চারতলার রহমত সাহেব মানুষ হিসেবে খারাপ নন। ঠান্ডা মানুষ। ব্যাংকে ভালো চাকরি করেন। রেড মিট ছেড়ে দিতে পেরেছেন—এমনই মানসিক শক্তি। খুব পরোপকারী। সমস্যা একটাই, তিনি আর্জেন্টিনার সমর্থক। বিশ্বকাপ চলাকালে তাঁর আশপাশে যাওয়া যায় না। কাছেপিঠে গেলেই বলেন, সেভেন হইল একটা ম্যাজিক সংখ্যা! সাতটা সাগর, সাতটা আসমান আর সাতটা গোল…আহা রে!

সোবহান সাহেব নিতে পারেন না। আর্জেন্টিনা, ম্যারাডোনা, হাতে দেওয়া গোল—এসব একসঙ্গে করে ঝালমুড়ির মতো গুলিয়ে সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে রহমত সাহেবের পোস্টের দিকে ছুড়ে দেন। শুরু হয় একেকটা বেমক্কা কথার বর্শাক্ষেপণ—

‘শোনেন ভাই, আর্জেন্টিনা কবে সেই দুইটা বিশ্বকাপ জিতছে, যখন ডাইনোসররা ডিম পাড়ত খালে-বিলে, সেই বিশ্বকাপ দিয়া আর কত?’

‘ব্রাজিল খাইছে সাতটা গোল। সাতটা গোল খাওয়ার জন্য কত বড় জায়গা লাগে জানেন? ব্রাজিলদের তো চিচিংফাঁক!’

‘আমরা না, আপনারা চিচিংফাঁক! ফুটবল খেলা যে পায়ের খেলা, তা আপনারা ভুইলা যান ক্যান? হাত দিয়া গোল কইরা বুক ঠুইকা বলেন, ঈশ্বরের হাত! চোরের চোর আপনারা… বাটপার!’

‘আমরা বাটপার? আর আপনারা কী? আপনাদের নেইমার কী? সে তো সোজা হইয়া খাড়াইতেই পারে না। পুঁইশাকের লতা যেমন লতপতায়া থাকে, এরে–তারে না ধরলে পইড়া যায়, আপনাদের নেইমারও তো সেইটাই! লতারি প্লেয়ার! যাঁর পায়ে বল নাই, তাঁরেই আবার আপনারা বল দিয়া গোল দেওয়াইতে চান!’

‘মেসি তো? মেসি কি জিতছে?’

‘মেসি জেতে নাই? মেসি জেতে নাই? কতবার সেরা খেলোয়াড়…’

‘আরে রাখেন সেরা খেলোয়াড়! ভিনগ্রহের খেলোয়াড় নাকি! তাঁরে সসারে কইরা ভিনগ্রহেই পাঠায়া দেন না। ওইখানেই ফুটবল খেলুক। নিজের দেশের হইয়া একফোঁটা কিছু জেতে নাই!’

‘মেসিরে নিয়া আর একটা বাজে কথা বলবেন না কিন্তু…’

‘ক্যান, মেসি কি পেলে নাকি? তাঁরে নিয়া কিছু বলা যাবে না? মেসি দুই দিনের পোলা না? ভাতেরে কয় অন্ন…’

‘ভাই সাবধান, আর একবার যদি মেসিকে নিয়ে কিছু বলেন, তাহলে কিন্তু…’

কথা–কাটাকাটির এই পর্যায়টা ভয়ংকর হয়ে ওঠে। কোনো দলের মধ্যেই কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা হয়ে আমরা পরস্পরের পরাজয় কামনা করতে থাকি। আমাদের স্ত্রীরা এ রকম সময়েই তাঁদের সব ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন। আমাদের বকাঝকার চূড়ান্ত করে কিছুদিনের জন্য বাবার বাড়ি–মায়ের বাড়িতে রওনা দেন। তাতে আমাদের সুবিধা বই অসুবিধা হয় না। থাকে না আর ঝগড়ায় মেতে ওঠায় কোনো পিছুটান!

কিন্তু এবার পরিস্থিতি একটু ভিন্ন। ব্যাপারটা খোলাসা করে বলি। ফ্ল্যাটে একদল আমরা ব্রাজিল…। বিরাট একটা পতাকা আমরা টাঙিয়েছি। আরেক দল আর্জেন্টিনা…। ওরাও বিশাল এক পতাকা টাঙিয়েছে। দুটো অতিকায় পতাকা ঝুলছে আমাদের ফ্ল্যাটজুড়ে। কিন্তু এই দুই পতাকার মধ্যে একটা ছোট্ট জার্মানির পতাকাও ঝুলছে। এটা কার?

জার্মানি নিয়ে আমাদের দুই পক্ষেরই অভিজ্ঞতা সুবিধার নয়। ফ্ল্যাটে কবে কখন এসে জার্মানি জুটেছে, সেই খবর জানলামই না! এ তো বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা!

গার্ডকে ধরে আনা হলো, ‘জার্মানির পতাকা কে টাঙিয়েছে?’

গার্ড নিরুত্তর। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।

সোবহান সাহেবের রুদ্রমূর্তি, ‘এই কথা বলো না ক্যান? কে টাঙাইছে ওই পতাকা?’

রহমত সাহেব ভদ্রতার ধার দিয়েও গেলেন না, ‘তুই টাঙিয়েছিস? তুই জার্মানি? তুই হিটলার?’

গার্ড কেঁপে ওঠে, ‘না না, স্যার। আমি হিটলার না। হিটলার তো নতুন উঠছে এই বাসায়। একদম টপ ফ্লোরে… মিজান স্যার… তিনিই টাঙাইছেন।’

দেরি আর করা গেল না। লিফট ফেলে সিঁড়ি দিয়েই উঠলাম ওপরে। কে এই নয়া হিটলার আমাদের ফ্ল্যাটে?

কলবেলে চাপ দিতেই দরজা খুলে গেল। ভেতরে একটা ছোটখাটো নাদুসনুদুস শরীর। মুখে হাসি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। আমাদের দেখে হাসিটা আরও চওড়া হলো, ‘কেমন আছেন সবাই?’

আমাদের ভালো থাকার অবস্থা নেই। ভেতরে যথেষ্ট রাগের স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে রক্ত হয়ে। কিন্তু লোকটাকে দেখে খুব রাগ করা যাচ্ছে না। লোকটা তাঁর হাসি আরও প্রসারিত করে বলেন, ‘আসেন না, ভেতরে আসেন। বসেন। কালকে খালাতো ভাই আসছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। শিবগঞ্জের বিখ্যাত চমচম আনছে। খেয়ে যান।’

আমরা চমচম খেলাম। কম কম খেলাম, তা অবশ্য বলা যায় না। আর মিজান সাহেবের মিষ্টি এবং মিষ্টি কথার সিরায় আমরা ডুবে গেলাম। উনি যে জার্মানি, উনি যে হিটলার—এসব ভুলে গিয়ে উনি কত ভালো, তা নিয়েই চলতে থাকল আমাদের আলোচনা।

আমাদের দুই পক্ষের মধ্যেই ভেতরে–ভেতরে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়ে গেল অবশ্য! যে করেই হোক মিজান সাহেবকে আমাদের ডেরায় টানতে হবে। তার মতো এমন ভদ্র, নম্র, চমৎকার মানুষ জার্মানিকে কীভাবে সমর্থন করে!

আমরা যারা ব্রাজিলের সমর্থক, মিজান সাহেবের বাসায় গেলাম গোপনে। সাম্বানৃত্য যে পৃথিবীর অপূর্ব সৃষ্টি, তা জানিয়ে কিছু ছবি, ভিডিও, কিছু ওয়াকা ওয়াকা গান শুনিয়ে তাঁকে বিমোহিত করার চেষ্টা করলাম। মিজান সাহেব হাসলেন ঠিকই, কিন্তু গললেন না।

আর রহমত সাহেবও তাঁর আর্জেন্টাইন দলবল নিয়ে হাজির হলেন মিজান সাহেবের বাসায়। প্রায় একটা পুরো রাত মেসিবন্দনা করে কাটালেন। আর্জেন্টিনা যে ফুটবলের বিস্ময়, এ নিয়ে গলাকাঁপানো বক্তৃতা দিলেন। লাভের লাভ খুব যে হলো, তা মনে হলো না। মিজান সাহেব মুচকি মুচকি হেসে সবাইকে বিদায় দিলেন।

এরই মধ্যে শুরু হয়ে যাচ্ছে বিশ্বকাপ। আমরা আমাদের মুখে সর্বোচ্চ কথার ধার নিয়ে তৈরি। ওরা খেলবে পা দিয়ে, আমরা খেলব মুখ দিয়ে। তখনই মিজান সাহেব এলেন আমাদের কাছে। বললেন, ‘খেলা দেখবেন না?’

‘অবশ্যই দেখব। আমরা তো বাঁইচাই থাকি চার বছর পরপর ফুটবল বিশ্বকাপ দেখব বলে!’

‘কোথায় দেখবেন?’

‘বাসায় দেখব। টিভিতে। আমাদের কি আর মাঠে দেখার সুযোগ আছে ভাই! কাতারে কি আর সাঁতার দিয়া যাওয়া যাবে!’

‘মাঠ না হোক, মাঠের মতো বানায়া নিতে অসুবিধা কী?’

‘মানে?’

মানেটা যা দেখা গেল, তাতে বুকটা ভরে এল। ফ্ল্যাটের পাশেই পার্ক, সেখানেই মাঠের ব্যবস্থা হলো। মিজান সাহেব এদিক–ওদিক ফোন দিয়ে অস্থির করে তুললেন। চলে এল অতিকায় এক পর্দা। পর্দায় প্রজেকশনের ব্যবস্থা—সবকিছু চোখের সামনে এমনভাবে ঘটে যেতে থাকল যে শিহরণ জাগল শরীরে। মিজান সাহেব, মানুষ তো নন, যেন ভিনগ্রহের প্রাণী! 

সন্ধ্যা নাগাদ মাঠ কি, স্টেডিয়াম বানানো শেষ। খেলা শুরু হলো এর পরপরই। রেফারির বাঁশির ফুঁয়ে আমরা কেঁপে উঠলাম। আহা, যেন মাঠে বসেই খেলা দেখছি!

কিন্তু শুধু আমরাই দেখছি। মিজান
সাহেব নেই। হয়তো কোথাও গেছেন, চলে আসবেন। তাঁর ফোনও বন্ধ। থাক, খেলা তো আর বন্ধ নেই।

গোলশূন্য ড্র হলো ম্যাচ। যা হোক, আজ যেহেতু ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার ম্যাচ নয়, আমাদের মধ্যে উত্তেজনা কম। আগামীকাল ব্রাজিলের খেলা, সেটা নিয়ে মাথা দপদপ করছে এখনই। ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম। ওমা, আমাদের বাসার দরজাগুলো খোলা…শুধু দরজাই খোলা তা নয়, ভেতরের সব জিনিসপত্রও গায়েব। আমাদের ঘরগুলো একেকটা যেন ফুটবলের মাঠ—ফাঁকা আর ফাঁকা…। গার্ডের কাছে ছুটে গেলাম আমরা, খেলা দেখে সে তখনো ফেরেনি। আমরা মিজান সাহেবের টপফ্লোরে ছুটলাম। লোকটা নেই, কিন্তু দরজায় একটা চিরকুট লেখা—‘আপনাদের সবার ফুটবল হয়ে গেছে…।’