জলরঙের জীবন

‘সুন্দরবন’, শিল্পী: শাহনূর মামুন
‘সুন্দরবন’, শিল্পী: শাহনূর মামুন

শাহনূর মামুন তাঁর ফেসবুক পাতায় লিখে রেখেছেন ‘জীবন জলরঙের মতো।’ জলরঙের শিল্পী মামুনের এই একটি কথাই আমাদের কাছে পরিষ্কার করে দিয়েছে তাঁর শিল্পদর্শন। জলরঙের বাহারি স্বচ্ছতা আর নিরবধি বহমানতা তো জীবনেরই অন্য রূপ। ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি শিল্পীর মনকে আন্দোলিত করে, এভাবেই ঋদ্ধ হয় তাঁর শিল্পীসত্তা। এই তো কদিন আগে তরুণ চিত্রকর শাহানূর মামুনের তৃতীয় একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী ‘নস্টালজিয়া অ্যান্ড দ্য ফলোয়িং লাইফ’ শুরু হয়েছিল উত্তরায় অবস্থিত গ্যালারি কায়াতে। ৯ অক্টোবর শুরু হওয়া এ প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছিল জলরঙের ৪৬টি ছবি।
অনেক মাধ্যম থাকতে শুধু জলরং–ই কেন? উত্তরে মামুনের কথাটি উদ্ধৃত করি: ‘আমাদের দেশের ঋতুবৈচিত্র্যের সঙ্গে জলরংয়ের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। নিসর্গের বিভিন্ন মুহূর্তকে আলাদাভাবে মেলে ধরা যায় এই মাধ্যমে। এ কারণে প্রদর্শনীর সবগুলো ছবিতে জলরং ব্যবহার করেছি।’
শাহনূর মামুনের প্রথম ও দ্বিতীয়—এই দুই প্রদর্শনীর ছবিগুলোও ছিল একই মাধ্যমে আঁকা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে সেখানকার নিসর্গচিত্র ও জনজীবনের রোজনামচাই এ শিল্পীর ছবির মূল বিষয়। তিনি দেখিয়েছেন পুরান ঢাকার গলিতে কাদা আর বৃষ্টির পানিতে মাখামাখির চিত্র, ব্রহ্মপুত্র নদীতে বৃষ্টির ছন্দ, ছাতা মাথায় নগরবাসীর হেঁটে যাওয়া—এমন হরেক মনোহর দৃশ্য। বৃষ্টিকে উপজীব্য করে আঁকা ছবির মধ্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ হলো, ‘জলকাব্যে বর্ষা’, ‘বৃষ্টির ছন্দ’, ‘শহরে বৃষ্টি’ প্রভৃতি।
তবে মামুনের ক্যানভাসে শুধু বৃষ্টিই নয়, উজ্জ্বল রোদ-ঝলমল দিনে পাহাড়ের ছবিও পাওয়া যায়। আছে সারি বেঁধে চলা রাজপথের রিকশা, মাছ ধরা, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থান, বুড়িগঙ্গা নদী—জলরঙে আঁকা ইত্যাকার ছবি।
প্রায় সব ছবিই সাম্প্রতিক সময়ে আঁকা। ‘বান্দরবান’, ‘নৌকা ও জলকাব্য’, ‘সুন্দরবন’, ‘শীতের সকালে’—এই ছবিগুলো আলাদাভাবে উল্লেখ করার মতো। এ প্রসঙ্গে বলা যায়, জলরং নিয়ে কিছুটা বিলাসিতা করেছেন শিল্পী। মামুনের দক্ষতায় প্রকৃতির উদারতা আর নমনীয়তা জলরঙে যেন তুলির একেকটা আদুরে প্রলেপ হয়ে ধরা দিয়েছে। ছবিতে আলো-আঁধারির খেলা বেশ প্রশংসনীয়।
‘জলবিন্দু’ ও ‘জলছবি’ শিরোনামে এ শিল্পীর আগের দুটি প্রদর্শনী যাঁরা দেখেছেন, বর্তমানটিসহ তাঁদের কাছে এই তিন একক প্রদর্শনীকে সিরিজ প্রদর্শনী মনে হতে পারে। কারণ, তিনটি প্রদর্শনীর মধ্যকার দূরত্ব খুব বেশি সময়ের নয়। এ ছাড়া তিনটির কাজগুলোও প্রায় একই ঘরানার। ফলে প্রদর্শনীতে শিল্পীর নতুন ভাবনার অনুপস্থিতি লক্ষণীয়; বরং এটি তাঁর পুরোনো প্রকাশভঙ্গিকেই আরেকটু ঝালিয়ে দিয়েছে মনে হয়। ১২ দিনের এ প্রদর্শনী শেষ হয়েছে ২০ অক্টোবর।