মুক্তিযুদ্ধের দুর্ভোগ ও প্রতিরোধ

১৯৭১ সালে রঘু রাইয়ের তোলা এই ছবি রয়েছে প্রদর্শনীতে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে রঘু রাইয়ের আলোকচিত্র প্রদর্শনী হবে, শুনে শঙ্কা বোধ করেছিলাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি আলোকচিত্রীদের মধ্যে রঘু রাই প্রথম সারির। জয়নুল গ্যালারির সংকীর্ণ পরিসর আর দুর্বল আলোকসম্পাতে কি সেসব ঐতিহাসিক ছবি আদৌ উপস্থাপন করা সম্ভব? কিউরেটর জিহান করিমকে বাহবা দিতেই হবে। সেই স্বল্প পরিসরেও ব্যবস্থাপনা হয়েছে দারুণ। পুরো গ্যালারি কালোয় মুড়িয়ে দেওয়ায় সাদাকালো ছবিগুলোতে বাঙালির ক্রান্তিকাল আরও তীব্রভাবে ফুটে উঠেছিল।

‘রাইজ অব আ নেশন’ নামে এই প্রদর্শনীর উপলক্ষ চারুকলা অনুষদের ৭৫ বছর পূর্তি। উদ্যোগ যৌথভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও দুর্জয় বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের। রঘু রাইয়ের মুক্তিযুদ্ধের ছবিগুলো নিয়ে রাইজ অব আ নেশন নামে একটি বইও প্রকাশিত হচ্ছে।

দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে রঘু রাই দীর্ঘ সময় মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলেছেন। ঐতিহাসিক সেই সময়ের বিলীয়মান বহু মুহূর্ত চিরস্থায়ী করে রেখেছেন। ১৯৭৭ সালে দ্য স্টেটসম্যান থেকে তিনি চাকরি ছাড়েন। এরপর আরও দুবার অফিস পাল্টান। এ সময়ে ছবিগুলো হারিয়ে যায়। ৩০ বছর পর ছবি ডিজিটালাইজ করতে গিয়ে সেগুলো আবার তাঁর হাতে আসে। তখন কিছু ছবি নিয়ে বেরিয়েছিল বাংলাদেশ: দ্য প্রাইস অব ফ্রিডম বইটি।

প্রদর্শনীর প্রবেশপথ বরাবর একটি শিশুর অতিকায় আবক্ষ প্রতিকৃতি। হাড়সর্বস্ব উদোম শরীর। দৃষ্টিতে ক্ষোভমিশ্রিত ভয়। শরণার্থীশিবিরের অচেনা পরিবেশে শিশুটির অনিশ্চিত দৃষ্টির সামনে কুঁকড়ে যেতে হয়। মুহূর্তের অকৃত্রিম নির্যাস বের করে আনতে রঘুর জুড়ি নেই।

দুটি হলের প্রথমটিতে পরিবেশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তোলা ছবি—সীমান্ত পেরিয়ে আসা মানুষের ঢল, শরণার্থীশিবির ইত্যাদি। দ্বিতীয় হলে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্ব এবং শত্রুপক্ষের আত্মসমর্পণ। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর সঙ্গে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার আলোকচিত্র সাংবাদিক হিসেবে তিনি যুদ্ধরত বাংলাদেশে এসেছিলেন।

একটি জাতির দুর্ভোগ ও প্রতিরোধের এমন সব বাঙ্ময় ছবির গুরুত্ব বাড়াতে বাড়তি উপকরণের (প্রপস) প্রয়োজনই পড়ে না। কিন্তু এই প্রদর্শনীতে সেগুলো নতুন মাত্রা এনেছে। প্রথমটি গ্যালারির দেয়াল ঘেঁষে রাখা প্রমাণ সাইজের কিছু কাঠের তৈরি বই। খোলা পাতায় প্রকাশিতব্য বইটির লেখার অংশবিশেষ ও ছবি লেজারে খোদাই করা। দ্বিতীয়টিতে শরণার্থীদের আশ্রয় নেওয়া পাইপের মতো গোলাকার চাকতির ভেতরে মানুষগুলোর ছবি বসানো। সঙ্গে একজন আশ্রিতের আয়তাকার বড় ছবি।

আত্মসমর্পণের ছবিটির পাশেই রাখা সেই দলিলের একটি অনুলিপি। অনুলিপির সঙ্গে রঘুর ছবির বৈসাদৃশ্য যথেষ্ট অর্থবহ।

সৈয়দ লতিফ হোসাইন