জহির রায়হানের নতুন বই

আজ ৩০ জানুয়ারি জহির রায়হানের অন্তর্ধান দিবস। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের এই দিনে নিখোঁজ সহোদর শহীদুল্লা কায়সারের সন্ধানে বের হয়ে ঢাকার মিরপুরে হত্যার শিকার হন তিনি।

বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী জহির রায়হান বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। মাত্র ৩৭ বছরের জীবন পেয়েছিলেন। কিন্তু এই স্বল্পায়ুর জীবনের বৃহৎ অংশজুড়ে ছিল দেশ ও দেশের মানুষের মুক্তির তাড়না। গণমানুষের মুক্তির পথ হিসেবে তিনি গ্রহণ করেছিলেন বামপন্থী রাজনৈতিক আদর্শকে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে, তা সঞ্চারিত হয়েছিল জহির রায়হানের মধ্যেও, যা তাঁর শিল্পীসত্তা গঠনে রেখেছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

তাঁর প্রয়াণের এত বছর পরও নানা অনুসন্ধানে তাঁর অগ্রন্থিত গল্পের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে, যা রীতিমতো বিস্ময়কর এবং একই সঙ্গে আনন্দেরও। প্রথমা প্রকাশন থেকে ২০২৩ সালে মোট সাতটি অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল জহির রায়হানের বই যখন যন্ত্রণা। সেই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি প্রথমা প্রকাশন থেকে পাঁচটি অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে প্রকাশিত হলো জহির রায়হানের নতুন বই কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র। বইটি সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেছেন কাজী জাহিদুল হক।

জীবদ্দশায় জহির রায়হানের একটিমাত্র গল্পগ্রন্থ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয়। তাঁর ছোটগল্পের বড় অংশ গ্রন্থাকারে বের হতে থাকে মূলত তাঁর মৃত্যুর পর। এই বইয়ের গল্পগুলো ১৯৫৫ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে লেখা ও বিভিন্ন পত্রিকায় মুদ্রিত। এসব গল্পে মানুষের জীবনসংগ্রাম, মহাজনি শোষণ, ক্ষুধা, মানসিক টানাপোড়েন, সমাজে নারীর ভঙ্গুর অবস্থান এবং প্রেম ও মৃত্যুর মতো বিষয়গুলো প্রধান উপজীব্য হয়ে উঠেছে। এখানে জহির রায়হানের নিখুঁত সমাজবীক্ষণ ও সচেতন শিল্পীসত্তার পরিচয় পাওয়া যায়।

‘জিয়নকাঠি’, ‘ফাটল’, ‘বারো ঘরের ঘরনি’, ‘কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র’, ‘অজগর’—সব মিলিয়ে পাঁচটি অগ্রন্থিত গল্প নিয়ে এই বই।

‘জিয়নকাঠি’ গল্প ১৯৫০–এর দশকের একটি গ্রামীণ আবহ নিয়ে আমাদের দেখায় যে কীভাবে সমাজপতিদের দাসে পরিণত হয় অসহায়, নিরন্ন মানুষ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম টানতে হয় এই দাসত্বের ঘানি।

এই বইয়ের ‘ফাটল’ গল্প এমন এক সমাজবাস্তবতার মুখোমুখি করে, যেখানে আর্থিক ও কাঠামোগত উন্নতি খড়্গ হয়ে আসে প্রান্তিক মানুষের কাছে। তাদের নিরন্তর ছুটতে হয় বেঁচে থাকার তাগিদে।

‘বারো ঘরের ঘরনি’ গল্পের মূল কেন্দ্রে আছে ক্ষুধা। ‘নাতি উন্নত দেহে মায়ের দুধের ঘ্রাণ যেন এখনো লেগে আছে। সারা মুখ শিশুর চপলতায় ভরা।’—পাঁচ–ছয় বছরের এই শিশু আমেনাকে পথে নামতে হয় ক্ষুধার তাড়নায়। একসময় সে হয়ে ওঠে সর্বংসহা, নিস্পৃহ। এক অমানবিক, অসহিষ্ণু পৃথিবী পড়ে থাকে তার দুর্বিষহ, অনিশ্চিত জীবনের সামনে।

নামগল্প ‘কয়েকটি নদী ও একটি সমুদ্র’ মূলত রোমানা নামের এক মেয়ের আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে চারজনের জবানবন্দি। আঙ্গিক দিক থেকে ব্যতিক্রম এই গল্প। একটি আত্মহত্যা চারজন বর্ণনা করছেন চার রকম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। প্রতিটি জবানবন্দি আলাদা বাস্তবতা আর সত্য তুলে ধরে পাঠকের সামনে। প্রত্যেকের বর্ণনায় চরিত্রের নাম, সম্পর্ক আর ঘটনা বদলে যায়। পুলিশের কাছে মায়ের জবানবন্দি ‘যদিও ওরা আমায় মা বলে ডাকত, আসলে আমি ওদের মা নই। ফুলজান আর ফাতনা। ওরা আমার কেউ নয়। সবটাই একটা চক্রান্ত।’ আবার মেয়ের ডায়েরির সাক্ষ্য পাঠককে নিয়ে যায় অন্য সত্যের কাছে, ‘স্বচ্ছন্দে মাকে আপা বলে ডাকতাম সবার সামনে। কিন্তু কেউ যখন থাকত না, বিশেষ করে রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে শুয়ে মাকে আমি প্রাণভরে মা বলে ডাকতাম।’ গল্পটিতে জাপানি চলচ্চিত্রকার আকিরা কুরোসাওয়ার বিখ্যাত ছবি রাশোমন–এর ছায়া পাওয়া যায়।

‘অজগর’ গল্প নগরবাস্তবতায় দাঁড়িয়ে দেখায় কীভাবে অর্থ ও আধিপত্য ব্যক্তিকে একটি জন্তুতে পরিণত করে।

গল্পগুলোতে জহির রায়হানকে নতুন করে আবিষ্কার করবেন পাঠক। একই সঙ্গে এই বই পূর্ব বাংলার একটি বিশেষ কালপর্বের মানুষ, সমাজ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি করবে বলে মনে করি।