‘তুই কি শিওর?’
‘অবশ্যই! ১৭৫% শিওর।’
সাব্বিরের গলা একটু জড়িয়ে যাচ্ছে। তবে তাতে তার উত্তেজনায় কোনো ভাটা পড়ছে না। ওর বন্ধুরা—অনম, ফরহাদ ও রাজীব—এদের মধ্যে ভেড়াপ্রবণতা প্রবল। তারা অন্ধের মতো তাদের মেষশাবক দলনেতা সাব্বিরকে অনুসরণ করে। সে যদি এখন দশতলা থেকে লাফ দেয়, অবধারিতভাবে ওরা তিনজনও দলপতির পদাঙ্ক অনুসরণ করে চোখ বুজে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
যদিও এই আনুগত্য তাদের জন্য কখনোই কোনো মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসেনি। এই তো গত বছর থাইল্যান্ডে সাব্বির সবাইকে কনভিন্স করল, জামাকাপড় সব খুলে ফুকেটের সাগরে ঝাঁপ দিতে হবে। তো চার বান্দা কনকনে ঠান্ডা পানিতে ঝাঁপ দিল ঠিকই, একই সঙ্গে নগ্ন অবস্থায় ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে পুলিশের কাছে গুনতে হলো জনপ্রতি পাঁচ হাজার বাথ জরিমানা!
এর আগের বছর সবাইকে নিয়ে সাব্বির শুরু করল বান্দরবানে পাহাড়ের ওপর থেকে জৈবিক তরল নির্গতকরণ কম্পিটিশন। এর মধ্যে শুরু হলো ঝোড়ো বাতাস। ব্যাপারটা এমনই বিতিকিচ্ছিরি হয়ে গেল যে ভিডিও করলে সেটার কাছে হার মানত পুতিনের কাছে লুকিয়ে রাখা ট্রাম্পের ভিডিওটি! তারপরও কেন জানি সাব্বিরের প্রতি ভক্তি কমে না কারও।
তবে এই প্রথম অনম, ফরহাদ আর রাজীবের মধ্যে একটু দোনামোনা ভাব দেখা যাচ্ছে। সাব্বিরের হাতে নতুন আইফোন। আর তার ভেতর নাকি আছে ভূত নামানোর এক বিশেষ অ্যাপ! থার্টি–ফার্স্ট নাইটের এই বিশেষ ঘোরলাগা পার্টিতে সে নাকি ভূত নামাবেই!
‘এত কিছু থাকতে ভূত কেন?’
‘কারণ ভূতই তো বলতে পারবে ভবিষ্যৎ!’
অগত্যা রাজি হয়ে গেল সবাই। শর্ত একটাই, নিরীহ কাউকে নামাতে হবে। হিটলার বা মুসোলিনি এ রকম কেউ নয়! রূপবতী কাউকে নামানোর একটা আইডিয়া এলেও সেটা ধোপে টিকল না। যেহেতু তারা বাস্তবে কোনো রূপসী নারীর সঙ্গেই ঠিকমতো কথা চালাতে পারে না, তাই মেরিলিন মনরোর ভূতের সঙ্গে কথা বলতে না পেরে নিজেদের আর বিব্রত করতে চাইল না তারা।
‘আসলে রসিক কাউকে নামানো দরকার।’
‘রসিক মানে, গোপালভাঁড়?’
‘গোপালভাঁড়! সে তো মনে হয় রিয়েল না!’
‘বলিস কী!’
মনটাই খারাপ হয়ে গেল সাব্বিরের। বিরস মুখে ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে হঠাৎ তার চোখে পড়ল, নতুন বছর নিয়ে শিবরাম চক্রবর্তীর সেই অমর বাণী। ব্যস, ডিসিশন ফাইনাল। শিবরামের ভূতকেই নামাতে হবে। চার বন্ধু বসল আইফোন ঠিক মাঝেখানে রেখে। এরপর চালু করা হলো ভূত নামানোর অ্যাপটি।
অন্ধকার ঘর, জানালা দিয়ে হালকা ঠান্ডা বাতাসেও চারজনের কপালে দেখা যাচ্ছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। চোখ বন্ধ করে তারা বলে চলল শিবরামের সেই বাণী:
‘বহু বছরের কঠিন পরিশ্রমের পর আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে “নতুন-বছর” “নতুন-বছর” বলে খুব হইচই করার কিস্যু নেই। যখনই কোনো নতুন বছর এসেছে, এক বছরের বেশি টেকেনি...!’
‘হে বাবা শিবরাম, আপনি যদি এখনো এই কথা বিশ্বাস করেন, তবে এসে দেখা দিন আমাদের মাঝে!’
বলতে বলতে হঠাৎই জ্বলে উঠল মুঠোফোনের স্ক্রিনটা। যেন কেউ ভিডিও কল করেছে। চারজন কিছুটা অবিশ্বাস আর কিছুটা নার্ভাসনেস নিয়ে ফোনটা ধরেই দেখে, ও মা, এ যে শিবরাম চক্রবর্তী! অনম, ফরহাদ, রাজীবের গলা শুকিয়ে কাঠ। ঢোঁক গিলতেও কষ্ট হচ্ছে। সাব্বির আমতা–আমতা করে জিজ্ঞেস করল, ‘সরাসরি না এসে ভিডিও কল করলেন যে গুরু!’
‘কোভিডের পর থেকে কোথাও যাইটাই না। ভূত বলে কি আমরা মানুষ না নাকি? সোশ্যাল ডিস্টেনসিং আমি খুব সিরিয়াসলি নিই।’
‘আপনার কাছে একটা প্রশ্ন ছিল।’
‘একটা কেন, দশটা করো।’
‘ওয়াইফাই কাজ করছে না আর ডাটা একটু শর্ট আছে। তাই একটাই প্রশ্ন। আচ্ছা, নতুন বছর কি “মেড ইন চায়না”, নাহলে এক বছরের বেশি টেকে না কেন?’
শিবরাম একটু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘নতুন বছর এক বছরের বেশি টেকে না কেন জানো? কারণ, কেউ টেকানোর চেষ্টাই করে না! তোমরা তো ওপরে উঠতে উঠতে মহাশূন্যে চলে গেছ। সেখান থেকে তাকিয়ে চায়নার দিকে তাকালেই দেখবে ওদের প্রাচীর। তার মানে কি দাঁড়াল? ওরা শুধু সস্তার বছরই বানায় না, বরং হাজার বছর টিকে থাকার মতো স্থাপনাও বানাতে জানে। এখন তোমরাই বেছে নাও কী করবে—আরেকটা বছর কি কাটিয়ে দেবে জলত্যাগের প্রতিযোগিতায়, নাকি মাথা আর গতর খাটিয়ে করবে স্থায়ী কিছু?’
বলেই হাওয়া হয়ে গেলেন শিবরাম। অন্ধকার হয়ে গেল আইফোনটিও। সাব্বির ভূত নামানোর অ্যাপটি একটু ঘাঁটাঘাঁটি করেই চোখ কপালে উঠিয়ে বলল, ‘যা শালা, এই অ্যাপও তো দেখি মেড ইন চায়না!’