প্রথম আলোর আয়োজনে আলোচনা সভা: বাংলাদেশের সংস্কৃতির খোঁজে

‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির খোঁজে’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারীরাছবি: প্রথম আলো

সঞ্চালক

সেলিম জাহান

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক

সেলিম জাহান, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন কার্যালয়ের সাবেক পরিচালক
ছবি: প্রথম আলো

সেলিম জাহান: আজকের আলোচনার শিরোনামে তিনটি শব্দ আছে: ‘সংস্কৃতি’, ‘বাংলাদেশ’ ও ‘খোঁজ’। ‘সংস্কৃতি’ বলতে সাধারণ মানুষেরা বোঝেন শিল্পসাহিত্য। যাঁরা একটু গভীরভাবে বোঝেন, তাঁরা মনে করেন—ঐতিহ্য–কৃষ্টিও সংস্কৃতির অংশ। আমরা আবার বলি ‘গণতন্ত্রের সংস্কৃতি’, ‘অবিশ্বাসের সংস্কৃতি’, ‘ক্ষমতার সংস্কৃতি, এমনকি ‘ভয়ের সংস্কৃতি’। এটা বেশ বিস্তৃত। এটা মাথায় রাখলে আলোচনায় সুবিধা হবে।

দ্বিতীয় বিষয়টি ‘বাংলাদেশ’। বাংলাদেশের সংস্কৃতি বলতে আমরা বুঝি এই ভূখণ্ডের সংস্কৃতি। কিন্তু দেশ তো শুধু ভূখণ্ড নয়। দেশ হচ্ছে দেশের মানুষ, তার জনগণ। বাংলাদেশের জনগণ সমসত্তাসম্পন্ন নয়; এখানে পাহাড়ের জনগণ আছে, সমতলের জনগণ আছে। অর্থনীতির দিক থেকে আর্থসামাজিক বিভাজন আছে, শ্রেণিবিন্যাস আছে। সুতরাং পরিশীলিত, উচ্চশিক্ষিত নাগরিকদের সংস্কৃতি আর প্রান্তিক–গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতির মধ্যে তফাত আছে। পয়লা বৈশাখ এলে এটা প্রকটভাবে বোঝা যায়। এদিকে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি বিদেশে আছেন। বাংলাদেশের সংস্কৃতি বলতে এই আঙ্গিকগুলো মনে রাখা দরকার।

শেষ কথা হচ্ছে ‘খোঁজে’। প্রায়োগিক দিক থেকে আমরা ‘খোঁজে’ শব্দটি ব্যবহার করি দুই ভাবে: কিছু একটা চাচ্ছি, সেই জন্য খুঁজছি; আর কিছু একটা ছিল, হারিয়ে গেছে, সেটাও খুঁজছি। এখানে বিষয়টা কোনটা?

তাহমিদাল জামি এ আলোচনার প্রস্তাবনাপত্র পেশ করবেন।

তাহমিদাল জামি, গবেষক ও সাংবাদিক
ছবি: প্রথম আলো

তাহমিদাল জামি: বাংলাদেশের সংস্কৃতি কী? সেটাকে আমরা কীভাবে জানব ও চর্চা করব? সেলিম জাহান বললেন, বাংলাদেশের সংস্কৃতি সমসত্তাসম্পন্ন নয়। চিরন্তন বা শাশ্বতও নয়। আমাদের জাতিরাষ্ট্র গঠিত হয়েছে ১৯৭১ সালে। তার আগে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক নির্মাণ ঘটেছে। এর কিছু শ্রেয় দিক আছে। আমরা সেগুলো কীভাবে তুলে ধরতে পারি? আমি আমার প্রস্তাবনাপত্রে সংস্কৃতির ধারণা নিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করেছি। তারপর সংক্ষেপে আলোচনা করেছি ঔপনিবেশিক যুগে সংস্কৃতির নতুন ধারণায়নের বিষয়টি আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কীভাবে দেখতে পাই।

পূর্ব বাংলায় দেশভাগের আগে-পরের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একধরনের ছেদ ও ভেদের পরিস্থিতি তৈরি হওয়া, অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদের আবর্তন, রাজনৈতিকভাবে একটা আলাদা জনগোষ্ঠীর আবির্ভাব। সেটা খুব দ্রুত বিকশিত হয়, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরে আবার যে একধরনের অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতা ছিল, সেটার বিরুদ্ধে বাঙালিদের নতুন ধরনের বিকাশ ঘটে। ষাটের দশকে তা আমরা খুব ভালোভাবে দেখতে পাই। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর রাজনীতির ভেতর দিয়ে সংস্কৃতির নতুন বিন্যাসের ভাবনা হয়তো অনেকের মধ্যে ছিল। ভাবা হয়েছিল যে এখানে সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না; বাংলাদেশের সংস্কৃতির সুনির্দিষ্ট কিছু সীমা থাকবে, কিছু সাধনার জায়গা থাকবে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আদি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা অনেক ধরনের সমস্যা মোকাবিলার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ২০২৪-এর গণ–অভ্যুত্থানের পরে রাষ্ট্র, রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে নতুন করে বিতর্কের সূচনা হয়েছে।

আমরা নানা পরম্পরার মধ্য দিয়ে এগিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বাঙালি জাতিকেন্দ্রিক যে ধারণা ও যেসব সাংস্কৃতিক নির্মাণ দেখেছি, সেগুলো নিয়ে কীভাবে আলোচনা করতে পারি? অনেক ধন্যবাদ।

সেলিম জাহান: সাঈদ ফেরদৌস এ ভূখণ্ডের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে বিষয়টা কীভাবে দেখেন?

সাঈদ ফেরদৌস, সহ-উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: প্রথম আলো

সাঈদ ফেরদৌস: আমি চারটা বাঁকের মুহূর্ত বা বিন্দু ধরে কথা বলব। সংস্কৃতির আদলের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি বা পরিচয়ের রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিচয়বাদী রাজনীতির একটা বড় প্যারাডক্স এ রকম: আপনি যখন বাঙালি হিসেবে নিষ্পেষিত, তখন বাঙালি পরিচয় আঁকড়ে ধরে দাঁড়ানো আপনার জন্য অবদমনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার। আর এই আপনিই যখন বাঙালি রাষ্ট্র কায়েম করেন, তখন আপনি শাসক হিসেবে অন্যের ওপরে অবদমন চাপিয়ে দিচ্ছেন।

ইউরোপে যে জাতিরাষ্ট্রের আদিকল্প বিকশিত হয়েছিল, সেখানে জাতিগুলো ছিল মোটামুটি সমরূপ; অত্যন্ত শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জাতি গঠন প্রক্রিয়া ঘটেছিল। কিন্তু ঔপনিবেশিকতার মধ্য দিয়ে জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় ঔপনিবেশিক শাসকেরা এখানে জাতি বা নাগরিক তৈরি করতে চায়নি, চেয়েছিল তাদের প্রজা। ফলে জাতিরাষ্ট্রের বিকাশের মধ্যেই জাতি তার নিজের হয়ে উঠতে পারেনি। অনেক পরে যখন ঔপনিবেশিকতার পাল্টা স্রোত হিসেবে অভিবাসীরা ইউরোপের উপকূলে গিয়ে আছড়ে পড়তে থাকল, তখন ইউরোপের জাতিরাষ্ট্রের ফ্রেমের মধ্যে কীভাবে তাদের ফেলা হবে, সে প্রশ্নে বলতে হলো যে ফ্রান্সে থাকতে গেলে তোমাকে ফরাসি হতে হবে। তুমি মুসলমানের মতো হিজাব পরতে পারবে না। ইউরোপ এই টানাপোড়েনগুলো বহুসংস্কৃতিবাদের তত্ত্ব সামনে এনে মোকাবিলা করার চেষ্টা করল।

আবার ধরুন ভারতের মতো একটা বহু সমাজ, বহু ধর্ম, বহু ভাষা, বহু পোশাক, বহু খাদ্যাভ্যাসের দেশে একটা জাতিরাষ্ট্র গঠিত হচ্ছে। তার প্যারাডক্সটা শুরু থেকেই অন্য রকম। তার ক্ষেত্রে এ লড়াইগুলো চলতেই থাকল। আজকে আমরা বেশি বাঙালি হয়ে যাচ্ছি, নাকি বেশি মুসলমান হয়ে যাচ্ছি, কোনটা হওয়া ঠিক হবে, বাঙালি হওয়া শ্রেয় হবে না মুসলমান হওয়া শ্রেয় হবে—এই যে দ্বন্দ্বে আমরা পড়ি, এটার একটা পরিষ্কার ঐতিহাসিক যাত্রা আছে। আসলে তো আপনি একই সঙ্গে বাঙালি ও মুসলমান দুটোই হতে পারেন। কিন্তু আধিপত্যবাদী রাজনীতি আপনাকে কোনো না কোনো একটা বাক্সের মধ্যে আটকে ফেলতে চায়।

যে চারটা বিন্দুর কথা বলছিলাম—মুসলমানিত্ব ও বাঙালিত্বের এই যে দ্বন্দ্ব—এর চারটা বিন্দু। রফিউদ্দিন আহমেদ যে আশরাফ মুসলমানের অভিযাত্রা দেখিয়েছেন—আশরাফ মুসলমানের আরবি-ফারসি শেখা, পোশাক-পরিচ্ছদ, ও রকম নাম ধারণ করা ইত্যাদি দিয়ে—এখানকার খেটে খাওয়া মুসলমান, যারা লোকজ অর্থে ইসলাম ধারণ করে তাদের থেকে একটা দূরত্ব তৈরি করে নীল রক্তের আরব থেকে তাদের নিজেদের রক্ত ও কৌলীন্য দাবি করেছে। তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের মিশ খাচ্ছে না। পরবর্তী কালে বাঙালি জাতীয়তাবাদ হয়ে উঠল সাংঘাতিক রকম আধিপত্যমূলক একটা ধারণা। এখানে মুক্তিযুদ্ধ আছে, শহীদেরা আছেন। ফলে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানে একেবারে অজু ছাড়া ধর্মগ্রন্থে হাত দিয়ে ফেলার মতো। অথচ আমাদের সব বিষয়ে খুব পরিষ্কার আলাপ হওয়া উচিত।

আবুল মনসুর আহমদসহ কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালি মুসলমান লেখক, বুদ্ধিজীবী, সম্পাদক, উকিল যাঁরা পাকিস্তান আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন, তাঁরা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে আলাদা একটা ‘পাক-বাংলা’ হতে হবে; তাঁরা জিন্নাহ ও অন্যান্য রাজনীতিক বা মুসলিম লীগের পাকিস্তানের থেকে ভিন্নভাবে পাকিস্তানের কল্পনা করেছিলেন। তাঁরা বলেছিলেন, পাকিস্তান হবে একই সঙ্গে বাংলার ও বাঙালির। তাঁরা বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্ব উভয় সত্তা একই সঙ্গে ধারণ করতে চেয়েছিলেন। সামনে আনতে চেয়েছিলেন পূর্ব বাংলার স্বাতন্ত্র্য। তাঁদের মধ্যে মুসলমানিত্ব ও বাঙালিত্ব—এ দুইয়ের সমন্বয় সাধনের চেষ্টা ছিল। কিন্তু মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের শাসকদের কারণে তা খুব দ্রুত মার খেয়ে যায়।

যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের রমরমা অবস্থা, তখনো বাংলাদেশের মানুষজন বলেছে—আমরা পাকিস্তানি। তাদের পরিচয় ছিল মুসলমান। বাঙালিত্বকে তারা বলত ‘বাঙালি তো বাঙালিই’, স্বভাবগতভাবেই। কিন্তু এটা যে একটা পরিচয়ের স্মারক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, তা এসব মানুষ দেখতে পেত না। মুসলিম লীগ ও পাকিস্তানের শাসকদের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যে জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটল, তা একটা অলঙ্ঘনীয় চেহারা নিল। মুক্তিযুদ্ধ হলো, প্রচুর মানুষ শহীদ হলেন। এর ফলে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদ নিয়ে কোনো রকমের প্রশ্ন তোলা প্রায় কঠিন হয়ে গেল। এমনকি শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় না থাকলেও বাঙালি জাতীয়তাবাদের আধিপত্যমূলক ক্ষমতা একটুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের গায়ে সত্যিকার অর্থে ধাক্কা লাগল চব্বিশের জুলাই-আগস্টে এসে। পাকিস্তানি আমলে যেমন মুসলিম লীগের ব্যর্থতা কাজ করেছে, এখানে ঠিক তেমনি আওয়ামী লীগের দীর্ঘ স্বৈরশাসনে যে মুক্তিযুদ্ধকে এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, এগুলোর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে আওয়াজটা শক্তিশালী হয়ে উঠল। বাঙালি জাতীয়তাবাদ অন্য জাতিগোষ্ঠীর অধিকার দেখেনি। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গেলে তিনি তাঁকে বাঙালি হয়ে যেতে বলেছিলেন। আমরা বিহারিদের একাত্তরের ভূমিকার কারণে অপরাধী করেছি; কিন্তু বিহারি পরিবারের অনেকে তো মুক্তিযুদ্ধে অংশও নিয়েছিল।

আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে, এই অভিযোগ আজকে যারা করছে, তারা আবার ‘ভিকটিম’ কার্ড খেলছে। তারা বলছে, ‘আমরা মুসলমান হিসেবে বঞ্চিত ছিলাম।’ তারা স্পষ্টত তাদের ইসলামপন্থা সামনে এনে উদ্দেশ্য হাসিল করছে। এতে জামায়াতে ইসলামীর একাত্তরের ভূমিকা প্রশ্নের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ যেমন মুক্তিযুদ্ধ দিয়ে তার লুণ্ঠনকে জায়েজ করছে, ঠিক তেমন যারা এখন জাতীয়তাবাদকে খণ্ডন করছে, তাদের যুক্তি হচ্ছে—এই জাতীয়তাবাদ ‘দিল্লি’ থেকে আসা। আওয়ামী লীগ মানেই দিল্লি, মুক্তিযুদ্ধ দিল্লি, প্রথম আলো মানে দিল্লি।

চব্বিশের আগস্টে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ময়নাতদন্তের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু চব্বিশের প্রধান শক্তিগুলো তা না করে সস্তা রাজনৈতিক বুলি কপচেছে; ঠিক আওয়ামী লীগের মতো আরেকটা অবদমনের হাতিয়ার হিসেবে এই রাজনীতি শুরু করেছে।

সেলিম জাহান: এই বাঁকগুলো যখন আমরা দেখি, তখন খুব স্বাভাবিকভাবে আবুল মোমেন ভাইয়ের দিকে চোখ যায়। আপনার চিন্তায় যে সাংস্কৃতিক চেতনা আছে, যেটা দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে উঠেছে, তার কোনো বিচ্যুতি আপনি এখন দেখেন কি না?

আবুল মোমেন , প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
ছবি: প্রথম আলো

আবুল মোমেন: ১৯৬০-এর দশকে ছাত্ররাজনীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার সময় আমরা দেশের উত্তাল পর্বটা লক্ষ করেছি। সাঈদ ফেরদৌস বলছিলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের পর্বটা দ্রুত ঘটেছে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হলো, তখন একটা ভারত-বিরোধী চেতনা সবার মধ্যে কাজ করছিল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটা ফক্সওয়াগন গাড়ি ছিল, সেখানে উনি বড় করে লিখেছিলেন ‘ক্রাশ ইন্ডিয়া’। ছবিটা পাকিস্তান অবজারভার-এ ছাপা হয়েছিল।

১৯৬৬ সালে ছয় দফার সময় ব্যাপারটা ঘুরে যায়। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের বয়ানগুলোতে ছিল, বিভিন্ন সেক্টরে, বিশেষত লাহোর শহর রক্ষা করার জন্য যে রেজিমেন্টগুলো যুদ্ধ করেছে, সেখানে অধিকাংশ বাঙালি সৈনিক প্রাণ দিয়েছেন এবং তাঁদের বাঙালিত্বের গৌরবটা আমাদের সামনে হাজির করা হয়েছে। তখন শেখ মুজিব বললেন, ‘আমরা অরক্ষিত ছিলাম, পাকিস্তান আমাদের দেখেনি।’ বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে একটা উত্তাল ঢেউ তৈরি হবে, তা বোঝা যেতে শুরু করেছিল ১৯৬৬ সালে ছয় দফার সময় রাজপথে শেখ মুজিবের জনসভার মধ্য দিয়ে। সেটা দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেছে। ‘৬৬, ’৬৯, ’৭১-এর ভেতর দিয়ে যা ঘটেছে, তা বাঙালি জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে বাঙালি হিসেবে নিজেকে পুনরাবিষ্কার, কিন্তু এর সবটাই রাজপথে, বক্তৃতা-বিবৃতি-মঞ্চ ইত্যাদিতে। এর কোনো বিদ্যায়তনিক চর্চা হয়নি। এমনকি সাহিত্য পঠনপাঠনে কোনো তাত্ত্বিক কথাবার্তা আসেনি।

আমাদের এক মামা সাহিত্যের ব্যাপারে সব সময় তারাশঙ্কর, প্রেমেন্দ্র মিত্র ইত্যাদি করতেন; কিন্তু রাজনীতির কথা এলে একটু ‘মুসলিম মার্কা’ হতেন। আমি বললাম, ‘ব্যাপারটা কী? তুমি এ রকম কেন?’ তিনি বললেন, ‘একটা ঘটনা বলি। আমার বাবা প্রথম জীবনে কৃষ্ণনগর কলেজে বাংলার অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৪০ সাল। আমার তখন ১৪ বছর বয়স। উনি আমার মা ও আমাকে নিয়ে সেখানে গেছেন। দুই দিন পর আমি ভাবলাম, একটু পাড়াটা ঘুরে দেখি। বেরিয়েছি, ১৪ বছরের বালক। ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। আমি দৌড়ে গিয়ে একটা ঘরের দাওয়ায় উঠলাম। এক বৃদ্ধা বেরিয়ে বলল, “এই ছেলে, তুমি না ওই বাড়িতে থাকো? মুসলমান বাড়িতে? নামো, নামো, নামো!” আমাকে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে নামিয়ে দিল। সেই স্মৃতি কি আমি কোনো দিন ভুলতে পারব?’

আমরা একটা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, রাজনীতির প্রবাহের মধ্যে প্রগতির কথা বলেছি, সহনশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশের কথা বলেছি—এই সমস্ত কিছু হয়েছে লেখালেখির মধ্যে, মঞ্চে আলোচনায়, বিশেষ উপলক্ষে। এসব আমাদের সংসারের মধ্যে, অর্থাৎ পরিবার ও সমাজে প্রবেশ করেনি। আমরা পড়ে এসেছি যে আবুল মনসুর আহমদ বলেছেন, হিন্দু ও মুসলমান মিলে একটা রাষ্ট্র করা যাবে, কিন্তু সমাজ করা বা সংস্কৃতি করা কঠিন। এ দুটো আলাদা। এই কথা তো একটু পরিষ্কার করে আলোচনায় আনতে হবে। সেটা কীভাবে হবে? আমি যদি ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি, তাহলে তো হবে না। ধর্ম ধর্মের জায়গায় থাকবে, কিন্তু নাগরিক জীবনযাপনের জন্য একটা পারস্পরিকতা তৈরি হওয়া দরকার। নাগরিকের সঙ্গে নাগরিকের সেই সম্পর্কের পরিসর কীভাবে তৈরি হবে—এসব নিয়ে আলোচনা হয়নি।

আমরা যে প্রাসাদ তৈরি করি তা আদতে ঠুনকো। কারণ, তার ভিত্তিটা খুব দুর্বল। রাষ্ট্র সংস্কার ইত্যাদি অনেক কিছুই করা যাবে, কিন্তু সমাজকে তা ধারণ করার মতো করে আমরা তৈরি করেছি কি না? ৫০ বছরের স্বাধীনতার পরে যে শিক্ষা চলছে, সেটা দিয়ে এমন বিকাশমান মানুষ তৈরি করা যায় না যে তার গণ্ডি ছাপিয়ে বড় হবে বা বৃত্ত ভাঙবে।

আমি বলি আন্দোলন-সংগ্রাম এগুলো রাজনীতির ‘অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্র’, এ ক্ষেত্রে আমরা খুব দক্ষ। কিন্তু রাষ্ট্র গঠন করা, সংবিধান বা সংসদ চালানো, আইনের মাধ্যমে শাসন করা—রাজনীতির এসব ‘আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্র’-তে আমরা ভীষণভাবে ব্যর্থ। আমি বলি, আমরা এখনো আত্মীয় সমাজ রয়ে গেছি, নাগরিক সমাজ হইনি।

আমার ধারণা, আমরা যদি কার্যকরভাবে শিক্ষায় হাত দিতে না পারি, তাৎপর্যপূর্ণ গুণগত পরিবর্তন আনতে না পারি, তাহলে আমাদের নানা রকমের বয়ান রচনার চর্চা কাজে আসবে না।

সেলিম জাহান: সৈয়দ নিজারের কাছে প্রশ্ন, বাংলা অঞ্চলের ভাবসম্পদ কী রূপ নিয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

সৈয়দ নিজার, অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: প্রথম আলো

সৈয়দ নিজার: ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতির খোঁজে’—আলোচনার শিরোনাম দেখে ভাবছিলাম, হয়তো একটা বিশেষ ধরনের রাষ্ট্রের কল্পনার কথা বলা হচ্ছে। সেটা হয়তো ইউরোপীয় একধরনের মডেলের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফরাসি বিপ্লবের থেকে জাতিরাষ্ট্রের যেসব ধারণার জন্ম হয়েছে, সেই ধরনের কিছুর প্রতি ইঙ্গিত করা হচ্ছে। শিরোনামে যে ‘খোঁজ’ শব্দটা আছে, সেটা আবিষ্কার হতে পারে, উদ্ভাবনও হতে পারে। এর দুটো বিষয়ে আমরা আলাপ করতে পারি। রাষ্ট্র গঠন সম্পর্কে প্রশ্নগুলো আসে কিছু সুনির্দিষ্ট পটভূমি থেকে। ইউরোপে যে সময় জাতিরাষ্ট্রগুলোর উদ্ভব ঘটেছে, তখনকার একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট ছিল ক্যাথলিক চার্চের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসা। ঐশ্বরিক রাষ্ট্রের বিপরীতে সেক্যুলার রাষ্ট্র কল্পনা হয়েছে জাতিরাষ্ট্রের ধারণা থেকে। সে কারণে ইউরোপের সেক্যুলার রাষ্ট্রগুলো ধর্মটাকে খুব ভালোভাবে হ্যান্ডল করতে পারে, কিন্তু বহু জাতিগোষ্ঠীর স্বার্থ সমানভাবে রক্ষা করতে পারে না। যেমন ফ্রান্সের কথা ধরা যাক। দেশটি ফ্রেঞ্চ কালচারের নামে যা করে, অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতির মানুষের ওপর আরোপ করতে চায়।

আমাদের মাটি কোমল। আমরা অভ্যুত্থান করতে পারি, কিন্তু রাষ্ট্র গঠন করতে পারি না। তার কারণ এখানকার ভূমিপ্রকৃতি। এখানে সবাই কুবের ও কপিলার মতো অন্য কোথাও থেকে এসেছে, তারা নিজের সমাজে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি বা নিপীড়নের শিকার হয়েছে। তারা নতুন একটা আশা নিয়ে এসেছে। আবার আগে যেখানে ছিল, সেখানকার সংস্কৃতিও নিয়ে এসেছে। কিন্তু এটা কোথাও গিয়ে সম্পন্ন হতে পারেনি। এর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমাদের মাটি সব সময় পরিবর্তিত হচ্ছে।

আমাদের এখানে যে প্রবণতা আছে—বাঙালি না মুসলমান—এ পথ থেকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের বের হওয়া উচিত। গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন, নদী পার হওয়ার জন্য নৌকা প্রয়োজন হয়; নদী পার হওয়ার পর নৌকাটা মাথায় নিয়ে ঘুরলে সেটা হয়ে ওঠে বোঝা। আসলে জাতিরাষ্ট্রের যে আধুনিক কল্পনা, সেটা একটা স্ট্র্যাটেজিক অ্যাপ্রোচ। বদরুদ্দীন উমরের কিছু লেখায় আছে, জাতীয়তাবাদের ধারণা একটা স্ট্র্যাটেজিক অ্যাপ্রোচ। ষাট-সত্তরের দশকে স্বাধীনতার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদ দরকার ছিল। তারপরেই এটা নৌকার মতো বোঝা। মানে, এটা মাথায় বয়ে নিয়ে চললে আপনি রাষ্ট্র নির্মাণ করতে পারবেন না। তার মানে, রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে এখান থেকে সরে আসা খুব জরুরি। যখন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে, তখন কল্পনা পরিষ্কার ছিল না। বাঙালি জাতীয়তাবাদ স্বাভাবিকভাবেই অসম্ভব গুরুত্ব পেয়েছে।

আমাদের চিন্তা ও সংস্কৃতিতে বাইরের অনেক উপাদান ঢুকতে পারে। সেটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আজকে আমাদের দুপুরের খাবারে সালাদ ছিল। সালাদে গাজর, মরিচ, টমেটো ছিল। এর কোনোটাই এ অঞ্চলের সবজি নয়। এটা কোনো সংকট তৈরি করছে না। আবার আমাদের এখানে সংস্কৃতির এমন উপাদান আছে, যা ইউক্যালিপটাসগাছের মতো দেশি গাছগুলোকে বিকশিত হতে দেয় না।

আমরা কী করব? সংস্কৃতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকশিত হয়ে ওঠার বিষয়, তবে মাথায় রাখা দরকার যে এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রেরও কিছু মাত্রার ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন হয়। এসব সমস্যা সমাজ একটা মাত্রা পর্যন্ত সমাধান করতে পারে, কিন্তু দায়িত্ব নিতে হয় রাষ্ট্রকে।

সেলিম জাহান: সবার আলোচনাতেই একটা প্রসঙ্গ, নানাভাবে ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির যোগসূত্র বা ছেদ। এ বিষয়ে এখন যাব ফিরোজ আহমেদের কাছে।

ফিরোজ আহমেদ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিশ্লেষক
ছবি: প্রথম আলো

ফিরোজ আহমেদ: আমরা পলিমাটির দেশ বলে রাষ্ট্র গঠনে অক্ষম কি না, এটা কি আমাদের ঐতিহাসিক বা ভৌগোলিক নিয়তিবাদ? ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত বাকি ইউরোপের তুলনায় ইতালি ও আয়ারল্যান্ডের সামাজিক ও আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো ভীষণ কার্যকর ছিল। সেখানে চাকরি, বাণিজ্য, কোটা ইত্যাদি আত্মীয়তার ওপর অনেক বেশি নির্ভর করত। প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে শক্তিশালী হওয়ার মধ্য দিয়ে এসব প্রশমিত হয়েছে। ফলে বলা যায় না যে এটা নিয়তি-নির্দিষ্ট। এটা উতরানো সম্ভব।

হোসেন শাহী আমলে বাংলা নামের মমতাজুর রহমান তরফদারের বিখ্যাত বইয়ে আমাদের অসাধারণ এক রাষ্ট্রের কথা আছে। আজকের অর্থে হয়তো সেটা আদর্শ রাষ্ট্র নয়, কিন্তু মধ্যযুগের অর্থে এক অসাধারণ রাষ্ট্র এখানে নির্মিত হয়েছিল। এটা কি আমাদের শিক্ষা দেয় না যে এর সঙ্গে পলিমাটির বা ভৌগোলিক বাস্তবতার সম্পর্ক নেই? বিষয়টি হচ্ছে যাঁরা রাষ্ট্র নিয়ে কাজ করছেন, চিন্তা করছেন, তাঁরা কতখানি কার্যকরভাবে রাষ্ট্রের কল্পনা করছেন এবং সে অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরির চেষ্টা করছেন।

জাতীয়তাবাদী রাজনীতি আমাদের এখানে একটা প্রবল শক্তি অর্জন করেছে ধর্মকে প্রবল শত্রু হিসেবে হাজির করে। অন্যদিকে ধর্ম এখানে একটা অভিযোজনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, নিজেকে রূপান্তরিত করেছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উপযুক্ত একটা কাঠামো তৈরি করেছে এবং একটা অসাধারণ ধর্মবোধ তৈরি করেছে।

বদরুদ্দীন উমর বলতেন, আমাদের সংস্কৃতির দুইটা অসাধারণ উৎস বা প্রবাহ আছে। একটা হচ্ছে, আমরা সংস্কৃত ঐতিহ্য থেকে অনেক কিছু পাই, আবার আমরা ফারসি ও আরবি ঐতিহ্য থেকেও অনেক কিছু পাই। ভাষা আন্দোলন করেছি বলে আমাদের এখানকার বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা ফারসি-আরবি ঐতিহ্যটাকে আমাদের কাছ থেকে কেটে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর আমরা মুসলমান বলে এখানকার সংস্কৃতের ঐতিহ্যটাকে কেটে ফেলার চেষ্টা করছি। ফলে আমরাই দরিদ্র হচ্ছি। বরং আমাদের সমৃদ্ধ হতে হলে এই সবগুলো প্রবাহকে আবারও সচল করতে হবে এবং তার মধ্য দিয়ে যাকে আঞ্চলিক বন্ধুত্ব বলি, বৈশ্বিক বন্ধুত্ব বলি এবং রাষ্ট্র নির্মাণের যে স্বপ্নের কথা বলি, সেটা তৈরি হওয়া সম্ভব। কিন্তু তার জন্য আধিপত্যমুক্ত রাষ্ট্রকাঠামো দরকার।

পারভীন হাসান, উপাচার্য, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি
ছবি: প্রথম আলো

পারভীন হাসান: পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে বাঙালিত্ব নিয়ে একটা কিছু করার যে প্রচেষ্টা হয়েছিল, সেটা তুর্কি সুলতানরা করেছিলেন। তাঁরা বিদেশি ছিলেন। তাঁরা নিজেদের শাসনের সুবিধার্থে একটা সমঝোতার চেষ্টাই করেছেন। ব্রাহ্মণ্যবাদ এখানে আসেনি। বেশির ভাগ লোকই নানা লৌকিক দেবদেবীর পূজা করত কিংবা আচার-অনুষ্ঠান মেনে চলত। ধরাবাঁধা নিয়মকানুন এখানে ছিল না। প্রথমে আমরা যেটা দেখি, তাঁরা সংস্কৃত থেকে ভাষান্তর করালেন। মহাভারত, রামায়ণ নানা রকমের মনসামঙ্গল—এগুলো লেখা হলো তখনকার সেই আদি বাংলায়। তার সঙ্গে সঙ্গে কিছু ইসলামি সাহিত্যও হলো। ইসলামি সাহিত্যগুলো পরে আমরা পুঁথি হিসেবে পাই। ধর্মশিক্ষাও হতো পুঁথির মাধ্যমেই। পড়তে জানত কজন? নিজের ভাষাই পড়তে জানত না, আরবি-ফারসি তো দূরের কথা। সৈয়দ সুলতান, আলাওল—ওনাদের মাধ্যমেই ধর্মের কাহিনিগুলো এসেছে, সঙ্গে অনেক গল্প মিশেছে। সৈয়দ সুলতান বলেছেন, ‘আমি বাংলায় ধর্মের কথা বলছি বলে সৃষ্টিকর্তার কাছে মাফ চেয়ে নিচ্ছি। বাংলার ঘরে ঘরে রামায়ণ-মহাভারত পড়ে, ইসলামের কিছু তারা জানে না। তাদের কাছে পৌঁছাতে হলে আমাকে বাংলা ভাষায় করতে হবে।’

১৮৭২ সালের প্রথম জনশুমারির সময় ব্রিটিশ কর্মচারীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জিজ্ঞেস করত, ‘আপনি কোন ধর্মের, কোন জাতির?’ তার আগে লোকে জাতি-ধর্ম নিয়ে এত কিছু ভাবেনি। আমি নিজে ছোটবেলায় গ্রামে অনেক মুসলিম মহিলাকে সিঁদুর পরতে দেখেছি। এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, ‘আসল ইসলাম’ কী? এই তর্কবিতর্কে কি শান্তি বজায় থাকবে?

রাষ্ট্রের ব্যাপারে আমার মনে হয়, আমরা ‘সেক্যুলারিজম’ শব্দটি বুঝিনি। এর অর্থ গির্জা থেকে রাষ্ট্রকে একেবারে আলাদা করে ফেলা। কিন্তু আমাদের এখানে আইনের বিশেষ বিশেষ জায়গা আছে—ধর্মীয় বিধানে যা আছে, তা-ই প্রযোজ্য। দুটো তো একসঙ্গে যায় না। ফিরোজ আহমেদ যে বহু সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মানুষের একসঙ্গে মিলেমিশে বসবাসের কথা বলেছেন, সেটাই হতে পারে সবচেয়ে ভালো পথ।

সেলিম জাহান: এর পরে কী? আমাদের সামনে কী আছে?

সৈয়দ নিজার: এখন সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কোনো প্রভাব আর বিশেষ দেশ বা ভূমির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ঔপনিবেশিক পর্যায়ে একধরনের বিচ্যুতি ঘটেছে, কিন্তু এখনকার বিচ্যুতি আরও জটিল। সিমান্টিকসও মারা যাচ্ছে। যেমন আমরা হসপিটাল থেকে হাসপাতাল এসেছি। হাসপাতালে থেকে আবার হসপিটালে ফিরে যাচ্ছি কি না, এটা একটা বিষয়। এই যে বিপরীত প্রবণতা—নামাজ থেকে সালাতে বা রোজা থেকে রামাদানে যাওয়া—এর সঙ্গে তো সাংস্কৃতিক রাজনীতি খুবই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। এটা নানা দেশেই ঘটছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যয়নের জায়গা। আমাদের আলাপ-আলোচনা আগামী কয়েক দশকে অন্য মাত্রা পাবে বলে মনে হয়।

আবুল মোমেন: প্রযুক্তির কারণে একটা বড় রকম পরিবর্তন এসেছে। সেটা সাংস্কৃতিক অঙ্গনেই বেশি বড় ঝাপটা দেবে। এটা যেমন একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, তেমনি সুযোগও তৈরি করেছে। আমরা কোন দিকে যাব, তা এই মুহূর্তে বলতে যাওয়া বোকামি হতে পারে। আমাদের বরং শনাক্ত করা প্রয়োজন, কোন পথে গেলে সবার জন্য অর্থবহ জীবন তৈরি করতে পারি।

ফিরোজ আহমেদ: আমার মনে হয়, এখানে মূল সমস্যা পরিচয়বাদী রাজনীতিতে আধিপত্যের ধারণা। বাঙালিত্ব বা ইসলাম, যেটাই আধিপত্যবাদী রূপ নেয় সেটাই সমস্যাজনক। সংস্কৃতি কথাটাই বহুত্ববাদী। সমাজ মানেই বৈচিত্র্যময় মানুষের সহাবস্থান। এই বহুত্ব রাষ্ট্রকাঠামোতে ধারণ করতে হবে।

পারভীন হাসান: আমাদের মেনে নিতে হবে যে এখানে অনেক ধারা এসে মিশেছে। আমরা বহুসংস্কৃতিবাদের দিকে এগোচ্ছি, এটা স্বীকার করে সবার অবস্থান মেনে নিয়ে এগিয়ে চলতে হবে।

তাহমিদাল জামি: আমাদের ভয়ের অনেক কারণ থাকবে—হয়তো ডানপন্থার উদয় হচ্ছে, অনেক ধরনের সংকট আসছে। তাতে ভীতিবাতিকগ্রস্ততা কোনো কাজে আসবে না। রেনেসাঁর সময়েও সাম্প্রদায়িক সংঘাত ছিল, রামমোহনের যুগে ঔপনিবেশিকতা ছিল—এর মধ্যেই তাঁরা নতুন কিছু গড়ার চেষ্টা করেছেন। আমাদের সংস্কৃতির আলোচনায় শ্রেণির জায়গা কম। এখানে একটা ভদ্রবৃত্ত শ্রেণি গড়ে উঠছে। তাদের মধ্যে আরবি ও ইংরেজিকরণ ঘটবে। জনগণের সংস্কৃতির সঙ্গে তাদের বিচ্ছেদের কারণে ভয়টা বারবার উঠে আসবে। এ ক্ষেত্রে সমাজে কী ঘটছে, তা বোঝার চেষ্টা করা বুদ্ধিজীবীর দায়িত্ব।