লেখকদের কাজ এখানে নেটওয়ার্কিং করা এবং কমিউনিটি তৈরি করা। কারণ, পৃথিবীর এক বিরাটসংখ্যক মানুষ এখন ইউটিউব দুনিয়ার বাসিন্দা। গ্লোবাল মিডিয়া ইনসাইট বলছে, ইউটিউবের মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন ২৬০ কোটির বেশি। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিদিন ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখতে ১২ কোটি ২০ লাখ মানুষ প্রবেশ করেন। বাংলাদেশেও বাড়ছে ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা। গুগলের বিজ্ঞাপনী উৎস সূচক বলছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইউটিউব ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটি ৪৫ লাখ। এ সংখ্যাও ক্রমে বাড়ছে।

লেখকের কাজ যেহেতু নিজের চিন্তা ও লেখালেখিকে বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া, তাই বর্তমান বাস্তবতায় ইউটিউব থেকে দূরে থাকতে পারে না লেখকসমাজ।

খুব সংগতকারণেই লেখকেরা এই প্ল্যাটফর্মে সরব হয়েছেন এবং হচ্ছেন। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার যতগুলো মাধ্যম পৃথিবীতে আছে, এর মধ্যে অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ভিডিও। লেখকেরা তাই ছোট ছোট ভিডিও তৈরি করে ইউটিউবে দিচ্ছেন। সব কথা লিখে প্রকাশ করা যায় না। যে বিষয় লিখে প্রকাশ করতে এক হাজার শব্দের প্রয়োজন, সেই বিষয় দুই বা তিন মিনিটের ভিডিওর মাধ্যমে বলে বোঝানো সম্ভব। লেখকেরা তাই কোনো ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে ভিডিওর আশ্রয় নিচ্ছেন।

বর্তমান সময়ের লেখকদের একটি বড় কাজ নিজের লেখালেখি ও বইয়ের প্রচার-প্রচারণা চালানো। পোস্টার ছাপিয়ে, দেয়াললিখন করে, লিফলেট বিতরণ করে যতটা না নিজের বইয়ের প্রচার করা যায়, তার চেয়ে বেশি প্রচার করা যায় ছোট একটি ভিডিও দিয়ে। দুই মিনিটের একটি ভিডিও ইউটিউবে দিয়ে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

ইউটিউব এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সার্চ ইঞ্জিন। তথ্য ও বিনোদনের জন্য মানুষ এখন ইউটিউবে সার্চ করে থাকেন। সুতরাং আপনি যদি আপনার সর্বশেষ বইয়ের খবরটি ইউটিউবে দেন, তাহলে তা খুব সহজেই অনেক মানুষ খুঁজে পাবেন। থিঙ্ক উইথ গুগল নামে একটি প্রতিষ্ঠান বলছে, ৯০ শতাংশ মানুষ এখন বিভিন্ন পণ্যের খোঁজে ইউটিউবের সার্চ বাটনে ঢুঁ মারেন। বলাবাহুল্য, বই একটি পণ্য।

লেখক-পাঠক কমিউনিটি তৈরি করার জন্য ফেসবুকে যেমন বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে, তেমনি ইউটিউবে রয়েছে বুকটিউব কিংবা অথরটিউব। অথরটিউব চ্যানেলে লেখকেরা শুধু নিজের বইয়ের প্রচার নিয়েই কথা বলেন না; বরং নিজেদের নতুন নতুন চিন্তা, আইডিয়া ও কর্মকাণ্ড পরস্পরের সঙ্গে শেয়ার করেন। অথরটিউবের সাবস্ক্রাইবার এখন এক লাখের বেশি। ভেবে দেখুন, বিশ্বের এক লাখ লেখকের সঙ্গে আপনি আপনার ভাবনা শেয়ার করতে পারছেন!

এ ছাড়া ইউটিউব এখন আয়রোজগারেরও একটি অন্যতম মাধ্যম। নিজের চ্যানেলের মানটাইজেশনের মাধ্যমে অনেক লেখক এখন বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জন করছেন।

বিশ্বের অনেক জনপ্রিয় লেখকের এখন ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে। যেমন নিউইয়র্ক টাইমস বেস্ট সেলিং লেখক জোয়ানা পেনের চ্যানেল ‘দ্য ক্রিয়েটিভ পেন’ খুবই জনপ্রিয়। তিনি লেখালেখি–সংক্রান্ত পরামর্শ, বই বিপণনের কৌশল ইত্যাদি নিয়ে নিয়মিত ভিডিও দেন।

অন্যদিকে ফ্রিল্যান্স রাইটিং নিয়ে পরামর্শ দেন জর্দেন মেকেল। তাঁর চ্যানেলের নাম ‘রাইটিং রিভোল্ট’। বই প্রকাশের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ভিডিও তৈরি করেন মেগ ল্যাটর। তিনি নিজে একজন জনপ্রিয় লেখক ও প্রকাশক। জনপ্রিয় ফ্যান্টাসি লেখক ব্র্যান্ডন স্যান্ডারসন নিজের নামেই চ্যানেল খুলেছেন। ২০১৬ সাল থেকে লেখালেখি–বিষয়ক বিভিন্ন ধরনের বক্তৃতা দেন তিনি। তাঁর বক্তৃতাগুলো ভীষণ জনপ্রিয়।

লেখকদের দুনিয়া এখন আর শুধু কাগজ-কলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ‘কাগজ-কলম-মন, লেখে তিনজন’ কথাটি বাসি হয়েছে অনেক আগেই। সময়টা এখন ‘লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন’ বলার। এই সত্য যে লেখক যত দ্রুত অনুধাবন করতে পারবেন, তিনি তত সফলতার দৌড়ে এগিয়ে থাকবেন।

সূত্র: গ্লোবাল মিডিয়া ইনসাইট, ডেটারিপোর্টাল, অথর লার্নিং সেন্টার ও গোজপার্ক প্রেস