স্বাভাবিক বিচারেই বলা যায়, ইলা মিত্র ছিলেন তাঁর পরিপার্শ্ব, সময় ও আদর্শের সন্তান। এই উপদানগুলোই তাঁকে সম্মিলিত ও দ্বান্দ্বিকভাবে ‘ইলা মিত্র’ করে গড়ে তুলেছিল।
তাঁর জীবনবোধের দুটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় নিজের লেখা ‘আমার জীবনে স্বাধীনতার স্বাদ’ শীর্ষক সংক্ষিপ্ত ও গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ (মালেকা বেগম, ‘ইলা মিত্র’, পৃ-১৫০) এবং নাচোল থানায় থাকাবস্থার অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘জবানবন্দী’র বাইরে আরেকটি বিবরণে (সত্যেন সেনের বাংলাদেশের কৃষকের সংগ্রাম। রচনাবলি, ৮ম খণ্ড, পৃ-১৬৭)। তাঁকে দেখতে বাধ্য করে বন্দী সাঁওতাল সাথিদের ওপর নারকীয় নির্যাতন ও পিটিয়ে খুন করার দৃশ্য—এমন বিবরণের প্রাসঙ্গিক অংশে ইলা মিত্র বলেছেন: ‘মনে মনে একটা কথা আবৃত্তি করে চলেছিলাম, হে বীর সাথিরা আমার, তোমাদের কাছ থেকে যে শিক্ষা আমি আজ নিলাম, তা যেন আমার বেলায় কাজে লাগাতে পারি। আমার ওপর অত্যাচার এই তো সবে শুরু হয়েছে। আমি জানি, এরপর বহু অত্যাচার আর লাঞ্ছনা আমার ওপর নেমে আসবে। সেই অগ্নিপরীক্ষার সময়, হে আমার বীর সাথিরা, আমি যেন তোমাদের এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে নিঃশব্দে মুখ বুজে থাকতে পারি। আর যদি মরতেই হয়, যেন অমনি নিঃশব্দে মরে যেতে পারি।’
ইলা মিত্রর ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর সংগ্রামের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোদ্ধা ও সমর্থকদের উপযুক্তভাবে স্মরণ করা তাই নাচোলের রানিমাকে স্মরণ ও সম্মান জানানোর উপযুক্ত কাজ হতে পারে। ইলা মিত্রর সংগ্রামী নিষ্ঠা ও তেজ গড়ে তোলা ও আজীবন বহমান রাখায় তাঁদের সবার অবদান রয়েছে। কথাটির যৌক্তিকতার স্বার্থে আবারও ইলা মিত্রর ভাষ্যে বিষয়টি বলা যেতে পারে, ‘. . . এঁরা আমার শিক্ষক-শিক্ষিকা ছিলেন সমাজজীবনে, আমি এঁদের শিক্ষিকা ছিলাম রাজনৈতিক জীবনে এবং সবাই মিলে আমরা প্রত্যেকেই ব্যক্তি ছিলাম, অথচ সব ব্যক্তি মিলিয়ে সমষ্টি।’ (মালেকা বেগম, ‘ইলা মিত্র’, পৃ-১৫৪)
বর্তমান নিবন্ধটি লেখা হয়েছে নাচোলের নিপীড়িত সংগ্রামী কৃষক ও সাধারণ মানুষের চরম দুঃসময়ে স্বেচ্ছায় পাশে এসে দাঁড়ানো ইতালির এক খ্রিষ্টান পাদরিকে স্মরণ করতে, তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে সর্বসমক্ষে তুলে ধরতে। রাজশাহী শহরের অদূরে, পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লীতে নিয়োজিত চতুর্থ পিমে (বিদেশে প্রেরিত পাদরিদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের সংক্ষিপ্ত নাম—পিআইএমই) ফাদার টমাস (তোম্মাসো) কাত্তানিওর তৎপরতা ও অবদানের কথা ইলা মিত্র অবহিত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করা মুশকিল। জানলে পরে তিনি হয়তোবা ফাদার কাত্তানিওকেও ‘সমাজজীবনের শিক্ষক’ হিসেবে সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা করতেন না। স্বীকৃতি দেওয়ার সে কাজ বর্তমান সময়ে করা যেতে পারে নাচোলের কৃষক আন্দোলন এবং ইলা মিত্রর সমর্থক ও অনুরাগীদের মাধ্যমে।
একই সঙ্গে বর্তমান নিবন্ধটি পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেসের নেতা প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ীর প্রতিও শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি চেষ্টা করেছিলেন সশরীর নাচোলের ঘটনাবলির অনুসন্ধান করতে ও পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদে নাচোল বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের।
তেভাগা আন্দোলনের শেষাংশের পর্বে অকস্মাৎ ও পরিকল্পনাহীন বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৯৫০ সালের ৫ জানুয়ারি। ঘাসুড়া গ্রামে প্রবেশ করে গ্রামবাসীর ওপর অত্যাচার চালানো নাচোল থানার দারোগা ও তিনজন সশস্ত্র সিপাহির ওপর বিক্ষুব্ধ কৃষকদের প্রতি-আক্রমণে পুরো ঘটনাবলি উভয় পক্ষের—কৃষক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ও সরকারি প্রশাসন—নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠিত কৃষকদের দ্বারা পুলিশ দলটিকে হত্যা করে তাদের লাশ পুঁতে ফেলা ও অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় সরকারি মহলে প্রতিক্রিয়া হয়েছিল অভাবনীয় অসংযত ও নারকীয় ধরনের। পুলিশের ওপর এমন বড় আকারের আক্রমণের ঘটনা ১৯৪৭–পরবর্তী সময়ে ঘটার কোনো নজির নেই। দিশাহারা পুলিশ ও প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াও ঘটেছিল তাদের ছকবাঁধা মারো-কাটো-পোড়াও-ধরো পোড়ামাটি নিপীড়ন ও অত্যাচারের পদ্ধতির পথে।
ঘটনার পরদিন সকালের মধ্যে বিপুলসংখ্যক (কথিত আছে ২০০০) বিভিন্ন বাহিনীর প্রবল বল প্রয়োগ হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, অগ্নিদাহ, ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ, ধ্বংস ও নিপীড়নের ‘পোড়ামাটি’ পন্থাই সরকার বেছে নিয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক সংগঠিত কৃষক ও সাধারণ গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে। স্মর্তব্য যে তখন বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্টবিরোধী স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাবে সদ্য স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তানেও চলছিল প্রবল কমিউনিস্ট বিরোধিতা ও সহিংসতার জোয়ার। পাকিস্তানের পুলিশ-আনসার-ইপিআর-সেনাবাহিনী ও প্রশাসন ছিল প্রবলভাবে কমিউনিস্ট-ভীতি ও বিদ্বেষের বিকারে আচ্ছন্ন।
নাচোল-গোদাগাড়ী এলাকায় তৈরি করা হয়েছিল যুদ্ধাবস্থার মতো কঠোর অবরোধ।
বাইরের কারও অবরুদ্ধ নাচোলে যাওয়ার পরিস্থিতি ছিল না। সাংবাদিকতার অবস্থা ছিল যারপরনাই অপেশাদার, কৌতূহল-শূন্য ও দুর্বল। কমিউনিস্ট পার্টি থেকেও এই পরিস্থিতির সঠিক ও বিস্তারিত বিবরণ তৈরির সুযোগ যেমন ছিল না, তেমনি পরবর্তী সময়েও তা করার কোনো নজির নেই। সংবাদকর্মীদের দিক থেকেও অবস্থাটি ছিল একই। কয়েকজনের, যেমন শেখ আজহার হোসেন ও বৃন্দাবন সাহা লেখা ও বলা থেকে একটি সাধারণ বিবরণ পাওয়া যায় এবং সংখ্যা ও বিবরণে সুনির্দিষ্টহীনতায় দুর্বল সেই বিবরণগুলোই চালু আছে নাচোল প্রসঙ্গে।
নাচোলের প্রকৃত পরিস্থিতি অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রমী ব্যক্তি ছিলেন রাজশাহী থেকে নির্বাচিত পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য বা এমএলএ দুই মেয়াদে মন্ত্রীত্ব পাওয়া, প্রাজ্ঞ, সজাগ ও সক্রিয় রাজনীতিবিদ প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী।
বর্তমান নিবন্ধটি লেখা হয়েছে নাচোলের নিপীড়িত সংগ্রামী কৃষক ও সাধারণ মানুষের চরম দুঃসময়ে স্বেচ্ছায় পাশে এসে দাঁড়ানো ইতালির এক খ্রিষ্টান পাদরিকে স্মরণ করতে, তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে সর্বসমক্ষে তুলে ধরতে। রাজশাহী শহরের অদূরে, পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লীতে নিয়োজিত চতুর্থ পিমে (বিদেশে প্রেরিত পাদরিদের আন্তর্জাতিক সংগঠনের সংক্ষিপ্ত নাম—পিআইএমই) ফাদার টমাস (তোম্মাসো) কাত্তানিওর তৎপরতা ও অবদানের কথা ইলা মিত্র অবহিত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করা মুশকিল।
প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী শহরে বসেই নাচোল-গোদাগাড়ী অঞ্চলে ঘটমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আঁচ করতে পারছিলেন ঘটনার গুরুত্ব ও ভয়াবহতা সম্পর্কে। মূলত তাঁর আত্মজীবনীর (পাক-ভারতের রূপরেখা।) প্রথম খণ্ডে (পরবর্তী খণ্ডটি তিনি সম্ভবত লিখে যেতে পারেননি) বেশ বিস্তারিতভাবে বর্ণনা রয়েছে ফাদার কাত্তানিও ও তাঁর সক্রিয়তার। সেই বিবরণ থেকে জানা যায়, ‘রাজশাহীতে তখন ... সাঁওতালভ্রমে কালো রঙের মানুষেরও নিষ্কৃতি ছিল না। ... এই অবস্থা যখন ঐ অঞ্চলে চলছিল, তখন স্বভাবতই এসেম্বলির সদস্য হিসাবে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে সবিশেষ জানা আমার অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করি। এমন সময়ে একদিন [রাজশাহীতে বসবাসকারী জমিদার] বাগুদের বাড়িতেই দেখি তাদেরই তহশিলদার সাগ্রাম মাঝি (সাঁওতাল) বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বাগুর বাড়িতে এসে লুকিয়ে আছেন। তাঁকে গোপনে ডেকে তাঁর কাছে সেই অঞ্চলের অত্যাচার কাহিনীর কিছু কিছু খবর নিই। তাঁর কাছেই শুনি, আঁধারকোঠা গ্রামের রোমান ক্যাথলিক মিশনারী সাহেব ফাদার ক্যাটানিও (Father Cataneo) [লেখকের বানান] ঐ অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে সাঁওতালদের সব খোঁজখবর নিচ্ছেন। তিনি সাদা চামড়ার ইতালীয় সাহেব সুতরাং তাঁর গায়ে বিশেষভাবে হাত লাগাতে বা তাঁর কাজে বাধা দিয়ে তাঁর ঐ অঞ্চলে ঘোরা-ফেরা একদম বন্ধ করে দিতে কালো চামড়ার পুলিশ একটু ইতস্তত করে বৈ কি, তবে তিনিও একেবারে রেহাই যে পাননি, সে কথা পরে বলছি ...
‘ফাদার ক্যাটানিও সম্পর্কে সাগ্রামের কাছে থেকে খবর শুনে স্থির করি যে, আঁধারকোঠায় গিয়েই ফাদারের সাথে দেখা করবো। সব তথ্য আমাকে সংগ্রহ করতেই হবে। আঁধারকোঠা গ্রামটি পদ্মার তীরে এবং রাজসাহী শহর থেকে ৬/৭ মাইল দূরে, গোদাগাড়ীর দিকে। পরদিন সকালেই রওনা হয়ে বেলা প্রায় দশটার সময় মিশনারী সাহেবদের “আস্তানায়” পৌঁছাই। পৌঁছেই সাহেবের কাছে আমার “কার্ড” পাঠাই তাঁর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্য জানিয়ে। সাহেব খবর পেয়েই লোক মারফৎ আমাকে জানান যে, তিনি তখন পীড়িত সাঁওতাল রোগীদের দেখে ঔষধ দিচ্ছেন। কাজ শেষ করেই তিনি আসবেন। আমাকে নিয়ে গিয়ে ফাদারের লোক, “হল” ঘরের মধ্যে একখানি চেয়ারে বসাল। সামনেই একটা বড় “dining table” (খাওয়ার জন্য টেবিল) পাতা।
টেবিলে দেখি, একটা চায়ের ডিসে খানিকটা ঝোলাগুড় এবং তা থেকে যে চামচ দিয়ে কিছুটা গুড় তুলে নেওয়া হয়েছে, তা চামচের দাগ দেখেই বোঝা যায়। সেই গুড় যে ওখানে কি উদ্দেশ্যে রাখা ছিল, তা তখনও বুঝি নি। আমি বসে বসে সব দেখছি এবং ভাবছি সাহেবের সাথে কীভাবে কথা আরম্ভ করবো। সাহেব যদি তাঁর সংগৃহীত তথ্যাদি আমাকে না জানাতে চান, তাহলেই–বা কী করবো—এই সব কথা নিয়েই মনে মনে চিন্তা করছিলেম। এমন সময়, ফাদার আসেন এবং আমাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথেই অভ্যর্থনা করেন। তাঁকে যখন আমি তাঁর কাছে আসার উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানাই, তখন তিনি বলেন—সব হবে। আমি ঐসব ঘটনা সম্পর্কে একটা বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরী করেছি। তোমাকে তার একটা নকলও আমি দেব। পাকিস্তান সরকারের এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সকলের কাছেও তার নকল পাঠাব। তুমি ব্যস্ত হয়ো না। তোমাকে তো এখন ছাড়ছি না। দুপুরে তোমাকে আজ আমার সাথে খেতে হবে। এখন আগে একটু চা খাও।
এই বলেই ফাদার আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কেটলি নিয়ে ছোটেন চায়ের জন্য। সাহেব নিজেই জল গরম করে এনে চা তৈরী করেন এবং বলেন যে,—“দেখ, আমি থাকি এই গ্রামে। শহর ও সভ্যতা থেকে দূরে এখানে আমি চিনি পাই না তাই গুড় দিয়েই চা খাই। তুমি কি তাই খাবে?” এতক্ষণে বুঝলেম, টেবিলের উপর প্লেটে গুড় কিসের জন্য। ফাদারের কথা শুনে আমি একটু লজ্জিতই হই এবং সানন্দে আমার সম্মতি জানাই। চা-পর্ব শেষ হওয়ার পর, সাহেব সাঁওতালদের উপর নৃশংস অত্যাচায়ের এক ভয়াবহ বর্ণনা দিয়ে চলেন এবং বলেন,—আমি ৩৫ বছরকাল এই গ্রামে থেকে সাঁওতালদের মধ্যে কাজ করছি। এমন অত্যাচার হতে আমি আর কোন দিনই দেখিনি। আমি সব অঞ্চল ঘুরে স্বচক্ষে সব দেখে এসেছি। তোমাদের তো সেখানে ঢুকতেই দেবে না। সরকারের পুলিশ দল। আমাকেও তারা কম বেগ দেননি।
নাচোলের প্রকৃত পরিস্থিতি অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রমী ব্যক্তি ছিলেন রাজশাহী থেকে নির্বাচিত পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য বা এমএলএ দুই মেয়াদে মন্ত্রীত্ব পাওয়া, প্রাজ্ঞ, সজাগ ও সক্রিয় রাজনীতিবিদ প্রভাসচন্দ্র লাহিড়ী।
একদিন তো দু’জন পুলিশ এসে রাস্তার মাঝেই আমাকে বলেন যে, তারা আমাকে গ্রেপ্তার করলেন এবং আমাকে গোদাগাড়ী থানায় নিয়ে গেলেন। থানার দারোগাবাবু বলেন যে, তাদের খবর আমার কাছে নাকি “রিভলভার” আছে! সাহেব তার উত্তরে নাকি বলেন—“রিভলভারের চেয়েও বড় শক্তিশালী অস্ত্র তার কাছে আছে। সর্বদাই সেই অস্ত্র নিয়েই তো আমি ঘোরাফেরা করি।” দারোগাবাবু ঐ কথা শুনে হকচকিয়ে ওঠেন এবং অস্ত্রটি বের করতে আদেশ করেন। সাহেব তখন তাঁর পাদরীর সাদা পোষাকের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বুকের উপর থেকে বের করেন সেই অস্ত্রটি। সেটি আর কিছুই নয়—ব্রোঞ্জ বা ঐ জাতীয় একটি ধাতু দিয়ে তৈরী পরমপিতা যীশুর একটি ক্রুশবিদ্ধ প্রতিমূর্তি। এই অস্ত্র নিয়েই ৩৫ বছরকাল এক মাঠের মধ্যে একাকী তিনি কাটালেন! আদর্শের প্রতি কী অসীম বিশ্বাস ও আত্মত্যাগ। আমরা বহুবার বহু ক্ষেত্রেই শুনেছি এবং বইয়েও পড়েছি—“with missionary zeal” (অর্থাৎ পাদরীসুলভ উৎসাহ নিয়ে) চলার কথা! সেই দিন আমি প্রথম স্বচক্ষে দেখে বুঝি যে পাদরীসুলভ উৎসাহ নিয়ে চলার তাৎপর্য কত গভীর। সাহেব সব ঘরগুলে ঘুরিয়ে আমাকে দেখান। কোথাও বিলাসিতার একটু চিহ্নমাত্রও দেখি না। তাঁর শয়নঘরে দেখি, একটা দড়ির খাটিয়া। তাতে একখানি কম্বল ও একটা চাদর। মাথার ধারে একটা ছোট বালিশমাত্র। আর দেখলেম, ঐ ঘরে আছে মহামানব যীশুর একখানি প্রমাণ তৈলচিত্র। তিনি বলেন, “গত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি যখন দেউলি বন্দীশিবিরে বন্দী অবস্থায় ছিলেন, তখন তাঁরই একজন সহ-বন্দী ইতালীয় সাহেব ঐ তৈলচিত্রখানি এঁকে তাঁকে দিয়েছিলেন।”
‘ফাদার ক্যাটানিও সম্পর্কে সাগ্রামের কাছে থেকে খবর শুনে স্থির করি যে, আঁধারকোঠায় গিয়েই ফাদারের সাথে দেখা করবো। সব তথ্য আমাকে সংগ্রহ করতেই হবে। আঁধারকোঠা গ্রামটি পদ্মার তীরে এবং রাজসাহী শহর থেকে ৬/৭ মাইল দূরে, গোদাগাড়ীর দিকে। পরদিন সকালেই রওনা হয়ে বেলা প্রায় দশটার সময় মিশনারী সাহেবদের “আস্তানায়” পৌঁছাই। পৌঁছেই সাহেবের কাছে আমার “কার্ড” পাঠাই তাঁর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্য জানিয়ে।
‘তারপর দুপুরে সাহেবের সাথে ভাতও খেলেম। সে কী খাওয়া! মোটা-মোটা চালের ভাত আর তাঁরই বাগানের উৎপন্ন ফুলকপির (তাও আবার ফুটে গিয়েছে) একটা ঝোলা তরকারী। তাই দিয়েই সাহেব নির্বিকারচিত্তে এক থালা ভাত খেলেন। আর আমি? একেই আমি বরাবরই খাই খুব কম ভাত তার ওপর ভাতের চেহারা দেখেই আমার অন্তরাত্মা আঁতকে ওঠে। আমার দুর্বল হজমশক্তিতে কি ঐ ভাত হজম হবে? ভয়ে ভয়ে আমি অতি সামান্যই খাই। খাওয়ার পরে আমি বিদায় নেওয়ার কথা তাঁকে জানাতেই তিনি তাঁর টাইপ করা প্রকাণ্ড রিপোর্টের একটি নকল এনে আমার হাতে দেন। সাহেবের ঐ রিপোর্টের নকল ঢাকার ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনার পান এবং তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরুর বৈদেশিক দপ্তরেও নাকি তার নকল পাঠান। ...
‘ফাদার ক্যাটানিও সাহেবের রিপোর্ট ও অন্যান্য আরো নানাভাবে সংবাদ যতটা পারলেম তা সংগ্রহ করলেম। ঢাকা থেকে ডাক এসেছে, এসেম্বলি সেশনের। ১৯৫০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী তারিখে এসেম্বলির অধিবেশন বসবে। খবর পেয়েই আমি তেভাগা আন্দোলন থেকে উদ্ভুত পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনার জন্য একটি মুলতবী (adjournment motion) প্রস্তাবের নোটিশ ডাকযোগেই স্পীকারের নামে পাঠিয়ে দিয়ে ৪ঠা ফেব্রুয়ারী আমি রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই।’
গত ১৩ অক্টোবর ফাদার কাত্তানিও ও নাচোল বিষয়ে তাঁর তৈরি করা প্রতিবেদনটি সন্ধানের জন্য আমি আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লীতে গিয়ে কোনো কিছুর সন্ধান পাইনি। তাঁর নাম উল্লেখ করে কথা বলা শুরু করলে, সেখানকার কনিষ্ঠ ফাদার নির্বিকারভাবে অজ্ঞতা প্রকাশ করে ধর্মপল্লীর গির্জার পাশে স্থাপিত ফাদারদের নামের একটি ফলক দেখতে বলেন। সেই ফলকে ফাদার কাত্তানিওর নামটি সৌভাগ্যবশত খুঁজে পাওয়া যায়। তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে চতুর্থ স্থানে, এই মিশনে দুই পর্বে তিনি ছিলেন ১৯২১ থেকে ১৯৩০ সাল এবং ১৯৪৬ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত যুক্ত ছিলেন। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ১৫ অক্টোবর ঢাকার ক্যাথলিক বিশপ’স কনফারেন্স অব বাংলাদেশ এবং তার অনতিদূরে পিমে হাউসে অনুসন্ধানের জন্য গেলেও অভিজ্ঞতাটি সুখকর ও ভদ্রোচিত সহযোগিতামূলক হয়নি। অসৌজন্যতাকে অগ্রাহ্য করে কথা বলা ও আমি কী চাই তা বোঝানোর গোঁ ধরে থাকলে অবশেষে সেখানকার রূঢ় আফ্রিকান কর্মকর্তাটি বিরক্তিসহকারে কাউকে ফোন করে ইতালিয়ান ভাষায় বিষয়টি জানালে, ফোনের অপর প্রান্তে থাকা বিদেশি ফাদার ধৈর্য ধরে বিষয়টি আমার কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করেন এবং যোগাযোগের জন্য নাম-ঠিকানা ইত্যাদি রেখে যেতে বলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেখান থেকে কোনো উত্তর আসেনি। একটি প্রকাশিতব্য বইয়ের একটি অধ্যায়ে অন্তর্ভু্ক্ত করার জন্য ফাদার কাত্তানিওর তৈরি করা ‘নাচোল প্রতিবেদনটি’ উদ্ধারের প্রচেষ্টা থাকবে শেষ সময় পর্যন্ত।
‘ফাদার ক্যাটানিও সাহেবের রিপোর্ট ও অন্যান্য আরো নানাভাবে সংবাদ যতটা পারলেম তা সংগ্রহ করলেম। ঢাকা থেকে ডাক এসেছে, এসেম্বলি সেশনের। ১৯৫০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী তারিখে এসেম্বলির অধিবেশন বসবে। খবর পেয়েই আমি তেভাগা আন্দোলন থেকে উদ্ভুত পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনার জন্য একটি মুলতবী (adjournment motion) প্রস্তাবের নোটিশ ডাকযোগেই স্পীকারের নামে পাঠিয়ে দিয়ে ৪ঠা ফেব্রুয়ারী আমি রাজশাহী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই।’
ফাদার কাত্তানিও সম্পর্কে চারটি প্রাসঙ্গিক তথ্য পরিশেষে উল্লেখ করা যেতে পারে—১. ক্যালকাটা গেজেটের ১৯৩১ সালের ২৩ মে এবং ১৯৩৮ সালের ২১ জুলাইয়ে প্রকাশিত টমাস কাত্তানিও সংশ্লিষ্ট দুটি গেজেট বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়। দুটি গেজেট বিজ্ঞপ্তিই অবিভক্ত ভারত ও মালদাহ জেলা থাকাকালীন। তা থেকে অনুমান করা যায়, ১৯৩০ থেকে ১৯৪৫ সাল সময়ে আন্ধারকোঠা ধর্মপল্লীতে ফাদারের অনুপস্থিতির সময়ে তিনি মালদাহ জেলায় অন্য কোনো দায়িত্ব পালন করেছেন, হয়তো ক্যাথলিক গির্জার পক্ষ থেকে। ২. প্রভাতচন্দ্র লাহিড়ীর বলা ভাষ্যমতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে তিনি দেউলি অন্তরিন শিবিরে আটক ছিলেন, হয়তো তাঁর ইতালীয় নাগরিকত্বের কারণে। ৩. একটি অসমর্থিত সূত্র থেকে জানা যায়, ফাদার সাঁওতালদের প্রতি বিশেষভাবে সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে, বিশেষ করে সাঁওতালদের জমিজমা–সংক্রান্ত মামলার সময়ে সাঁওতালদের সমাজ-সংস্কৃতি-রীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ বিচারক রাখার বিধান নিশ্চিত করেছিলেন। ৪. নাচোল-গোদাগাড়ী-গোমস্তাপুরের সাঁওতাল ও হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর পাকিস্তান সরকারে নিপীড়ন ও ধ্বংসযজ্ঞ বিষয়ে ফাদার কাত্তানিওর তৈরি করা মূল প্রতিবেদনটির অস্তিত্ব ও বিষয়বস্তুর বিবরণ সম্পূর্ণভাবে এখনো পাওয়া না গেলেও ফাদারের নাম–পরিচয় উল্লেখপূর্বক সেই প্রতিবেনের মূল অভিযোগের দুটি উল্লেখ পাওয়া যায়—প্রথমত, ১৯৫০ সালের ২০ মার্চ পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদের পাঁচজন সংখ্যালঘু সদস্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের পূর্ববঙ্গ সফরকালে তাঁকে দেওয়া স্মারকলিপিতে এবং ১৯৬৫ সালে দিল্লি থেকে প্রকাশিত ‘রিকারেন্ট এক্সোডাস অব মাইনোরিটিস ফ্রম ইস্ট পাকিস্তান অ্যান্ড ডিস্টার্বেন্সেস ইন ইন্ডিয়া’ (পৃ. ৩৩৩) বইটিতে। উভয় জায়গাতেই ফাদার কাত্তিনিওর নামে দেয়া নাচোলে সংঘটিত ঘটনাবলির বিরণটি হুবহু এক। তাতে অনুমান করা যায়, বইটির বিবরণের তথ্য ও ভাষা নেওয়া হয়েছে পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদের পাঁচজন সদস্যের দেয়া স্মারকলিপিটি থেকে।
পরিশেষে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ফাদার কাত্তিনিওর মূল ‘প্রকাণ্ড রিপোর্টট’ উদ্ধার করা সম্ভব হলে সেটি হয়ে উঠবে নাচোলে পাকিস্তান সরকারের চালানো হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শীর একমাত্র বিস্তারিত বিবরণ এবং পূর্ব বাংলায় মানবাধিকার দলনের প্রথম প্রামাণিক দলিল।
––––
ওমর তারেক চৌধুরী, ‘শতবর্ষে ইলা মিত্র: অন্য চোখে’ (কলকাতা, ২০২৬) বইয়ের যুগ্ম সম্পাদক।
তাঁর প্রকাশিতব্য ‘ইলা মিত্র: অন্তরালে যা ঘটেছিল (১৯৫০-১৯৫৬)’ গ্রন্থের একটি অধ্যায়ের খসড়া থেকে বক্ষ্যমাণ নিবন্ধটি তৈরি।
omartarekchowdhurygmail.com