ঠাকুমা মরে গেল এই ফেব্রুয়ারি মাসে। সেনহাটি হাইস্কুলের ধার ঘেঁষে ভৈরব নদ, তার পারে ঠাকুমাকে দাহ করা হলো। ভৈরবের সঙ্গে ঠাকুমার শেষটুকু কেমন মিলেমিশে একাকার হয়ে হারিয়ে গেল। ঠাকুমা কোনো অসুখে মরেনি, বয়সে মরেছে। ৯৪ বছর বয়সে টুক করে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠল না। চলে যাওয়ার দুই দিন আগেও কথা হচ্ছিল। ঠাকুমার সঙ্গে আমি ঠিক তার মতন করেই কথা বলতাম, আদি ভাষায়। যদিও স্কুল আর ইংরেজি সাহিত্য পাঠের কল্যাণে ভদ্রলোকের বাংলা আর চটকদার ইংরেজিও বেশ পারতাম। 

‘ঠাম্মা আমরা ইন্ডিয়া না পাকিস্তান?’   

‘কী বলতিছিস।’   

‘দেশভাগ হবেনে তো, সবাই বলতিছে।’

ঠাকুমা চুপ হয়ে যায়।

বাবাকে ডেকে একটু পর প্রশ্ন করে, ‘এই সুনীল, এগুলো কী কচ্ছে ক দিকিনি?’

বাবা হাত নেড়ে সব উড়িয়ে দেয়। বাবা বিশ্বাস করতে ভালোবাসে, দেশ একটাই থাকবে। জমি ভাগ হয়। কিন্তু দেশ তো শুধু জমি না, দেশ তো আরও অনেক কিছু, মানুষ, পাখি, সময়, প্রেম। এগুলো কি ভাগ হয়? 

সে ফেব্রুয়ারির কথা। ঠাকুমা মরবার দুদিন আগের কথা। বাবা তখন বিশ্বাস করত দেশ একটাই। এপ্রিলে এসে বাবা আর সেলিম কাকা গল্প করে। দেশ ভাঙছে নাকি? বাবা এখন বিশ্বাস করে খুলনা ইন্ডিয়ার ভাগেই পড়বে। সেলিম কাকা সে কথা শুনে শুকনা মুখে ঘোরে। নোয়াখালীর দাঙ্গায় সেলিম কাকার ভাই মরে। সেলিম কাকা কেমন শুকিয়ে যায় ধীরে ধীরে, শুকনা লতার মতন নুয়ে নুয়ে হাঁটে।  

‘আমিও মরব দেখিস ক্যানে, আমিও। নতুন দেশ দেখে যাতি পারব না নে।’ বাবাকে বলে। 

দেশভাগের ৭৫ বছর (১৯৪৭—২০২২)

সেই এপ্রিল থেকে আগস্ট। দেশ স্বাধীন হলো, দেশ ভেঙে নতুন দেশ হলো। প্রথম তিন দিন জানতে পারলাম না, আমরা ইন্ডিয়া নাকি পাকিস্তান? কোনো খবর এসে পৌঁছাচ্ছে না। পানিগাতি, ব্রহ্মগাতি, পথের বাজার থেকে লোকেরা এসে ভিড় করে, ভৈরবের পাড়ে গুনগুন করে, ‘আমরা ইন্ডিয়া নাকি পাকিস্তান?’ কেউ জানে না তখনো। তিন দিন পর, বাবার সব বিশ্বাস ধুলোর মতন বাতাসে হারাল, আমরা জানলাম, আমরা পাকিস্তান। আসলে পাকিস্তানের টুকরা হলাম।  পোকায় কাটা পাকিস্তানের ছেঁড়া টুকরা। কেন হলাম, এই নিয়ে মত-দ্বিমত চলছে, চারপাশে গুনগুন ক্ষোভ। কেউ খুশি, কেউ চিন্তিত, কেউ ভাবছে যে সব বদলে যাবে এবার, নতুন কিছু হবে। বাবাকে দেখলে মনে হয় না তার মন খারাপ। বরং বাবা এখন ভাবছে, ইন্ডিয়া না পাকিস্তান? কোথায় বাস হবে আমাদের? আমার বাবা কোনো আমলা কুতুব না যে সে দেশ ত্যাগ করলে মানচিত্র বদলে যাবে, দেশ মরে যাবে। সে একজন শিক্ষক। ইংরেজি, বাংলা আর সংস্কৃত পড়ায় সেনহাটি স্কুলে। যেখানেই থাকুক বেঁচে থাকার মতন একটা কাজ তার জুটে যাবে। সে নিশ্চিত, স্বাধীন দেশে নাকি তার মতন অভিজ্ঞ শিক্ষকদের কদর বাড়বে।

বাবা আর সেলিম কাকা খুব বন্ধু। তাদের আরেক বন্ধু কামরুল কাকা, কলকাতায় থাকে। বাবার কোনো ভাই নেই। এক বোন, থাকে যশোরে। ছোটবেলা থেকে জেনে এসেছি, বাবার ভাইয়ের মতন দুই বন্ধু হলো সেলিম কাকা আর কামরুল কাকা। ছোট থেকেই আমরা আর সেলিম কাকারা পাশাপাশি থাকি। আমার জন্মের আগেই কামরুল কাকা কলকাতায় চলে গেছে। ঈদের সময়, পুজোর সময় দু–একবার এসেছে। আমরা তিন বছর আগে কলকাতায় গিয়ে ওদের বাড়ি ছিলাম পনেরো দিন। কামরুল কাকার ছেলে হাসান আমার চেয়ে বছর দুয়েকের বড়। খুব ভারিক্কি ভাব। আলগা চাল। শুনেছি কবিতা লেখে, তার লেখা গল্প ছাপা হয় স্কুলের দেয়ালপত্রিকায়। আমি বলেছিলাম, ‘আমিও লিখি।’

হাসান—যাকে সম্মান করে ভাই বলে ডাকি, আশাপূর্ণা দেবীর প্রেম ও প্রয়োজন নামে এক বইয়ে মুখ ডুবিয়ে বসে ছিল।

না তাকিয়েই বলল, ‘কী লেখো?’

‘যা মন চায়, গল্প, কবিতা।’

‘কোনো নির্দিষ্টজনেরা নেই!’ মুখ বাঁকিয়ে একটু হাসলও যেন, বই থেকে মুখ না তুলেই।

তারপর কিছুটা থেমে বলল, ‘লিখতে থাকো, লিখতে লিখতে হবে।’

মনে হলো যেন রবীন্দ্রনাথ। সব জানে। দু–একটা কী লিখে পরামর্শ দিচ্ছে, হামবড়া। কথা আর বাড়েনি আমাদের। তাই কামরুল চাচা বাবার বন্ধু হলেও হাসানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ডালপালা মেলেনি। পাশের বাড়ির সেলিম কাকার মেয়ে সেলিনাবু বরং আমাকে অনেক আদর করে। ওই বাড়িতে পায়েস রান্না হলে তো এ বাড়িতে এক বাটি আসেই। ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি। তারপরও সেলিনাবু বেশি করে পেস্তাবাদাম আর কিশমিশ ছিটিয়ে মিটসেফে আমার জন্য ছোট্ট এক বাটি আলাদা তুলে রাখে। তবে সেলিনাবু তো আমার চেয়ে অনেক বড়। বন্ধু তো নয়।

বাবা, সেলিম কাকা আর কলকাতা থেকে চিঠিপত্রের মাধ্যমে কামরুল কাকা মিলে বেশ আলোচনা করছে কদিন ধরে। এরপর কী হবে, কোথায় যাওয়া হবে। দেশভাগ কেমন, আমি জানি না। তবে বুঝি সব বদলে যাচ্ছে একটু একটু করে। ফরিদপুরে মামার বাড়িতে প্রতিবছর মণ্ডপ সাজিয়ে দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়। এবার হলো না। মামারাও নাকি চলে যাচ্ছে। পুজোতে আমরা বাড়িতেই থাকলাম। পুজোতে এবার নারকেলের সাদা সন্দেশও হলো না। ঠাকুমা নেই, কে তৈরি করবে? মা ষষ্ঠীর দিন তার বিখ্যাত তিলের নাড়ু তৈরি করেছিল, ভেঙে গুঁড়া গুঁড়া হয়ে গেল।

‘ধুরু, এমন তো কখনো হয় না।’ মা করুণ মুখে বসে থাকে।  

আমি আর আমার বোন মাকে খুশি করার জন্য ওই গুঁড়া নাড়ুর টুকরা সোনামুখ করে খাই।  

ভেঙে যাওয়া নাড়ুর মতন, আমাদের পুজোর আনন্দও কেমন ভেঙে গেল। আর পুজোর পর বাবা আমাদের জানাল, নতুন এক ভাঙনের সিদ্ধান্ত। 

‘আমরা কলকাতা যাচ্ছি।’

‘বেড়াতে?’

‘না না, থাকতে।’

‘এক্কেবারে?’

‘হুম এক্কেবারে।’

‘আমরা কই থাকব?’ আমার ছোট বোন অবাক হয়ে জানতে চায়।

‘তোমার কামরুল চাচার বাড়ি। মনে নাই কত সুন্দর বাড়ি?’

কামরুল চাচারা নাকি সেনহাটিতে চলে আসবে পাকাপাকি। আর আমরা যাব কলকাতায়। আমাদের বাড়ি বদল হবে। দেশ বদল হবে। অদলবদল খেলা।

আমার বোনটা কাঁদে, ‘দাদা, ওদের ওই বাড়ি তো ভালো না। কোনো উঠান নাই, ছোট ছোট ঘর।’

আমি বোনকে জড়িয়ে ধরে রাখি। ‘কাঁদে না টেপি কাঁদে না।’ আমাদের বাড়িটা আমার ঠাকুদার তৈরি। সামনে বিশাল উঠান। বরই, কাঁঠাল, পেয়ারা, নারকেল আর আমগাছে ঠাসা। বাড়ির পেছনে শিউলি আর রাধাচূড়ার গাছ। আমরা তার তলে বসে চড়ুইভাতি খেলি। আমার এবার ক্লাস নাইন। এত দিনের বন্ধুদের ছেড়ে, সাইফুল, আমিন, জ্যোতির্ময়, রামপ্রসাদ—সবাইকে ছেড়ে চলে যাব? আমি তো জানতাম এরাই আমার দেশ। আর স্কুল পাস করলে পরে নদীর ওপারে দৌলতপুর হিন্দু একাডেমিতে পড়তে যাব। এমনই তো কথা ছিল।  

সেই কবিগানের দল তৈরি করব না? কৃষ্ণপদদা আর আমি। যশোরে পিসি বাড়ি গেলে দেখা হতো। স্টেশনে বসে ক্লারিনেট বাজাতেন, সাপের মতন তিরতিরে সুর। আমায় ডাকত নীলবাবু। আমি আর কৃষ্ণদা ঠিক করেছিলাম, আমরা একটা কবিগানের দল করব। আমি কবিতা লিখব, আর কৃষ্ণদা গাইবে ক্লারিনেট বাজিয়ে। দেশ–বিদেশ ঘুরব আমরা। বিদেশ তখন ওই ফরিদপুর পর্যন্তই আমাদের। আর সেই কৃষ্ণদা সত্যি চলে গেল আমাকে ফেলে ক্লারিনেট সঙ্গে নিয়ে। সংসারহীন ভবঘুরে কৃষ্ণদা আশ্রয় নিয়েছিল প্রথমে রানাঘাট ক্যাম্পে। সেখান থেকে কিছুদিন আগে তাকে আন্দামানে পাঠিয়ে দিল কারা। ওখানে বসে কি নতুন গানের দল বানাবে কৃষ্ণদা, আমাকে ভুলে যাবে?

হাসানের কথা মনে হয়। এই যে তারও দেশ বদল হবে, সে কি খুশি? নির্লিপ্ত? এখনো গল্প লিখছে? আমি লিখতে বসি। বোনের মতন কাঁদতে পারি না, তাই লিখতে বসি। অনেক লিখি, আগাছা, জঞ্জাল এলোমেলো লেখা। লিখতে লিখতে মনে হয়, আমি অনেক বড় কিছু লিখতে চাই, পাতার পর পাতা, শব্দের ওপর শব্দ। আমার অনেক বলার আছে, কথা জমছে আর ভাঙছে। হাসান হয়তো ঠিকই বলেছিল, লিখতে লিখতেই জানব একদিন, কী লিখতে চাই। হাসানের জন্য আমার আজকাল মায়া হয়। আপন মনে হয়, আমার মতন সে–ও তো এই অদলবদল খেলার পুতুল। 

চারপাশে কত কিছু ঘটে যাচ্ছে। ঘটিবাটি এটা–সেটা বিক্রি করে দিচ্ছে বাবা। সেলিম কাকা, বাবার প্রিয় বন্ধু, দেশভাগের চিন্তায়, দাঙ্গায় ভাই হারিয়ে যে ঝুরঝুর করে নুয়ে পড়ছিল, আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াচ্ছে। এখানেই থাকবে সেলিম কাকা। অনেক কিছু করবে, ব্যবসা, খেত। ফসল ফলবে, ফুল ফুটবে—কত স্বপ্ন। সেলিনাবু উঠানে বসে আগের মতনই চুলে তেল মেখে বেণি তুলছে। আমাকে দেখলে জড়িয়ে চেপে রাখে গায়ের সঙ্গে। ‘তোরা চলে যাবি সুনীল, আমার কান্না পাচ্ছে। তোদের ছাড়া কেমনে থাকব?’

ভারি হিংসা হয় সেলিনাবুকে। আমাদের মতো ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট ওদের নেই। সেলিম কাকার বউ পারভীন কাকি এসে আমাদের গোছানোতে সাহায্য করে। মায়ের সঙ্গে একটু একটু করে ট্রাংকে সব গুছিয়ে সাজায়। মা আর কাকি গুনগুন করে। কাকি বলে, ‘ওই যে দুজন মিলে টাকা জমিয়ে সবুজ বেনারসিটা কিনলাম, ওইটার কী হবে নে?’

মা আর কাকি, মেলাতে কোনো দামি শাড়ি পছন্দ হলে, দুজন মিলে টাকা ভাগ করে সে শাড়ি কিনত। কখনো মা পরত, কখনো কাকি। তারা তো জানেনি কখনো এমন দিন আসবে। দেশভাগের মতো করে, শাড়িটা কেটে তো ভাগ করে ফেলা যায় না। তবে দুজনের আলাপ শুনে মনে হচ্ছে এমনটা করা গেলেই বোধ হয় শান্তি হতো।

কাকি আর মা দুজনের যুক্তিই অকাট্য। কাকি বলে, ‘সামনে সালমার বিয়ে দেব তো। এমন শাড়ি তো আর কিনি দিতে পারব না। জিনিসপত্রের যে দাম বাড়িছে।’

মা তার পাল্টা জবাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ‘দেশটাই ছেড়ে দিচ্ছি বউদি, আমাদের তো কিছুই থাকল না।’

কান পেতে শুনি, চারপাশে লেনদেন, হিসাব–নিকাশ—কত দিতে হবে আর নিতে হবে—তার হিসাব। যত শুনি, ভেতরে ঘূর্ণিঝড়ের মতো লেখার ইচ্ছা দোল খায়। কত কী লিখতে ইচ্ছা করে। ঠাকুমার কথা মনে পড়ে। সে কেমন করে মেনে নিতে এত বিচ্ছেদ? ভালোই হয়েছে মরে গিয়েছে। আমি লিখবার জন্য খাতায় আঁকিবুঁকি করি। নতুন খাতা কিনি, বড় বড় করে নিজের নাম লিখি, সুনীল বন্দ্যোপাধ্যায়। শুরুর লাইনটা হাতড়ে বেড়াই, ঠিক কোথা থেকে শুরু করব?

লিখি, ‘দেশ কেমন মানুষের মতন, জন্ম আছে, মৃত্যুও।’

আমাদের যাওয়ার দিন চলে আসে, মায়ের হাতে দেখি সেই সবুজ বেনারসি। কোন যুক্তির খেলায় শেষ পর্যন্ত মা পারভীন কাকির কাছ থেকে সেই শাড়ি জিতে নিল, কে জানে? নতুন দেশে যাচ্ছে মা সবুজ বেনারসি হাতে, টেপির কোলে ওর কাপড়ের পুতুল। আমার ঠাকুমার কথা মনে হয় বড্ড। ঘরে ফিরে গোলাপি মাছওয়ালা মশারিটা সঙ্গে নিই। চলুক ঠাকুমাও আমাদের সঙ্গে নতুন দেশে। মাঝপথে এসে মনে হয়, এহহে লেখার খাতাটা ফেলে এসেছি ঘরে। থাক।

কলকাতায় আমাদের নতুন ঘর। হাসান ভাইয়ের ফেলে যাওয়া জবুথবু ঘরটা এখন আমার। পড়ার টেবিলে দেখি, একটা খাতা, মলাটে সবুজ কালিতে লেখা, ‘লেখার খাতা—হাসান হক।’

প্রথম পাতায় লেখা আছে শুধু একটি লাইন। ‘দেশ স্বাধীন হলো, আর আমরা দেশ হারালাম।’

আহা সেই প্রথম লাইন। সেই প্রথম লাইনের সঙ্গে আমি জুড়ে দিতে থাকি সব, যা বলবার ছিল, পাতার পর পাতা, ফুলের পর ফুল, জল আর মাটি। আমি লিখে যাই, ‘দেশ স্বাধীন হলো, আর আমরা দেশ হারালাম। সেই গোলাপি মাছের মতন, যে তার জীবনের জল হারিয়ে ঠাঁই পেয়েছিল নীল মশারির জালে...।’