সেদিন বাসায় সান্ধ্য আড্ডা নেই। বইমেলা শেষ, কিন্তু একটি নাটকের স্ক্রিপ্ট লিখছিলেন হুমায়ূন ভাই। আমি গিয়েছি খবর পেয়ে এসে
হাত ধরে ভেতরে টেনে নিয়ে গেলেন। আমার মুখের কাঁচুমাচু ভাব তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। স্নেহের সুরে বললেন, ‘কী সমস্যা, বলেন তো লতিফ ভাই?’

আমি বললাম, আগামীকাল ইংল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের খেলা। কারও কারও ধারণা, আমি বললেই আপনি কাগজ-কলম নিয়ে এখনই লিখতে বসে যাবেন এবং দেশের ক্রিকেটারদের উত্সাহ দিয়ে একটি লেখা লিখে ফেলবেন। আগামীকাল প্রথম আলোর প্রথম পাতায় আপনার লেখাটি ছাপা হবে।

আমার কথায় হুমায়ূন ভাইয়ের মুখে অদ্ভুত এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল।

‘আচ্ছা লিখব। আপনার বসে থাকার দরকার নেই। লেখা শেষ হলে পাঠিয়ে দেব।’

ঘড়িতে দেখলাম সন্ধ্যা ছয়টা। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে প্রথম আলোতে ফিরে এলাম।

রাত নয়টা পার হয়েছে। টেনশন নিয়ে আলীম আজিজের সঙ্গে বসে আছি। এমন সময় বার্তাবাহক হাজির। লেখাটি নিয়ে দ্রুত গেলাম মতি ভাইয়ের দপ্তরে। তিনি লেখাটি ছোঁ মেরে নিয়ে বার্তা সম্পাদককে দিয়ে এলেন।

পরদিন প্রথম পাতার মধ্যভাগে হুমায়ূন আহমেদের লেখাটি ‘মন্তব্য প্রতিবেদন’ হিসেবে ছাপা হলো।

দুই.

হুমায়ূন আহমেদের ‘দখিন হাওয়া’র বাসার সদর দরজা কখনো খিল আঁটা থাকে না। সেদিন আমি যখন তাঁর বাসায় পৌঁছালাম, তখন রাত পৌনে আটটা। সদর দরজার বাইরে একগাদা জুতা। বোঝা গেল, ভেতরে অনেক অতিথির সমাগম। জুতা খুলে ভেতরে ঢুকে আমি কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত। অনেক মানুষ বসে আছেন। হুমায়ূন ভাই নেই। আমি প্রায় কাউকেই চিনি না। ঠিক এ সময় ভেতরের ঘরের দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন হুমায়ূন ভাই। পরনে থ্রি–কোয়ার্টার আর হাফ শার্ট। আমাকে দেখে বললেন, ‘আসেন লতিফ ভাই, বসেন।’

আমি বললাম, এই পোশাক?

এক গাল হেসে হুমায়ূন ভাই ইঙ্গিত করলেন আসাদুজ্জামান নূরের দিকে, ‘একটু আগে নূর এসেছে। বলল, একজন মন্ত্রী আসবেন। এই দেশে মন্ত্রী এলে কিছু একটা করতে হয়। তাই ভেতরে গিয়ে লুঙ্গি পাল্টে থ্রি কোয়ার্টার পরে এলাম। ঠিক আছে না?’

সারা ঘরে হাসির রোল উঠল। আসাদুজ্জামান নূরের পাশে বসে হুমায়ূন ভাই সিগারেট ধরালেন।

তিন.

কয়েক দিন ধরে হুমায়ূন আহমেদের বাসায় যাওয়া হচ্ছে না। গতকাল তিনি ফোনে মেসেজ পাঠিয়েছেন। সেই মেসেজে কোনো কথা লেখা নেই, কেবল একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন (?)। এমন বার্তার অর্থ হলো, তাঁর বাসায় কেন যাচ্ছি না। আজ সন্ধ্যাবেলায় আবার তাঁর মেসেজ পেয়েছি। এবার দুটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন (??)। হাতে কাজ ছিল, তবু দখিন হাওয়াতে গেলাম। বেশিক্ষণ বসার সুযোগ ছিল না। নয়টা বাজতেই উঠে পড়লাম। হুমায়ূন ভাই বললেন, ‘এখনই যাবেন? একটা জিনিস দেখে যান।’

হাত ধরে তিনি শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরের একপাশে দুটি বকযন্ত্র। একটিতে লাল, অন্যটিতে হলুদ পদার্থ।

হুমায়ূন ভাই হেসে বললেন, ‘সারা পৃথিবীতে আঙুর থেকে বিভিন্ন পানীয় তৈরি হয়। আঙুরে চিনি আছে। ফার্মেন্টেশন করে চিনি থেকে তৈরি হয় নানান পানীয়। আমাদের দেশে আঙুর হয় না, আম হয়, কাঁঠাল হয়। এই দুই ফল চিনিতে ভর্তি। এক কেজি আমের রস আর এক কেজি কাঁঠালের রস ফার্মেন্টেশনে বসিয়েছি। দেখি, কী তৈরি হয়। আগামীকাল আপনি অবশ্যই আসবেন। এক্সপেরিমেন্টের ফলটা তো জানা দরকার।’

পরদিন রাতে হুমায়ূন ভাইয়ের বাসায় দিয়ে দেখি, তাঁর মন খুবই খারাপ। তাঁর এক্সপেরিমেন্ট ব্যর্থ হয়েছে। দুঃখিত গলায় বললেন, ‘আঙুরে যে রকমের চিনি থাকে, আম–কাঁঠালে সম্ভবত সে রকম চিনি থাকে না। তাই ফার্মেন্টেশনে কোনো পানীয় তৈরি হলো না। কী আর করা!’

চার.

২০০৯ সালের ১৩ নভেম্বর। হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। আমি গিয়েছি দুপুরের দিকে। সঙ্গে এক শ প্যাকেট তেহারি। তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে অনেকে আসবেন। তাঁদের জন্য সংক্ষিপ্ত লাঞ্চ। যা চেয়েছিলাম, তাই হলো, হুমায়ূন ভাই অভিভূত হলেন। তিনটা নাগাদ দখিন হাওয়া ফাঁকা হয়ে গেল। মেঝেতে হুমায়ূন ভাই আর শাওন বসে আছেন। তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনার প্রিয় লেখক কে?’

আপনি।

‘আমার কথা বাদ থাক। ফ্রানৎস কাফকার লেখা পছন্দ করেন?’

পড়েছি প্রায় সবই। তবে তিনি আমার প্রিয় লেখক নন।

‘আমারও না। একজন শক্তিশালী লেখকের নাম বলেন।’

সল বেলো।

হুমায়ূন আহমেদ মাথা নেড়ে বললেন, ‘একমত। তাঁর হারজোগ পড়েছিলাম। পড়েছেন?’

ঘাড় নাড়লাম, পড়িনি। হ্যান্ডারসন দ্য রেইন কিং পড়েছি।

তিনি বললেন, ‘পড়িনি। হারজোগ সাড়ে তিন শ পৃষ্ঠার বই। এত বড় বই লেখা কষ্টকর।’

আমি বললাম, আপনি লিখলে ব্রাদার্স কারমাভ তিন শ পৃষ্ঠায় লিখতেন।

এ কথায় এক চোট হাসলেন হুমায়ূন ভাই। বললেন, ‘ইমদাদুল হক মিলনের নূরজাহান পড়েছেন?’

মাথা নাড়লাম।

তিনি বললেন, ‘এ লেখাটা টেনে বারো শ পৃষ্ঠা করার প্রয়োজন ছিল না। দুই থেকে তিন শ যথেষ্ট ছিল।’

আমি বললাম, আপনার মধ্যাহ্ন প্রায় চার শ পৃষ্ঠা।

‘দুই খণ্ডে লেখা। আপনি প্রথম আলোতেুব প্রশংসা করে রিভিউ করেছিলেন।’

তৃতীয় খণ্ড লিখবেন না?

‘দেশভাগের গল্প বিষণ্ন করে। লিখতে ইচ্ছা করে না। তবে কখনো লিখতে বসে যেতে পারি। বলা মুশকিল। আপনার তো অনেক পড়াশোনা। আমার স্টাইলে আর কেউ লেখে মনে হয়?’

গত ১০০ বছরের ৭০-৮০ জনের উপন্যাস পড়েছি। আপনি তাঁদের থেকে আলাদা। তবে হারুকি মুরাকামির মধ্যে আপনার ছায়া দেখি।

‘তাঁর একটা বই দিয়েন। পড়ব।’

কোনো বই নেই আমার কাছে। কোনো বই পড়িনি। দুটো গল্প পড়েছি।

‘মুরাকামির কথা আমাকে আরও কে যেন বলেছে। সে–ও বলেছে, মুরাকামির লেখার স্টাইল আমার সঙ্গে মেলে। বই আনাতে হবে।’

আড্ডায় সাধারণত সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন না হুমায়ূন আহমেদ। এই দিন অনেক কথা বলেছিলেন। আড্ডায় বরাবরই তিনি ছিলেন তাঁর চরিত্রের মতোই—খেয়ালি। যে গল্পগুলো এখানে বললাম, তাতে হুমায়ূনের খেয়ালি চরিত্রের দু–একটি নমুনা হয়তো ধরা থাকল।