default-image

এই সময়ের কোনো কবি যদি গত দু-এক বছরের মধ্যে লিখতেন ‘এপ্রিল একটি নিষ্ঠুরতম মাস’, তবে কেউই খুব একটা অবাক হতেন না। কারণ, এপ্রিলকে নিষ্ঠুর মাস মনে করার যথেষ্ট কারণ এই দুই বছরে ঘটেছে। এত মৃত্যু, এত অশ্রু ও হাহাকার, এত বিপদ আর কোনো বছরের এপ্রিলে ঘটেছিল কি না, পৃথিবীবাসীর জানা নেই। কিন্তু আজ থেকে নিরানব্বই বছর আগে পৃথিবীতে কী এমন ঘটেছিল যে টি এস এলিয়টকে লিখতে হয়েছিল ‘এপ্রিল একটি নিষ্ঠুরতম মাস’? তখনো কি জরা-ব্যাধি ও মহামারির নিষ্ঠুরতা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল জগৎ?

বিশ্ববরেণ্য ইংরেজ কবি টি এস এলিয়ট ১৯২২ সালে লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতাটি। প্রকাশের পরপরই আলোচিত হওয়া সেই কবিতার প্রথম লাইন ছিল ‘এপ্রিল একটি নিষ্ঠুরতম মাস (এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মান্থ)’। লাইনটি আজও আগের মতোই জনপ্রিয় এবং কিংবদন্তি হয়ে আছে। কিন্তু কেন এবং কোন পরিপ্রেক্ষিতে এলিয়ট এমন পঙ্​ক্তি রচনা করেছিলেন, তা নিয়ে আছে বিতর্ক।

কেউ কেউ বলছেন, কবিতাটির প্রথম কয়েকটি লাইনেই যেহেতু বসন্তের আগমন, ঠান্ডাজনিত রোগব্যাধি, পল্লবশূন্য বৃক্ষ, বৃষ্টি, রোদ ইত্যাদির উল্লেখ রয়েছে, সেহেতু এলিয়ট এই লাইনের মাধ্যমে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতাকেই বুঝিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

এলিয়ট বোঝাতে চেয়েছেন যে এপ্রিল আমাদের বসন্তের আগমনী গান শোনায় কিন্তু সত্যিকারের বসন্ত এনে দেয় না। এই সময় মানুষেরা ঠান্ডার রোগে ভোগে, গাছেরা পাতা হারায়। কোনো ছায়া থাকে না। সূর্য উত্তপ্ত দাঁত দিয়ে কামড় বসায় সারাক্ষণ। মাঝেমধ্যেই বৃষ্টি হয় আর ঠান্ডায় কাবু হয়ে যায় মানুষ। এহেন মাসকে নিষ্ঠুরতম মাস ছাড়া আর কী–ই বা বলা যায়?

তবে সাদাচোখে দেখা এই ব্যাখ্যা মানেননি মার্কিন লেখক ও ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক রবার্ট ল্যাংবাম। সেই ১৯৭৭ সালের ১৭ এপ্রিল নিউইয়র্ক টাইমস–এর এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, এলিয়টের মৃত্যুর তিন বছর পর (১৯৬৮ সাল) নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে জন কুইন্স নামের নথিপত্রের সঙ্গে টি এস এলিয়টের দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর একটি কপি পাওয়া যায়। যদিও কপিটি প্রথম সংস্করণ নয়।

এরপর রবার্ট ল্যাংবাম লিখেছেন, ওই কপির একটি অনুরূপ প্রতিলিপি (ফেসিমিল এডিশন) ১৯৭১-এ প্রকাশ করেন এলিয়টের দ্বিতীয় স্ত্রী ভ্যালেরি এলিয়ট। সঙ্গে একটি ভূমিকাও জুড়ে দেন তিনি। ভূমিকায় ভ্যালেরি লিখেছেন, টি এস এলিয়টের প্রথম স্ত্রী ছিলেন ভিভিয়েন হাই-উড। ভিভিয়েনকে তিনি বিয়ে করেছিলেন ১৯১৫-তে। কিন্তু তাঁদের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। তাঁদের দাম্পত্য-তিক্ততা এতটাই মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে এলিয়টকে সে সময় লসানের একটি মানসিক চিকিৎসালয়ে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। অসুস্থতার ওই সময় প্রায়ই ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়তেন এলিয়ট। তখন তাঁর মধ্যে কবিতা ভর করত। যেন অলৌকিক ইশারায় মাথায় একের পর এক কবিতার লাইন আসতে থাকত। ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কবিতাটি সেই সময়েরই লেখা।

এই তথ্য-উপাত্তের নিরিখে রবার্ট ল্যাংবাম মন্তব্য করেছেন, প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা নয়, বরং ব্যক্তিজীবনের নিষ্ঠুরতাই এলিয়টকে বাধ্য করেছিল এই কালজয়ী পঙ্​ক্তি লিখতে।

টি এস এলিয়ট যেহেতু নিজে থেকে লাইনটির ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা দেননি, তাই এ বিতর্কের সুরাহাও হয়নি আজ অবধি। এলিয়ট মারা গেছেন ১৯৬৫-এর ৪ জানুয়ারি। আর কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। তাঁর মৃত্যুর ছয় বছর পর দ্বিতীয় স্ত্রী ভ্যালেরি যখন নতুন করে দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড প্রকাশ করেন, তখন থেকে আবার আলোচনা শুরু হয় কবিতাটি নিয়ে। সেটি এখনো অব্যাহত রয়েছে। কবি ও সমালোচকেরা নতুন চোখে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। উদ্​ঘাটিত হচ্ছে নতুন নতুন নানা তথ্য। যেমন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোবাসী তরুণ লেখক স্কটি হ্যান্ডরিকস ২০১৮ সালে এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ লেখার সময় এলিয়টের জীবন ছিল অত্যন্ত বিশৃঙ্খল, প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে, স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হয়ে বাস করছেন হাসপাতালে, এমন এক নিদারুণ সময়ে খ্যাতিমান দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলও তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করেছিলেন। সব মিলিয়ে সময়ই তাঁকে ‘এপ্রিল একটি নিষ্ঠুরতম মাস’ লেখার দিকে ধাবিত করেছিল।

যে কারণেই লেখা হোক না কেন, লাইনটি আজও বিশ্বসাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় কীর্তি হয়ে আছে। এ এমনই এক কবিতা, যা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতি, ক্ষয়, হতাশা এবং যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর বিশৃঙ্খলাকে উন্মোচিত করে।

এলিয়টের জীবনে এপ্রিল সত্যিই নিষ্ঠুরতম মাস ছিল কি না, জানা যায় না। তবে আমাদের জীবনে এপ্রিল যে নিষ্ঠুরের চেয়েও নিষ্ঠুর, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এলিয়টের ওই অমর পঙ্​ক্তি সে কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, বিগ থিঙ্ক, ইন্টারেস্টিং লিটারেচার ও ই-নোটস।

বিজ্ঞাপন
অন্যান্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন