১৭ জুন প্রথম আলোর ক্রোড়পত্র ‘অন্য আলো’তে জেমস জয়েসের ৭৫০ পৃষ্ঠাব্যাপী ইউলিসিস উপন্যাস নিয়ে মাসরুর আরেফিনের দীর্ঘ লেখাটি পড়লাম যথেষ্ট মনোযোগ দিয়ে। যদিও ইউলিসিস এবং এর প্রকাশনাসংক্রান্ত অনেক বিষয় আমার জানা, তবু কিছু অজানা, চাঞ্চল্যকর তথ্য পাই কি না, লেখটি পড়ার পেছনে সেই আগ্রহই মূলত কাজ করেছে। পড়ে মনে হলো, লেখাটি মোটামুটি বিস্তৃত ও বিশ্লেষণগুণসম্পন্ন। এ লেখার সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিকভাবেই দু-একটি কথা বলতে চাই।
ইউলিসিস আমি প্রথম পড়ি ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে এমএ ক্লাসে পড়ার সময়। পরে আবার পড়ি ১৯৮০ সালের প্রথম দিকে। প্রথমবার বইটির বহু জায়গা দুর্বোধ্য লেগেছে নিরীক্ষামূলক বাংলা ও ইংরেজি গদ্যের প্রতি আমার প্রবল আগ্রহ সত্ত্বেও। দ্বিতীয় পাঠে আমি উপন্যাসের নায়ক লিওপোল্ড ব্লুমের সঙ্গে ডাবলিনের পথে পথে ঘুরি তার নানা ধরনের ফ্যান্টাসি ও তার স্বগতচিন্তার চোরাস্রোত ধরে। উল্লেখ্য, ভিক্টোরিয়ান যুগের কবি আলফ্রেড টেনিসনের ‘ইউলিসিস’ নামে একটি জনপ্রিয় কবিতা আছে। প্রকাশকাল ১৮৪২। টেনিসনের কবিতার মূল বিষয় অডিসিউসের বাড়িতে ফেরার দুর্গম যাত্রা এবং আবার সমুদ্রাভিযানে যাওয়ার অভিলাষ।
মাসরুর আরেফিন তাঁর লেখায় ইউলিসিস (প্রথম প্রকাশ: ২ ফেব্রুয়ারি ১৯২২, প্যারিস) উপন্যাসটির প্রকাশনাসংক্রান্ত দীর্ঘ জটিলতা বিবৃত করেছেন। আইরশি লেখকের এ অধ্যায় সম্পর্কে তাঁর একনিষ্ঠ পাঠকেরা মোটামুটি অবগত। তাঁরা জানেন, এসবের মূলে আছে উপন্যাসে বিবৃত বিশদ যৌনতা। মুদ্রিত অক্ষরে জয়েসীয় সেক্স-ফ্যান্টাসিগুলো মূলধারার সাহিত্যে এ রকম নগ্নভাবে প্রকাশিত হতে পারে, উপমহাদেশের লেখকেরা কল্পনাও করতে পারেন না। প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন বাঙালি লেখক বুদ্ধদেব বসু (রাতভর বৃষ্টি), সমরেশ বসু (বিবর, প্রজাপতি)। আর এ ক্ষেত্রে সন্দীপন চট্রোপাধ্যায়ের নামও নেওয়া যায়। তাঁদের কাউকে কাউকে আদালত পর্যন্ত যেতে হয়েছিল।
আর ব্রিটেনে ধিক্কৃত হয়েছিলেন ডি এইচ লরেন্স তাঁর রেইনবো ও লেডি চ্যাটার্লিস লাভার-এর জন্য। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রে উইলিয়াম বারাসের নেকেড লাঞ্চ (১৯৬২), ফিলিপ রথের পোর্টনয়’স কমপ্লেইন্ট (১৯৬৯) সাধারণ পাঠক মহলে সমালোচনার রীতিমতো টর্নেডো বইয়ে দেয়। অবাক ব্যাপার হচ্ছে, দুনিয়াখ্যাত টাইম সাময়িকীর মতে, ফিলিপ রথের বইটি ১৯২৩ থেকে ২০০৫-এর মধ্যে প্রকাশিত টাইম নির্বাচিত ১০০টি শ্রেষ্ঠ ইংরেজি উপন্যাসের একটি। অনেকে বলবেন, এখানেই নিহিত আছে পূর্ব ও পশ্চিমের মূল্যবোধের পার্থক্যের বিষয়টি। গত শতকের মধ্যসত্তর ও মধ্য–আশি দশকে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন শহর ও ঢাকা ঘুরে যাওয়া জার্মান লেখক গুন্টার গ্রাস তাঁর টিন ড্রাম (১৯৫৯) উপন্যাসে উদার স্বেচ্ছা-স্বাধীনতায় যৌনতাকে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এটি তিনি করেছেন পরম কুশলতায়। উপন্যাসের আবহের সঙ্গে এটা মিলে গেছে অনায়াসে।
এখন প্রশ্ন, প্রাচ্যবাসীদের চোখে ইউলিসিস-এর যৌনতানির্ভর অবচেতনের দৃশ্যাবলি এবং বেডরুমের কল্পনাশ্রয়ী ক্রিয়াকলাপগুলো আদৌ অনিবার্য ছিল কি না। জেমস জয়েস কি বাড়াবাড়ি করেছেন? এসবে গা না ছেড়ে দিয়েও টমাস মান, গ্রিসের নিকোস কাজানজাকিস বা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস আধুনিককালের একেকজন দিকপাল হয়ে বেঁচে আছেন বিশ্বসাহিত্যে।
এরপরও জেমস জয়েস অমর হয়ে থাকবেন তাঁর নিজস্ব ভাষাশৈলী এবং উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র লিওপোল্ড ব্লুমের জন্য। জয়েস নিঃসন্দেহে অন্যদের সঙ্গে শীর্ষেই অবস্থান করছেন।
শিহাব সরকার
সেন্ট্রাল রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা।