বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আলতাফ: প্রায়ই শোনা যায় কথাটি, কবিতার পাঠক কমে যাচ্ছে, কাব্যগ্রন্থের বিক্রিও হ্রাস পাচ্ছে। এই বাস্তবতায় সাধারণ পাঠক কি কবিযশপ্রার্থী, কাব্যমোদি—বিপুলসংখ্যক পাঠককে দীর্ঘদিন কবিতায় আবিষ্ট করে রেখেছেন আপনি। আপনার কবিতায় এমন কী ঘটে যে এত বিপুল অনুরাগী তৈরি হয়?

জয়: বাংলা ভাষায় এমন অসংখ্য কবি আছেন, যাঁদের অনেক পাঠক আছে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, আমার লেখা কবিতা যখন একটা-দুটো করে বিভিন্ন জায়গায় সবে ছাপা হতে শুরু করেছে, সেই ১৯৭৩ সাল থেকে আমি শুনে আসছি, আধুনিক কবিতা দুর্বোধ্য, কেউ পড়ে না। আধুনিক কবিতার পাঠক কমে আসছে। ৪০ বছর ধরে এই কথা শুনছি। অথচ দেখুন, ৪০ বছরে নতুন অনেক কবিকে পেয়েছি আমরা। বাংলাদেশে ও কলকাতায় প্রতিবছরই বইমেলার সময় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ কবির বই বের হয়। নতুন কবিদের বই প্রকাশে আগে প্রকাশকেরা যতটা উৎসাহী ছিলেন, এখন তুলনামূলকভাবে সেই আগ্রহ আরও বেড়েছে বলেই আমার ধারণা। এই যাত্রাসহ তিনবার বাংলাদেশে আসা হলো আমার। প্রতিবারই অজস্র তরুণ কবির বই কিনেছি, উপহারও পেয়েছি। শুধু আমি কেন, আমার সমসাময়িক কলকাতার অন্য কবিদেরও একই অভিজ্ঞতা। অথচ বছরের পর বছর ধরে শোনা যাচ্ছে—কবিতার পাঠক কমে যাচ্ছে! আচ্ছা, পাঠক যদি না পড়ে, বই যদি না চলে, তাহলে ফিবছর এত এত তরুণের কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পাচ্ছে কেন? এই দুটো জিনিস পাশাপাশি দেখলে কিন্তু ফারাকটা স্পষ্ট চোখে পড়ে। দেখুন, ‘কবিতা পাঠক হারাচ্ছে’—এই প্রচারণার মধ্যেই দুই বাংলায় অনেক নতুন কবি পেয়েছি আমরা। অন্যদিকে যে পুরোনো কবিরা অনেক দিন ধরে লিখছেন, তাঁরা যখন কোনো নতুন বইয়ে নতুনভাবে বাঁক নিচ্ছেন, সেটি তো তাঁদের একধরনের নবজন্ম, নতুন উত্থান। তাই আমার মনে হয়, কবিতার পাঠক নেই, বই বিক্রি হয় না—ইত্যকার কথাগুলোর দিকে মন না রাখাই ভালো। বরং যাঁরা লিখছেন, তাঁদের দিকে মনোযোগ দিলেই উপকার হবে বেশি।
আর আমার কবিতা অনেক পাঠককে আকর্ষণ করে বলে যে কথা বললেন, সেটি ঠিক নয়। কথাটি আপনি এখানে বলছেন তো? উড়োজাহাজে আধঘণ্টা পেছনে উড়ে কলকাতায় গিয়ে কথাটি বলুন মশাই। সেখানে এমন কথা বলার লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে।

আলতাফ: তাহলে আপনার বই কেনে কারা, শুধু বাংলাদেশের পাঠক?

জয়: তা তো জানি না, বলতে পারব না। আমি যখন লিখি, তখন অজানার মধ্য দিয়ে যাই। একসময় আমি কবিতা লেখা পুরোপুরি বন্ধ রেখেছিলাম। আমার বয়স যখন ৫৩ বছর তখন থেকে ৫৬—এই তিন বছর কোনো কবিতা লিখতে পারিনি। সে সময় মনে হচ্ছিল, লেখার মতো কোনো শব্দ-ভাষা আমি খুঁজে পাচ্ছি না। আর যেসব কথা তখন মনের ভেতরে গুমরে মরছিল, সেগুলো প্রকাশেরও উপযুক্ত কোনো ভাষা ছিল না আমার কাছে—এ যে কেমন একটা অনুভূতি, সেটি বলে বোঝানো যাবে না। বিভিন্ন সময় আমার এমন হয়। গত তিন মাস অর্থাৎ এ বছরের ২৩ আগস্ট থেকে আজ ২২ নভেম্বর অবধি কোনো নতুন কবিতা আমি লিখিনি। সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় আমার যেসব কবিতা ছাপা হয়েছে, তা ২৩ আগস্টের আগে লেখা।

default-image

আলতাফ: খ্যাতি, জনপ্রিয়তা—এগুলো কি তাহলে আপনার ভেতর কোনো চাপ তৈরি করে? এক সাক্ষাৎকারে আপনি এমন বলেছিলেন: এখন কবিতা দিলেই ছাপা হয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক সময় কবিতাটির ভালো-মন্দ আমি বুঝতে পারি না। এতে ভেতরে একটা শূন্যতা তৈরি হয়।

জয়: এ কারণেই আমি তিন বছর লেখা থামিয়ে রেখেছিলাম। অদূর ভবিষ্যতেও এটা হতে পারে। এখনো তো থামিয়ে রেখেছি লেখা। এখন কেবল চাকরিসূত্রে বই আলোচনা ও কলাম লিখছি; কিন্তু সৃজনশীল কোনো কিছু লিখছি না।

আমার মনে হলো, একদিন এখানে আমি থাকব না। যাঁরা আমায় কখনো দেখেননি, তাঁরা তখন আমাকে জানবেন কতগুলো গল্পের মধ্য দিয়ে। কিন্তু একটা বইয়ের সঙ্গে আমার যে মানসিক অবস্থান, সেটা যদি আমি কোথাও লিখে রাখি, তবে মৃত্যুর পর দু-চারজন মানুষও যদি আমার বই উল্টেপাল্টে দেখেন, তখন তাঁরা আমার মনের অবস্থাটি জানতে পারবেন। তাঁদের সঙ্গে আমার কোনো প্রতিযোগিতা বা ঈর্ষা থাকবে না। তাঁরা ভাববেন না, এই লোক আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে। আসলে কবিতা লেখার সময় আমার মনটা কেমন ছিল, সেটাই ভূমিকার মাধ্যমে অনেকটা চিঠির মতো করে আমি পাঠকদের জানাতে চেয়েছি। জয় গোস্বামী

আলতাফ: নিজের ব্যক্তিজীবনের টুকরো টুকরো অনেক ঘটনা ধরা আছে আপনার কবিতায়। কবিতাকে কি আপনি আত্মজীবনী মনে করেন?

জয়: আত্মজীবনী নিয়ে আমার ভাবনা একটু ভিন্ন রকম। আমার কাছে আত্মজীবনী শুধু নিজের জীবন বা আমি যে পরিবারে বাস করি, সেই পরিবারের ঘটনাই নয়; এর প্রেক্ষাপট আরেকটু বিস্তৃত। ধরা যাক, আমার আয়ুষ্কাল ৬০ বছর। এর মধ্যে এই মাটির পৃথিবীতে, দেশে ও মহাকাশে ঘটেছে অজস্র ঘটনা। ১৯৮৭ সালে সুপারনোভা আবিষ্কৃত হলো। তবে এই সুপারনোভার বিস্ফোরণ হয়েছিল হাজার বছর আগে। অথচ বিজ্ঞানীরা সেটা ধরতে পারলেন মাত্র কয়েক বছর আগে। কিন্তু ঘটনাটি তো ঢের আগের। সে ক্ষেত্রে আমার আয়ুষ্কালটা পেছনের দিকে বাড়তে বাড়তে চলে গেল সুপারনোভার ওই বিস্ফোরণের সময় পর্যন্ত। এই সময় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলাম ৯৮৭ বছর আগের ঘটনা। আত্মজীবনী বলতে আমি এমন একটি পটভূমির কথা ভাবি, যার মধ্যে রয়েছে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড। এখানে বসেই পুরো ব্রহ্মাণ্ডে আমি বসবাস করছি। এর মধ্যে যেমন আমার ব্যক্তিজীবন, স্ত্রী, কন্যা-পরিজন আছে, তেমনই আছে এই মহাবিশ্ব। কথাটি আগেও বলেছি আমি। একবার আমায় একজন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনার কবিতায় অনেক বাঁক দেখা যায়। পাল্টে পাল্টে গেছে কবিতা। কিন্তু আপনার সাক্ষাৎকারগুলো সব এক রকম কেন? উত্তরে বলেছিলাম, বইগুলো আমি নিজে লিখেছি কিন্তু সাক্ষাৎকারগুলো লিখেছে অন্য লোক. . . হা হা হা।

default-image

আলতাফ: প্রেম আর নারী আপনার কবিতার একটি বড় অনুষঙ্গ। এ বিষয়ে কিছু বলুন।

জয়: বিভিন্ন সময় আমি কী অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছি, সেই যাত্রাপথে কেমন অনুভূতি হয়েছে, সবই লেখা আছে আমার কাব্যগ্রন্থে। মুখে আলাদাভাবে সেটা বলা মুশকিল। ভেতরকার অভিজ্ঞতা মুখে বলা কঠিন। আসলে প্রেম শব্দটি সহজে উচ্চারণ করা গেলেও সবিস্তার প্রকাশ করা যায় না। এর অন্তর্গত সারাৎসার কিছুটা হয়তো প্রতিফলিত হয় কবিতার মাধ্যমে।

আলতাফ: বিভিন্ন কবিতার বইয়ে কবিতার সঙ্গে আলাদাভাবে ভূমিকা জুড়ে দেন আপনি। কবিতার বইয়ে ভূমিকা কি জরুরি?

জয়: ‘সূর্যপোড়া ছাই’ বইতে প্রথম ভেবেছিলাম ভূমিকা দেওয়ার কথা। কিন্তু কবিতার বইয়ে ভূমিকা থাকা ভালো নয়—বয়োজ্যেষ্ঠ এক কবির পরামর্শে এই বইতে ভূমিকা দিতে চেয়েও দিইনি। পরে ২০০৩ সালের পর থেকে কবিতার বইয়ে আলাদা করে ভূমিকা দিতে শুরু করি। ভূমিকা নয়, কবিতাই কবিতার কথা বলবে—এমন একটা ধারণা আমাদের মধ্যে আছে এবং এটি যেন আদর্শ হয়ে গেছে। কিন্তু ভেবে দেখুন, আপনি নিজে যখন কবিতা লেখেন তখন শক্তি চট্টোপাধায় বা আল মাহমুদের মতো লেখেন না। আপনার বই সম্পর্কে আপনার ধারণাটি নিজস্বই হওয়া উচিত। তাই একসময় আমার মনে হলো, একদিন এখানে আমি থাকব না। যাঁরা আমায় কখনো দেখেননি, তাঁরা তখন আমাকে জানবে কতগুলো গল্পের মধ্য দিয়ে। কিন্তু একটা বইয়ের সঙ্গে আমার যে মানসিক অবস্থান, সেটা যদি আমি কোথাও লিখে রাখি, তবে মৃত্যুর পর দু-চারজন মানুষও যদি আমার বই উল্টেপাল্টে দেখে, তখন তারা আমার মনের অবস্থাটি জানতে পারবে। তাদের সঙ্গে আমার কোনো প্রতিযোগিতা বা ঈর্ষা থাকবে না। তারা ভাববে না, এই লোকটি আমার কোনো ক্ষতি করতে পারে। আসলে কবিতা লেখার সময় আমার মনটা কেমন ছিল, সেটাই ভূমিকার মাধ্যমে অনেকটা চিঠির মতো করে আমি পাঠকদের জানাতে চেয়েছি।

default-image

আলতাফ: বাংলাদেশে কাদের লেখা আপনাকে আকর্ষণ করে?

জয়: বাংলাদেশকে আমি চিনি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস—এঁদের মাধ্যমে। এখানে বিশেষভাবে বলব আল মাহমুদের কথা। তাঁর মতো কবি যুগে যুগে একজনই আসেন। ‘সোনালি কাবিন’-এর মধ্যে যে চিরায়ত বাংলা, বাংলার ইতিহাস ও ব্যক্তিগত প্রেম, তা তো এককথায় অসামান্য।

আলতাফ: এতদিন ধরে কবিতা লিখছেন, আপনার উপলব্ধি কী?

জয়: আমি কিছু লিখতে পারিনি, কিছুই হয়ে উঠিনি। কিছু মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি, যা আমার প্রাপ্য ছিল না। সাহিত্য করার চেষ্টা করেছি; কিন্তু বলার মতো কিছুই ছিল না।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন