১৪ মার্চ ৯৬ বছরের দীর্ঘ জীবনের অবসান হলো ইয়ুর্গেন হেবারমাসের (১৯২৯-২০২৬)। আমরা যারা নয়া মার্ক্সবাদ বা সমালোচনা তত্ত্বের পাঠক ও অনুরাগী, তাদের কাছে দিনটি বিশেষ হয়ে থাকবে। কারণ, তার আগপর্যন্ত তিনিই ছিলেন ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের শেষ জীবিত তাত্ত্বিক।
ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২৩ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই স্কুলের তাত্ত্বিকেরা ক্রমাগত আধুনিক পুঁজিবাদীব্যবস্থায় ক্ষমতা, রাষ্ট্রকাঠামো ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক বিশ্লেষণে নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে এসেছেন। বিশেষত গণমাধ্যম কীভাবে মতাদর্শ তৈরি করে এবং আধিপত্যকে বৈধতা দেয়—এই প্রশ্নগুলো তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল বিখ্যাত। এই স্কুলেরই দ্বিতীয় প্রজন্মের চিন্তক হেবারমাস। এডর্নো, হর্খেইমার, বেঞ্জামিন আর মার্কুইজের মতো হেবারমাসও একাডেমিয়ায় বহুল আলোচিত পাঠ্য। ৯৬ বছরের দীর্ঘজীবন তাঁকে কিছু বাড়তি সুযোগ দিয়েছে। বিশ্বরাজনীতি, পুঁজির সম্প্রসারণ কিংবা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পর গণমাধ্যাম ও সংস্কৃতিতে যেসব পরিবর্তন এসেছে, তার সবকিছুতে দীর্ঘ সময় ধরে ভীষণ রকম প্রাসঙ্গিক থাকতে পেরেছেন। এবং ধারাবাহিকভাবে তিনি গণমাধ্যম, বিকল্প মাধ্যম বা এগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রক্ষমতা এবং ভোগবাদী সাংস্কৃতিক কাঠামোগুলো নিয়ে ক্রিটিক্যাল থেকেছেন।
পিএইচডি শেষে তিনি ১৯৫৬ সালে থিওডর এডর্নোর সহকারী হিসেবে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলে যুক্ত হন। থিওডরের এডর্নোর সঙ্গে তাঁর খুব বেশিদিন বনিবনা হয়নি। তাই কিছুদিনের জন্য ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল ছেড়ে দেন তিনি, পরে আবার সেখানে যুক্ত হন।
হেবারমাস দেখান যে দুনিয়ায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর রয়েছে—একটি হলো নিয়ন্ত্রণ (system), আরেকটি বিকাশের ক্ষেত্র (lifeworld)। নিয়ন্ত্রণ হলো রাষ্ট্র বা প্রশাসনিক কাঠামো আর বিকাশের ক্ষেত্র হলো সমাজ বা মানুষের সংস্কৃতি, যেখানে শিশু জন্মায়, বেড়ে ওঠে, কথা বলে, আচরণ শেখে।
হেবারমাসের চিন্তাকে মোটাদাগে তিনটি বিশেষ পর্বে ভাগ করে আমাদের আলোচনা এগিয়ে যেতে পারে। পাবলিক স্ফিয়ার বা জনপরিসর তাঁর কর্মজীবনের শুরুর দিকের ভাবনা। আর ‘দ্য থিওরি অব কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন’ (১৯৮১) এবং ‘মডার্নিটি: আ আনফিনিশড প্রজেক্ট’ (১৯৮০) পরের দিকের, কিন্তু কাছাকাছি সময়ে গড়ে উঠেছে। হেবারমাসের এই সব চিন্তার ভিত তৈরি হয়েছিল হেগেল, কার্ল মার্ক্স, ম্যাক্স ওয়েবার, ইমানুয়েল কান্টের মতো দার্শনিকের পাঠের মধ্য দিয়ে।
‘নাগরিকেরা কোথায় আলোচনা করবে?’
পাবলিক স্ফিয়ার বা জনপরিসর বলতে তিনি এমন একটি জায়গা বা সামাজিক পরিসরকে বুঝিয়েছেন, যেখানে রাষ্ট্রের নাগরিকেরা মুক্তচিন্তা প্রকাশ করতে পারবে, নির্ভয়ে নিঃশঙ্কচিত্তে আলোচনা করতে পারবে।
তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘গণতান্ত্রিক পরিবেশে নাগরিকেরা কোথায় আলোচনা করবে?’ কিছু ট্র্যাডিশনাল জনপরিসরের উল্লেখ আমরা পাই; যেমন নাপিতের দোকান, চায়ের দোকান, রিডিং বা আর্ট ক্লাব। এমন পরিসর ইউরোপের বুর্জোয়া সমাজে গড়ে উঠেছিল আঠারো শ শতকের দিকে। রাষ্ট্রক্ষমতা বা বাজারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে একদল মানুষ জনস্বার্থ নিয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা ও মতামত তৈরি করতে পারতেন সেই সময়টাতে।
কিন্তু হেবারমাস দেখান যে এ ধরনের জনপরিসরের প্রভাব ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। পুঁজির আগ্রাসী বিকাশের সহগ সম্পর্কে গণমাধ্যম বিস্তার পায় ঠিকই; কিন্তু ট্র্যাডিশনাল জনপরিসরের কাঠামো ভেঙে পড়ে। আমাদের কাছে মনে হয় যেন গণমাধ্যমই জনগণের দেখভাল করছে, সরকারকে জনবান্ধব নীতিমালা তৈরিতে চাপ দিচ্ছে বা দিকনির্দেশনা দিচ্ছে। আদতে গণমাধ্যমগুলো জনপরিসর হিসেবে দাঁড়াতে পারে না। কারণ, তার মেরুদণ্ড বাঁধা থাকে বিজ্ঞাপন কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের উপকরণ হিসেবে।
হেবারমাসের এই থিসিস গণমাধ্যম গবেষণা, এমনকি রাজনৈতিক তত্ত্ব তৈরিতে বিপুল ভূমিকা পালন করে আসছে। গণমাধ্যমের প্রভাব, কাজ, নির্বাচনী কাভারেজ কিংবা জনমত নিয়ে ক্রিটিক্যাল আলোচনা করতে চাইলে তাঁর এই জনপরিসর তাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবে দারুণভাবে কার্যকর।
হেবারমাস দেখিয়েছিলেন, যুক্তি, সংলাপ ও সমালোচনামূলক চিন্তার মধ্য দিয়ে পাবলিক স্ফিয়ার গড়ে না উঠলে গণতন্ত্র ভিত্তিহীন হয়ে পড়ে। এরপর নানা সময়ে সচেতন মানুষ নানাভাবে পাবলিক স্ফিয়ার বা জনপরিসর হিসেবে নানা মাধ্যমকে অলটারনেটিভ মিডিয়া বা বিকল্প গণমাধ্যম আকারে খুঁজেছে বা ব্যবহার করতে চেয়েছে। লিটলম্যাগ আন্দোলন কিংবা পরবর্তী সময় ব্লগোস্ফিয়ার কিংবা সোশ্যাল মিডিয়াকে অনেকে বিকল্প গণমাধ্যম বা জনপরিসর হিসেবে ভাবতে চেয়েছে। বিশেষত ‘আরব বসন্ত’ কিংবা ‘শাহবাগ আন্দোলন’ নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্লগিংকে জনপরিসর হিসেবে ভাবা হয়। ইদানীং জেন–জিদের আন্দোলন কিংবা ফ্রি প্যালেস্টাইন আন্দোলনে মনে করা হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্য ও মতামত উৎপাদনে, সম্প্রচারে এমনকি আন্দোলিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পেরেছে।
হেবারমাস দেখিয়েছিলেন, যুক্তি, সংলাপ ও সমালোচনামূলক চিন্তার মধ্য দিয়ে পাবলিক স্ফিয়ার গড়ে না উঠলে গণতন্ত্র ভিত্তিহীন হয়ে পড়ে। লিটলম্যাগ আন্দোলন কিংবা পরবর্তী সময় ব্লগোস্ফিয়ার কিংবা সোশ্যাল মিডিয়াকে অনেকে বিকল্প গণমাধ্যম বা জনপরিসর হিসেবে ভাবতে চেয়েছে।
কিন্তু হেবারমাস ডিজিটাল মিডিয়ার জনপরিসর হিসেবে গড়ে ওঠার বা ভূমিকা নেওয়ার এই বিষয়টি নিয়ে নিরেট কোনো বক্তব্য দেননি; বরং তিনি এর কিছু নেতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রবল সম্ভাবনা থাকার পরও ডিজিটাল মাধ্যম জনপরিসরের এক খণ্ডিত কাঠামো তৈরি করেছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমের একটা বড় সমস্যা হলো, খণ্ডিত হয়ে পড়া এবং সেটাকেই পূর্ণ বাস্তবতা মনে হওয়া। অন্যান্য গণমাধ্যম লিনিয়ার বা একমুখী বলে এই বিষয়টি এত প্রবল হয়ে ওঠে না। কিন্তু অনলাইনে এলগরিদমিক কাঠামো এবং পছন্দের মানুষের সঙ্গে ছোট ছোট প্রায় একই রকম দলে একই ধরনের বিষয়বস্তু ঘুরপাক খায় বলে খণ্ডিত চিত্র প্রকট হয়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো পুরো জনগোষ্ঠীর আলোচনার ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে না।
মানুষ যুক্তি ও ভাষার মধ্য দিয়ে বোঝাপড়ায় পৌঁছায়
পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে হেবারমাসের দ্য থিওরি অব কমুউনিকেটিভ অ্যাকশন তাঁর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এখানে হেবারমাস দেখান যে দুনিয়ায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর রয়েছে—একটি হলো নিয়ন্ত্রণ (system), আরেকটি বিকাশের ক্ষেত্র (lifeworld)। নিয়ন্ত্রণ হলো রাষ্ট্র বা প্রশাসনিক কাঠামো আর বিকাশের ক্ষেত্র হলো সমাজ বা মানুষের সংস্কৃতি, যেখানে শিশু জন্মায়, বেড়ে ওঠে, কথা বলে, আচরণ শেখে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রব্যবস্থা (নিয়ন্ত্রণ) যখন মানুষের সামাজিক জীবনকে (বিকাশ ক্ষেত্র) গ্রাস করে ফেলে তখন সমস্যা দেখা দেয়। তিনি এই প্রক্রিয়াকে বিকাশ ক্ষেত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণের উপনিবেশ (colonisation of lifeworld) হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। ধরা যাক, শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানবিক বিকাশ বা প্রত্যেক মানুষের ভেতরকার সুপ্ত প্রতিভা বা আকাঙ্ক্ষাকে কাঠামো দেওয়া, কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সব শিশুকে একই রকম ছাঁচে ফেলে, কঠোর বিদ্যায়তনিক জীবনে ফেলে দেয়। একই ধরনের চিন্তা, চাকরি বা ভোগের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করার মধ্যে দিয়ে শেষ অবধি তাদের বাজারের জন্য উপযুক্ত শ্রমিক ও ক্রেতা হিসেবে তৈরি করা হয়।
একই কথা চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা আইনজীবীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রীতি অথবা পদ্ধতি এমনভাবে রাষ্ট্রের কাঠামোকে তৈরি করে যে সেটা সংস্কৃতি তথা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকেও একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে দেয়।
ন্যয়সংগত, যুক্তিবাদী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কি সম্ভব?
‘মডার্নিটি: অ্যান আনফিনিশড প্রজেক্ট’ হেবারমাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বক্তৃতা। যার মধ্য দিয়ে মিশেল ফুকো বা উত্তর আধুনিকতাবাদী দার্শনিকদের সঙ্গে হেবারমাস নিজের অবস্থানকে আলাদা করতে পেরেছেন বলে মনে করা হয়। মিশেল ফুকো মত দিয়েছিলেন, আলোকায়নের পর আধুনিকতা নিজেই নতুন সমস্যার কারণ হয়েছে। উত্তর আধুনিকতাবাদীরা আধুনিকতাকে ব্যর্থ বলে নিকুচি করলেও হেবারমাসের মতে আধুনিকতা শেষ হয়নি, ব্যর্থও হয়নি। বরং তিনি বলেন, আধুনিকতা এখনো পুরোপুরি বিকশিত হতে পারেনি। অর্থাৎ আধুনিকতা এখনো স্বরূপে আসেনি, তাই সাফল্য–ব্যর্থতার প্রশ্ন আসতে পারে না। এখনো আধুনিকতার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি।
এখন প্রশ্ন আসে, আধুনিকতার মৌল কী? যুক্তি, সমালোচনামূলক চিন্তা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক আলোচনা—এই সব আধুনিকতার ভিত্তি এবং মানবসমাজের কল্যাণের জন্য তা নিঃসন্দেহে প্রাসঙ্গিক।
তাই আধুনিকতাকে পরিত্যাগ করার পরিবর্তে তাকে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন। হেবারমাসের এই তিনটি ভাবনা আলাদা আলাদাভাবে আমাদের সামনে এলেও একটি আরেকটিকে পূর্ণাঙ্গতা দেয়। তাঁর প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি যুক্তিনির্ভর মানবসমাজের শক্তির জায়গাটা নির্দেশ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, যুক্তিনির্ভর আলোচনা ও সমালোচনামূলক চিন্তার মাধ্যমে সমাজকে আরও ন্যায়সংগত ও গণতান্ত্রিক করা সম্ভব।
জনপরিসর, যোগাযোগমূলক ক্রিয়া এবং আধুনিকতার অসম্পূর্ণ প্রকল্প—এই ধারণাগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন যে ন্যয়সংগত ও মানবিক সমাজ নির্মাণের সম্ভাবনা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার চেয়েও বারবার যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং জনপরিসরের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাই তিনি চলে গেলেও তাঁর আশার জায়গাটা আমাদের মধ্যে কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই দিশারি হয়ে থাকবে।