ব্রুকের সঙ্গে আমার প্রথম মোকাবিলার কথা শেষে বলছি। দ্বিতীয় মোকাবিলা হয় ১৯৮৫ সালে, ভারতের ভূপাল শহরে, ‘ভারত ভবন’ নামে খ্যাত বহু-শিল্প কমপ্লেক্স ও জাদুঘরে পরিচালিত এক নাট্য কর্মশালায়। আমি তখন কলকাতায় নান্দিকারের সঙ্গে প্রশিক্ষণ আর প্রযোজনা-নির্মাণসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলাম। এ সময় বাংলাদেশের কৃতী আবৃত্তিকার ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ও নান্দিকারে কর্মরত ছিলেন। একদিন রুদ্রদা (রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত) খবর দিলেন তিনি পিটার ব্রুকের কর্মশালায় অংশগ্রহণের জন্য ভূপাল যাচ্ছেন। যদিও কর্মশালাটিতে কেবল ভারতীয় খ্যাতিমান নাট্যকর্মীরাই আমন্ত্রিত ছিলেন, আমি আর ভাস্বর মনস্থির করলাম, যে করেই হোক আমাদের কর্মশালায় যোগ দিতেই হবে। ভূপাল পৌঁছে দেখি এনএসডির (ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা) বেশ কিছু জ্যেষ্ঠ স্নাতক সেখানে উপস্থিত। আমরা দুজনেই এনএসডি স্নাতক, অতএব কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ সহজেই ঘটে গেল। কর্মশালায় পিটার ব্রুকের বক্তৃতা, আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করি, তিনি অত্যন্ত অমায়িক, কোনো প্রশ্নকে তুচ্ছ জ্ঞান করেন না, বরং যুক্তি দিয়ে নিজের ভাবনা মেলে ধরতে সদা প্রস্তুত। তাঁর যুক্তিগুলো ছিল সব সময় খুব সহজ অথচ ধারালো ও স্পষ্ট। দুষ্টুমি ভরা দুই চোখের তারার অবারিত নাচনে ছিল এক জাদুকরি সক্ষমতা—সব আক্রমণাত্মক প্রশ্ন জল করে দিয়ে আক্রমণকারীর প্রশ্নের ভেতর পাল্টা নতুন প্রশ্ন মেলে ধরতে খুব সহজেই পেরে যেতেন তিনি। তাঁর প্রতিটি কথা কোনো বুদ্ধিজীবীর তাত্ত্বিক ধারণার সূত্র ধরে নয়, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকের স্বতঃসিদ্ধ জ্ঞানের ওপর নয়, বরং এমন এক নাট্যকর্মীর হাতেকলমে কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে নির্মিত ছিল, যিনি নিরন্তর প্রশ্ন তুলে, ভুল করে, অতঃপর কার্যকর পথ খুঁজে পেয়েছেন; জেনেছেন নাট্য নির্মাণের কলাকৌশল। সব সময় তিনি ছিলেন বাহুল্য কর্তনে সজাগ, মৃদুভাষী কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে সৎ ও তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন।

কর্মশালার এক অংশে পিটার ব্রুক তিনজন অভিনেতা নিয়ে একটি ইম্প্রোভাইজেশন নির্মাণ করেন। শূন্য মঞ্চ। প্রথমে এক অভিনেতার উদ্দেশে বললেন, সে তার ইচ্ছেমতো যেকোনো একটি কাজ করতে পারে। অভিনেতা মেঝেতে বসে পড়ে, দুই পা এক পাশে একটু ছড়িয়ে। আমরা দেখলাম, ব্রুক অত্যন্ত ভদ্র ও অমায়িক ভাষায় অভিনেতার মনের সব দুশ্চিন্তা মুছে দিয়ে, শান্ত অথচ দৃঢ়ভাবে তাকে বললেন কল্পিত কোনো এক বস্তুর ওপর সব মনোযোগ নিবদ্ধ করতে। তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অভিনেতার সব বাহুল্য আর ভান ছেঁটে ফেলে, ব্রুক ধীরে ধীরে অভিনেতার মনোযোগ এমন এক নিবিষ্ট পর্যায়ে নিয়ে গেলেন যে দর্শক হিসেবে আমরা পিনপতন নীরবতায় অপেক্ষা করতে থাকলাম, এরপর কী হবে তা দেখার জন্য।

এরপর ব্রুক দ্বিতীয় অভিনেতাকে বললেন, সে যেন প্রথমজনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। এবারও ‘ডানে যাও’, ‘বাঁয়ে যাও’, ‘বসো’ বা ‘দাঁড়াও’ গোছের কোনো নির্দেশনা নয়।

বরং তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অভিনেতার চিন্তা ‘পরিচালনা’ শুরু করে ব্রুক নিবিষ্ট চিত্তে অভিনেতাকে উদ্বুদ্ধ করেন তার মনের গভীরে উৎখননে লিপ্ত হতে। এখানে কোনো চাপ নেই, একেবারে মুক্ত অভিনেতা। একপর্যায়ে দ্বিতীয় অভিনেতা প্রথমজনের সঙ্গে একাগ্র চিত্তে যুক্ত হয়: প্রথমজনের চোখ আদৃশ্য এক বস্তুর ওপর, দ্বিতীয়জনের চোখ প্রথমজনের ওপর। দুজনেই নীরব, কিন্তু কী ভয়ংকর সেই নীরবতা! তারপর ব্রুক তৃতীয় একজন অভিনেতা যুক্ত করেন। এবারও সব ভান ছেঁটে ফেলে কেবল তিন অভিনেতার এক স্থিরচিত্র। একপর্যায়ে প্রথম অভিনেতা চোখ তুলে তাকাল তৃতীয়জনের দিকে। আর আমার মনে হলো, কনস্তান্তিন স্তানিস্লাভস্কি কথিত ‘আস্থা ও সত্য-বোধ’ (বিলিফ অ্যান্ড সেন্স অব ট্রুথ)–এর শুদ্ধতম নির্যাস প্রত্যক্ষ করছি। এই পর্যায়ে ব্রুক তাঁর কাজ শেষ করলেন।

পিটার ব্রুক
জন্ম: ২১ মার্চ ১৯২৫, লন্ডন, ইংল্যান্ড, মৃত্যু: ২ জুলাই ২০২২, প্যারিস, ফ্রান্স আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নাট্য নির্দেশক ও নাট্যবিষয়ক বইয়ের লেখক পিটার ব্রুক। ‘বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত থিয়েটার পরিচালক’ বলা হতো তাঁকে। থিয়েটারে কাজের সূচনা ১৯৫০ দশকে, ১৯৫৪ সালে ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী রয়্যাল শেক্​সপিয়ার কোম্পানিতে কাজে শুরু করেন। এখানে মঞ্চস্থ করেছেন রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েট, মেজার ফর মেজার, দ্য উইন্টারস টেল, মারাট/সাদ প্রভৃতি প্রযোজনা। থিয়েটারের প্রথাগত গণ্ডি ভেঙে জিমনেসিয়াম, খনি, স্কুল ও পুরোনো গ্যাস কারখানা বা বিভিন্ন নির্জন কারখানা—এমন বিচিত্র স্থানে নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। ১৯৭০ সালে তাঁর নির্দেশিত স্ট্রাটফোর্ড প্রযোজনা শেক্​সপিয়ারের আ মিডসামার নাইটস ড্রিম থিয়েটারের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এ বছরই প্যারিসে কাজ করার জন্য যুক্তরাজ্য ছেড়ে যান তিনি। ১৯৭৪ থেকে স্থায়ী হন প্যারিসে। প্রতিষ্ঠা করেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব থিয়েটার রিসার্চ। ১৯৮৫ সালে মহাকাব্য মহাভারত-এর ৯ ঘণ্টাব্যাপী মঞ্চ রূপান্তর করেন। পরে ১৯৮৯ সালে সেটিকে চলচ্চিত্রে রূপ দেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অভিনেতারা একত্র হয়েছিলেন এই মহাযজ্ঞে। লিখেছেন নাটকবিষয়ক একাধিক বই। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দ্য এম্পটি স্পেস (১৯৬৮), রিডিং ফর দ্য প্লট (১৯৮৪), দ্য শিফটিং পয়েন্ট (১৯৮৭), দ্য ওপেন ডোর, (১৯৯৩), টিপ অব দ্য টং (২০১৭)। থিয়েটারের পাশাপাশি চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও নাম–যশ ছিল পিটার ব্রুকের। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন টনি অ্যাওয়ার্ড, এমি অ্যাওয়ার্ড, ইবসেন পুরস্কার, ভারত সরকারের পদ্মশ্রীসহ একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা।

ভূপালের কর্মশালায় আমিসহ কয়েকজন পরিচালক ইম্প্রোভাইজেশন নির্মাণ করার সুযোগ পাই। আমার ইম্প্রোভাইজেশনটি ছিল এক পিতা ও তার পুত্রের ছোট্ট একটি ঘটনার ওপর নির্মিত। গভীর রাতে পিতা অপেক্ষা করে পুত্রের ঘরে ফেরার জন্য। পুত্র ফেরে, দুজন দুজনার দিকে তাকায়, কিন্তু কোনো কথা না বলে পুত্র চলে যায় নিজের ঘরে। এতে কোনো সংলাপ ছিল না; ছিল কেবল কাহারবা তালে ঢোলের বাদন—শুরুতে লয় অতি বিলম্বিত, পুত্রের আগমনের পর লয় বৃদ্ধি পায়, পিতা–পুত্র মুখোমুখি হওয়ার সময় দ্রুত হয় লয়, পরে পুত্র চলে যাওয়ার সময় থেকে লয় আবার কমতে শুরু করে এবং বিলম্বিত মাত্রায় শেষ হয়। এনএসডির অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী আমার এই ইম্প্রোভাইজেশনকে ‘ক্লিশে’ আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করে। আর ব্রুক তাঁর অতি নম্র ভাষায় শুধু বলেন, কাজটিতে প্রশংসনীয় নাট্য মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল।

আমার সঙ্গে পিটার ব্রুকের তৃতীয় মোকাবিলা ছিল গ্লাসগো শহরে, ১৯৮৮ সালের এপ্রিল কি মে মাসে, ৯ ঘণ্টাব্যাপী মহাভারত প্রযোজনাটি দেখার সময়ে। তবে ব্রুকের সঙ্গে আমার এবার সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি। যে রাতে আমি প্রযোজনাটি দেখতে যাই, সে রাতে তিনি উপস্থিত ছিলেন না। মহাভারত উপস্থাপিত হয় গ্লাসগো শহরের ওল্ড ট্রান্সপোর্ট মিউজিয়ামে। এই সময় এটি এক পরিত্যক্ত ভবন ছিল। দর্শক প্রায় তিন দিক ঘিরে কাঠের গ্যালারিতে বসেছিলেন। তাঁদের সামনে ছিল এক বৃহৎ ভূমিসমতল অভিনয় স্থান, যার অধিকাংশই মাটি দিয়ে লেপা। পেছনে একটি উঁচু দেয়াল, পলেস্তারা খসে সারি সারি ইট দৃশ্যমান। দর্শক সারিতে বসে আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, পিটার ব্রুকের পরিচালনা কৌশল বুঝেই ছাড়ব। বলা বাহুল্য, সেই রাতে আমার উদ্দেশ্য সফল হয়নি। আমি ১০ মিনিটের মতো সময় সজ্ঞানে বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম। দেখলাম, ব্রুস মায়ার্স যেন হাসতে হাসতে খেলতে খেলতে গণেশরূপে অভিনয় শুরু করলেন একটি ছেলের সঙ্গে। কষ্টসাধ্য কিছু না। খুব ‘সহজে’ যেন, অনায়াসে সুতার পর সুতা গেঁথে এক অনির্বচনীয় বস্ত্রখণ্ড বুনন করছিলেন অভিনেতাবৃন্দ। রিসইয়ার্ড চিসল্যাক ছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের ভূমিকায়, মল্লিকা সারাভাই দ্রৌপদি, ইয়শি ওইডা দ্রোণরূপে। একেবারে ডুবে গিয়েছিলাম ব্রুকের মহাভারত-এর কল্পিত ভুবনে। আমার ‘জ্ঞান’ ফেরে প্রযোজনার শেষে। তখন সকাল ছয়টার কিছু পর। গ্লাসগো শহরের প্রায় ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হেঁটে ট্রেন স্টেশনে যাওয়ার পথে দেখি দূরে ব্রুস মায়ার্স, মল্লিকা সারাভাই আর কয়েকজন অভিনেতা হাসতে হাসতে তাঁদের হোটেলে ফিরে যাচ্ছেন। কোনো এক অদ্ভুত কারণে এই দৃশ্য দেখে আমার মনে হয়েছিল, আমি যেন ইংমার বার্গম্যান পরিচালিত দ্য সেভেন্থ সিল চলচ্চিত্রের অন্তিম দৃশ্যের ‘ডান্স মাকাব্রা’ দেখছি, যে নৃত্যে মৃত্যুর জয়যাত্রা নয়, জীবনের উৎসব উদ্​যাপিত হয়।

পিটার ব্রুকের মহাভারত সমূলে প্রত্যাখ্যান করে, এক উত্তর-উপনিবেশবাদী ও জাতীয়তাবাদী ক্রোধ দ্বারা তাড়িত হয়ে থিয়েটার অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড (১৯৯০) গ্রন্থে রুস্তম ভারুচা অভিযোগ করেন, প্রযোজনাটি কেবল ভারতীয় সংস্কৃতিকে চরমভাবে তুচ্ছ করে তা-ই নয়; বরং একই সঙ্গে এটি হিন্দু দর্শনকে মামুলি বক্তব্যে পর্যবসিত করে এবং ভারতীয় সংস্কৃতি নির্লজ্জভাবে আত্মসাৎ করে (পৃ. ৪, ৬৯)। বর্তমানে ভারতে গেরুয়া বসনধারী উগ্র জাতীয়তাবাদীরা ভারুচার মতে আত্মতুষ্টি লাভ করতে পারেন বটে, কিন্তু এই মত ভুলে যায় যে ব্রুকের আগে রামানন্দ সাগর পরিচালিত টিভি সিরিয়াল রামায়ণ (১৯৮৭-৮৮) ছিল ভারতীয় সংস্কৃতির উত্তুঙ্গ উদাহরণ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ২০২২ সালের ৬ জুলাই প্রকাশিত এক নিবন্ধ স্বীকার করে যে পিটার ব্রুকের মহাভারত ভারতীয় মহাকাব্যের প্রতি ভারতীয়দের ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করেছে।

পিটার ব্রুকের সঙ্গে আমার প্রথম মোকাবিলা ঘটে ১৯৮২ সালে, দিল্লিতে, দ্য এম্পটি স্পেস বইটি আমি যখন কিনতে সমর্থ হই তখন। হালকা-পাতলা বই, ভাষা একেবারেই ব্রুকের নিজস্ব সেই সহজ রূপ। এটি আমি এখনো পাঠ করি, প্রায়শই। বইটির প্রথম বাক্য দুটি অতি পরিচিত—আমি যেকোনো শূন্য আয়তন গ্রহণ করে দাবি করতে পারি, এটি একটি শূন্য মঞ্চ। একজন মানুষ এই শূন্য আয়তন পার হয়, যখন অন্য একজন তাঁকে প্রত্যক্ষ করে এবং একটি নাট্যক্রিয়াব্যাপৃত হতে কেবল এতটুকুই প্রয়োজন। এই বইয়ের একেবারে শেষে ব্রুক তাঁর প্রাঞ্জল-সহজ ভাষায় নাট্য প্রযোজনার সঙ্গে জীবনের সম্মিলন-ক্ষেত্র খুঁজেছেন। তিনি বলেন:

আমাদের রোজকার জীবনে, ‘যদি’র মানে কল্পনা, কিন্তু থিয়েটারে ‘যদি’ হলো পরখ করে দেখা। রোজকার জীবনে ‘যদি’ হলো ফাঁকি, কিন্তু থিয়েটারে ‘যদি’ সত্য। আর আমরা যখন সেই সত্যকে বিশ্বাস করি, সেখানে জীবন আর থিয়েটার মিলেমিশে এক।

তবে এই মিলমিশের ব্যাপারটা খুব সহজ নয়। অনেকক্ষেত্রেই উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেন।

default-image

নাটকের জন্য খুব পরিশ্রমী হতে হয়। কিন্তু আমাদের মতন যাঁদের কাজটাই নাটক নিয়ে, তাঁদের কাছে নাটককে আর ঠিক কেজো ঠেকে না। নাটক হলো খেলা, নাটক হলো নাটক।

আমি, সৈয়দ জামিল আহমেদ, জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই পার হয়ে, অনেক পথ ঘুরে ব্রুকের শূন্য আয়তনে ফিরেছি বিস্ময়কর সবকিছু নাট্য প্রযোজনায়। উপলব্ধি করেছি আবার, যাপিত জীবনের সত্য আর নাট্য ভুবনের সত্য কখন কীভাবে এক হয়ে যায়, স্রেফ খেলাচ্ছলে। আজ বিস্ময়কর নাট্যপরিচালক পিটার ব্রুক যখন ‘জীবন’ ধারণাটি আর সশরীর ধারণ করেন না, তখন তাঁর মহাভারত মূর্ত হয় পুনর্বার: বনপর্বে সরোবর তীরে যুধিষ্ঠিরকে ধর্ম যখন প্রশ্ন করেন, পৃথিবীতে সর্বপ্রধান বিস্ময় কী, যুধিষ্ঠির উত্তরে বলেন, প্রতিদিন মৃত্যু আঘাত হানে, অথচ আমরা অমরত্বের ভ্রমে জীবনযাপন করি। এটাই সর্বপ্রধান বিস্ময়।

পিটার ব্রুকের প্রতি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রণতি জানিয়ে স্বীকার করি, নাট্য বিষয়ে আমার চিন্তা, কর্ম আর শিক্ষাদানের ভিত্তিভূমি বলে যদি কিছু থাকে, তার এক বড় অংশজুড়ে রয়েছেন তিনি। দুই চোখে দুষ্টামি ভরা তারার নিরন্তর নাচনে অন্তর্যামীর অবারিত উৎখনন এখন ক্ষান্ত হয়েছে। কিন্তু ব্রুকের মৃত্যু অশ্রুসিক্ত শোক পালনের ক্ষণ নয়।

প্রতিদিনের শত শত মৃত্যুর মুখেও আমরা যে অমরত্বের আস্থা নিয়ে বেঁচে থাকি, যে ভোঁতা বোধ প্রতিনিয়ত আমাদের ‘হাত রাখে হাতে’, সেই হাত ঝেড়ে ফেলে, কুরোসাওয়া পরিচালিত ড্রিমস চলচিত্রের অষ্টম অনুকাহিনিতে উপস্থাপিত শতবর্ষী বৃদ্ধার শেষকৃত্য মিছিল তুল্য অপর এক মিছিলে যোগ দিতে পারি পিটার ব্রুকের উদ্দেশে শোক জ্ঞাপনের জন্য নয়, বরং আনন্দময় উৎসব উদ্​যাপনের জন্য, তাঁকে প্রণতি জ্ঞাপনের জন্য, যে তিনি সহজ-শূন্যতা অবলম্বন করে, জীবন আর কল্পলোক একাকার করে, আমাদের বিস্মিত করেছেন বারংবার—জীবনের আদৃশ্য সত্যকে মনে আর প্রাণে দগদগে জলছাপ রূপে এঁকে দিয়ে।

আপনার চোখের তারার অন্তহীন নাচনে অন্তর্যামীর অবারিত উৎখনন আমার উড়াল দেওয়ার পথে সহায় হোক, পিটার!

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন