নৃশংসতার অ্যানাটমি

অতীত পাঠের অনেক ধরনের উপায় রয়েছে। তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণ বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে যেমন, আবার এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যাদের সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষেপে ধারণ করে কেবল একটি আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা ভেদ করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে থাকে একাধিক গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব এমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বুখেনভাল্ড কনসেনট্রেশন ক্যাম্প মানবসভ্যতার ইতিহাসে নৃশংসতার এক ভয়াবহ নিদর্শন। ১৯৩৭ সালের জুলাই মাসে জার্মানির ভাইমার শহরে এই কনসেনট্রেশন ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে আশ্চর্যের বিষয় এই যে ভাইমার শহর ছিল জার্মান কবিতা, সংস্কৃতি, মানবতাবাদ ও আলোকায়নের পীঠস্থান। সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা শহরের ছায়াতলে গড়ে উঠেছিল অমানবিকতার এক নিষ্ঠুর কারাগার, যেখানে মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল মানবিকতা, সম্মান, স্বাধীনতা—এমনকি জীবনও। ক্যাম্পটি গঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নাৎসি শাসনের রাজনৈতিক বিরোধী, বিশেষ করে কমিউনিস্ট এবং সামাজিক গণতন্ত্রপন্থীদের পাশাপাশি ইহুদি, রোমা, জিহোবার সাক্ষী, সমকামী, সোভিয়েত যুদ্ধবন্দী এবং অন্য ‘অবাঞ্ছিত’ গোষ্ঠীগুলোকে বন্দী করা এবং তাদের ওপর নৃশংসতা চালানো। ক্যাম্পটি কেবল বন্দিশিবিরই ছিল তা–ও নয়, এটি ছিল দাসশ্রমের একটি কেন্দ্রস্থল। যেখানে বন্দীদের জোরপূর্বক জার্মানির যুদ্ধ–অর্থনীতি ও শিল্পের জন্য কাজ করতে বাধ্য করা হতো, যা শেষ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু এবং জঘন্য অত্যাচারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

রোগ, অনাহার, নির্যাতন, চিকিৎসার নামে নিষ্ঠুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা সরাসরি হত্যার ফলে ৫৬ জারের বেশি বন্দী প্রাণ হারায় এই কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ এখানে বন্দী ছিল।

ভাইমার শহর ছিল জার্মান কবিতা, সংস্কৃতি, মানবতাবাদ ও আলোকায়নের পীঠস্থান। সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা শহরের ছায়াতলে গড়ে উঠেছিল অমানবিকতার এক নিষ্ঠুর কারাগার, যেখানে মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল মানবিকতা, সম্মান, স্বাধীনতা—এমনকি জীবনও।

বুখেনভাল্ড কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের দৈনন্দিন জীবন ছিল এক চিরস্থায়ী মৃত্যুশিবিরের মতো। বন্দীদের দিন কাটত পাথর কোয়ারি, অস্ত্র কারখানাসহ নানা শিল্পকারখানায় কাজ করার মধ্য দিয়ে। শ্রম এখানে উৎপাদনের উদ্দেশ্য পূরণ করলেও, নাৎসিদের কাছে এটি ছিল মানুষের জীবনকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ করার অস্ত্র। ভর্ৎসনা, শারীরিক নির্যাতন, অপুষ্টি, রোগ আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ প্রতিনিয়ত ক্ষয় করত বন্দীদের দেহ ও মনকে। চিকিৎসার নামে চালানো হতো নির্মম মানবপরীক্ষা এবং নানা রোগ ছড়িয়ে দেওয়া হতো ইচ্ছাকৃতভাবে, তাদেরকে ব্যবহার করা হতো নানা ভ্যাকসিন পরীক্ষা করার গিনিপিগ হিসেবে। মেডিকেল সেবকেরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখত না; বরং তারা একেকজন জলজ্যান্ত মানুষকে একেকটি মরদেহ ভাবত, যা গবেষণার কাজে বিনা শর্তে ব্যবহার করা যেত।

সেপ্টেম্বর ২৭, ১৯৩৯ বুখেনভাল্ড কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে আসা বন্দীরা
ছবি: ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস

বুখেনভাল্ডের শক্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এর উপশিবিরগুলো। বিশেষ করে ডোরা-মিটেলবাউ কমপ্লেক্স, যেখানে নির্মিত হতো ভি-২ রকেট। ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের অমানবিক পরিবেশে বন্দীদের মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে অস্ত্র তৈরির পাষাণ প্রকল্প চালাত নাৎসি সাম্রাজ্য। বিজ্ঞান আর নিষ্ঠুরতার সংমিশ্রণে এই বিভীষিকাময় জোট দেখায় যে নৈতিকতা যদি হারায়, তাহলে বিজ্ঞানও হয়ে উঠতে পারে ধ্বংসের অলৌকিক যন্ত্র।

তবু এই নিকষ অন্ধকারের মধ্যেও মানবতা পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি। ক্যাম্পের অভ্যন্তরে বন্দীদের মধ্যে গড়ে ওঠে গোপন সংগঠন, যারা ভাগ করে নিত অপ্রতুল খাদ্য, সাহস, খবর এবং আশা। যুদ্ধের শেষ দিকে, যখন নাৎসিদের শক্তি তলানিতে নামতে থাকে, তখন এই প্রতিরোধ দৃঢ়তর হয়। ১৯৪৫ সালের ১১ এপ্রিল, আমেরিকান সেনারা আসার ঠিক আগমুহূর্তে বন্দীরা ক্যাম্পের নিয়ন্ত্রণ দখল করে নিতে সক্ষম হয়। একই দিন আমেরিকান বাহিনী ক্যাম্পটি মুক্ত করে। মুক্তির পর মানবদেহগুলোকে দেখা যায় কঙ্কালসম জীবনের করুণ ছায়ায় মতন; যারা বেঁচে আছে, তারা ইতিহাসের দায় ও প্রমাণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বন্দীর আইডি
ছবি: সংগৃহীত

বন্দী মুক্তির পর সত্য সামনে এলে বিশ্ব চমকে ওঠে বুখেনভাল্ডের ভয়াবহতা দেখে। আমেরিকান বাহিনীর তোলা ছবি, সাক্ষ্য, দলিল—সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয় নাৎসি শাসনের নির্মম প্রকৃতি। এলি ভিজেলসহ বহু বেঁচে ফেরা বন্দীর লেখা ও স্মৃতিচারণা নাৎসি নিপীড়নের স্মারক হয়ে আজও বেঁচে আছে। এলি ভিজেল লিখলেন, ‘যে রাতে আমি ক্যাম্পে পৌঁছালাম, সেই রাতই আমার জীবনের সব আলো নিভিয়ে দিল—মানুষের প্রতি আস্থা, ন্যায়ের বিশ্বাস, ঈশ্বরের প্রতি ভরসা—সব। সবকিছু যেন এক গভীর শূন্যতায় বিলীন হয়ে গেল। আমি শুধু দেখেছি ক্ষুধা, মৃত্যু আর মানুষের অন্তহীন নীরবতা। বন্দিত্বে প্রতিটি দিন ছিল অজানা আতঙ্কের ভার। মানুষ আর মানুষ ছিল না। সবাই একটি নম্বর, একটি ছায়া, একটি ক্ষুধার্ত অপেক্ষা হয়ে ছিল। আমরা যারা বেঁচে ফিরেছি, তারা কেবল বেঁচে থাকা মানুষ নই, আমরা ইতিহাসের সাক্ষী।’

ডোরা-মিটেলবাউ কমপ্লেক্স, যেখানে নির্মিত হতো ভি-২ রকেট। ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের অমানবিক পরিবেশে বন্দীদের মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে অস্ত্র তৈরির পাষাণ প্রকল্প চালাত নাৎসি সাম্রাজ্য। বিজ্ঞান আর নিষ্ঠুরতার এই সংমিশ্রণ দেখায়, নৈতিকতা যদি হারায়, তাহলে বিজ্ঞানও হয়ে উঠতে পারে ধ্বংসের অলৌকিক যন্ত্র।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিম অধ্যায়ে, ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসে বুখেনভাল্ড কনসেনট্রেশন ক্যাম্প মুক্ত হওয়ার অব্যবহিত পর যে আলোকচিত্রটি ধারণ করা হয়েছিল, তা মানবসভ্যতার ইতিহাসে অন্যতম হৃদয়বিদারক দলিল হয়ে আছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সিগন্যাল কর্পসের আলোকচিত্রী হ্যারি মিলারের তোলা আলোকচিত্রটি ইতিহাসে স্থায়ী কালিমা হয়ে থাকা বুখেনভাল্ডের নগ্ন সত্যকে পর্দার আড়াল থেকে তুলে এনেছে। কাঠের তৈরি গাদাগাদি শয্যায় শায়িত ও কঙ্কালসার শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বন্দীদের চোখেমুখে ক্ষুধা, যন্ত্রণা, বেঁচে থাকার হাহাকার—সবকিছুই একসঙ্গে ধরা পড়েছে।

ছবির কম্পোজিশন নির্মমভাবে সোজাসাপটা। একটি কাঠের তিনতলা খাট, যেন আদিম মৃত্যুঘর ছড়িয়ে আছে পুরো ফ্রেমে। অতি চিপা জায়গায় একাধিক মানুষ গাদাগাদি করে শুয়ে আছে। তাদের সবার দেহে কেবল হাড়ের স্পষ্ট উপস্থিতি, চোখে স্থির হয়ে আছে ভয়। কেউ তাকিয়ে আছে বিস্ময়ে, কেউবা নিস্পৃহ, আবার কারও মুখে যেন এক অচেনা প্রশ্ন—কেন? কী? যেন লাকড়ির মতন কাঠের স্তরের মতন স্তরে স্তরে সাজানো আছে মুখগুলো।

ডান দিকে দাঁড়িয়ে থাকা নগ্ন, অতি শীর্ণ একটি দেহ ছবির ব্যথাকে আরও তীব্র করে জাগিয়ে তোলে। পায়ের নিচে মাটি, হাতে ধরে রাখা কাপড়, দেহের প্রতিটি হাড় স্পষ্ট এবং তার উপস্থিতি ছবিটিকে একটি ভাব প্রকাশের পূর্ণতা দেয়। দৃশ্যত, লোকটি কোনো প্রতিবাদ জানায় না; সে শুধু অবর্ণনীয় কষ্টের নীরব ভাষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টিহীন স্থিরতা এবং দেহের ভঙ্গি যা বলে, তা আমরা লিখে প্রকাশ করতে পারি না।

বুখেনভাল্ড কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। আলোকচিত্র: হ্যারি মিলার, ১৯৪৫
ছবি: সংগৃহীত
এই আলোকচিত্র নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোর প্রকৃত চেহারা প্রথমবারের মতো বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সারিতে অন্যতম। বুখেনভাল্ড ক্যাম্পটি ছিল প্রধানত শ্রমশিবির। প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ অনাহার, রোগ, নির্যাতন, চিকিৎসার নামে পরীক্ষা ও সরাসরি হত্যার শিকার হয়।

আলোকচিত্রটি একটি অসহ্য নীরবতা তুলে ধরেছে। কয়েকজন যারা বেঁচে আছে, কিন্তু প্রাণহীন শূন্যতায় ঝুলছে। মুক্তি এসেছে এতটাই দেরিতে, যত দিনে হাজার হাজার জীবন ইতিমধ্যেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। ছবিটি তাই একদিকে জীবনের দলিল, অন্যদিকে অসম্পূর্ণ মৃত্যুর স্মৃতিফলক।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে এই আলোকচিত্র নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোর প্রকৃত চেহারা প্রথমবারের মতো বিশ্বের সামনে তুলে ধরার সারিতে অন্যতম। জার্মানির ভাইমারের কাছে অবস্থিত বুখেনভাল্ড ছিল প্রধানত শ্রমশিবির। তবে এই শ্রম কোনো দিনও সঠিক উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হয়নি। প্রায় ৫৬ হাজার মানুষ অনাহার, রোগ, নির্যাতন, চিকিৎসার নামে পরীক্ষা ও সরাসরি হত্যার শিকার হয়। এপ্রিল ১১, ১৯৪৫ মার্কিন বাহিনী ক্যাম্পে প্রবেশের পর জীবিতদের শারীরিক অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ছবিতে ধারণ করা সেই দৃশ্যগুলো বিশ্ববিবেককে স্তব্ধ করে দেয়।

আরও পড়ুন

আলোকচিত্রটি শুধু দলিল হিসেবে নয়, ছবিটি ইতিহাসকে বারবার প্রশ্ন করেছিল। আলোকচিত্রটি উঠেছিল একাধারে অপরাধের সাক্ষ্য, আদালতের নথি, অস্বীকারের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রমাণ। নুরেমবার্গ ট্রায়ালসহ বহু বিচারে নাৎসি নৃশংসতা শনাক্তকরণের মতো আরও অনেক ছবির ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

এ ছবির নান্দনিকতা আমাদের সামনে এক কঠিন নীতিগত প্রশ্নও তোলে, কষ্ট আর মৃত্যুর ছবি আমরা কীভাবে দেখি? এটি কৌতূহলের বস্তু নয়; অতীতের ভয়াবহতার প্রত্যক্ষ দলিল। বন্দীরা কখনো সম্মত হয়নি; আঁধারের গর্ভেই তাদের ছবি চিরস্থায়ী। তবু সেই চিত্র আজ স্মৃতি ও ন্যায়ের পৃষ্ঠপোষক। তাই ছবিটি দেখা মানে দায়িত্ব নেওয়া—স্মরণ করা, যেন ইতিহাসের এমন পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।