মমতাজের প্রেমে জসীমউদ্​দীন যখন দেওয়ানা, তখন কিশোরী মেয়েটি কি তা বোঝে? অগত্যা মমতাজের নানা মৌলভি ইদ্রিস মিয়াকে নানাভাবে বশে আনার চেষ্টা চালালেন কবি। বিভিন্ন অজুহাতে ওই বাড়িতে যাতায়াত শুরু করলেন। মৌলভি সাহেব কাব্যপ্রেমী মানুষ ছিলেন। তাই তাঁর বাড়িতে কবির আনাগোনাকে স্বাভাবিকভাবেই নিলেন। এভাবে এক দিন, দুই দিন করে মমতাজের ঘর অবধি পৌঁছে গেলেন জসীমউদ্​দীন এবং তাঁকে অবাক করে দিয়ে টেবিল থেকে খাতা নিয়ে লিখলেন:

‘আমারে করিও ক্ষমা

সুন্দরী অনুপমা

তোমার শান্ত নিভৃত আলয়ে

হয়তো তোমার খেলার বাসরে

অপরাধ রবে জমা

আমারে করিও ক্ষমা।’

মমতাজ এবার কবির আকুতি বুঝতে পারলেন। নিজের অজান্তেই তাঁর প্রেমে ডুবে গেলেন। এ প্রসঙ্গে নিজের স্মৃতিকথায় বেগম মমতাজ লিখেছেন, ‘ভদ্রলোক তো আমারে দেখার পর নানা দিক থেইকা আমার নানাভাইকে হাত করার জন্য লাইগা গেল। অনেককে দিয়া সুপারিশ করতে লাগল। ওই যে আমারে দেখল, আমার রূপ তার মনে ধইরা নিল। কবি তো!’

কিছুদিন যেতে না যেতেই নানা মৌলভি ইদ্রিসের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন জসীমউদ্​দীন। এরপর মৌলভি সাহেব যখন বুঝলেন এ বিয়েতে তাঁর নাতনিও রাজি, সে সময় তাঁর রাজি না হওয়ার তো কোনো কারণই নেই, মিয়া-বিবি রাজি তো কিয়া করেগা কাজি।

কিন্তু বাদ সাধলেন মমতাজের বাবা মোহসেনউদ্দিন। তিনি কিছুতেই এই ভবঘুরে কবির কাছে মেয়েকে বিয়ে দেবেন না। একে তো তাঁর বয়স বেশি, তার ওপর চেহারাও কৃষ্ণবর্ণ। এ অবস্থায় দীর্ঘ এক চিঠি লিখলেন তিনি মৌলভি ইদ্রিসের কাছে, ‘আপনি কি পাগল হইয়া গেলেন! এই লোকটা (জসীমউদ্​দীন) পাগল। চরে ঘুরে বেড়ায়। গান গেয়ে বেড়ায়। ভাবের গান, আধ্যাত্মিক গান, মুর্শিদি গান। গানের মজলিশে সারা রাত কান্নাকাটি করে মাটিতে গড়াগড়ি খায়। এই রকম ছেলের সাথে বিয়া দেবেন? তার চাইতে নাতিনকে পদ্মায় ফালাইয়া দেন।’

চিঠি পাওয়ার পর উভয়সংকটে পড়লেন ইদ্রিস সাহেব। তাঁর নিজেরও কবিকে খুব পছন্দ হয়েছিল। তা ছাড়া পাত্র তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষকও বটে।

অতঃপর পাত্র সম্বন্ধে খোঁজখবর নিতে বের হলেন ইদ্রিস সাহেব। কিন্তু নিউমার্কেট এলাকায় কবির মেসের সামনে গিয়ে ‘ধরা’ খেয়ে গেলেন তিনি, তাঁকে ঘরে নিয়ে গিয়ে খুব আপ্যায়ন করলেন জসীম। পরে বললেন, ‘আমার কাছে নাতিন বিয়া দিবেন কি না, কথা দিয়া যাইতে হইব। নইলে আইজকা আপনাকে ছাড়ুম না।’ একবেলা আটক থাকার পর নাতনি বিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে মুক্তি মিলল মৌলভি ইদ্রিসের।

ছাড়া পেয়ে বিয়ের বন্দোবস্ত শুরু করলেন ইদ্রিস সাহেব, ১৯৩৯ সালে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হলো জসীমউদ্​দীন ও বেগম মমতাজের বিয়ে। রবীন্দ্রনাথসহ সব বড় সাহিত্যিকই সেই বিয়েতে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন।

সূত্র: শতবর্ষে জসীমউদ্​দীন বইয়ে প্রকাশিত বেগম মমতাজ জসীমউদ্​দীনের লেখা ‘আমার কবি’


গ্রন্থনা: বাশিরুল আমিন

অন্য আলো থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন