সুনীলের বাবা ছিলেন শিক্ষক। ছেলের হাতে তিনি তুলে দিলেন টেনিসনের কবিতার বই। তাঁর কড়া আদেশ, প্রতিদিন একটা করে কবিতা অনুবাদ করে খাতা দেখাতে হবে।

কয়েক দিন অনুবাদ করে দেখানোর পর সুনীল খেয়াল করলেন, তাঁর বাবা ভালো করে না পড়েই সই বা টিক চিহ্ন দিয়ে দেন। এতে তাঁর মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি খেলে গেল। এবার ইংরেজি কবিতার লাইনের হিসাবের সঙ্গে মিল রেখে নিজেই কবিতা লিখতে শুরু করলেন। ওদিকে বাবাও আগের মতো ভালোভাবে না দেখেই স্বাক্ষর দিয়ে যেতে লাগলেন ছেলের খাতায়। 

কিন্তু সুনীল এভাবে কাব্য লিখে কি তা কেবল পকেটে বন্দী করে রাখতে পারেন! তাই পছন্দের এক মেয়ের উদ্দেশে ‘একটি চিঠি’ শিরোনামে একটি কবিতা লিখে তিনি পাঠিয়ে দিলেন ডাকে। মেয়ের বাড়িতে পাঠানোর সাহস হলো না অবশ্য, পাঠালেন নাম করা পত্রিকা দেশ-এর ঠিকানায়। 

কিছুদিন পর ১৯৫২ সালের ২৯ মার্চ সংখ্যার দেশ পত্রিকায় সুনীল কুমার গঙ্গোপাধ্যায় নামে এক তরুণের কবিতা ছাপা হলো। কিন্তু কেউই বিশ্বাস করল না, এটা ১৭ বছর বয়সী সুনীলের কবিতা। এমনকি যে মেয়েকে উদ্দেশ করে তিনি কবিতাটি লিখেছিলেন, তিনি পাত্তা তো দিলেনই না, উল্টো বললেন, অন্যের কবিতা নিজের নামে চালিয়ে দিচ্ছ বুঝি! তরুণ বয়সে এ নিয়ে খুব কষ্ট পেলেও পরবর্তী জীবনে এসব কথা খুব মজা করে বলতেন সুনীল।

ছোট, বড়—সবার সঙ্গেই রসিকতা করে কথা বলতেন কথাসাহিত্যের এই বরপুত্র। একবার এক আড্ডায় বিখ্যাত ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ের সঙ্গে তাঁর দেখা। তাঁকে সুনীল প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি বাঙালির ইতিহাস: আদি পর্ব লিখে আর লেখেননি কেন?’ নীহাররঞ্জন বললেন, ‘আমি দীর্ঘদিন জেলে ছিলাম, তখন আমার হাতে খুব সময় ছিল, তাই বইটি লিখতে পেরেছিলাম। এখন তো ব্যস্ত। তাই আর লিখতে পারছি না।’ এ সময় সুনীল যা বললেন তা শুনে হেসে উঠল পুরো মজলিশ, ‘আপনাকে তবে আবার জেলে ঢোকানো উচিত। যাতে করে আপনি বাঙালির ইতিহাস পুরোটা শেষ করতে পারেন।’ 

সূত্র: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী অর্ধেক জীবন ও আনন্দবাজার পত্রিকা

গ্রন্থনা: বাশিরুল আমিন