ভবিষ্যদ্বাদী ইশতেহারে কামনা

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

১৯১৩ সাল। এক বৈপ্লবিক শক্তি হিসেবে ইতিমধ্যে ভবিষ্যদ্বাদীদের উত্থান ঘটেছে। এর আগের বছর প্রকাশ্যে এসেছে তাঁদের ঐতিহাসিক ইশতেহার—‘গণরুচির মুখে একটা থাপ্পড়’ (১৯১২)। সেখানে প্রথাগত সাহিত্যকে তাঁরা চাবুক মেরেছেন নির্মমভাবে। ওই আঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার তাঁরা সামনে নিয়ে এলেন সমাজের আরেক নিষিদ্ধ অথচ কাঙ্ক্ষিত বিষয়—কামনা। দীর্ঘ সময় ধরে পাপ, দুর্বলতা বা গোপনীয়তার অন্ধকার সিন্দুকে কামনাকে সিলগালা করে রাখার যে প্রচলন ছিল, সেটাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করলেন ফরাসি এক নারী—ভ্যালেন্টাইন মেরিয়েভে (১৮৭৫–১৯৫৩)। বিবাহসূত্রে পরে যিনি হয়ে উঠবেন ভ্যালেন্টাইন দ্য সেইন্ট-পয়েন্ট; আর এ নামেই কুড়াবেন খ্যাতি-কুখ্যাতি দুটোই। ইতিহাস তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করবে ইউরোপীয় অ্যাভান্ট-গার্ড আন্দোলনের অন্যতম কুশীলব হিসেবেও, যার শুরুটা বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে। ফিউচারিস্ট বা ভবিষ্যদ্বাদীদের মুখপাত্র হিসেবে তিনি রচনা করবেন সমালোচনা উসকে দেওয়া এক ঘোষণাপত্র: ‘কামনার ভবিষ্যদ্বাদী ইশতেহার’ (ফিউচারিস্ট ম্যানিফেস্টো অব লাস্ট)। আগুনে ঘি ঢেলে দেবে এই ঘোষণাপত্র; জন্ম দেবে নানা তর্ক-বিতর্কের।

কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, সমালোচক, চিত্রশিল্পী, নৃত্যশিল্পী—বহুমাত্রিক পরিচয় ছিল ভ্যালেন্টাইনের। ভবিষ্যদ্বাদী আন্দোলনটি তখন ইতালি, ফ্রান্স, রাশিয়াসহ পৃথিবীর নানা প্রান্তে তুঙ্গে। গজিয়ে ওঠা শিল্পের এই নতুন ধারায় যোগ দিলেন ভ্যালেন্টাইন, পেলেন তৃপ্তিও। আন্দোলনে যোগ তো দিলেনই, সেই সঙ্গে প্রথম কোনো নারী হিসেবে লিখে ফেললেন গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইশতেহার—‘ম্যানিফেস্টো অব দ্য ফিউচারিস্ট ওম্যান’ (১৯১২) এবং ‘ফিউচারিস্ট ম্যানিফেস্টো অব লাস্ট’ (১৯১৩)। প্রথমটিতে তিনি তুলাধোনা করলেন নারীর দুর্বল ভূমিকা, আবেগপ্রবণতা আর রোমান্টিক ধারণার। এসবের বিপরীতে নারীকে দেখতে চাইলেন শক্তিশালী, যোদ্ধা আর তেজস্বী ভূমিকায়। দ্বিতীয় ইশতেহারে ঘোষণা করলেন এমন এক বিষয়, তখনো পর্যন্ত যা কেউ মুখে আনার সাহসও করেনি। দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘কামনা পাপ নয়—জীবনশক্তির এক প্রবল আর সৃজনক্ষম উৎস।’

দীর্ঘ সময় ধরে পাপ, দুর্বলতা বা গোপনীয়তার অন্ধকার সিন্দুকে কামনাকে সিলগালা করে রাখার যে প্রচলন ছিল, সেটাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করলেন ফরাসি এক নারী—ভ্যালেন্টাইন মেরিয়েভে (১৮৭৫–১৯৫৩)। বিবাহসূত্রে পরে যিনি হয়ে উঠবেন ভ্যালেন্টাইন দ্য সেইন্ট-পয়েন্ট।
ভ্যালেন্টাইন দ্য সেইন্ট-পয়েন্ট (১৮৭৫–১৯৫৩)
ছবি: সংগৃহীত

কী ছিল সেই ইশতেহারে? শুধু সাহিত্যিক নথি নয়, এটি ছিল প্রথাগত নৈতিকতা, সামাজিক ভণ্ডামি আর পুরুষতান্ত্রিক নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এক অদম্য উচ্চারণ। পুরুষকেন্দ্রিক ভবিষ্যদ্বাদী আন্দোলনের অভ্যন্তরে ঢুকে ভ্যালেন্টাইন এই মুভমেন্টটির ভিত্তিগত ধারণাগুলোকেই দাঁড় করালেন কাঠগড়ায়। কামনাকে নিষেধাজ্ঞার কড়া চাদরে ঢেকে রাখার যে চিরায়ত দৃষ্টিভঙ্গি, এর বাইরে গিয়ে তিনি একে প্রতিষ্ঠা করলেন—জীবনের জন্য অতীব জরুরি, গতিময় আর রূপান্তরকারী এক শক্তি হিসেবে।

এক. কামনা শক্তির প্রকাশ, পাপ নয়

পাপ-পুণ্য বিবেচনার ক্ষুদ্র চিন্তার সীমানা ছাড়িয়ে কামনাকে এক পরিবর্তনকারী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করলেন ভ্যালেন্টাইন, যা হয়ে উঠবে ইশতেহারটির মূল প্রতিপাদ্য: ‘কামনা কোনো মরণশীল পাপ নয়; এটি শক্তির সেই বিরাট উৎস আর সদ্‌গুণ, মানবজাতিকে যা এগিয়ে নিয়ে যায় সামনের দিকে।’ ভ্যালেন্টাইনের যুক্তি ছিল—প্রথাগত ‘খ্রিষ্টান নৈতিকতা’ এবং এরও আগের ‘পেগান নৈতিকতা’ কামনার স্বাভাবিক আনন্দকে পরিণত করেছে অত্যন্ত লজ্জার, একই সঙ্গে গোপনীয় এক বিষয়বস্তুতে। প্রতিষ্ঠিত এই চিন্তাকে কাউন্টার করে তিনি বললেন, ‘কামনা, সে তো এক অহং, মোটেই তা দুর্বলতার চিহ্ন নয়; এটি এমন এক গুণ, যা মানবজাতিকে টেনে নিয়ে যায় সম্মুখে; এ এক মহাশক্তিধর উৎস।’ কেবল জৈবিক তাড়না হিসেবে নয়, কামনাকে তিনি দেখলেন এক ‘যন্ত্রণাময় সৃজনশীলতা’ হিসেবে, যা স্ববিরোধিতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। এটি স্ফুটনের সেই সতেজ বেদনা, পুরোনোকে ধ্বংস করে যা নির্মাণ করে নতুনের। আর এই কামনা যখন তীব্র হয়ে ওঠে, তখন তা দেহের চেনা গণ্ডি ছাড়িয়ে ব্যক্তিকে নিয়ে যায় এক বৃহত্তর অনুভূতির জগতে। তাকে মিলিয়ে দেয় মহাপৃথিবীর সংবেদনশীলতায়।

ব্যক্তি আর বিশ্ব একই সংবেদনশীলতার সূত্রে গাঁথা। এটি ব্যক্তিকে করে তোলে চঞ্চল আর উসকে দেয় নতুন কিছু উদ্ভাবনের—হোক তা শিল্প, বিজ্ঞান কিংবা দর্শন। এর মাধ্যমে ভ্যালেন্টাইন ফিউচারিজমের মূল বিশ্বাস ‘ভাইটালিজম’ বা প্রাণশক্তির দার্শনিক ধারণাটিকে একীভূত করেন যৌনশক্তির সঙ্গে, একদম সরাসরি।

লেখকের দৃষ্টিকোণ থেকে, কামনা হলো জীবনের মৌলিক দ্বান্দ্বিক শক্তি। দেহের সীমানা ছাড়িয়ে গেলেও যার মূলে রয়েছে সুনির্দিষ্ট জৈবশক্তি (যৌনশক্তি)। এই পর্যায়ে তিনি কামনার ধারণাটিকে এক দার্শনিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করলেন। এটি একই সঙ্গে ধ্বংসকারী (ক্ষতবিক্ষত দেহের যন্ত্রণা) এবং সৃষ্টিকারী (নতুন উদ্ভাবন ও স্ফুটনের সতেজতা)। ব্যক্তিগত যৌন আকাঙ্ক্ষার মাধ্যমে শুরু হয়ে, চূড়ান্তভাবে তা মহাজাগতিক প্রাণশক্তির (ভাইটালিজম) সঙ্গে মিশে যায়, যেখানে ব্যক্তি আর বিশ্ব একই সংবেদনশীলতার সূত্রে গাঁথা। এটি ব্যক্তিকে করে তোলে চঞ্চল আর উসকে দেয় নতুন কিছু উদ্ভাবনের—হোক তা শিল্প, বিজ্ঞান কিংবা দর্শন। এর মাধ্যমে ভ্যালেন্টাইন ফিউচারিজমের মূল বিশ্বাস ‘ভাইটালিজম’ বা প্রাণশক্তির দার্শনিক ধারণাটিকে একীভূত করেন যৌনশক্তির সঙ্গে, একদম সরাসরি। আরও জানান, যৌনতাকে শুধু প্রজনন বা আনন্দের উৎসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; একে ভাবতে হবে সেই নিগূঢ় চালিকা শক্তি হিসেবে, যা সমগ্র মহাবিশ্বকে গতিশীল রাখছে—সৃষ্টি আর ধ্বংসের চক্র যেখানে কাজ করছে নিরন্তর।

দুই. দেহ এবং আত্মা—দুটিই সমান সৃষ্টিশীল

ইশতেহারে ভ্যালেন্টাইন দাবি তুললেন, সৃষ্টিশীল কাজের ক্ষেত্রে দেহ ও আত্মা—দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ এবং একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। কামনাকে তিনি দেখলেন—‘অজ্ঞাতের সন্ধানে দেহের অনুসন্ধান রূপে, যা আত্মার অনুসন্ধান (উদ্‌যাপন) থেকে কম কিছু নয়।’ দৃঢ়কণ্ঠে ঘোষণা দিলেন, ‘দেহ সৃষ্টি এবং আত্মা সৃষ্টি, মহাবিশ্বের চোখে দুটিই সমান—একটি অন্যটির চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়, বরং আত্মার সৃষ্টি দেহের সৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল।’ পশ্চিমা সভ্যতার প্রতিষ্ঠিত নৈতিকতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন এই বলে, ‘একটিকে দমিয়ে রেখে অন্যটির বিকাশ ঘটানো দুর্বলতা; সেই সঙ্গে সেটা ভুলও।’ ‘খ্রিষ্টান নৈতিকতা’ এবং ‘পিউরিটানবিরোধী’ (অ্যান্টিপিউরিটান) দৃষ্টিভঙ্গি যেখানে দেহের প্রতি ঘৃণা তৈরি করে; ভ্যালেন্টাইন সেখানে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেন—দেহ আত্মার সমান এক সৃজনশীল শক্তির উৎস। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে বড় করে দেখলে সৃষ্টিজগৎ নিয়ে যে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি একজন মানুষকে আত্মোপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়, সেটার ভারসাম্য নষ্ট হবে। তাঁর এই অবস্থান কেবল দার্শনিক নয়, এটি আধুনিকতাবাদী শরীর-রাজনীতির এক র‍্যাডিক্যাল ঘোষণা—বলিষ্ঠ মানুষকে যা আহ্বান জানায় তার দৈহিক ও আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার পুরোটা উপলব্ধির মাধ্যমে একজন সামগ্রিক মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশের।

তিন. বিজয়ী ও শিল্পীর প্রেরণা

ভ্যালেন্টাইন কামনাকে কেবল ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি একে উপস্থাপন করলেন বৃহত্তর সামাজিক আর ঐতিহাসিক শক্তিগুলোর চালিকা শক্তি হিসেবে, যা একই সঙ্গে যোদ্ধা, বিজয়ী, শিল্পী, এমনকি আধুনিক ব্যবসায়ীদের (যাঁরা ব্যাংক, সংবাদপত্র ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিচালক) প্রেরণা হিসেবেও কাজ করে। কারণ, তাঁদের ধনসম্পদ বৃদ্ধি বা আধিপত্য বিস্তারের বাসনা বা লালসা হলো কামনারই প্রতিচ্ছবি। এই ধারণাকে পুষ্ট করতে গিয়ে তিনি দাবি তোলেন—শিল্প এবং যুদ্ধ হলো কামনাবৃত্তির দুটি বৃহৎ প্রকাশ। তবে এই ঘোষণাপত্রের সবচেয়ে সমস্যাজনক অংশটি হলো ‘যুদ্ধের পরে...বিজয়ীদের জন্য...বিজিত ভূমিতে ধর্ষণে লিপ্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক,’ যা যুদ্ধকালীন ধর্ষণকে ‘প্রাণশক্তি’ পুনরুদ্ধারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবে একপ্রকারের বৈধতা দেয়। এই চরমপন্থী অবস্থানটি ফিউচারিজমের একটি মূল নৈতিক সংকটকেও তুলে ধরে, যেখানে ইতালির ফিউচারিস্ট কবি মারিনেত্তির (১৮৭৬-১৯৪৪) মতোই ভ্যালেন্টাইন ‘আগ্রাসন = শক্তি = সৃষ্টি’ ধারণায় বিশ্বাসী হয়ে ‘সহিংসতা = সৌন্দর্য’ ধারণাকে রোমান্টিসাইজ করেন। আজকের পৃথিবীর নৈতিক, আইনি ও মানবিক মানদণ্ডের রাডার সেটাকে আটকে দেবে, নিঃসন্দেহে।

চার. রোমান্টিক ভালোবাসাকে প্রত্যাখ্যান

ইশতেহারটি রোমান্টিকতা ও সেন্টিমেন্টালিটিরও (কৃত্রিম আবেগপ্রবণতা) তীব্র বিরোধিতা করে। ভ্যালেন্টাইন মনে করতেন, এটি একটি আরামদায়ক ও অবনতিশীল আবরণ; সাহসের অভাব থেকে যার জন্ম। থই থই আবেগের পর্দা থেকে ভালোবাসা বা কামনাকে মুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি; যাতে একে পূর্ণ সচেতনতার সঙ্গে মোকাবিলা করে রূপ দেওয়া যায় মহৎ শিল্পকর্মে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসার নাম করে তৈরি করা আবেগ, কবিত্ব, চিরন্তনতার নাটক—এর সবটাই আসলে দ্বিচারিতা। তীব্র আবেগ হলো দুর্বলতার চিহ্ন, কারণ কোনো অভিজ্ঞতা বা সুস্পষ্ট জ্ঞান ছাড়াই যদি কামনাকে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে তা নেহাত অক্ষমতা। বরং প্রকৃত শক্তি হলো কামনাকে সচেতনভাবে এবং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বেছে নেওয়া, যাতে এটি দুজন সঙ্গী বা পার্টনারের অনুভূতি ও ইচ্ছাকে পূর্ণতার মাধ্যমে মহিমান্বিত করে তুলতে পারে। এর মধ্য দিয়ে ভ্যালেন্টাইন ১৮-১৯ শতকের রোমান্টিক ধারণারও কঠোর সমালোচনা করেন। আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির পক্ষ নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন—দেহের প্রতি দেহের আকর্ষণই প্রধান এবং এটাই বিবর্তনের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া।

পাঁচ. নিরন্তর যুদ্ধ এবং আত্ম-উত্তরণ

ভ্যালেন্টাইন তাঁর ইশতেহারটির একদম শেষে এসে কামনাকে এক অনন্ত যুদ্ধ আর আত্ম-উত্তরণের আবশ্যকীয় শক্তি হিসেবে দেখেন, যাকে কখনোই একেবারে জেতা যায় না; কেননা ক্ষণিক বিজয়ের পরেও মানুষের অন্তরে অতৃপ্তি জেগে ওঠে, যা তাকে উৎসাহ দেয় নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কামনা হলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের এক সাহায্যকারী শক্তি—দুর্বলকে ধ্বংস করে যা শক্তিশালীকে মহিমান্বিত করে তোলে। পাশাপাশি এটি দেহ ও আত্মার অনুরূপ আদর্শ—যেন মায়াময় এক কল্পনার ঘোড়া (ম্যাগনিফিসেন্ট কাইমেরা), যাকে মানুষ ক্রমাগত অনুসরণ করে ঠিকই, কিন্তু কখনোই সম্পূর্ণ আয়ত্তে আনতে পারে না। ধারণাটি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি সমালোচনা করে বলেন, ‘কামনাকে লুকানো, আড়াল করা বা অজুহাত দেওয়া প্রচণ্ড ভণ্ডামি। বরং এটিকে উপভোগ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মাণ করতে হবে সচেতনভাবে; এই অর্থে যেন তা পরিণত হতে পারে একটি শিল্পকর্মে।’ এই অ্যাস্থেটিক ইরোটিসিজমের (নান্দনিক কামুকতা) মাধ্যমে তিনি এ–ও দেখান যে কামনা মানুষকে তাঁর আপন সীমানা অতিক্রম করার দুঃসাহস জোগায়। একই সঙ্গে এটি অবিরাম উৎকর্ষেরও এক আকাঙ্ক্ষা—জার্মান দার্শনিক ফ্রেডরিখ নিৎসের (১৮৪৪-১৯০০) ‘অতিমানব’ (উবারমেনশ) ধারণার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে যা ইচ্ছাশক্তির উত্তরণকে (উইল টু পাওয়ার) প্রতিষ্ঠা করে।

ভ্যালেন্টাইন দ্য সেইন্ট-পয়েন্ট (১৮৭৫–১৯৫৩)
ছবি: সংগৃহীত

এই ম্যানিফেস্টো কামনা, দেহ আর সৃষ্টিশীলতার ধারণাগুলোকে নিয়ে আসে এক নতুন আলোয়, যা বিতর্কিতভাবে প্রভাব ফেলে আধুনিকতাবাদী নারীবাদের আলোচনায়। প্রথাগত নৈতিকতাকে অস্বীকার করে ‘কামনাকে শিল্পকর্মে রূপান্তর করার’ আহ্বান জানালেও, ‘যুদ্ধকালীন ধর্ষণকে বৈধতা’ দেওয়ার মতো চরমপন্থী অবস্থানের কারণে ইশতেহারটি কড়া সমালোচনার মুখে পড়ে। মারিনেত্তির পুরুষতান্ত্রিক ফিউচারিজমকে ভ্যালেন্টাইন চ্যালেঞ্জ জানালেও, তাঁর ‘সহিংসতা = সৃষ্টি’র মতো ধারণা এই আন্দোলনটির নৈতিক সংকটকেই স্পষ্ট করে তোলে। এত কিছুর পরও গবেষকেরা একে পিউরিটানবিরোধী এবং শরীর-রাজনীতির এক র‍্যাডিক্যাল দলিল হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

এই দার্শনিক ইশতেহারটি ছাড়াও ভ্যালেন্টাইন শিল্প আন্দোলন ও অভিব্যক্তিপূর্ণ নতুন নৃত্যশৈলী চালুর মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় শিল্পজগতে গভীর প্রভাব রেখেছেন। তাঁর নৃত্য-দর্শন ছিল আধ্যাত্মিকতা এবং দৈহিক শক্তির এক মিশ্রণ। অবশ্য জীবনের শেষ দিকে এসে তাঁর চিন্তাধারায় ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। তারুণ্যের প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা দিনগুলোয় ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও ফিউচারিস্ট দর্শন নিয়ে মজে থাকলেও পরিণত বয়সে পৌঁছে এসব থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনেন। ১৯২৪ সালে সব ছেড়েছুড়ে কায়রোতে পাড়ি জমান ভ্যালেন্টাইন, সেখানে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা লাভ করে নিজের নামও পাল্টে ফেলেন। পরিচিতি পান রাওহিয়্যা নুরেদ্দিন নামে। জানা যায়, জীবনের শেষ দশকগুলোতে তিনি মুসলিম নারী ও সমাজের ওপর গবেষণায় নিমগ্ন ছিলেন। এগুলো নিয়ে লিখেছেনও প্রচুর। প্রারম্ভের দৈহিক কামনাকেন্দ্রিক সেই শক্তির অনুসন্ধান, শেষমেশ গিয়ে ঠেকে আধ্যাত্মিক আর আত্মিক শান্তির অনুসন্ধানে।