জীবন জড়িয়ে যাচ্ছিল মুহুর্মুহু নানা সাংসারিক কৌতূহলে। কেবল বইটাই তখনো প্রকাশ করা হয়ে উঠছিল না। ঠিক এ সময়ে আবারও প্রথম আলোর পাতায় দেখি জীবনানন্দ দাশ পাণ্ডুলিপি পুরস্কারের জন্য পাণ্ডুলিপি জমা নেওয়া হচ্ছে মর্মে বিজ্ঞাপন। ভাবলাম, পাণ্ডুলিপি কি জমা দেব? 

আমি তখন দুটো ছোট্ট শিশুর মা। তাদের জন্যই বরাদ্দ আমার সমস্ত সময়। এর মধ্যেই একদিন সময় নিয়ে আমার কবিতাগুলো খুঁজে খুঁজে জড়ো করলাম। পরে পাণ্ডুলিপি তৈরি করে সেটা দিয়ে এলাম প্রথমার অফিসে।

এরপর ২০১৬ সালে আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশ্য হওয়ার আগে জীবনানন্দ দাশ পাণ্ডুলিপি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলো। আমার জন্য সেই অনুভূতিটা ছিল দারুণ আনন্দের। আদতে পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার পর থেকেই মনে হচ্ছিল যেন পরীক্ষায় বসেছি। এ পরীক্ষা যেমন ছিল নিজের লেখাপত্রের সঙ্গে আমার বোঝাপড়ার, তেমনি বিচারকেরা পাণ্ডুলিপিটি দেখে কী বলেন, সে ভাবনাও ছিল।

পুরস্কার পাওয়ায় অবশেষে প্রথমা প্রকাশন থেকে বইটি বের হয় ২০১৭ সালে। খুবই যত্ন করে বইটি ছেপেছিল তারা। বানান থেকে শুরু করে প্রতিটি ছোট–বড় ব্যাপার নিয়ে এত সচেতনতা আমার মতো নবীন লেখকের জন্য ছিল অন্য রকম এক ভালো লাগার। সবচেয়ে ভালো লেগেছিল শ্রদ্ধেয় শিল্পী মাসুক হেলাল যেদিন আমাকে বইয়ের প্রচ্ছদটা দেখালেন। প্রথম দেখাতেই মনে ধরে প্রচ্ছদ। অবশেষে আমার বই হচ্ছে, সে যে কী অনুভূতি!

পুরস্কার পাওয়ার পর এবং বই হওয়ার আগের সময়টা ছিল আমার জীবনের এক অম্লমধুর অধ্যায়। পাঠকেরা বইটি কীভাবে গ্রহণ করবেন, সে ভাবনা তো ছিলই, এর সঙ্গে ছিল ঈর্ষাকাতর আমারই কিছু বন্ধুর আচরণ নিয়ে কমবেশি তিক্ততার অনুভূতিও।

প্রথম একজন নারী হিসেবে আমি এ পুরস্কার পেয়েছিলাম। আমার পরে অন্য দুজন নারী পুরস্কারটি পেয়েছেন। ফলে আমার জন্য বিষয়টি সহজ ছিল না। কিছু কথা শুনতে হয়েছে কেবল আমি লৈঙ্গিক দিক থেকে একজন নারী বলেই। অবশ্য বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর সব তিক্ততা একেবারেই ধুয়েমুছে যায়।

আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের পড়াপড়ি, লেখালেখির ছোট গণ্ডি—এসব পেরিয়ে হঠাৎই বৃহৎ পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে গেলাম এই পুরস্কার ও বইটির মাধ্যমে। চেনা-অচেনা অনেক মানুষের ভালো লাগা, আমার কবিতার সঙ্গে তাদের নিজেদের অনুভব মিলিয়ে দেখা—সর্বোপরি তাদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসাও এক নতুন অভিজ্ঞতার দরজা উন্মোচন করে দিল আমার সামনে। এ জন্য প্রথমা প্রকাশন ও প্রথম আলোর সাহিত্য পাতার কাছে নিজেকে আমি একধরনের ঋণী মনে করি।