১৮৩০-এর দশকের শেষ ও ’৪০-এর দশকের শুরুর দিকে মধুসূদন কলকাতার হিন্দু কলেজের ছাত্র ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটির নামের ‘হিন্দু’ অংশটি ছাত্রদের ধর্মীয় পরিচয় বোঝাত কেবল, কোনো অনুষদ কিংবা পাঠ্যসূচি নয়। এটির বিভাগগুলো ও পাঠ্যসূচি ছিল নিখাদ পাশ্চাত্যমুখী, যা ছিল ভারতে দ্রুত ঢুকে পড়া প্রভাবশালী সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ধারার একটি। হিন্দু কলেজের ছাত্রদের সবাই ছিল হিন্দুধর্মাবলম্বী। মধুসূদন যখন ১৮৪৩ সালের প্রথম দিকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন, একজন সাধারণ খ্রিষ্টান যুবক হিসেবে তাঁকে হিন্দু কলেজ থেকে নাম কাটিয়ে অবশেষে বিশপ কলেজ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করতে হয়, ভবিষ্যৎ খ্রিষ্টান মিশনারিদের সেই শিক্ষাশ্রমে তিনি হয়ে পড়েন এক আনাড়ি শিক্ষার্থী।
মাইকেলের ওপর গোলাম মুরশিদের চমৎকার গবেষণালব্ধ গ্রন্থ আশার ছলনে ভুলি থেকে আমরা জানতে পারি, এ সময়ে তাঁর নাম ছিল কেবলই মধুসূদন। বইতে সংযুক্ত ১৮৪৩ সালের ব্যাপটিস্ট রেজিস্টার ও ১৮৪৪ সালের বিশপ কলেজের তৈরি প্রগ্রেস রিপোর্টের ছবিতে দেখা যায়, তাঁর নাম ছিল কেবল মধুসূদন। মাইকেল নামটি তখনো যুক্ত হয়নি। এই দুটি ছবি আমাদের কাছে এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ যে সে সময় পর্যন্ত তাঁর নাম পরিবর্তন করা হয়নি। তখনো যে তিনি নিজেকে কেবল ‘মধুসূদন’ বলতেন, তার আরেকটা প্রমাণ পাওয়া যায় গৌরদাস বসাকের কাছে লেখা তাঁর একটি চিঠির শেষে পুনশ্চ অংশে। চিঠিটির তারিখ কিছুটা অনিশ্চিত। জীবনীটির পরিশিষ্ট ও সংযুক্তিতে এক বিদ্রোহী কবির হৃদয়: মাইকেল মধুসূদন দত্তের পত্রাবলি নামের একটা সম্পাদিত খণ্ডে গোলাম মুরশিদ আনুমানিকভাবে চিঠিটির সাল উল্লেখ করেছেন ১৮৪৩ বা ১৮৪৪ বলে। যে বছরই হোক না কেন, চিঠিখানা ১৮৪৩ সালে তাঁর ধর্মান্তরিত হওয়ার পরেই লেখা হবে। কারণ, বর্ধিতাংশে লেখা ছিল, ‘পুনশ্চ: চিঠির পেছনে তুমি যে লেখ—“জি. ডি. বি. হইতে খ্রিষ্টান এম. এস. দত্তের প্রতি,” এইটি আমার পছন্দ নয়।’
১৮৪৩ সালের ব্যাপটিস্ট রেজিস্টার ও ১৮৪৪ সালের বিশপ কলেজের তৈরি প্রগ্রেস রিপোর্টের ছবিতে দেখা যায়, তাঁর নাম ছিল কেবল মধুসূদন। মাইকেল নামটি তখনো যুক্ত হয়নি। এই দুটি ছবি আমাদের কাছে এ পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ যে সে সময় পর্যন্ত তাঁর নাম পরিবর্তন করা হয়নি।
এই চিঠির পাণ্ডুলিপিটি যে এখনো আছে, কিংবা গোলাম মুরশিদ যে মূল চিঠিখানা দেখতে পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ আছে আমার। তাঁর সম্পাদিত চিঠিপত্রের প্রাপ্তি স্বীকার অংশে এবং বইটির প্রথম অধ্যায়ে অধ্যাপক রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্তকে তাঁর সাহায্য ও বদান্যতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি, ‘তিনি অর্ধশতাব্দী ধরে পঁয়ত্রিশখানা মূল চিঠি যে কেবল সংরক্ষণ করেছেন তা-ই নয়, খুব উদারভাবে সেগুলো ব্যবহার করতেও দিয়েছেন আমাকে। চিঠিগুলো যখন পড়ি আমি, তখন বুঝতে পারি, আগেকার সম্পাদকদের সম্পাদিত চিঠিপত্রের সংকলনগুলোতে ভুলের মাত্রা কতখানি।’ এই পঁয়ত্রিশটি চিঠি প্রায় ১৮৬০-এর দশক থেকে পরবর্তী সময়ের, যা শুরু হয়েছে মাইকেল ইউরোপবাসের সময়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে অর্থ সাহায্য চেয়ে যখন চিঠি লিখতেন, সেই সময় থেকে। মধুসূদনের ১৮৪০-এর দশকের চিঠিগুলো আমরা প্রাথমিকভাবে পাই ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত যোগীন্দ্রনাথ বসুর লেখা মূল জীবনীগ্রন্থ মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনচরিত থেকে। এটিতে সীমিতসংখ্যক কিছু চিঠি ছিল, একই জীবনীগ্রন্থের পরবর্তী সংস্করণে আরও কিছু বাড়তি চিঠি যুক্ত হয়। এ ছাড়া আমাদের সামনে আরও রয়েছে ড. ক্ষেত্র গুপ্ত সম্পাদিত মাইকেলের রচনাসমগ্র মধুসূদন রচনাবলীর সাহিত্য সংসদ সংস্করণ। এ প্রতিষ্ঠানের আগেকার সংস্করণে মাইকেলের কোনো চিঠি অন্তর্ভুক্ত ছিল না, সংশোধিত সংস্করণগুলোর দ্বিতীয়টি থেকে চিঠিপত্র যুক্ত হতে শুরু করে। এভাবে ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত চতুর্থ সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল মোট ১৪৮ খানা চিঠি। গোলাম মুরশিদের দ্য হার্ট অব আ রিবেল পোয়েট বইতে রয়েছে মাইকেলের ১৫৫টি চিঠি।
গোলাম মুরশিদের ভাষ্যে, উল্লেখিত চিঠির পুনশ্চ অংশে যা লেখা, সেটি মূলত ক্ষেত্র গুপ্ত সম্পাদিত দুই খণ্ডে যেমন পাওয়া যায়, তার অনুরূপ। ক্ষেত্র গুপ্ত সম্পাদিত সংস্করণের সেই চিঠিতে ‘তিন’, ‘ষোলো’ ও ‘আট’ সংখ্যাগুলো অঙ্কে লেখা। অন্যদিকে গোলাম মুরশিদের বইয়ে ‘তিন’ ও ‘আট’ কথায় লেখা হলেও ‘ষোলো’ শব্দটি অঙ্কে লেখা। ক্ষেত্র গুপ্তের প্রকাশনায় পুনশ্চ অংশে ‘এইটি আমার পছন্দ নয়’ বাক্যটি বাঁকা হরফে দেওয়া, বোঝা যায়, বিষয়টির ওপর জোর দেওয়ার জন্য মধুসূদন এটির নিচে রেখা এঁকে দিয়েছিলেন। গোলাম মুরশিদের বইতে এই শব্দগুলোকে রোমান হরফে রেখে দেওয়া হয়েছে। এক পাদটীকায় ক্ষেত্র গুপ্ত উল্লেখ করেছেন, এই চিঠি ও পরেরটি লেখা হয়েছিল ১৮৪৩-৪৫ সালের মধ্যে। আগেও যেমন বলা হয়েছে, ১৮৪৩ কিংবা ১৮৪৪ সালে এই চিঠি লেখা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন গোলাম মুরশিদ এবং পাদটীকায় বলেছেন, এটির সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা কঠিন। তবে সেখানে এটা তিনি উল্লেখ করেননি, মূল চিঠিখানা তিনি দেখেছিলেন, নাকি মধুসূদনের পত্রাবলির আগে প্রকাশিত কোনো সংস্করণ থেকে নিয়েছেন। ‘তিন’ ও ‘আট’ সংখ্যা দুটি কথায় লেখা এবং ‘এইটি আমার পছন্দ নয়’ বাক্যটিকে বাঁকা হরফে কিংবা নিম্নরেখাঙ্কিত করে না দেওয়ায় এ কথা ধরে নেওয়া যায় যে গোলাম মুরশিদ মূল চিঠিখানি দেখেছেন এবং ক্ষেত্র গুপ্তের সংকলনের ভুলগুলো সংশোধন করে নিয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্তের সমর্থনে গোলাম মুরশিদের বইতে যেহেতু কোনো পাদটীকা নেই এবং আগেও উল্লেখ করেছি, আমার সন্দেহ, এই চিঠির পাণ্ডুলিপিটি এখনো রয়েছে কি না।
মধুসূদন ছিলেন খাঁটি ও সহজভাবে মধুসূদন। সুতরাং এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রমাণ নেই যে মধুসূদন ‘মাইকেল’ নামটি ধারণ করেছিলেন, অন্তত এই চিঠির তারিখ থেকে পরবর্তী প্রায় তিন বছর কিংবা তাঁর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পাঁচ বছর পর অন্তত ১৮৪৭ সালের শেষ পর্যন্ত ‘মাইকেল’ তাঁর নামের অংশ ছিল না।
বিশেষ আগ্রহের বিষয় হচ্ছে ‘বিশপ কলেজ, ২৭ জানুয়ারি, ১৮৪৫’ তারিখের এক চিঠির পাদটীকা। এ চিঠির পাদটীকায় আগের একটি চিঠির কথা উল্লেখ রয়েছে এভাবে, ‘আগের এক চিঠিতেও গৌরদাস বসাক দত্তকে সম্বোধন করেন ‘খ্রিষ্টান এম. এম. দত্ত’ বলে।’ প্রথমত. পুনশ্চ–সংবলিত চিঠিখানি, অর্থাৎ জানুয়ারি ১৮৪৫ তারিখের চিঠিতে মধুসূদন উল্লেখ করেননি গৌরদাস বসাক তাঁকে কীভাবে সম্বোধন করেছেন। কেবল তিনি চেয়েছেন তাঁকে যেন ‘এম. দত্ত মহাশয় কিংবা বাবু’ বলে উল্লেখ করা হয়। দ্বিতীয়ত. আরও গুরুত্বপূর্ণ যে স্বয়ং মধুসূদনের মতে গৌরদাস বসাক তাঁর বন্ধুকে ‘এম. এম. দত্ত’ বলে সম্বোধন করেননি, ওপরে উদ্ধৃত পুনশ্চতে আমরা দেখি, তাঁকে ‘এম. এস. দত্ত’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। এখানে সংক্ষিপ্ত এম. এস. হচ্ছে দুভাগ করা মধুসূদন—মধু ও সূদন। মধুসূদন ছিলেন খাঁটি ও সহজভাবে মধুসূদন। সুতরাং এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের প্রমাণ নেই যে মধুসূদন ‘মাইকেল’ নামটি ধারণ করেছিলেন, অন্তত এই চিঠির তারিখ থেকে পরবর্তী প্রায় তিন বছর কিংবা তাঁর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পাঁচ বছর পর অন্তত ১৮৪৭ সালের শেষ পর্যন্ত ‘মাইকেল’ তাঁর নামের অংশ ছিল না।
‘মাইকেল’ নামটি যে ১৮৪৭-এর আগে আসেনি, এ সিদ্ধান্তকে দৃঢ়তর করার জন্য আরও প্রমাণ মেলে মধুসূদনের প্রথমদিকের চিঠিগুলোতে পাওয়া স্বাক্ষরে। তাঁর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করার পর অক্টোবর ১৮৪১ থেকে মে ১৮৪৭ পর্যন্ত বিস্তৃত দীর্ঘ সময়ে গোলাম মুরশিদের বইতে আমরা কেবল চারটি জায়গায় তাঁর স্বাক্ষর পাই (এই চারটির মধ্যে দুটি পাওয়া যায় একই চিঠিতে, একটি মূল চিঠির পর, আরেকটি পুনশ্চের পর)। যোগীন্দ্রনাথ বসুর লেখা জীবনীগ্রন্থে এ সময়ের সাতটি চিঠি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার সব কটিই পাওয়া যায় গোলাম মুরশিদের বইতেও। তবে যোগীন্দ্রনাথের বইয়ের সাতটির মধ্যে ছয়টিতে স্বাক্ষর পাওয়া যায় ‘এম. এস. দত্ত’ কিংবা ‘এম. এস. ডি’। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর কেবল একটি চিঠির শেষে স্বাক্ষরে পাওয়া যায় ‘এম. এস. ডি.’। এই চিঠি যদিও তারিখবিহীন। ক্ষেত্র গুপ্তর মতে, এটির তারিখ ১৮৪৩ সালেরই হওয়া উচিত, গোলাম মুরশিদও একই সালের বিষয়ে একমত। এই ‘এম. এস. ডি.’ আদ্যক্ষরের স্বাক্ষর যৌক্তিকভাবে বোঝায় ‘মধু সূদন দত্ত’, ‘মাইকেল মধু সূদন দত্ত’ কিংবা ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ নয়। ‘মাইকেল’ নামটির অনুপস্থিতি এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট।
বিভ্রান্তিটা এখানে শেষ হওয়া উচিত ছিল—মধুসূদন ১৮৪৭ সালের শেষের এ সময় পর্যন্ত মধুসূদনই ছিলেন (মাইকেল মধুসূদন নন)। কিন্তু বিষয়টা আরও জটিল হয়ে ওঠে গোপা মজুমদারের করা গোলাম মুরশিদের লেখা জীবনীগ্রন্থটির অনুবাদ লিউর্ড বাই হোপ: আ বায়োগ্রাফি অব মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রকাশিত হওয়ার পর। কারণ, গোলাম মুরশিদের ভুল পাদটীকার সূত্র ধরে অনুবাদক নিজে থেকেই লেখেন—
‘গৌর ভুলতে পারেননি যে মধুসূদন এখন মাইকেল হয়ে গেছেন। তিনি বন্ধুকে এক নতুন কায়দায় ডাকতে শুরু করেন। এক চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘প্রিয় খ্রিষ্টান বন্ধু মাইকেল মধুসূদন দত্ত।’ আহত মধু তার জবাবে লিখলেন, ‘চিঠির পেছনে তুমি যে লেখ—‘জি. ডি. বি.র কাছ হইতে খ্রিষ্টান এম. এম. [বানান অপরিবর্তিত] দত্তের প্রতি,’ এইটি আমার পছন্দ নয়।’
মধুসূদন ১৮৪৩ সালে তাঁর ধর্মান্তরের সময় যে মাইকেল হননি, সেটা গোলাম মুরশিদের ভুল, অনুবাদকের নয়। তাঁর এই ভুল শব্দ ব্যবহারেও ‘প্রিয় বন্ধু মাইকেল মধুসূদন দত্ত,’ এটি কোনো চিঠিতে পাওয়া যায় না। তবে পুনশ্চ অংশটির ভুল উদ্ধৃতি—‘“জি. ডি. বি.র কাছ হইতে খ্রিষ্টান এম. এম. [বানান অপরিবর্তিত] দত্তের প্রতি,” এইটি আমার পছন্দ নয়,’ গোলাম মুরশিদের লেখা মূল জীবনীর কোথাও নেই, এটি যুক্ত করেছেন অনুবাদক নিজেই। এটি হবে এম. এস. দত্ত, এম. এম. দত্ত নয়। পাছে দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রান্তি ঘটে, আরও একবার বলি—মধুসূদন খ্রিষ্টধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার পরই মাইকেল হয়ে যাননি, মধুসূদনই ছিলেন, ধর্মান্তরের কাগজপত্র অনুযায়ী যার বানান ছিল ‘Modoosoodun’।
খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হলেও তিনি মূলত ছিলেন হিন্দু কলেজের একই ব্যক্তি। নিজ পরিবার ও সমসাময়িক লোকজনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অটুট। অন্যদিকে ১৮৪৭ সালের শেষ দিকে এম. এম. কিংবা এম. এম. এস. হওয়ার জন্য বাংলা ছেড়ে মাদ্রাজে চলে আসার পর তিনি পরিণত হয়েছিলেন পুরোপুরি অন্য মানুষে।
১৮৪৭ সালের শেষ দিকে মধুসূদন কলকাতা থেকে দক্ষিণ অভিমুখে ছেড়ে যাওয়া মাদ্রাজগামী একটা জাহাজে চড়ে বসেন উদ্দেশ্যহীনভাবে। সেই জাহাজের জন্য যথার্থ নাম ছিল ভারতে ব্রিটিশ সেনা অফিসার স্যার রবার্ট সেইলের স্ত্রীর নামে লেডি সেইল। সেই দশকে এই কর্মকর্তার নিজের নামেও বার্মায় নির্মিত একটা জাহাজ ছিল। মাদ্রাজ অভিমুখে যাত্রা করা লেডি সেইল নামের এই জাহাজের সূত্রে আমরা মধুসূদনের নাম পরিবর্তনের প্রথম অকাট্য প্রমাণ পাই, আবারও সেটি উদ্ঘাটিত হয় গোলাম মুরশিদের বিচক্ষণ গবেষণার মাধ্যমে। মাদ্রাজ থেকে প্রকাশিত সাময়িকী অ্যাথেনিয়াম–এ ‘আগমন ও নির্গমন’ শিরোনামের বিভাগে একজন আগত যাত্রীর নাম পাওয়া যায় ‘বিশপ কলেজের এম. এম. ডাট’। দুই দিন পর ২০ জানুয়ারি ১৮৪৮ তারিখের অন্য একটি প্রকাশনায় ‘এন. এন. ডাট’ নামটি আবারও পাওয়া যায়, এটিও ‘বিশপ কলেজের’। ‘এন. এন.’ ও ‘এম. এম.’ দুজনই নিঃসন্দেহে ছিলেন একই ব্যক্তি। জাহাজের লগবইতে শুদ্ধ ও ভুলভাবে লেখা এই নামই মধুসূদন থেকে মাইকেল মধুসূদন হওয়ার প্রথম প্রমাণ। নামের এই পরিবর্তন যাত্রার জন্য করা হয়েছিল কি না, সেটি জানা যায়নি।
তাঁর মাদ্রাজে (বর্তমানে চেন্নাই) আসার ছয় মাসের অল্প কিছুদিন পর কোনো আদ্যক্ষর ছাড়াই পুরো চার শব্দের বানানের জনৈক মাইকেল মুদি [মধু] সাউদেন [সূদন] দত্ত বিয়ে করেন রেবেকা টমসন ম্যাকটাভিশকে। এবার নিশ্চিতভাবে মধুসূদন হয়ে পড়েন ‘মাইকেল মধুসূদন ডাট’। মাইকেলের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় মাদ্রাজের এক সাময়িকীতে টিমোথি পেনপোয়েম ছদ্মনামে। অবশ্য ১৮৪৯ সালের মার্চে যখন তাঁর প্রথম বই দ্য ক্যাপটিভ লেডি প্রকাশিত হয়। সেটির প্রচ্ছদে লেখকের নাম ছাপা হয়েছিল ‘এম. এম. এস. ডাট’। বাকি জীবন ‘মাইকেল মধু সূদন’ কিংবা বিষ্ণুর ডাকনামকে একত্র করে একশব্দে মাইকেল মধুসূদন রয়ে গিয়েছিলেন মাইকেল।
আমরা যদি নামের গুরুত্ব উপেক্ষা করার জন্য শেক্সপিয়ারের কাব্যিক আহ্বান রোমিও জুলিয়েটের গোলাপ–সম্পর্কিত মন্তব্য, ‘গোলাপকে যে নামেই ডাকো, সে তার মিষ্টি সুগন্ধ বিলোবেই’—মেনে নিই, তাহলে মাইকেলের নাম এবং নিজের পুনর্নামকরণের প্রতীকি গুরুত্বটা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলব। যে নামে নিজেকে ডাকেন, সেটাই তিনি। ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত কলকাতার বহু বছরের পুরোনো ছাত্র মধুসূদন দত্ত অন্য নামে মধুসূদন দত্ত হতেন না, পরিণত হতেন সম্পূর্ণ অন্য একজনে। খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হলেও তিনি মূলত ছিলেন হিন্দু কলেজের একই ব্যক্তি। নিজ পরিবার ও সমসাময়িক লোকজনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অটুট। অন্যদিকে ১৮৪৭ সালের শেষ দিকে এম. এম. কিংবা এম. এম. এস. হওয়ার জন্য বাংলা ছেড়ে মাদ্রাজে চলে আসার পর তিনি পরিণত হয়েছিলেন পুরোপুরি অন্য মানুষে। ১৮৫৬ সালের প্রথমে যখন কলকাতায় ফিরে আসেন, তখনো ভিন্ন একজন মানুষ তিনি, এই ধর্মান্তর, ধর্মীয় রূপান্তরের চেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক রূপান্তর—মাইকেল মধুসূদন দত্ত কিংবা মাইকেল এম. ডাট, কিংবা এমনকি মাইকেল এম. এস. ডাট—সবগুলোতে ছিল মাইকেল নামটির প্রাধান্য। এবার তিনি যে নামে নিজেকে পরিচিত করিয়েছিলেন, সেটাই হয়ে ওঠেন—মাইকেল।
(লেখাটি ক্লিনটন বি সিলির বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড বইয়ের প্রকাশিতব্য বাংলা সংস্করণ থেকে উদ্ধৃত ও সংক্ষেপিত।)