সেই সঙ্গে বাড়তি পাওনা ছিল নীলক্ষেতের ফুটপাতে বিছানো বইসামগ্রী, নিউমার্কেট আর স্টেডিয়ামের বইয়ের দোকান। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে ভাগাভাগি করে বই কিনতাম আর পড়তাম সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ থেকে নিয়ে রশীদ করীম, শামসুর রাহমানের সঙ্গে আল মাহমুদ। সৈয়দ শামসুল হক আর আবদুল মান্নান সৈয়দকে পড়লাম তাঁদের দেখতে পাওয়ার অনেক আগে। ইংরেজি বিভাগে সময়টা তখন ‘ক্যানন’-এর, অর্থাৎ ধ্রুপদ বলে পশ্চিমা সাহিত্যে যেসব বই উচ্চ রুচির ও মর্যাদার দাবিদার, সেসব বইয়ের। মার্ক্সবাদে আস্থা রাখা আমি ও আমার বন্ধুদের কাছে ক্যাননের একটা আবেদন থাকলেও আামদের দৃষ্টি থাকত এর বাইরের এবং তথাকথিত প্রান্তজনের সাহিত্যের প্রতিও। একদিন শোনা গেল, আহমদ ছফা, যাঁর অনেক ভাবনা আমাদের আন্দোলিত করত, এক নতুন লেখককে আবিষ্কার করেছেন, তাঁর নাম হুমায়ূন আহমেদ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরই রসায়নের ছাত্র। আমিও রসায়ন পড়তে চেয়েছিলাম, কিন্তু ব্যাটে-বলে হয়নি বলে ইংরেজির পথ ধরেছিলাম। হুমায়ূন আহমেদকে আমার কেন জানি আপন মনে হলো। তিনি রসায়নের ছাত্র হয়েও সাহিত্যকর্ম করছেন, আহমদ ছফার প্রশংসাও পেয়েছেন আর আমি সাহিত্য পড়ছি রসায়ন পড়তে পারিনি বলে। যেদিন নন্দিত নরকে হাতে পেলাম, পড়তে শুরু করে একসময় টের পেলাম, গল্পটা আমাকে এমনভাবে টেনে ধরেছে যে বইটা মাঝপথে বন্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। মন্টুকে আমার খুব চেনা মনে হলো, রাবেয়াকেও। আমার ধারণা হলো, মানুষের মনের রসায়ন সব যেন হুমায়ূনের জানা। এক-দুজন বন্ধু বইটা পড়ে বলল, পাঠক ধরে রাখার ক্ষমতা এই লেখকের আছে।

নন্দিত নরকে আমার সাহিত্য–সংগ্রহে স্থান করে নিল।

একসময় এই বইয়ের লেখক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। সময়টা ছিল এমনই যে বড় লেখকদেরও কেউ ‘সেলিব্রিটি’ ভাবত না, তাঁরাও ভাব নিয়ে চলতেন না। এক শরীফ মিয়ার ক্যানটিনেই বাংলা সাহিত্যের কত নক্ষত্র আলো ছড়াতেন, তাঁদের কাছে বসার জন্য অনুমতি লাগত না, সাহিত্যের ভোজ ছিল উন্মুক্ত। হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবে আসতেন। চুপচাপ বসে চা খেতেন। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক আর কাজী মোতাহার হোসেনের দাবা খেলা দেখতেন। দাবা খেলতে তাঁর হাত নিশ্চয় নিশপিশ করত, কিন্তু তা চেপে রেখে তিনি দর্শক হয়েই থাকতেন।

হুমায়ূনের সঙ্গে প্রথম পরিচয়েই বুঝলাম, তিনি সোজাসাপটা কথা বলতে পছন্দ করেন, নাক গলানো মানুষ তাঁর অপছন্দ এবং কাউকে পছন্দ না হলে তাঁর সঙ্গে একটা কথাও তিনি বলেন না। এই চরিত্রপাঠ উপকারী হয়েছিল। কারণ, কখনো দেখা হলে দু-একটা কথা বলে আমি বিদায় নিতে চাইলে তিনিই বসতে বলে টুকটাক কথা বলতেন। তবে এ রকম দেখাসাক্ষাৎ হতো কালেভদ্রে।

একসময় আমার ক্লাবে যাওয়া বন্ধ হলো, হুমায়ূনও ধীরে ধীরে দৃষ্টি থেকে মিলিয়ে গেলেন। আমি গেলাম আমার পিএইচডির তালাশে বিদেশে। তিনিও গেলেন। পিএইচডি শেষে দেশে ফিরে এসে যখন লেখালেখিতে সক্রিয় হলাম, কিছু সময় পর হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাবেই দেখা হলো। তিনিও ফিরেছেন পিএইচডি শেষ করে। আমি জানলাম তিনি লিখছেন, কিন্তু তখনো তাঁর আর কোনো বই পড়া হয়নি। আশির দশকের শেষ প্রান্তে এসে দেখলাম, তাঁর জনপ্রিয়তার পারদ ওপরে উঠছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য তিনি নাটক লিখতে শুরু করলে সেই পারদ ক্রমাগত ওপরে উঠল। তাঁর লেখক-নাট্যকার খ্যাতি আকাশমুখী হলো বটে, কিন্তু ক্লাবের অনিয়মিত বিকেলগুলো থেকে তিনি ছুটি নিলেন।

তারপরও একদিন দেখা হলো, চা খেতে বসেছিলেন, আমাকে দেখে ডেকে নিলেন। তাঁর হাতে একটা বাদামি প্যাকেট ছিল, ভেতরে দুটি বই। প্যাকেটের ওপর পশ্চিমবঙ্গের এক বিখ্যাত লেখকের নাম–ঠিকানা লেখা। তিনি বললেন, প্যাকেটটা ডাকে দিতে ভুলে গেছেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, পশ্চিমবঙ্গের বড় লেখকেরা কি তাঁকে এভাবে তাঁদের বই পাঠান? তিনি বললেন, না। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন, হয়তো জানতেন, আমি কেন প্রশ্নটা তাঁকে করেছি। আমি বললাম, বাংলাদেশের বিশালসংখ্যক তরুণ তাঁকে অনুসরণ করেন, তাঁর আসনটি ওই লেখকের পাশে, নিচে নয়।

হুমায়ূন আহমেদ প্যাকেটটা ছিঁড়ে ফেললেন। বই দুটি বের করে ভেতরের পাতায় আমার নাম লিখে শুভেচ্ছা জানিয়ে আমাকে দিলেন। তারপর ছেঁড়া প্যাকেটটা যত্ন করে একটা ঝুড়িতে ফেলে কোনো কথা না বলে প্রস্থান করলেন।

তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত এই দুই বই-ই শুধু তিনি আমাকে দিয়েছেন। 

একসময় তাঁর ধারণা হয়েছিল, আমি বোধ হয় তাঁর সাহিত্যকে বাঁকা চোখে দেখি। কারণ, তত দিনে তাঁকে ‘জনপ্রিয় সাহিত্যিক’ আখ্যা দিয়ে অনেকেই একটা নিম্নবর্গে ফেলে দিতে চাইছেন। অথচ তাঁর যে কয়েকটা বই পড়েছি, তাঁর লেখার শক্তির প্রশংসা করেছি। তাঁর হিমু যে সবার ভেতরেই থাকে, শুধু তাকে সামনে আনতে অনেকের দ্বিধা থাকে, অনেক কারণে, তা–ও বুঝেছি। 

হুমায়ূনের খুব বেশি বই যে আমি পড়েছি, তা নয়, কিন্তু যেগুলো পড়েছি, মনে হয়েছে, তারা আমাকে কিছুটা সময় তাদের দখলে নিয়ে নিয়েছে। জন বার্থ জানিয়েছেন, সাহিত্য পাঠের আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। সাহিত্যের মধ্যে অবসাদ জমছে, যে অবসাদ তৈরি হয় বিষয়বস্তুর পৌনঃপুনিকতা এবং ফর্ম ও টেকনিকের মধ্যে নতুনত্বের অভাবে।

হুমায়ূন সেই পড়ার আনন্দকে ফিরিয়ে এনেছেন। অনেক দিন আগে সাজ্জাদ শরিফের অনুরোধে ভোরের কাগজ-এ আমি একটা লেখা লিখেছিলাম, ‘হুমায়ূন আহমেদ কেন জনপ্রিয়’—এই শিরোনামে। আমার লেখা পড়ে হুমায়ূনের ভুল ভেঙেছিল। কিন্তু তিনি হুমায়ূন বলেই আমাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানাননি, কোনো উৎসাহও দেখাননি। অনেক পরে শুধু আমাকে বলেছিলেন, আমার লেখা পড়ে তিনি একটু অবাকই হয়েছিলেন। অবাক হওয়ার ব্যাখ্যা তিনি দেননি, আমিও চাইনি।

আহমদ ছফা একদিন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, হুমায়ূন যে কল্পবিজ্ঞান লিখছেন, তাতে মৌলিকতা আছে কি না। যাঁরা ছফা ভাইকে চিনতেন, তাঁরা নিশ্চয় বলবেন, প্রশ্নটি হুমায়ূনের শক্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্যই তিনি করেছেন, তাঁর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য হিসেবে নয়। হুমায়ূনের দু-একটি কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক বই পড়ে আমার মনে হয়েছিল, কল্পবিজ্ঞান তাঁর স্ফূর্তির জায়গা নয়। সেই জায়গাটি মধ্যবিত্তের জীবন; জীবনের, প্রকৃতির ও মানুষের ভেতরের অজানা যত রহস্যময়তা; গল্প বলার নানা কলাকৌশল এবং সেগুলোকে রেসের ঘোড়ার মতো চালিয়ে বাজিমাত করা। এ কারণে নাটকে তিনি সফল, চলচ্চিত্রেও।

ভোরের কাগজ-এর সেই লেখায় আমি লিখেছিলাম, অসংখ্য তরুণকে তিনি চোখে স্বপ্ন নিয়ে ঘুমাতে পাঠান, যে স্বপ্ন প্রেমের, জ্যোৎস্নার, বৃষ্টিবিলাসের, নিজের ভেতরের হিমুকে আবিষ্কার করে তার হাত ধরে পথে নেমে যাওয়ার। প্রেমকে তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন, অনুভূতিকে পাখির ওড়াউড়ি আর রাতের নিঃসঙ্গ বাতাসের সঙ্গে। অতিপ্রাকৃতিককে তিনি নিয়ে এসেছেন রহস্য আর অবিশ্বাসের সঙ্গে স্বাভাবিকের একটা ঠোকাঠুকি লাগিয়ে।

দুই.

হুমায়ূন আহমেদ শেষবার দেশে এলে তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। আরও কয়েকজনও এসেছিলেন। একজনকে বললেন ছবি তুলতে। আমাদের নিউইয়র্ক যেতে বললেন।

জ্যামাইকায় তাঁর বাসার পাশে একটা মাঠ আছে, সেই মাঠে এক জ্যোৎস্নার রাতে বসে থাকার আমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল নিউইয়র্কের সেই হাসপাতালে, যেখান থেকে তাঁর আর বাসায় ফেরা হয়নি। সেদিন নিউইয়র্কের আকাশে ছিল ঝকঝকে রোদ। তাঁকে তা বললে তিনি একটু হাসলেন। হয়তো জ্যোৎস্না রাতের বিপরীতে তাঁকে মেলালেন। কিছু কথা বললেন। হাসালেন। তারপর আমার হাত একটু ছুঁয়ে বললেন, আবার আসবেন।

আবার গিয়েছিলাম, তবে হাসপাতালে নয়, শহীদ মিনারে, যেখানে তাঁর মরদেহ রাখা হয়েছিল মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জানানোর জন্য। লোকের অরণ্য পেরিয়ে শহীদ মিনারে ওঠা সম্ভব ছিল না, সে জন্য দূর থেকেই তাঁকে বলেছিলাম, বিদায়।