হারুকি মুরাকামির গল্প
ঈশ্বরের সব সন্তানই নাচতে পারে
জাপানের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির ‘আফটার দ্য কোয়েক’—১৯৯৫ সালের হানশিন ভূমিকম্পের ছায়ায় লেখা ছয়টি গল্পের সংকলন। ‘আফটার দ্য কোয়েক’ বইয়ের তৃতীয় গল্প ‘অল গডস চিলড্রেন ক্যান ড্যান্স’-এর বাংলা রূপ ‘ঈশ্বরের সব সন্তানই নাচতে পারে’।
• ভাষান্তর: জিয়া হাশান
জঘন্য রকমের খোঁয়ারি নিয়ে ইয়োশিয়ার ঘুম ভাঙে। ফলে এক চোখ খোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায় আর বাঁ চোখের পাতা নড়তেই চায় না। মনে হয় যেন রাতে পচে যাওয়া দাঁত মাথার ভেতরে গুঁজে ভরে দেওয়া হয়েছে। তাই পচন ধরা মাড়ি থেকে কাদার মতো তরল একধরনের দুর্গন্ধময় রস গড়িয়ে বের হয়ে এসে তার মস্তিষ্ককে কুরে কুরে খেয়ে নিচ্ছে। তাতে যদি সে কোনো বাধ না সাধে তবে তার আর কোনো মস্তিষ্কই থাকবে না। সেটা হলে অবশ্য ভালোই হয়, সবকিছু থেকে মুক্তি মিলে যায়। তবে ইয়োশিয়া এখন কেবল আরেকটু ঘুমোতে চায়। কিন্তু সে জানে, সেটা অসম্ভব। তার শরীর-মন এতটাই খারাপ যে এখন তার ঘুম আসারই কোনো উপায়ই নেই।
ইয়োশিয়া বালিশের পাশে রাখা ঘড়িটা খুঁজে দেখে, তা উধাও। কিন্তু নেই কেন? চশমাও তো নেই। নিশ্চয়ই কোথাও ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। আগেও তো এমন দু–একবার হয়েছে।
এখন উঠতেই হবে। সে চেষ্টা করে সে কোনোমতে শরীরের ওপরের অর্ধেকটা তুলতে পারে, কিন্তু তাতেই মাথার ভেতরটা এলোমেলো হয়ে যায়, আর তার মুখ আবার বালিশের ওপর আছড়ে পড়ে।
টের পায়, পাড়ার ভেতরে একটা ট্রাক ঢুকে কাপড় শোকানোর খুঁটি বিক্রি করছে। মাইকে তার ঘোষণা ভেসে আসছে। পুরোনো খুঁটি দিলে নতুন খুঁটি বদলে দেওয়া হবে। আর তার দাম নাকি বিশ বছর আগের মতোই। এক মধ্যবয়সী লোকের একঘেয়ে, টেনে লম্বা করা কণ্ঠস্বর। তা শুনে ইয়োশিয়ার বমি বমি ভাব আসে, কিন্তু বমি করতে পারে না।
ইয়োশিয়ার এক বন্ধুর মতে, টিভিতে বিনোদনজগতের সাংবাদিকদের চাঁছাছোলা শব্দের বিরক্তিকর কণ্ঠস্বর আপনার পাকস্থলীতে থাকা রাতের খাবারের শেষ দানাটুকু অবধি যেভাবে বের নিয়ে আসে, তেমনিভাবে জঘন্য রকমের খোঁয়ারি থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে ভালো ওষুধ হতে পারে সকালের কোনো টক শো শোনা।
কিন্তু ইয়োশিয়ার এখন টিভির দিকে ঘেঁষে যাওয়ার শক্তিটুকুও নেই। এমনকি কেবল শ্বাস নেওয়াও বেশ কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার চোখের ভেতরে হঠাৎ হঠাৎ এলোমেলো কিন্তু একের পর এক স্বচ্ছ আলো আর সাদা ধোঁয়ার স্রোত মিশে ঘুরে বেড়ায়। ফলে জগৎকে সে অদ্ভুতভাবে ফ্ল্যাট বা সমতল দেখতে পায়। মৃত্যুর বোধ কি এমন? তা যদি হয়, তাহলে এবারে যথেষ্ট হয়ে গেছে হে গড। দয়া করে আর কখনো আমাকে এমন কষ্ট দেওয়ার চেষ্টা কোরো না।
গডের প্রসঙ্গ আসায় ইয়োশিয়ার তার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। তাই তাকে ডেকে পানি চায়, কিন্তু তারপরেই বুঝতে পারে যে সে একা বাড়িতে। মা তিন দিন আগে কয়েকজন নানের সাথে কানসাইয়ে ধর্ম প্রচারে গেছে। বুঝতেই পারছেন, আমি মদ্যপানে চ্যাম্পিয়ন হলেও আমার মা ঠিকই ধর্মভীরু। পৃথিবী গড়ে উঠতে মদ্যপায়ী আর ধার্মিক—এদের সবাইকে লাগে।
ইয়োশিয়ার আবার উঠতে চায়, তবে পারে না। এখনো তার বাঁ চোখ খোলা সম্ভব হয় না। এত বেশি মদ সে কার সাথে খেয়েছে মনে করার চেষ্টা করে; কিন্তু তা–ও পারে না। কারণ, চেষ্টাটুকু করতে গেলেই তার মস্তিষ্কের গভীর অংশ পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। সুতরাং এখন এসব নিয়ে ভেবে সময় নষ্ট করার দরকার নেই। পরে এ ব্যাপারে ভাবা যাবে বলে সে মন স্থির করে।
দুপুর এখনো হয়নি। তবে পর্দার ফাঁক দিয়ে ভেসে আসা আলো দেখে ইয়োশিয়া আন্দাজ করে যে এগারোটা পার হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। সে একটা প্রকাশনা সংস্থার তরুণকর্মী। যেহেতু সে রাতে কাজ করে পুষিয়ে দেয়, তাই দেরি করে অফিসে গেলে তা তার বসের কাছে বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু দুপুরের পর হাজির হলে বস সাধারণত খোঁচা দিয়ে কথা বলে। তবে যে ধর্মভীরু এই চাকরিটা পাইয়ে দিয়েছে, তার কোনো সমস্যা হতে পারে বলে ইয়োশিয়া সেসব খোঁচা গ্রাহ্য করে না।
ঘর থেকে বের হতে হতে আজ তার প্রায় একটা বেজে যায়। অন্য কোনো দিনে, সে কোনো অজুহাত দেখিয়ে ঘরে থাকত, কিন্তু আজ অফিসে একটা ডিস্কে কিছু নথি ফরম্যাট করে প্রিন্ট আউট দেওয়ার কাজ আছে। এ কাজ যেহেতু অন্য কেউ করতে পারবে না, তাই তার অফিসে যাওয়া জরুরি।
ফেরার সময় রাত প্রায় দশটার দিকে কাসুমিগাসেকি স্টেশনের মাটির নিচের রাস্তা দিয়ে উল্টো দিকে যাওয়ার সময় ইয়োশিয়া কানের লতিকাটা লোকটাকে দেখে। তার চুল অর্ধেক ধূসর, বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের মাঝামাঝি—লম্বা, চশমাহীন, গায়ে সেকেলে টুইডের ওভারকোট, ডান হাতে একটা ব্রিফকেস।
মায়ের সাথে সে আসাগায়া এলাকার একটি ফ্ল্যাটে থাকে। সেখান থেকে বের হয়ে সে এলিভেটেড চুয়ো লাইন ধরে ইয়োৎসুয়া অবধি যায়। তারপর মারুনৌচির দিকের সাবওয়ে ধরে কাসুমিগাসেকি অবধি গিয়ে আবার লাইন বদল করে হিবিয়ার দিকের সাবওয়ে ধরে কামিয়া-চোতে গিয়ে নামে। এই স্টেশনের কাছেই তার ছোট বিদেশি ভ্রমণগাইড প্রকাশনা সংস্থার অফিস। প্রতিটি স্টেশনে তার নড়বড়ে পায়ে দীর্ঘ সিঁড়ি চড়াই-উতরাই করতে হয়।
ফেরার সময় রাত প্রায় দশটার দিকে কাসুমিগাসেকি স্টেশনের মাটির নিচের রাস্তা দিয়ে উল্টো দিকে যাওয়ার সময় ইয়োশিয়া কানের লতিকাটা লোকটাকে দেখে। তার চুল অর্ধেক ধূসর, বয়স আনুমানিক পঞ্চাশের মাঝামাঝি—লম্বা, চশমাহীন, গায়ে সেকেলে টুইডের ওভারকোট, ডান হাতে একটা ব্রিফকেস। গভীর চিন্তায় ডুবে থাকা মানুষের মতো ধীর পায়ে সে হিবিয়া লাইনের প্ল্যাটফর্ম থেকে চিয়োদা লাইনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। একমুহূর্তও দ্বিধা না করে তার পিছু নেয় ইয়োশিয়া। তখনই সে টের পায় যে তার গলা পুরোনো চামড়ার টুকরোর মতো শুকিয়ে গেছে।
ইয়োশিয়ার মায়ের বয়স তেতাল্লিশ, কিন্তু দেখতে পঁয়ত্রিশের বেশি মনে হয় না। তার ফরসা চেহারায় চিরায়ত সৌন্দর্য খেলা করে। সাধারণ খাবারদাবার খেয়ে আর সকালে ও সন্ধ্যায় কঠোর ব্যায়াম করে সে তার সুঠাম দেহ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সাথে আছে সতেজ ও আর্দ্র ত্বক। ফলে সে মাত্র আঠারো বছর বড় হওয়ার পরও অনেক সময়ই মানুষ তাকে ইয়োশিয়ার বড় বোন বলে ভুল করে।
তার মধ্যে মা-সুলভ আচার-আচরণ খুব একটা নেই। অথবা তার আচার-আচরণই অদ্ভুত ধরনের। ইয়োশিয়ার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ওঠার পর, যখন সে যৌন বিষয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠে, তখনো মা প্রায়ই বাসার ভেতর সামান্য এক টুকরার আন্ডারওয়্যার পরে, আবার কখনো কখনো কোনো পোশাক-আশাক ছাড়াই ঘোরাফেরা করতেন। যদিও তাদের শোয়ার রুম ছিল আলাদা তবে রাতে একা লাগলে মা প্রায় কিছু না পরেই এসে ইয়োশিয়ার কম্বলের নিচে ঢুকে পড়তেন। যেন কোনো কুকুর বা বিড়ালকে জড়িয়ে ধরছেন—এমন ভঙ্গিতে ইয়োশিয়াকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতেন। ইয়োশিয়া জানত, এ ধরনের আচরণের পেছনে তার মায়ের কোনো অন্য উদ্দেশ্য নেই, তবু ব্যাপারটা তাকে অস্বস্তিতে ফেলত। তখন সে যে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে, তা মাকে বুঝতে না দিয়ে শরীর কুঁকড়ে নিয়ে এক অস্বাভাবিক ভঙ্গিতে শুয়ে থাকত।
তখন নিজের মায়ের সাথে সর্বনাশা কোনো সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার আতঙ্কে ইয়োশিয়া সম্পর্কটা সহজ রাখার জন্য মরিয়া হয়ে কোনো উপায় খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু তেমন কোনো কিছু না পেয়ে সে মাঝে মাঝে মাস্টারবেট করে নেয়। এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক না হয়েও সে পর্ণসামগ্রী বেচার একটা দোকানে ঢুকে খণ্ডকালীন কাজের বেতন থেকে জমানো টাকা দিয়ে কিছু যৌন যন্ত্র কিনে আনে।
ইয়োশিয়া তখন বুঝতে পারে যে মায়ের বাসা ছেড়ে তার আলাদা করে নিজের জীবন শুরু করা দরকার। কলেজে ভর্তি হওয়ার এবং পরে আবার চাকরি নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোয় এ নিয়ে সে ভীষণ দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। তারপরও এখন এই পঁচিশ বছর বয়সে এখনো নিজেকে সেই বন্ধন থেকে ছিঁড়ে আনতে পারেনি। তার একটা কারণ, তার মনে হয়, সে যদি মাকে একা ছেড়ে যায়, তবে মা কী করে বসে তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। তাই মা ভেবে ভেবে যত সব বেপরোয়া, আত্মবিধ্বংসী (যদিও মন থেকে সৎ) পরিকল্পনা নিত, তা বাস্তবায়ন আটকাতে ইয়োশিয়া বছরের পর বছর ধরে বিপুল শক্তি ব্যয় করে আসছে।
তার ওপর, হঠাৎ করে সে বাড়ি ছাড়ছে—এ কথা জানালে যে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটবে, তা অবশ্যম্ভাবী। তার দৃঢ় বিশ্বাস, একদিন তারা আলাদা থাকবে—এ ভাবনা তার মায়ের মাথায় কখনোই আসেনি। তেরো বছর বয়সে ইয়োশিয়া যখন ঘোষণা করে যে সে ধর্ম ত্যাগ করেছে, তখন মায়ের একেবারে ভেঙে পড়া আর মানসিক যন্ত্রণায় ভোগার কথা আজও মনে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে গেঁথে আছে। টানা দুই সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় মা কিছু খায়নি, কিছু বলেনি, একবারও স্নান করেনি, চুল আঁচড়ানি, এমনকি অন্তর্বাসও বদলায়নি। মাসিক এলে কেবল তা কোনোমতে সামলে নিয়েছে। নিজের মাকে এমন নোংরা, দুর্গন্ধময় অবস্থায় ইয়োশিয়া আগে কখনো দেখেনি। আলাদা হয়ে গেলে আবার এমনটা ঘটতে পারে—এই ভাবনাই ইয়োশিয়ার বুকে ব্যথা ধরে যায়।
ইয়োশিয়ার যেন কোনো বাবা নেই। জন্মের পর থেকেই তার জীবনে কেবল তার মা। আর ইয়োশিয়া যখন ছোট, তাকে তখন বারবার মা বলত, ‘তোমার বাবা আমাদের প্রভু’ (তারা তাদের ঈশ্বরকে এভাবেই ডাকে)। ‘আমাদের প্রভুকে স্বর্গের অনেক উঁচুতে থাকতে হয়, সে আমাদের সাথে এখানে নিচে থাকতে পারে না। তবে সে সব সময় তোমার ওপর নজর রাখছে। শোনো ইয়োশিয়া! প্রভু সব সময়ই তোমার মঙ্গলই চায়।’
ছোটবেলায় ইয়োশিয়ার বিশেষ অভিভাবক হিসেবে যিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই মি. তাবাতাও প্রায় একই ধরনের যেসব কথাই বলেছেন:
‘এটা সত্য, এই পৃথিবীতে তোমার কোনো বাবা নেই, আর তুমি এমন নানা ধরনের মানুষের দেখা পাবে, যারা এ নিয়ে তোমাকে বোকার মতো প্রশ্ন করবে। দুর্ভাগ্যবশত, বেশির ভাগ মানুষের চোখ ঝাপসা হয়ে থাকে এবং সত্য দেখতে পারে না ইয়োশিয়া। কিন্তু আমাদের প্রভু, তোমার বাবা, নিজেই এই বিশ্ব। তুমি ভাগ্যবান যে তার ভালোবাসার কোলে জীবন যাপন করছ। তোমাকে তা নিয়ে গর্ব করতে হবে এবং এমন একটি জীবন যাপন করতে হবে, যা সৎ ও সত্য।’
‘আমি জানি,’ নার্সারি স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর একদিন ইয়োশিয়া উত্তর দেয়। ‘কিন্তু ঈশ্বর সবারই, তাই না? বাবা তো আলাদা। প্রত্যেকেরই আলাদা একজন করে বাবা থাকে। তাই না?’
‘শোনো, ইয়োশিয়া। একদিন আমাদের প্রভু, তোমার বাবা, তোমার একমাত্র বাবা হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করবে। তুমি তাকে তখনই দেখবে, যখন এবং যেখানে একদম ভাবতে পারবে না। কিন্তু তুমি যদি সন্দেহ করতে শুরু করো বা বিশ্বাস না করো, তাহলে সে এতটাই হতাশ হতে পারে যে কখনো নিজেকে তোমার সামনে প্রকাশ করবে না। বুঝেছ?’
‘বুঝছি।’
‘আর আমার এসব কথা কি তোমার মনে থাকবে?’
‘মনে রাখব, মি. তাবাতা।’
আসলে মি. তাবাতা যা বলেছে, তা ইয়োশিয়ার কাছে ততটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। কারণ, সে বিশ্বাস করতে পারে না যে সে নিজে ঈশ্বরের বিশেষ ‘সন্তান’। অন্য যেসব ছেলেমেয়েকে সে দেখে, সে তাদের মতোই সাধারণ। এমনকি হয়তোবা তাদের থেকেও কম সাধারণ কোনো ছেলে। তার সাধারণ হওয়ার কারণ, তার এমন কোনো গুণ নেই যাতে তাকে আলাদা করে দেখায়। আর সে সব সময় কিছু না কিছু এলোমেলো করেই ফেলে। স্কুলের দিনগুলো সে এভাবেই কাটায়। তার রেজাল্ট যথেষ্টই ভালো হয় বটে; কিন্তু খেলাধুলায় সে একেবারেই হতাশাজনক হয়ে ওঠে। তার পা ধীর ও সরু, চোখ দূরদৃষ্টিহীন, আর হাত অদক্ষ। বেসবল খেলায় আউটফিল্ডে উঁচুতে ওঠা বল সে বেশির ভাগ সময়ই ধরতে পারত না। তা দেখে তার সহপাঠীরা হতাশ হয়ে পড়ত, আর মেয়ে দর্শকেরা ফিসফিস করে হেসে ফেলত।
সে বিশ্বাস করতে পারে না যে সে নিজে ঈশ্বরের বিশেষ ‘সন্তান’। অন্য যেসব ছেলেমেয়েকে সে দেখে, সে তাদের মতোই সাধারণ। এমনকি হয়তোবা তাদের থেকেও কম সাধারণ কোনো ছেলে। তার সাধারণ হওয়ার কারণ, তার এমন কোনো গুণ নেই যাতে তাকে আলাদা করে দেখায়।
তাই ইয়োশিয়া প্রতি রাতে শোয়ার আগে ঈশ্বরের কাছে, যাকে সে নিজের বাবা বলে ভাবত, তার কাছে প্রার্থনা করত—‘আমি কথা দিচ্ছি, যদি তুমি আমাকে আউটফিল্ডে উঁচুতে ওঠা বলগুলো ঠিকমতো ধরতে দাও, তবে আমি তোমার প্রতি অবিচল বিশ্বাস বজায় রাখব। আপাতত আমি কেবল এটুকুই চাই।’ যদি ঈশ্বর সত্যিই তার বাবা হন, তবে তার পক্ষে অন্তত এটুকু করা তো সম্ভব। কিন্তু তার প্রার্থনার কোনো উত্তর আসে না। আউটফিল্ডে উঁচুতে ওঠা বলগুলো বারবার তার গ্লাভস থেকে পড়ে যেতে থাকে।
‘এর মানে তুমি আমাদের প্রভুকে পরীক্ষা করে দেখছ, ইয়োশিয়া,’ মিস্টার তাবাতা কঠোর স্বরে বলেন। কিন্তু ‘কিছু পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করাতে দোষ নেই, তবে তার চেয়ে বড় কিছুর জন্য প্রার্থনা করো। চোখে দেখা যায়, এমন কোনো নির্দিষ্ট জিনিসের জন্য সময়সীমা বেঁধে দিয়ে প্রার্থনা করা ঠিক নয়।’
ইয়োশিয়ার বয়স যখন সতেরো হয়, তখন তার জন্মের রহস্য যতটুকু সম্ভব তা তার মা বলে দেয়। সে বলে যে এসব জানার জন্য এখন তুমি যথেষ্ট বড় হয়েছ।
‘কৈশোরে আমি গভীর অন্ধকারের মধ্যে বাস করেছি। আমার আত্মা ছিল সদ্য গঠিত কাদামাটির সাগরের মতোই বিশৃঙ্খল। প্রকৃত আলো ঢাকা ছিল ঘন মেঘের আড়ালে। সে কারণেই ভালোবাসাহীন অবস্থায় আমার একাধিক ভিন্ন পুরুষের সঙ্গে “মিলন” হয়। “মিলন” বলতে কী বোঝায়, তুমি তো জানো, তাই না?’
ইয়োশিয়া বলে, সে সত্যিই জানে তার অর্থ কী। যৌনবিষয়ক প্রসঙ্গে তার মা অবিশ্বাস্য রকমের সেকেলে ভাষা ব্যবহার করে। আর জীবনের সেই পর্যায়ে এসে ইয়োশিয়ার নিজেরও ভালোবাসা ছাড়াই একাধিক ভিন্ন মেয়ের সঙ্গে ‘মিলন’ হয়ে গিয়েছে।
মা তার গল্প বলা চালিয়ে যায়, ‘হাইস্কুলের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ই আমি প্রথম প্রেগন্যান্ট হই। তখন প্রেগন্যান্ট হওয়ার অর্থ যে কতটা গভীর, তা আমার একেবারেই জানা ছিল না। আমার এক বান্ধবী আমাকে এক ডাক্তারের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, সে আমার গর্ভপাত করায়। সে খুবই সদয় মানুষ, আর বয়সেও বেশ তরুণ। অপারেশনের পর সে আমাকে গর্ভনিরোধ ব্যবহার করারও উপদেশ দেয়। সে বলে, গর্ভপাত শরীরের পক্ষেও ভালো নয়, আত্মার পক্ষেও নয়। যৌনরোগের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হবে, তাই সব সময় যেন কনডম ব্যবহার করি। এই বলে সে আমাকে কনডমের একেবারে নতুন একটা প্যাকেটও হাতে ধরিয়ে দেয়।
‘আমি তাকে বলেছি যে আমি কনডম ব্যবহার করেছি। তখন সে বলে, “তা হলে নিশ্চয়ই কেউ ঠিকমতো পরেনি। আশ্চর্যের বিষয়, কত কম মানুষই বা কনডম ব্যবহারের সঠিক উপায় জানে।” কিন্তু আমি বোকা নই। গর্ভনিরোধের ব্যাপারে আমি খুবই সতর্ক থেকেছি। আমরা কাপড় খোলার সাথে সাথে আমি নিজেই লোকটার কনডম পরে নেওয়া নিশ্চিত করেছি। এ ধরনের বিষয়ে পুরুষদের ওপর ভরসা করা যায় না। তুমি তো কনডম সম্পর্কে জানো, তাই না?’
ইয়োশিয়া বলে যে সে কনডম সম্পর্কে জানে।
‘কিন্তু তার দুই মাস পরই আমি আবার প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ি। আমি নিজেই তা বিশ্বাস করতে পারিনি। কারণ, আমি সেবার মিলিত হওয়ার সময় সবচেয়ে বেশি সতর্ক ছিলাম। কিন্তু প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ার পর আমার আর কিছুই করার থাকে না, আমাকে আবার সেই একই ডাক্তারের কাছেই যেতে হয়। সে আমাকে একনজর দেখেই বলে “আমি তো তোমাকে সাবধান থাকতে বলেছি। তোমার মাথার ভেতরে আসলে কী আছে?” আমি আর কান্না থামাতে পারিনি। প্রতিবার “মিলন”-এর সময় গর্ভনিরোধের ব্যাপারে আমি কতটা যত্ন নিয়েছি, তা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, কিন্তু সে আমার কথা বিশ্বাস করে না; বরং বলে, “ঠিকমতো পরালে এটা কখনোই ঘটে না।” সে ভীষণ রেগে যায়।
‘যাক, সংক্ষেপে বলি—প্রায় ছয় মাস পর, এক অদ্ভুত ঘটনার ধারাবাহিকতায় শেষ অবধি সেই ডাক্তারের সাথেই আমার “মিলন” হয়ে যায়। তখন তার বয়স তিরিশ, আর সে তখনো অবিবাহিত। কথা বলার দিক থেকে সে খানিকটা একঘেয়ে ধরনের ঠিকই, তবে মানুষ হিসেবে ভদ্র ও সৎ। তার ডান কানের লতি নেই। ছোটবেলায় একটা কুকুর সেটা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলে। একদিন সে রাস্তায় হেঁটে যাচ্ছিল, হঠাৎ এমন একটা বড় কালো কুকুর, যাকে সে আগে কখনো দেখেনি, ডাক্তারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার কানের লতিটা কামড়ে ছিঁড়ে নিয়ে যায়। সে অনেকবার বলেছে, শুধু কানের লতিটা হারিয়েছে বলে সে খুশি, কানের লতি ছাড়াও মানুষ বাঁচতে পারে। কিন্তু নাক হলে ব্যাপারটা আলাদা হতো। এই কথায় আমি তার সাথে একমত হয়েছি।
“মিলন” বলতে কী বোঝায়, তুমি তো জানো, তাই না?’ ইয়োশিয়া বলে, সে সত্যিই জানে তার অর্থ কী। যৌনবিষয়ক প্রসঙ্গে তার মা অবিশ্বাস্য রকমের সেকেলে ভাষা ব্যবহার করে। আর জীবনের সেই পর্যায়ে এসে ইয়োশিয়ার নিজেরও ভালোবাসা ছাড়াই একাধিক ভিন্ন মেয়ের সঙ্গে ‘মিলন’ হয়ে গিয়েছে।
‘তার সাথে থাকায় আমি যেন আমার পুরোনো সত্তা ফিরে পাই। তাই তার সাথে “মিলন”-এর সময় আমার মাথায় আর কোনো অস্বস্তিকর চিন্তা আসেনি। এমনকি তার ছোট্ট কানের দিকটাও আমার ভালো লাগতে শুরু করে। সে নিজের কাজের প্রতি এতটাই নিবেদিত যে আমরা বিছানায় থাকাকালেও সে আমাকে কনডম ব্যবহারের ওপর বক্তৃতা দেয়—কখন, কীভাবে পরাতে হবে, আর কখন, কীভাবে খুলতে হবে। মনে হতে পারে, এতে গর্ভনিরোধ একেবারে নির্ভুল হওয়ার কথা, কিন্তু শেষ অবধি আমি আবারও প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ি।’
ইয়োশিয়ার মা তার ডাক্তার-প্রেমিকের কাছে গিয়ে বলে যে তার মনে হচ্ছে প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়েছি। ডাক্তার তখন পরীক্ষা করে নিশ্চিত করে যে সত্যিই তা-ই। কিন্তু সে সন্তানের বাবা হওয়ার কথা স্বীকার করে না।
সে বলে ‘আমি একজন পেশাদার ডাক্তার, গর্ভনিরোধের ব্যাপারে আমার পদ্ধতি নিয়েছি তা নিয়ে কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সুতরাং এর মানে, তুমি নিশ্চয়ই অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক করেছ।’
ইয়োশিয়ার মা বলে, ‘ফলে আমি ভীষণভাবে মুষড়ে পড়ি। তার এ কথা বলার পর আমি এতটাই রেগে যাই যে আমি আমার শরীরের কাঁপাকাঁপি বন্ধ করতে পারি না। তুমি কি বুঝতে পারছ, এটা আমাকে কতটা গভীরভাবে আঘাত করে?’
ইয়োশিয়া বলে, সে বুঝতে পেরেছে।
‘আমি যখন তার সাথে ছিলাম, তখন আর কোনো পুরুষের সঙ্গে আমার কখনোই “মিলন” হয়নি, একবারও না। কিন্তু সে আমাকে একধরনের চরিত্রহীন নারী বলেই ধরে নেয়। তাই তার সাথে সেটাই হয়ে দাঁড়ায় আমার শেষ দেখা। তবে আমি গর্ভপাতও করাইনি; বরং আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নিই। তাই ঠিক করি আমি ওশিমাগামী একটি নৌকায় উঠব, আর ডেক থেকে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আমি তা করতামও যদি না মিস্টার তাবাতা আমাকে রাস্তায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতে দেখে কথা বলতেন। মরতে আমার একটুও ভয় ছিল না। অবশ্য, আমি যদি তখন মারা যেতাম, তবে তুমি এই পৃথিবীতে জন্মাতেই না, ইয়োশিয়া। কিন্তু মিস্টার তাবাতার দেখানো পথ ধরে আজ আমি সেই “উদ্ধারপ্রাপ্ত মানুষ” হয়ে উঠেছি, যাকে তুমি আজ চেনো। শেষ পর্যন্ত আমি প্রকৃত আলো খুঁজে পেয়েছি। আর অন্যান্য ধার্মিকদের সহায়তায়ই আমি তোমাকে এই পৃথিবীতে এনেছি।’
ইয়োশিয়ার মাকে তখন মি. তাবাতা এই কথা বলে:
‘তুমি সর্বাধিক কঠোর গর্ভনিরোধের ব্যবস্থা নিয়েছিলে, তবু তুমি প্রেগন্যান্ট হয়েছ। শুধু তা–ই নয়, একটানা তিনবার। তুমি কি মনে করো, এমন ঘটনা কাকতালীয়ভাবে ঘটতে পারে? আমি অন্তত তা মনে করি না। তিনটা “কাকতাল” আর কাকতাল থাকে না। সংখ্যা তিন—এটাই সেই সংখ্যা, যার মাধ্যমে আমাদের প্রভু তাঁর ঐশী বাণী প্রকাশ করেন। শোনো ওসাকি, অন্য কথায়, তোমার একটা সন্তানের জন্ম দেওয়াই আমাদের প্রভুর ইচ্ছা। তুমি যে শিশুকে গর্ভে ধারণ করেছ, সে কোনো সাধারণ মানুষের সন্তান নয়, ওসাকি, সে স্বর্গের প্রভুর সন্তান, তাই এটা ছেলে হবে। আর আমি তার নাম রাখব ইয়োশিয়া, যার অর্থ এটা মঙ্গলের জন্য।’
‘আর মি. তাবাতার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী যখন সত্যিই আমার একটি ছেলে জন্ম নেয়, তখন তারা তার নাম রাখে ইয়োশিয়া।’ এরপর ইয়োশিয়ার মা ঈশ্বরের দাসী হিসেবে জীবন যাপন করতে শুরু করে, আর কোনো পুরুষের সঙ্গে তাঁর আর কোনো সম্পর্ক থাকে না।
‘তা হলে,’ কিছুটা দ্বিধার সাথে ইয়োশিয়া তার মাকে বলে, ‘জৈবিক দিক থেকে বলতে গেলে, আমার বাবা তো সে-ই ডাক্তারই, যার সাথে তুমি সম্পর্কে গিয়েছিলে।’
‘মিথ্যে কথা!’ চোখে আগুনের ঝিলিক তুলে চেঁচিয়ে ওঠে তার মা। ‘সে গর্ভরোধের যে ব্যবস্থা নিয়েছিল, তাতে কোনো ফাঁকফোকর ছিল না। মি. তাবাতা ঠিকই বলেছে, তোমার পিতা আমাদের প্রভু। তুমি এই পৃথিবীতে এসেছ কোনো শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে নয়; বরং আমাদের প্রভুর ইচ্ছার ফল হিসেবে।’
তার মায়ের বিশ্বাস অবিচল, কিন্তু ইয়োশিয়াও সমানভাবে নিশ্চিত হয়ে যায় যে তার বাবা সেই ডাক্তার। কনডমে নিশ্চয়ই কোথাও গলদ ছিল, এর বাইরে আর কোনো ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য নয়।
‘ডাক্তার কি জানে যে তুমি আমাকে জন্ম দিয়েছ?’
‘আমার মনে হয় না জানে,’ তার মা বলে। ‘এরপর আর কখনো তাকে দেখিনি, কোনোভাবেই তার সাথে যোগাযোগও করিনি। সে সম্ভবত কিছুই জানে না।’
কাসুমিগাসেকি স্টেশনে দেখা লোকটা আবিকোর দিকে যাওয়া চিয়োদা লাইনের ট্রেনে উঠে পড়ে। তার পিছু নিয়ে ইয়োশিয়াও একই বগিতে ঢোকে। তখন রাত সাড়ে দশটা পার হওয়া সারা। তাই ট্রেনে যাত্রীও খুব কম। লোকটা একটা আসনে বসে তার ব্রিফকেস থেকে ম্যাগাজিন বের করে। সেটা মনে হয় যেন কোনো ধরনের পেশাগত জার্নাল। তার মুখোমুখি বসে ইয়োশিয়া নিজের হাতের পত্রিকা পড়ার ভান করে। লোকটা দেখতে ছিপছিপে গড়নের, চেহারায় গভীরভাবে খোদাই করা গভীর রেখা, আর ভাবসাবে একধরনের আন্তরিকতা। তার মধ্যে কিছুটা ডাক্তারসুলভ ভাবও চোখে পড়ে। বয়সও যেন মিলে যাওয়া, আর তার একটা কানে, মানে ডান দিকের লতিটা কুকুরের কামড়ে ছিঁড়ে গেলে যেমন হয়, তেমন বলেই বলা যায়।
ইয়োশিয়া নিজ থেকেই বুঝতে পারে যে তার জৈবিক পিতা এই লোকটাই। অথচ এই লোকের হয়তোবা কোনো ধারণাই নেই যে তার এমন একটা ছেলে আছে। আর ইয়োশিয়া যদি এখনই তাকে সব কথা জানিয়েও দেয়, তবু সে সবকিছু মেনে নেবেন—এমন সম্ভাবনাও খুব কম। কারণ, শেষ অবধি সে একজন পেশাদার ডাক্তার, যার গর্ভরোধের পদ্ধতি প্রশ্নাতীত, একেবারেই ত্রুটিমুক্ত বলেই ধরা হয়ে থাকে।
ট্রেনটা শিন-ওচানোমিজু, সেনদাগি ও মাচিয়া—এই সব সাবওয়ে স্টেশন পার হয়ে মাটির ওপরে উঠে আসে। প্রতিটি স্টেশনে যাত্রীর সংখ্যা কমতে থাকে। তবে লোকটা এক মুহূর্তের জন্যও তার ম্যাগাজিন থেকে চোখ সরায় না, কিংবা নিজের আসন ছাড়বে—এমন কোনো আলামত তার আচরণে দেখা দেয় না। নিজের হাতে ধরা পত্রিকার ওপর দিয়ে তাকে লক্ষ করতে করতে ইয়োশিয়ার মনে আগের রাতের কিছু খণ্ডচিত্র ভেসে ওঠে। সে কলেজের এক পুরোনো বন্ধু আর সে বন্ধুর পরিচিত দুই মেয়ের সঙ্গে রোপ্পঙ্গিতে মদ্যপান করতে গিয়েছিল। বার থেকে একটা ক্লাবে যাওয়ার কথা তার মনে আছে, কিন্তু নিজের সঙ্গিনীর সঙ্গে সে আদৌ শুয়েছিল কি না, তা আর মনে পড়ে না। সম্ভবত না, সে নিজেই এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। কারণ, সে এতটাই মাতাল হয়ে পড়েছিল, তখন শারীরিক সম্পর্কে যাওয়ার মতো অবস্থা আর ছিল না।
ইয়োশিয়ার হাতে ধরা পত্রিকায় ভূমিকম্প–সংক্রান্ত খবরে ভরা। ভূমিকম্পের সময় তার মা আর তার সাথের নানরা সম্ভবত গির্জার ওসাকা কেন্দ্রে ছিল। পরদিন থেকে প্রতিদিন সকালে তারা নিজেদের ব্যাকপ্যাক ভরে নানা রসদ নিয়ে ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত এলাকায় যাতায়াতকারী ট্রেনে যত দূর সম্ভব যায়, তারপর ধ্বংসস্তূপে ছেয়ে থাকা মহাসড়ক ধরে হেঁটে বাকি পথটা পাড়ি দেয় কোবের দিকে। সেখানে গিয়ে তারা ভূমিকম্প-পীড়িতদের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস বিতরণ করে। ফোনে তার মা তাকে একদিন বলে যে তার ব্যাগের ওজন প্রায় পঁয়ত্রিশ পাউন্ডের মতো। ইয়োশিয়ার কাছে কোবে যেন আলোকবর্ষ দূরের কোনো জায়গা। সে জায়গা ঠিক ততটাই দূরের যতটা দূরে মনে হয় তার সামনে বসা নিজের ম্যাগাজিনে ডুবে থাকা লোকটাকে।
প্রাইমারি পাস না করা অবধি ইয়োশিয়া প্রতি সপ্তাহে একবার তার মায়ের সাথে মিশনারি কাজে বের হয়েছে। তখন দেখেছে যে চার্চের আর সবার তুলনায় মায়ের প্রচারণার ফলই হয়েছে সবচেয়ে ভালো। মা তখন এতটাই তরুণী ও সুন্দরী, আর দেখতে এতটাই ভদ্রঘরের (আসলে সে সত্যিকারের ভদ্রঘরের মেয়ে) যে মানুষ সাধারণত তাকে পছন্দ করে ফেলে। তার সাথে আবার এই ছোট্ট, মিষ্টি একটা ছেলে। ফলে মা কোথাও হাজির হলে অধিকাংশ মানুষই নিজেদের সতর্কতা ঢিলে করে দেয়। তারা ধর্মে আগ্রহী না-ও হতে পারে, তবে মায়ের কথা শুনতে উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। সে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে গেছে। তার তখন পরনে থাকত সাধারণ তবে শরীরের সঙ্গে মানানসই একটা স্যুট। সে হাতে হাতে প্রচারপত্র বিলি করেছে আর শান্ত স্বরে ধর্মের আনন্দের বিষয়গুলো তুলে ধরেছে।
‘আপনারা কখনো যদি কোনো কষ্ট বা সমস্যায় পড়েন, তাহলে অবশ্যই আমাদের কাছে আসবেন,’ তাদের সে বলেছে। ‘আমরা কখনো জোর করি না—আমরা শুধু প্রস্তাব দিই,’ চোখে আলোর ঝলক তুলে আন্তরিক কণ্ঠে সে যোগ করেছে। ‘এক সময় ছিল, যখন আমার আত্মা গভীরতম অন্ধকারে পথ হারিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। তারপর আমাদের ধর্মের শিক্ষার মাধ্যমে আমি উদ্ধার হই। তখন আমি এই সন্তানটাকে গর্ভে ধারণ করেছিলাম, আর তাকে নিয়ে আমি নিজে এক ভয়াবহ- জীবন দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু স্বর্গে যিনি আছেন, তাঁর করুণার হাতেই আমি রক্ষা পাই। আর এখন আমার ছেলে আর আমি আমাদের প্রভুর পবিত্র আলোর মধ্যেই জীবন যাপন করছি।’
ইয়োশিয়া নিজ থেকেই বুঝতে পারে যে তার জৈবিক পিতা এই লোকটাই। অথচ এই লোকের হয়তোবা কোনো ধারণাই নেই যে তার এমন একটা ছেলে আছে। আর ইয়োশিয়া যদি এখনই তাকে সব কথা জানিয়েও দেয়, তবু সে সবকিছু মেনে নেবেন—এমন সম্ভাবনাও খুব কম।
মায়ের সাথে অপরিচিত মানুষের দরজায় কড়া নাড়তে ইয়োশিয়ার কখনোই লজ্জা লাগেনি। ফলে তখন তার মা তার প্রতি বিশেষভাবে স্নেহশীল হয়ে ওঠে, তার হাতে সব সময়ই পায় উষ্ণ ছোঁয়া। এতবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের হয়েছে যে কোনো এক দিন কারও মুখ থেকে সামান্য একটি সদয় কথা শুনলেই তখন ইয়োশিয়ার আনন্দ আরও বেড়ে গেছে। আর যখন তারা নতুন কাউকে ধর্মে রাজি করাতে পেরেছে, তখন তা তাকে গর্বে ভরে দিয়েছে। তার মনে হয়েছে, হয়তো এবার আমার পিতা ঈশ্বর আমাকে তাঁর সন্তান হিসেবে চিনে নেবে।
কিছুদিন পরই, যখন উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ইয়োশিয়া ধর্মত্যাগের ঘোষণা দেয়। কারণ, সে যেমন নিজের স্বাধীন অস্তিত্বকে উপলব্ধি করতে শুরু করে, তেমনি সাধারণ মূল্যবোধের সাথে সংঘর্ষপূর্ণ ধর্মের কঠোর নিয়ম মেনে চলা তার জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে। কিন্তু সবচেয়ে মৌলিক ও চূড়ান্ত কারণ ছিল তার পিতার, অর্থাৎ ঈশ্বরের—অবিরাম শীতলতা: তার আঁধার করা, ভারী, নিঃশব্দ পাথরের হৃদয়। ইয়োশিয়ার ধর্মত্যাগ তার মায়ের জন্য গভীর দুঃখের কারণ হয়ে ওঠে বটে; তবে তারপরও ইয়োশিয়া তার সিদ্ধান্তে অবিচল হয়ে থাকে।
ট্রেনটা টোকিওর প্রায় বাইরে চলে এসেছে। চিবা প্রিফেকচারে ঢোকার আগে আর মাত্র এক-দুটি স্টেশন বাকি। এমন সময় লোকটা তার ম্যাগাজিনটি ব্রিফকেসে গুছিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ায় এবং দরজার দিকে এগোয়। প্ল্যাটফর্ম অবধি তার পিছু নেয় ইয়োশিয়া। লোকটা গেট পার হওয়ার সময় গার্ডকে একটা পাস একঝলক দেখিয়ে এগিয়ে যায়। কিন্তু এত দূরের স্টেশনের জন্য বাড়তি ভাড়া দিতে ইয়োশিয়াকে লাইনে দাঁড়াতে হয়। তবু সে যখন ঠিকই ট্যাক্সির লাইনে পৌঁছায়, ঠিক তখনই লোকটা তার ট্যাক্সিতে উঠে বসেছে। তাই পরের ট্যাক্সিতে উঠে ইয়োশিয়া মানিব্যাগ থেকে একেবারে নতুন একটা দশ হাজার ইয়েনের নোট বাড়িয়ে ধরে চালককে বলে, ‘ওই ট্যাক্সিকে ফলো করো।’
চালক সন্দেহভরা চোখে ইয়োশিয়ার দিকে তাকায়, তারপর টাকার দিকে চোখ যায়— ‘কোনো মব-টবের ব্যাপার নাকি?’
‘সে নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না’ ইয়োশিয়া বলে। ‘শুধু একজনকে ফলো করছি।’
চালক দশ হাজার ইয়েনের নোটটা নিয়ে ফুটপাত থেকে নেমে গাড়ি ছোটায়, ‘ঠিক আছে, কিন্তু সাথে ভাড়াটাও। মিটার চালিয়ে দিয়েছি।’
দুটো ট্যাক্সি রাস্তার দুই পাশের ঝাঁপ নামানো দোকানের সারি পেরিয়ে ছুটে চলে, অন্ধকার ও ফাঁকা কয়েকটা প্লট পার হয়, আলোভরা হাসপাতালের জানালার পাশ দিয়ে যায়, তারপর বাক্সের মতো ছোট ছোট বাড়ি নিয়ে গড়ে ওঠা একটা নতুন আবাসিক এলাকার ভেতর ঢুকে পড়ে। তার রাস্তাগুলো প্রায় ফাঁকাই, তাই ফলো করতে কোনো অসুবিধা হয় না। তেমন কোনো উত্তেজনাও দেখা দেয় না। ইয়োশিয়ার চালক যথেষ্ট বুদ্ধিমান, সে নিজের ট্যাক্সি আর সামনেরটার মাঝে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে চলে।
‘লোকটা কি কোনো পরকীয়ার সাথে জড়িত?’
‘না,’ ইয়োশিয়া বলে। ‘হেড-হান্টিং। একজন লোককে নিয়ে দুটো কোম্পানির টানাটানি।’
‘তাই নাকি? জানতাম আজকাল কোম্পানিগুলো লোকের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছে, কিন্তু ব্যাপারটা যে এত খারাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটা বুঝিনি।’
এখন রাস্তার ধারে প্রায় কোনো বাড়িঘরই নেই। নদীর পাড় ঘেঁষে এগিয়ে গিয়ে ঢুকেছে কারখানা আর গুদামঘরে সারি দেওয়া এক এলাকায়। এখানে মাটি ফুঁড়ে উঠে আসা নতুন নতুন ল্যাম্পপোস্টই কেবল চোখে পড়ে। রাস্তার পাশে লম্বা একটা উঁচু কংক্রিটের টানা দেয়াল, যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানেই সামনের ট্যাক্সিটি হঠাৎ থেমে যায়। ব্রেকলাইট জ্বলে ওঠায় সতর্ক হয়ে ইয়োশিয়ার চালক নিজের ট্যাক্সি অন্য গাড়িটার প্রায় এক শ গজ পেছনে থামায় এবং হেডলাইট নিভিয়ে দেয়। মাথার ওপরের বাতিগুলোর কড়া ও নির্মম আলো পিচঢালা রাস্তায় গড়িয়ে যায়। এখানে দেখার মতো কিছুই নেই। কেবল দেয়ালটা যেন দুনিয়ার বাকি সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে তার ওপরের ঘন কাঁটাতারের মুকুট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেক দূরে সামনের ট্যাক্সির দরজা খুলে যায়, আর কানের লতি-খোয়ানো লোকটা নেমে পড়ে। ইয়োশিয়া প্রথমে দেওয়া দশ হাজার ইয়েনের ভাড়ার বাইরে ড্রাইভারের হাতে আরও দুটো দুই হাজার ইয়েনের নোট গুঁজে দেয়।
‘এত দূর এই জায়গায় আপনি আর কোনো ট্যাক্সি পাবেন না। আমি কি আশপাশে অপেক্ষা করব?’ চালক জিজ্ঞেস করে।
‘অপেক্ষা করতে পারো,’ বলে ইয়োশিয়া গাড়ি থেকে নেমে যায়।
লোকটা ট্যাক্সি ছেড়ে নামার পর আর একবারও মাথা না তুলে সাবওয়ে প্ল্যাটফর্মে যেমন ধীর, স্থির গতিতে হাঁটছিল, ঠিক সেই একই ছন্দে কংক্রিটের দেয়াল ঘেঁষে সোজা এগিয়ে যেতে থাকে। তাকে দেখে মনে হয় যেন নিখুঁতভাবে তৈরি কোনো যান্ত্রিক পুতুল চুম্বকের টানে টেনে টেনে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। ইয়োশিয়া কোটের কলারটা তুলে দেয় এবং তার ফাঁক দিয়ে মাঝেমধ্যে সাদা নিশ্বাসের মেঘ ছাড়তে ছাড়তে লোকটার পিছু নেয়। তবে এতটাই দূরে থেকে যে চোখে পড়ার ভয় নেই। তার কানে আসে কেবল পিচঢালা পথে লোকটার চামড়ার জুতোর অচেনা, একঘেয়ে আওয়াজ। তবে ইয়োশিয়ার রাবারের সোল দেওয়া জুতোয় কোনো শব্দ ওঠে না।
এখানে মানুষের জীবনের কোনো চিহ্নই চোখে পড়ে না। জায়গাটাকে মনে হয় স্বপ্নের ভেতর তৈরি করা কোনো কল্পিত মঞ্চসজ্জা। কংক্রিটের দেয়াল যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে একটি গাড়ির ভাঙারি। তাকে মনে হয় তারের জালের বেড়া দিয়ে ঘেরা ভাঙা গাড়ির স্তূপে তৈরি এক পাহাড়। শুকিয়ে যাওয়া ধাতব টুকরাগুলোর সেই স্তূপকে ল্যাম্পপোস্টের গ্যাস-বাতির সমতল আলোয় বর্ণহীন এক পিণ্ড বলে মনে হয়। তা পার হয়ে লোকটা সোজা সামনে এগিয়েই চলে।
ইয়োশিয়া ভাবে, এমন নির্জন জায়গায় ট্যাক্সি থেকে নামার মানে কী হতে পারে। লোকটা কি তবে বাড়ির দিকেই যাচ্ছে না? নাকি পথ একটু ঘুরে নেওয়ার ইচ্ছে? কিন্তু ফেব্রুয়ারির এই ভীষণ ঠান্ডা রাতে হাঁটা তো কষ্টকর। মাঝেমধ্যে জমাট ঠান্ডা বাতাস রাস্তা ধরে ছুটে এসে ইয়োশিয়ার পিঠে সজোরে ধাক্কা দিয়ে যায়।
গাড়ি-ভাঙারির স্তূপ যেখানে শেষ, সেখান থেকেই আবার শুরু হয়েছে দীর্ঘ নিষ্ঠুর কংক্রিটের এক দেয়াল—মাঝে শুধু সরু একটি গলির মুখ। জায়গাটা লোকটার কাছে পরিচিত বলেই মনে হয়। তাই সে কোণ ঘুরতে তার একমুহূর্তও দ্বিধা করে না। গলিটা বেশ অন্ধকার। তাই তার ভেতরে ইয়োশিয়া কিছুই দেখতে পায় না। একমুহূর্ত সে থমকায়, কিন্তু এত দূর এসে এখন আর হাল ছাড়া যাবে না, তাই লোকটার পিছু পিছু গলির ভেতর ঢুকে পড়ে।
কলেজজীবনের পুরো সময়ে ইয়োশিয়াকে তার বান্ধবী ডাকত ‘বিশাল ব্যাঙ’ বলে। কারণ, নাচতে শুরু করলে তাকে নাকি বড়সড় এক ব্যাঙের মতো দেখায়। সে প্রায়ই ইয়োশিয়াকে টেনেহিঁচড়ে ক্লাবে নিয়ে যেত। আর হাসতে হাসতে বলত, ‘এই লম্বা হাত-পা দুটো যেভাবে ঝাপটাও, দারুণ লাগে! বৃষ্টির মধ্যে ব্যাঙের মতো দেখায়!’
দুপাশে উঁচু দেয়ালের মাঝে চিপা সোজা রাস্তাটায় দুজন মানুষের পাশাপাশি চলার মতোও প্রায় জায়গা নেই, আর অন্ধকারটা যেন রাতের সমুদ্রের তলদেশ। ইয়োশিয়ার ভরসা শুধু লোকটার জুতোর শব্দ। লোকটার চামড়ার জুতো মাটিতে পড়ে যে টকটক আওয়াজ তোলে, তা একই অবিচ্ছিন্ন ছন্দে সামনে এগিয়ে চলায় সে শব্দটাকেই আঁকড়ে ধরে প্রায় ঝুলে থাকার মতো করে ইয়োশিয়া আলোহীন এই জগতের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যায়। তারপর একসময়ে এসে হঠাৎ আর কোনো শব্দই পায় না।
লোকটা কি বুঝে ফেলেছে যে তাকে অনুসরণ করছি? তাই কি এখন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পড়েছে—শ্বাস আটকে রেখে, পেছনে কী আছে তা দেখার আর শোনার জন্য সব ইন্দ্রিয় টান টান করে রেখেছে? অন্ধকারে তাই ইয়োশিয়ার বুকটা কুঁকড়ে যায়। কিন্তু ধুর, যা হবে হোক, ভেবে নিয়ে সে হৃৎকম্পনের ধুকপুকানি দমন করে এগিয়ে চলে। তাকে অনুসরণ করার জন্য যদি সে চিৎকার করে, করুক। আর ধরা পড়ে গেলে শুধু সত্যিটাই বলব। কারণ, ভুল–বোঝাবুঝি মেটানোর সেটাই সবচেয়ে সহজ উপায়।
কিন্তু গলিটা এসে শেষ হয়ে যায় একেবারে বদ্ধ একটা জায়গায়, শিট-ধাতু দিয়ে তৈরি একটা বেড়ায় পথ আটকানো। কয়েক সেকেন্ড খুঁজে ইয়োশিয়া ফাঁকটা পায়, যেখানে কেউ ধাতুটা বাঁকিয়ে দিয়েছে, এতটাই ফাঁক যে একজন মানুষ কোনোমতে গলিয়ে যেতে পারে। সে নিজের কোটের ঝুলটা গুছিয়ে নিয়ে আর চেপে-চুপে সেই ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে।
বেড়ার ওপাশে এক বিশাল খোলা জায়গা। তবে সেটা কোনো ফাঁকা প্লট নয়, কোনো ধরনের খেলার মাঠ। ফ্যাকাশে চাঁদের আলোয় কিছুর খোঁজে ইয়োশিয়া চোখ কুঁচকে তাকায়; কিন্তু লোকটাকে পায় না। সে যেন উধাও।
ইয়োশিয়া তখন টের পায় যে একটা বেসবল মাঠের আউটফিল্ডের অনেকটা ভেতরে, পায়ে মাড়ানো আগাছার বিস্তীর্ণ অংশের মধ্যে কোথাও সে দাঁড়িয়ে আছে। যে জায়গাটায় সাধারণত সেন্টার ফিল্ডার দাঁড়ায়, সেখানকার নির্ঘাস খোলা মাটি অনেকটা দাগের মতো দেখা যায়। দূরের হোম প্লেটের ওপরে ব্যাকস্টপটা কালো ডানার জোড়ার মতো উঁচু হয়ে আছে। পিচারের মাউন্ডটা মানে মাটির সামান্য উঁচু ঢিবিটা আরও কাছে। উঁচু ধাতব বেড়ায় পুরো আউটফিল্ডটা ঘেরা। ঘাসের ওপর দিয়ে এক ঝাপটা হাওয়া বয়ে যায়, সে সাথে করে অন্য কোথাও নয়; বরং শূন্যের দিকে নিয়ে যায় একটা ফাঁকা পটেটো চিপসের প্যাকেট।
কিছু একটা ঘটার অপেক্ষায় ইয়োশিয়া কোটের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে শ্বাস চেপে ধরে। কিন্তু কিছুই ঘটে না। তাই সে পয়লা ডান দিকের আউটফিল্ডটার দিকে তাকায়, তারপর বাঁ দিকের ও পিচারের মাউন্ড আর নিজের পায়ের নিচের মাটির দিকে। শেষে চোখ তোলে আকাশ পানে। দেখে সেখানে কয়েক টুকরা মেঘ ঝুলে আছে, চাঁদের আলো তাদের শক্ত ধারগুলো অদ্ভুত এক রঙে রাঙিয়ে তুলেছে। ঘাসের গন্ধের সাথে কুকুরের পায়খানার এক ঝাঁজালো গন্ধ ভেসে আসে। এসবের ভেতর দিয়ে লোকটা কোনো চিহ্ন না রেখেই অদৃশ্য হয়ে গেছে।
মিস্টার তাবাতা যদি এখানে থাকত, তবে নিশ্চয়ই বলত, ‘দেখছ তো ইয়োশিয়া, আমাদের প্রভু সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত রূপেই নিজেকে আমাদের সামনে প্রকাশ করেছেন।’ কিন্তু মিস্টার তাবাতা তো আগেই মারা গেছে।
তিন বছর আগে মূত্রনালির ক্যানসারে সে মারা যায়। তার জীবনের শেষ কয়েক মাসের যন্ত্রণা চোখে দেখা অসহ্য হয়ে উঠেছিল। তবে সেই পুরো সময়ে কি সে একবারও ঈশ্বরকে পরীক্ষা করেনি? একবারও কি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে সে ভয়ংকর ব্যথা থেকে সামান্য স্বস্তি চায়নি? নিজের কঠোর বিধিনিষেধ সে এমন নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছে এবং ঈশ্বরের সাথে এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জীবন কাটিয়েছে যে, অন্য সবার চেয়ে সে-ই তো এমন প্রার্থনা করার যোগ্য ছিল (যদিও তা হতো নির্দিষ্ট ও সীমিত সময়ের জন্য)। আর তা ছাড়া ইয়োশিয়ার মনে হয়, যদি ঈশ্বরের পক্ষে মানুষকে পরীক্ষা করা ঠিক হয়, তবে মানুষের পক্ষে ঈশ্বরকে পরীক্ষা করা কেন ভুল হবে?
আমি এ থেকে আসলে কী পেতে চাইছি?—এগিয়ে যেতে যেতে ইয়োশিয়া নিজেকে প্রশ্ন করে। আমি কি এমন কোনো বন্ধন নিশ্চিত করতে চাইছি, যা আমাকে এখন এখানে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে? আমি কি চাইছি কোনো নতুন কাহিনির সাথে জড়াতে, আরও স্পষ্ট, আরও ভালোভাবে নির্ধারিত কোনো ভূমিকা পেতে? না। সে ভাবে, তা নয়। আমি যে বৃত্তাকারে ধাওয়া করছি, সেটা নিশ্চয়ই আমার ভেতরের অন্ধকারের লেজটাকেই। কেবল হঠাৎ তার একঝলক দেখেছি, তারপর তাকে অনুসরণ করেছি, আঁকড়ে ধরেছি, আর শেষে তাকে আরও গভীরে আন্ধকারে উড়ে যেতে দিয়েছি। আমি নিশ্চিত, আর কখনোই তাকে দেখব না।
ইয়োশিয়ার আত্মা তখন সময় ও স্থানের এক বিশেষ বিন্দুর নিস্তব্ধতা আর স্বচ্ছতার ভেতর থির হয়ে থাকে। লোকটা যদি তার বাবা হয়, বা ঈশ্বর, কিংবা কেবলই কোনো অচেনা মানুষ, যার ডান কানের লতিটা হঠাৎ হারিয়ে গেছে, তাতে আর কী আসে যায়? এখন আর তার কাছে কোনো পার্থক্যই নেই। আর এই অনুভূতিটাই যেন নিজেই এক প্রকাশ, একধরনের ধর্মানুষ্ঠান: তবে কি তার উচিত ছিল প্রশংসার গান গাওয়া?
সে বেসবল খেলার ‘পিচার-ঢিবি’–তে উঠে পড়ে এবং তাতে পা রাখার ক্ষয়ে যাওয়া জায়গাটার ওপর দাঁড়িয়ে পুরো উচ্চতায় নিজেকে মেলে ধরে। আঙুলগুলো পরস্পর জড়িয়ে সে দুই হাত আকাশের দিকে তোলে, রাতের ঠান্ডা বাতাসে ফুসফুস ভরে নিয়ে আবার একবার চাঁদের দিকে তাকায়। চাঁদটা বিশাল। কোনো কোনো দিনে চাঁদ এত বড় লাগে, আবার কোনো দিনে এত ছোট, কেন?
প্রথম আর তৃতীয় বেস লাইনের সমান্তরালে সাধারণ কাঠের গ্যালারি লম্বা করে বসানো। ফেব্রুয়ারির মাঝরাত তাই স্বাভাবিকভাবেই সেগুলো ফাঁকা। সোজা কাঠের তিন স্তরের আসন দীর্ঘ, হিমশীতল সারিতে ওপরে উঠে গেছে। ব্যাকস্টপের ওপারে জানালাবিহীন, বিষণ্ন কয়েকটা ভবন, সম্ভবত গুদামঘর, গা ঘেঁষে দাঁড়ানো। কিন্তু কোনো আলো নেই। কোনো শব্দ নেই।
ঢিবির ওপর দাঁড়িয়ে ইয়োশিয়া বড় বড় বৃত্ত এঁকে হাত দোলায়—ওপরে, সামনে ঘুরিয়ে আবার নিচে নামায়। এর তালে তালে সে পা-ও নাড়ায়, সামনে আর পাশে। নাচের মতো এই ভঙ্গিগুলো চালিয়ে যেতে যেতে তার শরীর ধীরে ধীরে গরম হওয়া শুরু করে, আবার জীবিত এক দেহের পূর্ণ অনুভূতি ফিরে পায়। অল্প সময়ের মধ্যেই সে বুঝতে পারে যে তার মাথাব্যথা প্রায় সেরে গেছে।
কলেজজীবনের পুরো সময়ে ইয়োশিয়াকে তার বান্ধবী ডাকত ‘বিশাল ব্যাঙ’ বলে। কারণ, নাচতে শুরু করলে তাকে নাকি বড়সড় এক ব্যাঙের মতো দেখায়। বান্ধবীর নাচ ছিল ভীষণ পছন্দের। তাই সে প্রায়ই ইয়োশিয়াকে টেনেহিঁচড়ে ক্লাবে নিয়ে যেত। আর হাসতে হাসতে বলত, ‘নিজেকে দেখো তো! তোমার এই লম্বা হাত-পা দুটো যেভাবে ঝাপটাও, দারুণ লাগে! বৃষ্টির মধ্যে ব্যাঙের মতো দেখায়!’
তার এ কথা শুনে ইয়োশিয়ার প্রথমে খুব কষ্ট হয়। কিন্তু বান্ধবীর সাথে যথেষ্ট সময় কাটানোর পর ইয়োশিয়া নাচ উপভোগ করতে থাকে। নিজেকে ছেড়ে দিয়ে সুরের তালে শরীর নড়াতে নড়াতে তার মনে হয়, নিজের ভেতরের স্বাভাবিক ছন্দ যেন পৃথিবীর মৌলিক ছন্দের সাথে নিখুঁত একতানে নেচে যাচ্ছে। জোয়ার-ভাটার ওঠানামা, সমতলভূমির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের নৃত্য, আকাশপথে তারাদের গতিপথ—এসব যে তার সাথে সম্পর্কহীন কোনো জায়গায় ঘটছে, তা তার তখন মোটেই মনে হয়নি।
তার বান্ধবী তার পেনিসটা হাতের মুঠায় নিয়ে প্রায়ই বলেছে যে সে আগে কখনোই এমন বিশাল পুরুষাঙ্গ দেখেনি। নাচার সময় এটা কি কোনো রকম সমস্যা করে? বান্ধবীর এমন প্রশ্নের জবাবে ইয়োশিয়া বলেছে, না, কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সত্যি বলতে কী, তার এই অঙ্গটা আসলেই বেশ বড়। ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছে অন্যদের তুলনায় তার সাইজটা লম্বা। তবে তাতে তার জীবনে বিশেষ কোনো সুবিধা হয়েছে—এমনটা সে কখনো মনে করতে পারে না; বরং উল্টো ঘটনা দেখা দিয়েছে বেশ কয়েকবার, কোনো কোনো মেয়ে অঙ্গটাকে বেশি বড় মনে করে ইয়োশিয়ার সাথে সেক্স করতেই রাজি হয়নি। এ ছাড়া তার কাছে সৌন্দর্যের দিক থেকেও পেনিসটাকে ধীর, ভারী আর কিছুটা বোকাসোকা মনে হয়েছে। সে কারণেই সে সব সময় ওটাকে আড়াল করে রাখতে চেয়েছে।
আর তার মা গভীর আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছে, ‘তোমার এই “অঙ্গটা” যে এত বড় এটা একটা প্রমাণ যে তুমি ঈশ্বরের সন্তান।’ মায়ের কথা ইয়োশিয়া তখন নিজেও বিশ্বাস করেছে। কিন্তু একদিন হঠাৎই অঙ্গটার অদ্ভুতত্ব তার চোখে ধরা পড়ে। সে তো সারা জীবন শুধু একটাই প্রার্থনা করেছে যেন বেসবল খেলায় উঁচুতে ওঠা বলগুলো ঠিকমতো ক্যাচ ধরতে পারে। তার জবাবে ঈশ্বর তাকে দিয়েছে এমন কিছু, যা সবার চেয়ে বড়। কী অদ্ভুত এক পৃথিবী, যেখানে এমন হাস্যকর চাওয়া-পাওয়াই যেন স্বাভাবিক।
ইয়োশিয়া চশমা খুলে তার খাপে ঢুকিয়ে রাখে। নাচ! তা-ই তো? তা তো একেবারেই খারাপ হবে না। সে তাই চোখ বন্ধ করে, আর চাঁদের সাদা আলো ত্বকে অনুভব করতে করতে একা একাই নাচতে শুরু করে দেয়। ফুসফুস ভরে গভীর শ্বাস নেয়, তারপর সমান গভীরভাবে নিশ্বাস ছাড়ে। মনের অবস্থার সঙ্গে মানানসই কোনো গান মনে না আসায়, সে ঘাসের দোলন আর মেঘের ভেসে চলার ছন্দে তাল মিলিয়ে নেচে যায়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মনে হতে থাকে, কোথাও কেউ যেন তাকে দেখছে। তার পুরো শরীর–ত্বক–অস্থি নির্ভুলভাবে তাকে জানায়—সে কারও দৃষ্টিসীমার ভেতর আছে। তাতে কী? সে ভাবে। দেখতে চাইলে দেখুক, যে-ই হোক না কেন। ঈশ্বরের সব সন্তানই তো নাচতে পারে।
সে মাটিতে পা ফেলে আর বাহু ঘোরাতে থাকে। প্রতিটি ভঙ্গি এত সুচারু, মসৃণ ও নিরবচ্ছিন্ন হয় যে তা পরের ভঙ্গিকে ডেকে আনে। তার দেহ এঁকে যায় যেন ছকবদ্ধ নকশা আর হঠাৎ জন্ম নেওয়া কোনো বৈচিত্র্য, দৃশ্যমান ছন্দ। যার আড়ালে ও মাঝখানে লুকিয়ে থাকে অদৃশ্য ছন্দের ছায়া। নাচের প্রতিটি মোড়ে এসব উপাদানের জটিল বুনন সে স্পষ্টভাবেই যেন দেখতে পায়।
তখন তার চোখের ভেতর ধরা দেয় বাস্তব ও বিভ্রমের মাঝামাঝি দৃশ্য। তাতে দেখে বনের ভেতর পশুরা ওত পেতে আছে। তাদের মধ্যে কিছু পশু এমন ভয়ংকর যে, সে আগে কখনো তাদের দেখেনি। একসময় তাকে ওই বনের মধ্য দিয়েই যেতে হবে, কিন্তু তার মনে কোনো ভয় নেই। কারণ সে জানে, এই বন তার ভেতরেই আছে, আর এই বনই তাকে সে যা করেছে, তা বানিয়েছে। ওই জন্তুগুলোও সে তার নিজের ভেতরে লালন–পালন করে।
ইয়োশিয়া কতক্ষণ ধরে নাচে, সে নিজেও বলতে পারে না। তবে সময়টা দীর্ঘ হওয়ায় তার বগলের নিচে ঘাম জমে ওঠে। তখনই তার মনে হয়, যে মাটির ওপর তার পা এত দৃঢ় থির খাড়া হওয়া, সেই মাটির বহু গভীরে কী কী যেন চাপা পড়ে আছে: গভীরতম অন্ধকারের অশুভ গর্জন, আকাঙ্ক্ষা বহনকারী গোপন নদী, পিচ্ছিল জীবের কুণ্ডলী পাকানো নড়াচড়া, আর ভূমিকম্পের আড্ডাখানা, যা মুহূর্তে মুহূর্তে পুরো শহরকে ধ্বংসস্তূপে রূপান্তরিত করে দিতে প্রস্তুত। এগুলোও জগতের ছন্দ গড়ে তোলার কাজে ভূমিকা রাখছে।
শেষে সে নাচ থামায়, হাঁপাতে হাঁপাতে নিশ্বাস সামলে নেয়, আর পায়ের নিচের মাটির দিকে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে, যেন সে কোনো তলহীন গহ্বরের ভেতরে চোখ নিয়ে গেছে।
তার তখন মায়ের কথা মনে পড়ে, সে এখন দূরের বিধ্বস্ত নগরে আছে। ইয়োশিয়া মনে হয় সে সে নিজেকে ঠিক এই অবস্থায় রাখতেই পারে আর সময়কে উল্টিয়ে দিয়ে মাকে নিয়ে যেতে পারে কিশোরকাল বা যৌবনের সময়ে, যখন তার আত্মা গভীরতম অন্ধকারে ডুবে ছিল, তাহলে কী হয়? সন্দেহ নেই, তারা এক হয়ে এমন বিশৃঙ্খলার কুয়াশায় পড়ে যাবে এবং একে অপরের সাথে এমন কাজে জড়িয়ে পড়বে, যার জন্য তাদের সবচেয়ে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। আর তারপর কী? ‘শাস্তি?’ আমার সে শাস্তি পাওয়ার সময় তো অনেক আগেই এসেছে। শহরটাও আমার চারপাশে অনেক আগেই টুকরা টুকরা হয়ে ভেঙে যাওয়া উচিত ছিল।
ইয়োশিয়ার প্রেমিকা কলেজ শেষ করার পর তাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। বলেছে ‘আমি তোমার সাথে বিয়ে বসতে চাই, বিশাল-ব্যাঙ। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই, আর তোমার সন্তান চাই—একটা ছেলে, তোমার যে একটা বড় কিছু আছে তেমন কিছুসহ।’
আমি তোমাকে বিয়ে করতে পারি না, ইয়োশিয়া বলেছে, ‘আমি জানি এটা আগে তোমাকে বলা দরকার ছিল যে আমি ঈশ্বরের সন্তান। তাই কারও সাথে বিয়ে বসতে পারি না।’
‘তা কি সত্য?’
‘হ্যাঁ, সত্যি। দুঃখিত।’
ইয়োশিয়া হাঁটু মেঝেতে বিছিয়ে দিয়ে মাটির একমুঠো তুলে নেয় এবং আঙুলের ফাঁক দিয়ে মাটিটা আবার জগতে ফিরিয়ে দেয়। এ রকম বারবার করে। মাটির ঠান্ডা ও অসমানছোঁয়া তাকে মনে করিয়ে দেয় শেষবার মি. তাবাতার শীর্ণ হাতের ছোঁয়ার কথা।
‘ইয়োশিয়া, আমি আর বেশি দিন বাঁচব না,’ কর্কশ হয়ে আসা স্বরে মি. তাবাতা বলেছে। ইয়োশিয়ার প্রতিবাদ করার আগেই হালকা মাথা নেড়ে তাকে থামিয়ে দেয় মি. তাবাতা।
‘থাক,’ সে বলে যায়, ‘এই জীবন আসলে এক ছোট্ট যন্ত্রণাময় স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রভুর পথনির্দেশে ভর করেই আমি এত দূর অবধি আসতে পেরেছি। তবে মারা যাওয়ার আগে তোমাকে একটা কথা বলতেই হবে। বলতে লজ্জা লাগে, কিন্তু উপায় নেই: বহুবার তোমার মায়ের প্রতি আমার মনে কামনাপূর্ণ ভাব জেগেছে। তুমি জানো, আমার এমন একটি পরিবার আছে, যাদের আমি প্রাণভরে ভালোবাসি, আর তোমার মা এক নির্মল হৃদয়ের মানুষ। তবু তার প্রতি আমার দেহগত কামনা জেগেছে—এমন কামনা, যাকে আমি কখনোই পুরোপুরি দমন করতে পারিনি। এ জন্য আমি তোমার কাছে মাফ চেয়ে নিচ্ছি।’
‘মি. তাবাতা, কারও কাছে ক্ষমা চাওয়ার দরকার নেই। কামনাপূর্ণ ভাব শুধু তোমার একার মধ্যেই জাগেনি। এমনকি আমি নিজেও, তারই সন্তান, ভয়ংকর কিছু আসক্তি ভাবের তাড়া খেয়েছি...’
ইয়োশিয়া এভাবে নিজের ভেতরের কথা খুলে বলতে চেয়েছে, কিন্তু তার মনে হয়, তাতে মি. তাবাতা আরও বেশি বিচলিত হয়ে পড়তে পারে। তাই সে মি. তাবাতার হাত অনেকক্ষণ ধরে রাখে এ আশায় যে তার বুকে জমে থাকা ভাবনাগুলো হয়তো হাতের ছোঁয়ার ভেতর দিয়ে মি. তাবাতার কাছে পৌঁছে যাবে।
আমাদের হৃদয় পাথর নয়। পাথর সময়ের সাথে সাথে ভেঙে চুরমার হয়ে তার বাহ্যিক রূপ হারাতে পারে। কিন্তু হৃদয় কখনো ভেঙে যায় না। তার কোনো বাহ্যিক রূপ নেই, আর তা ভালো হোক বা মন্দ—আমরা সব সময়ই একে অন্যের কাছে পৌঁছে দিতে পারি। ঈশ্বরের সব সন্তানই নাচতে পারে। পরদিন মি. তাবাতা শেষনিশ্বাস ত্যাগ করে।
মাটির ঢিবিতে হাঁটু গেড়ে বসে ইয়োশিয়া নিজেকে সময়ের প্রবাহের হাতে ছেড়ে দেয়। দূরে কোথাও সে ক্ষীণ সাইরেনের আর্তনাদ শুনতে পায়। হঠাৎ এক ঝাপটা বাতাস ঘাসের পাতাগুলোকে নাচিয়ে তোলে, আর সে বাতাস শেষ হয়ে যাওয়ার আগে ঘাসের গানটা শুনে নেয়।
‘ওহ ঈশ্বর!’ ইয়োশিয়া উচ্চ স্বরে বলে।