল নিয়েই ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা গঠিত হয়।

অভিবাসীদের বংশধরদের সূত্রে ইসলাম প্রচারের তত্ত্বটি এসেছে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মুসলমান হওয়ার তত্ত্বটির বিরোধিতা থেকে। হীন অবস্থায় থাকা হিন্দুরা মুসলমানদের পূর্বপুরুষ—এটা তাদের জন্য মেনে নেওয়াটা কঠিন ছিল।

ফলে সাম্যের আকর্ষণে কিংবা সুফিদের প্রচারণার কারণে যদি মানুষেরা ধর্মান্তরিত হতেন, তাহলে আর্যাবর্ত বা কেন্দ্রীয় বৃত্তটি কিংবা অন্তত তার ঠিক বাইরের বৃত্তটিতে বেশি মানুষের মুসলমান হওয়ার কথা ছিল। কারণ, বর্ণাশ্রমও এ অঞ্চলে বেশি সুপরিগঠিত ছিল, আজও ভারতের এই গোবলয়টিতে বর্ণকাঠামোর রাজনীতি অনেক শক্তিশালী।

অভিবাসীদের বংশধরদের সূত্রে ইসলাম প্রচারের তত্ত্বটি এসেছে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের মুসলমান হওয়ার তত্ত্বটির বিরোধিতা থেকে। আশরাফ উচ্চম্মন্যতা ছিল এর সূতিকাগার, হীন অবস্থায় থাকা হিন্দুরা মুসলমানদের পূর্বপুরুষ—এটা তাদের জন্য মেনে নেওয়াটা কঠিন ছিল। হিন্দু সমাজের অস্পৃশ্য অংশ থেকে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের উদ্ভব হওয়ার সম্ভাবনা আশরাফ সম্প্রদায়ের সামাজিক মর্যাদাকে ঝুঁকিগ্রস্ত করেছিল, এ বিষয়ে আবু এ গজনভী ও খোন্দকার ফজলে রাব্বী নামের দুজন আশরাফ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধির রচনা নিয়ে অধ্যাপক ইটন বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বাংলার আশরাফ শ্রেণি ও কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলামবিষয়ক গভীর বিভাজনটি আজও সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে নানান মাত্রা নিয়ে উপস্থিত রয়েছে।

চার

অধ্যাপক ইটন এমনকি ধর্মান্তরকরণের ধারণাটিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, বরং অনেকগুলো দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, মোগলরা সাধারণভাবে প্রজাদের ধর্ম পরিবর্তনের বিরোধী ছিলেন। মোগল সেনাবাহিনী বা অভিজাত কুলে প্রবেশের জন্য মুসলমান হওয়াটা কোনো শর্ত ছিল না। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্মের আওতায় থেকেই মোগল রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করতে পারতেন, এই বিচারে সমকালীন তুর্কি উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে মোগলরা স্বতন্ত্র ছিলেন। বাংলায় ধর্মান্তর ঘটানোর জন্য শাস্তিও পেতে হয়েছে কোনো কোনো সেনা কর্মকর্তাকে।

গ্রাম পর্যায়েও মোগল আদালত কীভাবে হিন্দুধর্মীয় সংবেদনশীলতার প্রতি সাড়া দিতেন, তা বোঝাতে বিখ্যাত পর্তুগিজ পাদরি সেবাস্তিয়ান মানরিকের একটি অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন ইটন। এ ঘটনায় মানরিকের অনুচর একজন বাঙালি মুসলমান একটি হিন্দু গ্রামে ময়ূর জবাই করার দায়ে আদালতে শাস্তির সম্মুখীন হন, বিচারকও ছিলেন আরেকজন বাঙালি মুসলমান। ইসলামের ধর্মীয় যুক্তি দিয়ে মানরিক এই শাস্তি রদ করার অনুরোধ করলেও এবং তার ধর্মীয় যুক্তির সঙ্গে একমত হয়েও সেই মফস্‌সলি বাঙালি মুসলিম বিচারক রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

পাঁচ

তাহলে এই মোগল আমলেই কীভাবে প্রথম বাঙালি মুসলমান কৃষক জনগোষ্ঠীর দেখা মিলল?

এই আপাতদৃশ্যে স্ববিরোধী ফলাফলের ব্যাখ্যাতেই অধ্যাপক ইটন বাংলা অঞ্চলের সীমান্ত বৈশিষ্ট্যটির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। গ্রন্থটির নামকরণে ‘বাংলা সীমান্ত’ কথাটিও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে; এই ধর্মীয় রূপান্তরের পুরো সময়টিতে বাংলা অঞ্চলটি নিজেই ছিল অস্থির এবং সুনির্দিষ্ট অবয়বহীন একটি সীমান্ত এবং তা বহুবিধ অর্থে।

মোগল আমলে পশ্চিম থেকে প্রধানত পূর্ব মুখে প্রসারিত হতে থাকা রাজনৈতিক সীমান্ত, কৃষি সীমান্ত, ইসলামের সীমান্ত ঠাঁই করে নিল আগে থেকে অস্তিত্বমান একটি সংস্কৃত সংস্কৃতির সীমান্তের ওপর, হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মরূপে এর আগেকার কয়েক শ বছর ধরে এটিও প্রধানত পশ্চিম থেকে পূর্ব মুখে বিস্তৃত হচ্ছিল।

গ্রন্থটির নামকরণে ইসলাম ধর্মের বিস্তারের কথা থাকলেও একই সময়েই—অর্থাৎ ওই মোগল আমলেই—পূর্ববঙ্গে হিন্দুধর্মেরও বিস্তার ঘটেছে। আওরঙ্গজেবের আমলেও শুধু সিলেট অঞ্চলেই হিন্দুধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৩টি দানের দলিল মেলে।

বাংলা সীমান্তে ইসলামের অভ্যুদয়–বিষয়ক এই আখ্যানের প্রধান কুশীলব হলেন অরণ্য অগ্রদূতরা। এখানকার অধিবাসীদের বৃহৎ অংশই তখনো শাস্ত্রনির্ভর বৃহৎ ধর্মগুলোর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে খুব সামান্যই এসেছিলেন। কীভাবে জঙ্গল পরিষ্কার করে সেখানে ধান আবাদের সূচনা ঘটিয়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তারা প্রধানত ইসলাম ও হিন্দুধর্মের কাঠামোতে নিয়ে এলেন, মহাকাব্যিক সেই রূপান্তরের স্বরূপ পাঠক এই গ্রন্থে উপলব্ধি করবেন।

গ্রন্থটির নামকরণে ইসলাম ধর্মের বিস্তারের কথা থাকলেও একই সময়েই—অর্থাৎ ওই মোগল আমলেই—পূর্ববঙ্গে হিন্দুধর্মেরও বিস্তার ঘটেছে। এমনকি, রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত আওরঙ্গজেবের আমলেও শুধু সিলেট অঞ্চলেই হিন্দুধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৩টি দানের দলিল মেলে। ভূমির খাজনার ওপর নির্ভরশীল একটি সাম্রাজ্য হিসেবে মোগলদের মূল আগ্রহের বিষয়টি ছিল আরও বেশি জমিকে খাজনার আওতায় নিয়ে আসা। স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের অনুগত খাজনা প্রদানকারী প্রজায় পরিণত করা ছিল এই লক্ষ্য পূরণের উপায়।

ছয়

একই সঙ্গে গ্রন্থটি বাংলায় ইসলাম বিস্তারের একটি বৈশ্বিক ইতিহাসও।

বাংলায় সমুদ্রবাণিজ্য বৌদ্ধ আমলেও শক্তিশালী ছিল, সুলতানি আমলে তা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু মোগল আমলে বাংলা বলতে গেলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পুঁজি এখানে নিয়োজিত হয়েছিল। মির্জা নাথানের স্মৃতিকথা থেকে অধ্যাপক ইটন আমাদের জানাচ্ছেন মাড়োয়ারি লগ্নিপুঁজির কথা, যারা অরণ্য সাফ করায় কিংবা মোগল সেনাবাহিনীর অভিযানে বিনিয়োগ করছিল। এমনকি আমেরিকার খনি থেকে উত্তোলিত রুপারও অন্যতম শেষ গন্তব্য ছিল পূর্ব বাংলার রমরমা উৎপাদনী খাত, ‘১৫৫০–এর দশকে পর্তুগিজরা দেখতে পেল যে বাংলায় তারা এই পরিমাণ সম্পদ নিয়ে যায় যে, বাংলা ও মালাক্কায় যাত্রা করার মৌসুমের সাপেক্ষে গোয়ায় রৌপ্যমুদ্রার দাম কার্যত ওঠানামা করে।’

আরও পড়ুন

মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যও বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে ধরা দিয়েছে এই গ্রন্থে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বৃহদাংশের ইসলামের বলয়ে আসার তিনটি পর্বকে অধ্যাপক ইটন চিহ্নিত করেছেন, বিদেশি উৎসজাত উপাস্য ও সত্তাগুলো স্থানীয়দের ঐশীমণ্ডলীতে স্থান করে নেওয়ার প্রক্রিয়াটিকে তিনি বলেছেন অন্তর্ভুক্তিকরণ, পরের ধাপে ভিন্ন উৎস থেকে আসা ঐশী সত্তাগুলো স্থানীয় কোনো উপাস্যের সঙ্গে অভিন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং তৃতীয় একটি ধাপে তারা স্থানীয় দেবকুলকে প্রতিস্থাপিত করে। বাংলা সাহিত্য এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক সাহিত্য থেকে এই প্রতিটি পর্বের নিদর্শনগুলো ইটন হাজির করেছেন, একই সঙ্গে তিনি পৃথিবীজোড়া সাদৃশ্যমূলক দৃষ্টান্তগুলোও তুলে ধরেছেন। কালকেতু ও ফুল্লরা উপাখ্যানকে বাংলার অরণ্যে জমি পরিষ্কার, নগরায়ণের পাশাপাশি অগ্রিম অর্থ প্রদান এবং লেনদেনের মতো মুদ্রানির্ভর অর্থনীতির প্রচলনেরও সাহিত্যিক প্রকাশ হিসেবে প্রদর্শন একদিকে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগকে পাঠকের কাছে আরও তাৎপর্যময় করে তুলবে, একই সঙ্গে পৃথিবীর অন্য অঞ্চলগুলোর সঙ্গে তার তুলনামূলক বিচারও সম্ভব হবে।

সাত

গ্রন্থটির কোনো কোনো অংশ ভাষান্তর করতে গিয়ে উৎকণ্ঠিত থাকতে হয়েছে, বারবার সংশয় জেগেছে বিষয়বস্তুর মহত্ত্ব এই শব্দগুলো আদৌ ধারণ করতে পারছে তো! যেমন, যেখানে বাংলার নিজস্ব স্থাপত্যরীতিটির উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে—গ্রামীণ কুঁড়েঘরের চিরচেনা খড়ের ছাউনির চাপে বেঁকে যাওয়া বাঁশের কাঠামোর গড়নটিকে বাংলার কারিগরেরা অনুবাদ করেছেন পোড়া ইটের ভাষায়, আর এভাবে জন্ম নিচ্ছে নতুন একটি স্থাপত্যশৈলী—এই জন্মকাহিনি যে তুরীয় অনুভূতির জন্ম দেয়, তা হয়তো ভাষাতীত।

ইসলামের উত্থান ও বাংলা সীমান্ত: ১২০৪–১৭৬০
রিচার্ড ম্যাক্সওয়েল ইটন
ভাষান্তর: ফিরোজ আহমেদ
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬
প্রকাশক: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউ পি এল)
পৃষ্ঠা: ৪২০
মূল্য: ৭৪০ টাকা

বইটি সংগ্রহ করতে চাইলে ক্লিক করুন

বাঙালি স্থাপত্যের এই রীতিটি পূর্ণরূপে বিকশিত হয়েছিল সুলতানি আমলে; ভাগ্যান্বেষী তুর্কি যোদ্ধারা বাংলা বিজয় করেছিলেন, কয়েক প্রজন্ম পরই বাংলাই তাদের জয় করে নিয়েছিল। বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলে তুর্কি-আফগান-ইরানি-আরব বংশোদ্ভূত নগরবাসী আশরাফ শ্রেণিই ইসলামি মূল্যবোধের প্রধান ধারক ও বাহক। কিন্তু মোগল আমলেই অরণ্য পরিষ্কার ও রোপা আমন চাষের বদৌলতে ইসলাম [এবং হিন্দু, খুব স্বল্প মাত্রায় হলেও বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টধর্মও] ছড়িয়ে পড়ে বাংলার দূরতম ও প্রত্যন্ততম সব প্রান্তে।

অধ্যাপক ইটন দেখিয়েছেন, ইতিহাসের এক একটি পর্বে এক একটি শ্রেণি ইসলামের বাহক ছিল বলেই ধর্মটি নতুন নতুনভাবে ব্যাখ্যাকৃত হয়েছে। ত্রয়োদশ শতকে ইসলাম ছিল তুর্কি অভিজাতদের মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, নগরবাসী নানান সুফি সম্প্রদায়ের সূত্রে পরবর্তী কয়েক শতক তা অক্ষুণ্ন ছিল। কিন্তু সপ্তাদশ ও অষ্টাদশ শতকে আশরাফ শ্রেণি আর বাংলায় ইসলামি সভ্যতার প্রধান বাহক ছিলেন না। বরং তা হয়ে উঠলেন জমি আবাদকারী কৃষকেরা, অসামান্য সব উপায়ে যাঁরা ইসলামকে কৃষকের নিজস্ব বিশ্ববীক্ষায় আত্তীকৃত করেন। আর সাহিত্যেও, ঠিক এই সময়েই প্রথমবারের মতো জন্ম নিতে থাকল মনসুর বয়াতির লেখা দেওয়ানা মদীনার মতো সাহিত্যকর্মগুলো, যাদের কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রামীণ মুসলমান কৃষক ও কিষানি।