শরিফুলই বলছিল পুঁইশাক দিয়ে ভাত মাখতে মাখতে, ‘ভাইজান যদি বিয়া না করে, তালি আমাক বিয়া দেন।’ আরিফুল ভাতের লোকমা মুখে তুলতে তুলতে সলজ্জভাবে ঘাড় কাত করে সায় দেয়। গুলজানের গা জ্বলে। ‘পুরুষ মানুষ ক্যান হাসপি অমন মিচিক মারিয়া? পুরুষ মানুষ ক্যান ছোট ভাইরে আগে বিয়া করবের কয়?’

শরিফুলের বউ সারা উঠান হাঁটে। গুলজান দেখে রমিজার গলায়, বুকের কাছে দাগ। লাল লাল দাগ। গুলজান মনে মনে হাসে। এই রকম দাগ নিয়ে গুলজানও এ বাড়িতে একসময় হেঁটে বেড়িয়েছে। শরিফুল রমিজার গায়ে দাগ দেয়। রাতে রাতে দাগ দেয়। গুলজান দেখেও দেখে না। কিন্তু আরিফুল দেখে। গুলজানের গা জ্বলে। পুরুষ মানুষ ক্যান ছোট ভাইয়ের বউক অমন নজর করিয়া দেখে? কিন্তু আরিফুল দেখে। আর কী জানি খালি লেখে।

রমিজা টের পায়। তার অপার কৌতূহল। ভাইজান কী লেখে? ভাইজানের অনেক খাতা। সারা দিন লেখে। রমিজার দেখতে ইচ্ছা করে। গুলজানের গা জ্বলে। হারামজাদা এত কী লেখে? ইটভাটার হিসাবের খাতা লেখলিও তো কত কাজ হতো! না, হারামজাদা তা লেখপি না। ঘরের মদ্যি বইসে বইসে খালি চোতা লেখপি।

একদিন রমিজা সাহস করে আরিফুলের ঘরে যায়। বলে, ‘ভাইজান চা খাবেন?’ আরিফুল রমিজার গলার দাগের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে, ‘দেও!’ রমিজার খুব ভালো লাগে, তবু সে চট করে আঁচল টানে। একছুটে চা বানাতে যায়। গুলজানের গা জ্বলে। মাগি ক্যান ভাশুরেক দেখে হাসে? তা ছাড়া মাগির বাপে টানজেস্টার দিবে কইছিল, সাইকেলও দিবে কইছিল। সেসব এখনো আসে নাই।

রমিজার শরীরে আরও দাগ পড়ে। লাল লাল দাগ। তবে বুকে, গলায় না। পিঠে। পায়ে। পাছায়। চ্যালাকাঠের বাড়ির দাগ। রমিজাকে দাগানোর শারীরিক পরিশ্রমে গুলজানের শরীরে ক্লান্তি আর মনে শান্তি আসে।

আরিফুল বাক্‌রুদ্ধ। তার কলম পড়ে থাকে। গুলজানের গা জ্বলে। আরিফুল লেখে না ক্যা? হারামজাদার লেখা কি শেষ হয়া গেল? সেই রাতে কিন্তু রমিজার শরীরে আরও দাগ পড়ে। গলায়, বুকে। আরও গভীরে। ইটের ভাটা থেকে ফিরে শরিফুল রমিজাকে দাগায়। নির্যাতিতা আর ক্রন্দনরতাকে দাগানোয় আনন্দ আছে। রমিজাকে দাগানোর শারীরিক পরিশ্রমে শরিফুলের শরীরে ক্লান্তি আর মনে শান্তি আসে।

ঘোর বর্ষা। ইটভাটা তলিয়ে গেছে। শরিফুল রাগে দাগায়। শীতে ইট বিক্রি বেশি। এক নম্বর ইট বিক্রির টাকায় রাতে লেপের নিচে তাপ বাড়ে। শরিফুল ওমে সোহাগে দাগায়। রমিজা দাগ নিয়ে সারা বাড়ি হাঁটে।

যেদিন পুকুরঘাট থেকে গোসল করে এসে কাপড় বদলানোর সময় আরিফুলের সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়, সেই দিন থেকে রমিজা আর ভাশুরের সামনে যেতে পারে না।

তবে সেই দিন থেকে আরিফুল রমিজাকে নিয়ে লিখতে শুরু করে। গুলজান শান্তি পায়। হারামজাদা আবার লেখতে শুরু করছে। মাগি আর ভাশুরের সামনে যায় না।

কেবল রমিজা টের পায়, কবি কেমন করে তার শরীর দাগাতে থাকে। কবি আরিফুল। আরিফুল যতই খাতায় দাগাক, সেই দাগ কি আর খাতায় পড়ে? সেই দাগ পড়ে রমিজার কাঞ্চা শরীরে। আর রমিজা বোঝে, আরিফুল আসলে কী লেখে? তার কলম কোথায় দাগায়?

রমিজার শরীরে নিজ নিজ দাগ দেখে শান্তিতে ঘুমায় গুলজান আর শরিফুল। কেবল রমিজা জেগে থাকে। আর আরিফুল জেগে থাকে। অদৃশ্য দাগে তারা আঁকিবুকি খেলে, নিঃশব্দে। চাঁদের আলোয়।