সেলফ সেন্সরশিপ কী ও কেন

প্রতিটি সম্পর্কে বা প্রকাশের পথে সাধারণত সুনির্দিষ্ট বিধিনিষেধের কড়াকড়ি থাকে না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থাকে না আইনগত নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু মানুষ নিজেকে বা নিজের সৃষ্টিশীলতা প্রকাশে একধরনের বাধা অনুভব করে। অদৃশ্য বাধা। তাই স্বেচ্ছায় নিজের বক্তব্যকে নিজেই কেটেছেঁটে উপস্থাপন করে—সে হোক সংবাদে, সাহিত্যে, কী আলাপ-আড্ডায়। মোটামুটিভাবে এই হলো সেলফ সেন্সরশিপ, সাহিত্য বা সংবাদ প্রকাশনার আদর্শের কথা ভাবলে যা অত্যন্ত গর্হিত। তবে বিভিন্ন বাস্তবতায় সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ এতটাই বিদ্যমান থাকে যে মানুষ তার অনুসারী হয়; বরং সেলফ সেন্সরশিপের অনুপস্থিতি থাকলে বক্তা হন সমালোচনার শিকার, যা ‘গোপন থাকা উচিত’, তাকে প্রকাশ্যে এনে বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে!

কে তবে সিদ্ধান্ত নেন কোনটা গোপন থাকা উচিত আর কেনই–বা নেন এ রকম সিদ্ধান্ত?

আমরা প্রত্যেকেই নিই। নিজেকে প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি সমাজে ভয়ের আবহ লক্ষ করেই মূলত এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একজন সাংবাদিক কাজল, কার্টুনিস্ট কিশোর বা লেখক মোস্তাককে তুলে নিয়ে ভয়ের আবহ তৈরি করা যায়, একজন সাংবাদিক রোজিনাকে কারারুদ্ধ করে ‘শিক্ষা’ দেওয়া যায়, আর ঘাড়ের ওপরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে ফণা তুলিয়ে রাখা যায়, কোনো একটি বইকে বইমেলার ‘নীতির পরিপন্থী’ বলে মেলার স্টলে তালা ঝুলিয়ে প্রকাশকদের জুজুর ভয় দেখানো যায়, আর বইমেলার বাইরে লেখককে চাপাতির কোপে ঘায়েল করে লেখকদের কলমে লাগাম দেওয়া যায়। এসবের পর লেখক-সাংবাদিক ও সাধারণের ওপর আর বিশেষ নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হয় না, মানুষ এমনিতেই সুতোয় বাঁধা পুতুল হয়ে যায়।

অস্ট্রীয় মনস্তত্ত্ববিদ সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, কাজের ক্ষেত্রে অবচেতন মন থেকে চেতনাকে পৃথক করার নামই সেন্সরশিপ। স্বপ্নে মানুষ অবচেতনে থাকে বটে, তবে জেগে থাকলে স্বভাবগতভাবে চেতনাকে ক্রমাগত পৃথক করতে থাকে। সোজা কথায়, মানুষের সাধারণ ও স্বাভাবিক চিন্তাধারায় বিরতিহীন সেন্সরশিপ একরকমের অত্যাচার বা পীড়ন।

রাজনৈতিক মেরুকরণ

সমাজে তুলনামূলক বেশি প্রভাবশালী গোষ্ঠী থাকে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, বৈভবে, প্রশাসনিক কিংবা শারীরিক ক্ষমতায় তারা বলীয়ান। সমাজের মানুষের প্রবণতা থাকে তাদের খুশি রেখে কিংবা অখুশি হতে না দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করা, সাহিত্য বা ইতিহাস রচনা করা, চলচ্চিত্র নির্মাণ করা—এমনকি নিজের তাৎক্ষণিক অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রেও লোকে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ উপেক্ষা করতে পারে না। তখন তথ্য ও মতের দ্বন্দ্ব চলে। তাই সংবাদ-সাহিত্য-ইতিহাস-চলচ্চিত্রে পরিবেশিত তথ্য কেবল তথ্য নয়; বরং তা সাধারণভাবে মতামতমিশ্রিত তথ্য, যার মাধ্যমে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আদর্শ সম্পর্কে অন্যে ধারণা পেতে পারে। কেউ তথ্য পাওয়ামাত্র পরিবেশন করে, কেউ করে বেশ কিছু অপেক্ষার পর, মূলত অন্য পরিবেশনকারীর পর। কেউবা আবার কখনোই প্রকাশ করে না; অর্থাৎ বেমালুম চেপে যায়। এই চেপে যাওয়ার পেছনে অনেক ক্ষেত্রেই কাজ করে রাজনৈতিক বিবেচনা ও বিদ্যমান ভয়ের সংস্কৃতি।

সেলফ সেন্সরশিপ কেবল বাংলাদেশ বা এশিয়ার সমস্যা নয়—যেখানেই প্রকাশের মাধ্যম আছে, সেখানেই আছে সেলফ সেন্সরশিপ। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা যায়, রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রাদুর্ভাবে আমেরিকার প্রায় অর্ধেক মানুষ মতপ্রকাশের বদলে নীরব থাকতে পছন্দ করে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, ১৯৫৪ সালে ১৩ শতাংশ মানুষ নীরব থাকতে চাইত, যা ২০২০ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ শতাংশ। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের প্রকাশ যেমন বেড়েছে, বেড়েছে প্রকাশের ভয়ও। প্রকাশ্যে মত জানালে মানুষের অপছন্দের বা ঘৃণার পাত্র হতে হয়, কখনো এ জন্য বড় দাম দিতে হয় বলে অনেক আমেরিকানের ধারণা। একদিকে সেলফ সেন্সরশিপ অনুপস্থিত থাকলে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ হয়ে পড়ে, অন্যদিকে সে কারণে নিজস্ব গণ্ডির কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়ার মতো দুঃসহ পরিণতি ঘটে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত থেকে শুরু করে মধ্যম নিয়ন্ত্রণের বা খোলামেলা—যেকোনো সমাজের জন্য স্বাভাবিক।

নিজস্ব গণ্ডিতে অগ্রহণযোগ্যতা

যত বড় সমাজই হোক না কেন, মানুষ মূলত বাস করে নিজস্ব সীমিত গণ্ডিতে। কাছের বন্ধু বা পরিবার কী ভাববে? মতামত যদি সরকারের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়? সরকার যদি হস্তক্ষেপ করে? মতামত রাজনৈতিকভাবে সঠিক তো? মতপ্রকাশের ফলে কি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুসারী হিসেবে পরিগণিত হবে? রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার কবলে পড়ার আশঙ্কা আছে? গ্রেপ্তারের আশঙ্কা আছে? এত সব সচেতন প্রশ্ন মাথায় নিয়ে যা বলা উচিত, তা বলা বা লেখা সত্যিই দুরূহ। মানুষ সীমিত গণ্ডিতে বিচরণ করে বলেই অন্যের সমালোচনার লক্ষ্য হতে চায় না। তবে সাধারণ কথা থেকে শুরু করে প্রশংসাও মানুষ মন খুলে করতে পারে না। বিপরীত মতাদর্শের লোক সম্পর্কে প্রকাশ্য প্রশংসা নিজের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, এমনকি বিরাট ক্ষতির কারণও হয়। নিজের মতাদর্শের কাছে নিন্দিত তো বটেই, অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়ে মানুষটি। তাই সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার ভয় যে সমাজে যত বেশি, সে সমাজে সেলফ সেন্সরশিপও প্রকট।

আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী মাজলোর পিরামিড থিওরি অনুযায়ী, অন্ন-বস্ত্র-নিরাপত্তার প্রয়োজন মিটতেই মানুষ চায় সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা। না পেলে সে নিজেও একসময় অন্যের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে, ‘আমাকে যেহেতু বলতে দেয়নি, তাই আমিও বলতে দেব না!’

সেলফ সেন্সরশিপে আইনের ভূমিকা

নিরাকার অদৃশ্য বাধা চারদিকে ছেয়ে থাকে আর কাগজে-কলমে এ দেশে ডিজিটাল আইনও থাকে। বইপত্র, পত্রিকা, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে উপস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গেই সেলফ সেন্সরশিপ হাত ধরাধরি করে হাজির হয়। শুধু ছাপা মাধ্যম নয়, ফেসবুকে ইতিমধ্যে প্রকাশিত ও নিতান্ত সাধারণ বিষয় উত্থাপনের কারণেও মানুষ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার ও হয়রানির শিকার হয়েছে। এ কারণে ছাপার ক্ষেত্রে তো তো বটেই, ডিজিটাল যোগাযোগমাধ্যমে দুটো বাক্য লিখতে গেলেও মানুষ আগুপিছু ভাবে। কিছু বছর আগে হয়তো স্রেফ আড্ডাপ্রধান মাধ্যমগুলোতে ‘কোথাকার জল কোথায় গড়ায়’–জাতীয় দুর্ভাবনা মানুষের মনে এত প্রকটভাবে দানা বাঁধত না। 

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিরুদ্ধে এ দেশের প্রধান পত্রিকার সম্পাদকেরা রাস্তায় পর্যন্ত দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু মানুষকে সেলফ সেন্সরশিপের জালে বরাবর বেঁধে রাখার লক্ষ্যে এই আইনের উপস্থিতির বিকল্প সরকার হয়তো এখনো পায়নি। শোনা যায়, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পাশাপাশি আরও কিছু দমন-পীড়নমূলক আইনের প্রস্তুতি চলছে, যা ভবিষ্যতে মানুষকে সেলফ সেন্সরশিপের দাসে পরিণত করতে ব্যবহৃত হবে। কারণ, এই ধরনের আইনের ক্রমাগত চাপ সমাজে একধরনের ভীতি তৈরি করে, যা থেকে মানুষের মনস্তত্ত্ব বদলে যায়। প্রকাশ না করা কিংবা কেটেছেঁটে প্রকাশ করাকেই মানুষ তখন ভব্যতা মনে করে। সমাজে একসঙ্গে বসবাসরত মানুষগুলো তাই যান্ত্রিক আবহে স্বপ্রণোদিতভাবে সুনির্দিষ্ট শব্দ-বাক্য পরিহার করে, বহুল প্রচলিত ধ্যানধারণায় পরিচালিত হয়ে ‘আহা বেশ বেশ বেশ’ ধরনের জারিগানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এক সর্বজনীন মানসিক বৈকল্যের দিকে এগোয়।

এই পদ্ধতিতে একেক সীমিত গণ্ডি একেকটি ‘সাইলো’ কিংবা ‘ইকো চেম্বার’ হয়ে ওঠে। মানুষ যা বলে, কেবল তারই প্রতিধ্বনি শুনতে পায়। প্রতিধ্বনি শুনে নিরাপদ আছে জেনে নিশ্চিন্ত থাকে। আমার সমাজে বিরুদ্ধ মত নেই—এই ধারণাই সর্বজনীন মানসিক বৈকল্যের চূড়ান্ত প্রকাশ হিসেবে টিকে থাকে। মানুষের সৃষ্টিশীলতা তখন নিজস্ব গণ্ডির একমুখী ধ্বনি-প্রতিধ্বনির কাছে পরাজিত হয়।

এভাবে সমগ্র সমাজ, দেশের আইন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকলাপ সৃষ্টিশীল লেখক-শিল্পী-বক্তাকে সেলফ সেন্সরশিপের জটিল আবর্তে ঘুরপাক খাওয়ায়।

সর্বতোভাবে ভয়ের সংস্কৃতি পুরো বিষয়টাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কখনো আবহাওয়াকে আরও বেশি উসকে দেওয়ার জন্য কিছু ঘোষণা আসে। যেমন, চার বছর আগে প্রেসক্লাবে অপরাধবিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার সুস্থ মস্তিষ্কে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘কোন বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করা যাবে, কতটা প্রকাশ করা যাবে, সরাসরি সম্প্রচার কতটা করা যাবে, এ বিষয়গুলো সাংবাদিকদের একটা সেলফ সেন্সরশিপের আওতায় আনা উচিত।’ অসহিষ্ণুতা, ভীতি আর সংশয়প্রধান সমাজে তখন প্রকাশের শিষ্টতাবিরোধী এহেন অশোভন বক্তব্য বাড়তি হুঁশিয়ারি যোগ করে। মানুষ আরও বেশি করে শামুকের খোলসে ঢোকে, উটপাখির মতো বালুতে মুখ গোঁজে।

বইয়ের প্রকাশনা ও সেলফ সেন্সরশিপ

বাংলাদেশে বইয়ের প্রকাশনার ক্ষেত্রে লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশককে নানা রকমের সেলফ সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শুধু এ েদশে নয়, পৃথিবীব্যাপী বই প্রকাশে সেলফ সেন্সরশিপ বিশেষ বাধা হয়ে ওঠে। বিশ্বখ্যাত অ্যানিমেল ফার্ম উপন্যাসের মুখবন্ধে ব্রিটিশ লেখক জর্জ অরওয়েল বলেছেন, ‘স্বাধীনতার যদি কোনো মানে থেকেই থাকে, তবে তা হলো মানুষ যা শুনতে চায় না, তা তাকে শোনানোর অধিকার।’ স্তালিনের অধীন সোভিয়েত কমিউনিজমের নিষ্ঠুরতা ও প্রতারণার বিপক্ষে খামারভিত্তিক একটি রূপক কাহিনিসংবলিত উপন্যাসটির প্রকাশক খুঁজতে তাঁর এক বছর লেগেছিল। কারণ, তিনি এমন সময়ে উপন্যাসটি লেখেন, যখন আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্রিটেনের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বিশেষ শক্তি। ছয়টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, এমনকি কবি টি এস এলিয়টও চাননি সোভিয়েত কমিউনিজমের মুখোশটা বইটির মাধ্যমে
খসে পড়ুক।

সাংবাদিক বা লেখক যখন সমাজ, সরকার বা প্রতিক্রিয়ার ভয়ে নিজের লেখা একটু ঘুরিয়ে লেখেন বা যা লেখেন তা প্রকাশ করেন না, তখন তিনি সেলফ সেন্সরশিপের আওতায় থাকেন, যা কিনা লেখক বা সাংবাদিকের কর্তব্য বা দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন। এর সঙ্গে সম্পর্ক কেবল অজানা ভয়ের। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা র​্যাঙ্কিংয়ে ফিনল্যান্ড বরাবর প্রথম কয়েকটি দেশের মধ্যে থাকলেও সেখানকার একজন সাংবাদিককে বলতে দেখা গেছে, ‘আমার ওপর যারা আক্রমণ করেছিল, ভয়ের ব্যাপার হলো, তারা আমার সন্তানকে চেনে।’ তবে যাঁরা সেলফ সেন্সরশিপের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন, তাঁরা জানেন, তাঁদের কাজকর্মে কোনো কোনো মানুষের বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখানোর অর্থই হলো, তাঁরা সঠিক পথে আছেন।

প্রতিপক্ষের অসহিষ্ণু মন্তব্য ও নিষ্ঠুর আচরণই সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য ভয়কে জয় করার প্রমাণ। এই সমাজেই এমন মানুষ আছেন, যিনি সেলফ সেন্সরশিপকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সংবাদ উপস্থাপন বা সৃষ্টিশীল কাজ করেন।
এটাই প্রমাণ করে যে ভয় অনেক ক্ষেত্রে কেবল ‘জুজুর ভয়’। 

অখণ্ড নীরবতার আয়নায় নিজেকে আটকে ফেলা

সেলফ সেন্সরশিপ মানুষকে এমন এক আয়নার দেয়ালের মধ্যে আটকে ফেলে, যার চারদিকে কেবল নিজেরই প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। সমাজে সহিষ্ণুতা কমে যাওয়া আর সেলফ সেন্সরশিপের বৃদ্ধি ঘটা সমানুপাতিক। এই সময়ে হয়তো ভলতেয়ারের মতো কারও আবির্ভাব প্রয়োজন, যিনি অসহিষ্ণু মানুষদের শেখাতে পারেন, ‘তোমার মতে আমার অমত থাকতে পারে, কিন্তু মৃত্যুবরণ করতে হলেও আমি তোমার মত প্রকাশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে যেতে চাই।’ এখনকার সমাজ অন্য রকম, এখনকার নিয়ম চুপ থাকা। অখণ্ড নীরবতা। কারণ, এহেন ক্ষেত্র নেই, যাকে মিথ্যাচার, শঠতা গ্রাস করেনি। বর্তমানে সমাজের ব্যক্তিগত গণ্ডিতে মানুষ নিমজ্জিত, গা বাঁচিয়ে চলা সুখী হাসি এখন তার পরিচয়ের ছবি। এর বাইরে গেলে তাকে দায়িত্ববান বা সাহসী জ্ঞান করা হয় না; বরং ‘বোকামি’ বা ‘অর্থহীন দুঃসাহস’ চিহ্নিত হয়
তার স্বভাবে।

তাই তো যেকোনো বিষয় লেখকের লেখার বিষয়বস্তু হয় না। যেকোনো সংবাদ নিশ্চিত
হলেও সামনে আনার ব্যাপারে সাংবাদিককে বারবার ভাবতে হয়। যেমন এ রকম একটি লেখা শেষ করেই শুরু থেকে আরেকবার চোখ বোলাতে গিয়ে মনে হয়, এখানে যা লিখেছি, তার মধ্যে থেকে কোনো শব্দ কি বদলে দেওয়া উচিত? কোনো প্রসঙ্গ বাদ যাবে কি? কেউ আহত বা বিব্রত হবেন না তো? কেউ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ধরে নেবেন না তো? যদিও লেখার টেবিলের পাশে কেউই বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে নেই, শুধু আছে অদৃশ্য আতঙ্কের চাপ।