পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতে মনোযোগী হলাম। শুরুতেই একটি ছন্দোবদ্ধ কবিতা—নিজেকে প্রমাণে ছন্দের বিকল্প নেই। এরপর টানা গদ্য। একঘেয়েমি যাতে না লাগে, এ জন্য বিরতি দিয়ে দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কবিতা দিয়ে পাণ্ডুলিপি সাজালাম। চূড়ান্ত গোছানো শেষ হলে পাণ্ডুলিপির নাম বাছাইয়ের পালা। শেরাটনের সেই দৃশ্যের কথা মনে পড়ল, নাম রাখলাম—‘বিব্রত ময়ূর’।

পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ এক অপেক্ষা। ঠিক যখন আশা ছেড়ে দিলাম, তখন একদিন প্রথম আলো থেকে ফোন এল। বলা হলো দেখা করতে। বুক কাঁপতে লাগল আমার।

নির্ধারিত দিনে গেলাম প্রথম আলো কার্যালয়ে। প্রথমা প্রকাশনের সমন্বয়ক জাফর আহমদ রাশেদ জানালেন, আমার পাণ্ডুলিপিটি সেরা তিনে আছে। ছবি তুলতে ডেকেছেন।

সিএ ভবনের সামনের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছবি তুললেন খালেদ সরকার। কড়া রোদ। সরাসরি রোদে তাকাতে আমার অসুবিধা হয়। তার ওপর ক্যামেরার দিকে তাকালে মুখটা কেমন যেন গোমড়া হয়ে যায়। নানা কসরত করে ছবি তোলা হলো।

এরপর অনেক দিন কোনো খবর নেই। রোজ পত্রিকা দেখি। পুরস্কার-সম্পর্কিত কোনো সংবাদ আর ছাপা হয় না। অন্য কেউ জিতল নাকি বাকি দুজনের মধ্যে? কী এক তীব্র উৎকণ্ঠা!

আগেই তো ভালো ছিল। কী দরকার ছিল ডেকে নিয়ে গিয়ে ছবি তোলার!...মাত্র বিয়ে করেছি তখন। আমার অবস্থা দেখে সাংসারিক সব চাপ থেকে দূরে রাখে সদ্য বিবাহিতা।

অবশেষে প্রথম আলো শেষ পাতায় ছবিসহ সংবাদ প্রকাশিত হলো। নানা জায়গা থেকে অভিনন্দিত হলাম। আমার অফিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খুব খুশি হলেন খবরটি দেখে। এ ঘটনায় আমার বেতন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। সেই চাকরি পাল্টেছি, তবু মানুষটির প্রতি এখনো আমার গভীর ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা কাজ করে।

পরবর্তীকালে লেখালেখিসহ জীবনের নানা ক্ষেত্রে ‘জীবনানন্দ দাশ পাণ্ডুলিপি পুরস্কার’ প্রভাব রেখেছে। প্রচুর মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। ঢাকার বাইরে থেকে এসে একজন তরুণ লেখককে যে নানা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হয়, সে জায়গা থেকে আমি অনেকখানি বেঁচে যাই। ‘সুচাগ্র মেদিনী’ নয়, প্রায় বিনা যুদ্ধে ‘হলাগ্র মেদিনী’ লাভ করি।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার, আমার বাবা, যিনি আগে কোনো দিন আমার লেখালেখিতে সমর্থন দেননি, তিনিই পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরে আমাকে বলেছিলেন, ‘ভুলেও কখনো লেখালেখি ছাড়িস না।’