ডিসেম্বর ২০২৫ ছিল ঘটনাবহুল মাস, ভয় ও আশার সম্মিলন। এই উদ্গ্রীব সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এ কে খন্দকারের মৃত্যু অনেকের চোখে পড়েনি। সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় সম্মানের সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক দাফন সম্পন্ন করে, কিন্তু জনজীবনে সেই বিদায় যথেষ্ট স্বীকৃতি পায়নি। অথচ খন্দকার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের খেতাবপ্রাপ্ত ‘বীর উত্তম’ ও সেক্টর কমান্ডার। যুদ্ধের সমাপ্তিকালে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবিতে একমাত্র বাঙালি এই এ কে খন্দকার। এ প্রসঙ্গটি গত বছর প্রথম আলোতে লিখেছি (‘ইতিহাসের আদার ব্যাপারী’, প্রথম আলো, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫)। বিশেষ একটি কারণে এ কে খন্দকারের শেষ কয়েক বছর একধরনের জাতীয় অবজ্ঞায় আড়ালে পড়ে গেছে। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে অন্তঃসারশূন্য ‘সঠিক’ ইতিহাস–যুদ্ধের বলি হয়েছিলেন তিনি।
১৯৯৩ সালে আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি গবেষণা প্রকল্প শুরু করি। তখন একদিকে ছিল আর্কাইভভিত্তিক ইতিহাস (যেমন স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্র), অন্যদিকে মানুষের মুখের গল্প বা ওরাল হিস্ট্রি (যেমন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বীরাঙ্গনা প্রকল্প)। মৌখিক ইতিহাস স্মৃতির ওপর নির্ভর করে এবং একটি সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে। এই ধারা শরীর, স্মৃতি আর যুদ্ধের ট্রমাকে গুরুত্ব দেয়, প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। এই পদ্ধতি প্রচলিত ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিকল্প স্থানীয় বয়ান ও প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করে। ১৯৯০-এর দশকে বাংলাদেশে প্রান্তিক বয়ানের মৌখিক ইতিহাস বাণিজ্যিকভাবে ততটা সফল হয়নি। এর বিপরীতে প্রকাশনাশিল্প ক্রমাগত ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা প্রভাবশালী কণ্ঠ প্রকাশ করার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই ধারায় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য প্রথমা প্রকাশনের ইতিহাসগ্রন্থ, যেগুলো অত্যন্ত পাঠকনন্দিত হয়েছে। এই সফল পাঠক–সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখনীর সেই দুই ধারা প্রকাশ পেয়েছে—আত্মস্মৃতি এবং নথিভিত্তিক গবেষণা।
এ কে খন্দকারের ১৯৭১: ভেতরে বাইরে (প্রথমা, সেপ্টেম্বর ২০১৪, দ্বিতীয় সংস্করণ, চতুর্থ মুদ্রণ) এই প্রভাবশালী আত্মস্মৃতি ধারার মধ্যে পড়ে। গ্রন্থে যুদ্ধ শুরুর আগের ঘটনাগুলো অতি সংক্ষিপ্ত। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের অভিজ্ঞতা মাত্র এক অনুচ্ছেদ (পৃষ্ঠা ১৯)। পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় খন্দকার পশ্চিম পাকিস্তানে নিযুক্ত ছিলেন। তাই ১৯৬৯ সালের গণ–অভ্যুত্থানের ঘটনাও এখানে সংক্ষিপ্ত (পৃষ্ঠা ২০-২১)। তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বইটির গতি দ্রুত হয়ে ওঠে। তিনি সে সময়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের কমান্ড কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হন এবং যুদ্ধকৌশল নির্ধারণে অংশগ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ এ কে খন্দকারের মৃত্যু অনেকের চোখে পড়েনি। অথচ খন্দকার ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের খেতাবপ্রাপ্ত ‘বীর উত্তম’ ও সেক্টর কমান্ডার। যুদ্ধের সমাপ্তিকালে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ছবিতে একমাত্র বাঙালি এই এ কে খন্দকার।
পাকিস্তান বিমানবাহিনী থেকে বেরিয়ে যুদ্ধে যোগদান করা যে সহজ ছিল না, এই তথ্যও প্রকাশ পায় (পৃষ্ঠা ৭১-৮০)। যাঁরা বেসামরিক ব্যক্তি হিসেবে ভারতে গিয়ে যুদ্ধে যোগ দেন বা শরণার্থী হন, তাঁদের থেকে ভিন্নভাবে প্রতিটি বাঙালি সেনাসদস্যের ভারত গমন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নথিতে লিপিবদ্ধ হয়। যুদ্ধে পরাজিত হলে সেই সামরিক কর্মকর্তা পাকিস্তানে কোর্ট মার্শাল এবং মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হতো। এই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে যাঁরা সামরিক বাহিনী থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা অনেক বেশি ঝুঁকি নিয়েছিলেন। বইটি পড়লে বোঝা যায় যে খন্দকার মনে করেন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে দেশ গড়ার ক্ষেত্রে এই সামরিক কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত ছিল।
বইটির বিতর্কিত অংশ স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয় এবং বিশেষত সেনা কর্মকর্তা হিসেবে কোন ঘোষণা খন্দকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বইয়ের বিবরণীতে আছে ৭ মার্চে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ (পৃষ্ঠা ৩১-৩২), ২৭ মার্চ চট্টগ্রাম রেডিওতে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা (পৃষ্ঠা ৫২, ৫৯-৬০) এবং ১০ এপ্রিল আকাশবাণী রেডিওতে তাজউদ্দীন আহমদের ঘোষণা (পৃষ্ঠা ৬৫)।
৭ মার্চের ভাষণের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে খন্দকার নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। বইটিতে এই ভাষণটিকে প্রচলিত ধারাতেই উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে একেবারে শেষে একটি বিতর্কিত দাবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ‘সাতই মার্চের ভাষণ আমি শুনেছি। এর মধ্যে যে কথাগুলো আমার ভালো লেগেছিল, তা হলো: “দুর্গ গড়ে তোলো”, “তোমাদের যার যা আছে, তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকো”, “শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে”, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।’ এ পর্যন্ত খন্দকারের স্মৃতি ও প্রচলিত বয়ান হুবহু মিলে যায়। কিন্তু পরের অনুচ্ছেদে তিনি এক নতুন দাবি যুক্ত করেন: ‘এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল: “জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান”। তিনি যুদ্ধের ডাক দিয়ে বললেন “জয় পাকিস্তান”। এটি যে যুদ্ধের ডাক বা স্বাধীনতার আহ্বান, তা প্রচণ্ডভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এবং তর্কাতীত নয়।’ (পৃষ্ঠা ৩২)
৭ মার্চের ভাষণের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে খন্দকার নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। বইটিতে এই ভাষণটিকে প্রচলিত ধারাতেই উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে একেবারে শেষে একটি বিতর্কিত দাবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি এক নতুন দাবি যুক্ত করেন: ‘এই ভাষণের শেষ শব্দগুলো ছিল: “জয় বাংলা, জয় পাকিস্তান”।
বাংলাদেশের উত্তপ্ত ইতিহাস-বিতর্কে এই ২৩২ পৃষ্ঠাব্যাপী আত্মস্মৃতিতে আর কী লেখা ছিল, সেটা আর কেউ দেখতে গেলেন না। বইয়ের মাত্র একটি পৃষ্ঠাজুড়ে ৭ মার্চ ভাষণ বিষয়ক পরস্পরবিরোধী দাবিগুলো জাতীয় ইতিহাসের আলোচনায় বোমার মতো বিস্ফোরিত হলো। তখনকার ক্ষমতাসীন সরকার তীব্র প্রতিবাদ জানায়, মুক্তিযোদ্ধারাও খন্দকারের বক্তব্যের নিন্দা করে। জাতীয় সংসদে দাবি ওঠে, লেখককে তাঁর দাবি প্রত্যাহার করতে বাধ্য করতে হবে এবং বইটি বাজেয়াপ্ত করতে হবে। পাঠকেরা দলে দলে বইয়ের দোকানে ভিড় জমায়, কেবল এই কথাটুকু জানতে যে আসলে ঘটনাটা কী? দ্বিতীয় সংস্করণের ভূমিকায় খন্দকার প্রথম সংস্করণের বিষয়ে লিখেছেন, ‘প্রকাশের চার দিনের মধ্যে নিঃশেষিত হয়েছে’ (পৃষ্ঠা ১২)। সে বছরের সেপ্টেম্বরে আমি যখন বইটি কিনি, ইতিমধ্যে সেটির চতুর্থ মুদ্রণ পার হয়ে গেছে।
বইটি যতই বিক্রি হতে থাকে, ততই ক্ষুব্ধ রাজনৈতিক কর্মীদের দাবি আরও কড়া হয়ে ওঠে। এবার দাবি ওঠে এ কে খন্দকারের বিরুদ্ধে—যিনি একসময় সেই সরকারেরই মন্ত্রী ছিলেন (১৯৮৬-৯০, ২০০৯-১৪)—রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা হোক। সেনাবাহিনী যুদ্ধবীরদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম’ সেই বছরই তাঁকে বহিষ্কারের দাবি তোলে। দাবিটি ছিল বিস্ময়কর, কারণ সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা সেক্টর কমান্ডার বেঁচে ছিলেন হাতে গোনা। ১৯৭০–এর দশকে সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানের ডামাডোলে অনেক সেক্টর কমান্ডার প্রাণ হারিয়েছিলেন: মেজর জিয়াউর রহমান (সেক্টর ১, ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত), মেজর খালেদ মোশাররফ (সেক্টর ২, ৭ নভেন্বর ১৯৭৫ অভ্যুত্থানে নিহত), মেজর এ টি এম হায়দার (সেক্টর ২, ৭ নভেন্বর ১৯৭৫ অভ্যুত্থানে নিহত), উইং কমান্ডার খাদেমুল বাশার (সেক্টর ৬, ১৯৭৬ সালে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত), মেজর নাজমুল হক (সেক্টর ৭, যুদ্ধের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত), মেজর আবুল মঞ্জুর (সেক্টর ৮, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়ার পরে রহস্যজনকভাবে নিহত) এবং মেজর আবু তাহের (সেক্টর ১১, ১৯৭৬ সালে সামরিক আদালতে ফাঁসি)। অপঘাতে মৃত্যু এবং বয়সের কারণে মৃত কমান্ডারদের পর খন্দকার ছিলেন স্বল্পসংখ্যক জীবিত সদস্যের অন্যতম। তা সত্ত্বেও অব্যাহত চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত এ কে খন্দকার ‘সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম’ থেকে পদত্যাগ করেন।
খন্দকারের এই পরিণতিতে সেই সমীকরণের পুনরাবৃত্তি হয়, যা ঘটেছিল ডেভিড বার্গম্যানের যুদ্ধাপরাধ আদালত অবমাননা মামলায়। আদালত বার্গম্যানের পক্ষে চিঠি স্বাক্ষর করা মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন (বিবিসি, ২০১৫), কারণ তিনি যুদ্ধের বিবরণকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন—যে যুদ্ধে তিনি নিজেই অংশগ্রহণ করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে খন্দকারও একই ধরনের আচরণের শিকার হন, তবে তাঁর প্রতিপক্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়নি। সংবাদমাধ্যমে সৃষ্ট তীব্র তোলপাড় এবং গাজীপুরে তাঁকে ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করে তাঁকে সমাজচ্যুত করা হয়।
ইতিহাস–বিতর্ককে শিকারি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সমাপ্তি ঘটে ২০১৯ সালের জুন মাসে। এ কে খন্দকার ও তাঁর জীবনসঙ্গিনী ফরিদা খন্দকার অবশেষে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং বইটির বিতর্কিত অংশ প্রত্যাহার করেন। খন্দকার বলেন, ‘এটিকে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে গণ্য করছি।’
ইতিহাস–বিতর্ককে শিকারি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সমাপ্তি ঘটে ২০১৯ সালের জুন মাসে। এই মাসে এ কে খন্দকার ও তাঁর জীবনসঙ্গিনী ফরিদা খন্দকার অবশেষে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং বইটির বিতর্কিত অংশ প্রত্যাহার করেন। লিখিত একটি বিবৃতি থেকে থেমে থেমে পাঠ করতে গিয়ে একপর্যায়ে খন্দকার বলেন, ‘আমার বয়স এখন ৯০ বছর। আমি এটিকে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে গণ্য করছি।’ (বিডিনিউজ.কম, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯)
তাত্ত্বিক ফিলিপ লেজুন বলেছেন, আত্মজীবনী মূলত একটি ‘তথ্যনিষ্ঠ অঙ্গীকার’-এর ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়; যার মূল কথা হলো, ‘আমার কাছে যেভাবে সত্য প্রতিভাত হয়েছে, আমি ঠিক সেভাবেই তা তুলে ধরব।’ তবে এতে ‘স্মৃতিবিভ্রম, ভুলভ্রান্তি ও অনিচ্ছাকৃত বিকৃতির’ মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কিছুটা ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকে; কিন্তু আনুষ্ঠানিক ইতিহাসবিদদের রচনায় যেসব বিশ্লেষণ, উপসংহার ও ব্যাখ্যামূলক সংযোজন থাকাটা প্রত্যাশিত—আত্মজীবনীতে সাধারণত সেগুলোর অনুপস্থিতিই পরিলক্ষিত হয় (লেজুন, বিষয় আত্মজীবনী, মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস, ১৯৮৯, ২২)।
এ কে খন্দকারের বইটির গবেষণা-পদ্ধতির প্রশ্নকে কেন্দ্র করে ইতিহাসবিদ আফসান চৌধুরী প্রকাশনাশিল্পের সমালোচনা করে বলেন, ‘এত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর, অধিকাংশ মানুষের কাছেই বিষয়টি এখন অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে; আর এমনটি হওয়াই স্বাভাবিক, যখন কেউ প্রামাণ্য নথিপত্রের পরিবর্তে কেবল জনশ্রুতি ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় ইতিহাস বিনির্মাণ করতে যায়। আমাদের জানা তথ্যমতে, এখন আর বয়সের ভারে ম্লান হয়ে যাওয়া স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর না করে বরং প্রামাণ্য নথিপত্রের ওপর আস্থা রাখাই শ্রেয় (চৌধুরী, বিডিনিউজ.কম, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪)’।
তবে ইতিহাস লেখার জন্য কেবলই নথির ওপর নির্ভর করার চিন্তা বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে বাস্তবসম্মত নয়। বহু মূল্যবান নথি ও আলামত ৫৫ বছর ধরে ধ্বংস করা হয়েছে। এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানের শেষ মুহূর্তেও নথি নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। কথ্য ইতিহাসের ওপর কিছুটা হলেও নির্ভর করতে হবে, যে কাজ আফসান চৌধুরী নিজেও করেছেন ইউপিএল থেকে প্রকাশিত হিন্দু সম্প্রদায়ের ৭১ এবং নারীর ৭১ বই দুটিতে। বাংলাদেশের ইতিহাসচর্চার আধুনিকীকরণের একটি প্রয়োজনীয় ধাপ হলো ইতিহাসবিদদের ভয় ও হুমকি থেকে মুক্তি দেওয়া। গবেষকেরা একই লেখায় পরস্পরবিরোধী বা অমীমাংসিত তথ্য ইতিহাসের বহুমুখী বয়ান হিসেবে উপস্থিত করতে পারেন। এর বহু নজিরও আছে। কিন্তু তার জবাবে ‘মারমার-কাটকাট’ আচরণ দূর করতে হবে। নয়তো এই অতি জরুরি কাজে পরের প্রজন্ম থেকে কেউ এগিয়ে আসবে না। ইতিহাসের মারমুখী পাহারাদারেরা যেভাবে এ কে খন্দকারের বইটি বাজার থেকে তুলে ফেলতে বাধ্য করেছিল, ভবিষ্যৎ লেখক ও গবেষকদেরও যেন সে রকম ইতিহাসের মব সংস্কৃতির ভয়ে থাকতে না হয়।