২০০৪ সালে নিউইয়র্কের ভাসার কলেজ থেকে উইমেন্স স্টাডিজে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর কয়েকটি পেশায় যুক্ত ছিলেন তিনি। ‘মেক দ্য রোড নিউইয়র্ক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাউন্সেলর হিসেবে কাজ করেছিলেন কিশোর সংশোধন বা গৃহস্থালিতে নারী নির্যাতনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে। কর্মসূত্রে এ সময় বেশ কিছু দেশ ঘুরে দেখার সুযোগ তৈরি হয় তাঁর। লেখালেখি বলতে থিয়েটার করার সূত্রে কেবল নাটক লিখতেন তখন। তবে পুরোদস্তুর লেখক হওয়ার বাসনা মনের মধ্যে সুপ্ত ছিল। তাই স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের ১০ বছর বাদে আবার যুক্ত হন লেখাপড়ায়। ব্রুকলিন কলেজ থেকে ক্রিয়েটিভ রাইটিং বিষয়ে একটি মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।

শুধু লেখালেখি দিয়ে নিউইয়র্কে যেহেতু জীবিকা ধারণ সম্ভব ছিল না, এ জন্য একটি স্টার্টআপ কোম্পানির ব্র্যান্ড ম্যানেজার হিসেবে সে সময় কাজ করতেন তন্বী। ছয় মাস কাজ করার পর ৩০তম জন্মদিনের ঠিক আগমুহূর্তে আকস্মিকভাবে চাকরি চলে যায় তাঁর। মিডিয়া ও ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট-বিষয়ক কোনো চাকরির সন্ধান করেছিলেন কয়েক মাস ধরে। কিন্তু চাকরি আর মেলেনি। বাধ্য হয়ে তখন ফটোশপ, ইনডিজাইন ও ইলাস্ট্রেটরের কাজ শেখেন তন্বী এবং সেখান থেকে পাওয়া রোজগারে সে সময় দিন চলছিল তাঁর।

এ সময়েই সুগন্ধি ও প্রসাধনসামগ্রী নির্মাণের ভাবনা জোরালোভাবে তন্বীর মাথায় আসে। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া পাঁচ হাজার ডলার এবং নিজের কাছে থাকা সামান্য কিছু অর্থ নিয়ে শুরু করেন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘হাই ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার’। তাঁর প্রতিষ্ঠানের পণ্যকে ‘সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক’ বা ‘শতভাগ বিশুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপিত করতে চাননি তন্বী। বরং ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার বা বন্য ফুলের মধ্যে যে ধরনের স্বতন্ত্র সৌন্দর্য ও গন্ধ থাকে, সে ধরনের নির্যাসগুলো ধরার চেষ্টা করেছেন তাঁর নির্মিত সুগন্ধিগুলোর মধ্য দিয়ে।

এর পরের গল্প হলো, ধীরে ধীরে মানুষের ভালোবাসা পেতে শুরু করে তন্বীর ‘হাই ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার’-এর সুগন্ধি ও অন্য প্রসাধনসামগ্রী।

২০১৫ সালের আগস্টে জীবন ও জীবিকা নিয়ে টানাপোড়েনের ওই সময়েই পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ব্রাইট লাইনস’। ব্রুকলিন ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখা এ উপন্যাসে তিনজন নারী ও একটি পরিবারের গল্প বলেছেন তিনি। আর এ গল্প বিস্তৃত হয়েছে অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিভিন্ন পরিস্থিতির সঙ্গে তাদের সংগ্রাম ও সমঝোতার কাহিনি। লৈঙ্গিক পরিচয় ও যৌনতার অন্য মাত্রাগুলোর পাশাপাশি এ উপন্যাসে আরও উঠে এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং আমেরিকায় বাঙালি পরিবারগুলোর আত্মপরিচয়ের সংকট ও দ্বন্দ্ব। ‘ব্রাইট লাইনস’ উপন্যাসটির জন্য বেশ কিছু স্বীকৃতি ও পুরস্কার পেয়েছিলেন তন্বী নন্দিনী ইসলাম।

প্রথম উপন্যাস প্রকাশের সাত বছর পর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে হারপার কলিন্স থেকে প্রকাশ পায় তাঁর দ্বিতীয় বই ‘ইন সেনসোরিয়াম: নোটস ফর মাই পিপল।’ ‘তানাইস’ লেখক নাম নিয়ে এই বইয়ে তন্বী নন্দিনী ইসলাম লিখেছেন একজন স্বশিক্ষিত সুগন্ধিনির্মাতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার গল্প। বর্ণ, ধর্ম আর লৈঙ্গিক পরিচয়ের জন্য আমেরিকার আধুনিক সমাজে পদে পদে বিব্রত হওয়ার গল্প। বিস্তৃতভাবে আরও লিখেছেন ভারতীয় উপমহাদেশে গায়ের রং বা জাতভেদের জন্য পদে পদে লাঞ্ছিত হওয়ার নির্মম ইতিহাস। পাশাপাশি সুগন্ধি ও সৌন্দর্যচর্চাকে ঘিরে ভারতবর্ষ আর বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাসও উঠে এসেছে এতে। বলা ভালো, আলোচ্য বইটি যে তিনি ‘তানাইস’ নাম ধারণ করে লিখেছেন, এর পেছনেও রয়েছে একটি কারণ। এ নামের মাধ্যমে তিনি মূলত নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করতে চেয়েছেন। তাঁর বিচিত্র পরিচয়কে উদ্‌যাপন করতে যে নাম তিনি নিজেই নিজেকে দিয়েছেন, সেই একই নাম দিয়েছেন শ্রম ও যত্নে গড়ে তোলা নিজের প্রতিষ্ঠানকেও। ব্রুকলিনে তাঁর সুগন্ধিও প্রসাধনসামগ্রীর প্রতিষ্ঠান ‘হাই ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার’ও নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছে ‘তানাইস’ নামে।

প্রথম উপন্যাস প্রকাশের সাত বছর পর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে হারপার কলিন্স থেকে প্রকাশ পায় তাঁর দ্বিতীয় বই ‘ইন সেনসোরিয়াম: নোটস ফর মাই পিপল’। ‘তানাইস’ লেখক নাম নিয়ে এই বইয়ে তন্বী নন্দিনী ইসলাম লিখেছেন একজন স্বশিক্ষিত সুগন্ধিনির্মাতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার গল্প। বর্ণ, ধর্ম আর লৈঙ্গিক পরিচয়ের জন্য আমেরিকার আধুনিক সমাজে পদে পদে বিব্রত হওয়ার গল্প। বিস্তৃতভাবে আরও লিখেছেন ভারতীয় উপমহাদেশে গায়ের রং বা জাতভেদের জন্য পদে পদে লাঞ্ছিত হওয়ার নির্মম ইতিহাস। পাশাপাশি সুগন্ধি ও সৌন্দর্যচর্চাকে ঘিরে ভারতবর্ষ আর বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাসও উঠে এসেছে এতে।

স্মৃতিকথা, উপলব্ধি, ঐতিহাসিক আখ্যান ও সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের সমন্বয়ে লেখা নন-ফিকশনধর্মী এ বইয়ের জন্যই এ বছর সম্মানজনক কারকাস সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তন্বী নন্দিনী ইসলাম। টেক্সাসের অস্টিন সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে গত ২৭ অক্টোবর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। ফিকশন, নন-ফিকশন ও শিশু-কিশোর সাহিত্য—তিন বিভাগে প্রতিবছর দেওয়া হয় কারকাস সাহিত্য পুরস্কার। এ বছর ১ হাজার ৪৩৬টি বই থেকে প্রথমে সংক্ষিপ্ত তালিকা প্রণয়ন করা হয়। পরে যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে সেখান থেকে তিন শাখার তিন লেখককে চূড়ান্ত বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। অন্য দুই শাখায় বিজয়ী হয়েছেন হারনান ডিয়াজ ও হারমনি বেকার।

অকপট, সাহসী, উদ্ভাবনী দৃষ্টিভঙ্গি ও গীতিময় গদ্যশৈলীর জন্য তন্বী নন্দিনী ইসলামকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে বিচারকেরা জানিয়েছেন। ‘হারপার্স বাজার’-এ প্রকাশিত মাথাঙ্গি সুব্রামানিয়ানকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে নিজের বই প্রসঙ্গে তন্বীর ভাষ্য ছিল, ‘বইটা পড়ার পর পাঠক বিষাদে আক্রান্ত হবেন না, বরং নিজের মধ্যে একরকমের শক্তি ও সম্ভাবনা অনুভব করবেন। আমি এটাই চেয়েছি। ভয়াবহ রকম বেদনা ভোগ করে আমাদের যে পূর্বপুরুষেরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাঁদের ত্যাগকে আমরা স্মরণ ও সম্মান করব। ...তবে উত্তরাধিকারী হিসেবে শুধু সেই গ্লানি বা বেদনার ভার বয়ে বেড়ানো নয়, আমরা আনন্দেরও সন্ধান করব। বেঁচে থাকার আনন্দকে আমরা স্পর্শ করার চেষ্টা করব।’