তাঁর কথাসাহিত্যের সামনে দাঁড়িয়ে

তাঁর সর্বশেষ গল্প-উপন্যাস লেখার পরে প্রায় আট দশকের নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে আমরা ভুলেই গেছি যে রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণ করতে গিয়ে কত শত লেখক নিজেদের অপমৃত্যু ঘটিয়েছেন পিলসুজে আত্মাহুতি দেওয়া মথের মতো। আজ আমরা কল্পনাও হয়তো করতে পারব না যে রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে বাঁচার জন্য কেন হন্যে হয়ে উঠেছিলেন তিরিশের লেখক-কবিরা। রবীন্দ্রনাথ যখন সৃষ্টির তুঙ্গে, সেই সময় অন্যদের মধ্যে যতটুকু নিজস্বতা, তা সেই কাজী নজরুল ইসলামের। আরেকটি ধারায় ছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রমথ চৌধুরী, মোহিতলাল মজুমদারকেও সেই কৃতিত্ব কিছুটা দেওয়া হয় বটে, কিন্তু তা এতটাই সূক্ষ্ম চিন্তাশীলতা দিয়ে খুঁজে বের করতে হয় যে, তাকে না থাকারই নামান্তর বলা চলে। গদ্যে তিরিশের প্রেমেন্দ্র-অচিন্ত্য-শৈলজানন্দরা এটুকু বুঝে গিয়েছিলেন যে রবীন্দ্রনাথকে অনুকরণ করা অসম্ভব। অন্য পথে হাঁটতেই হবে। নানা জনে নানা ভাবে রবীন্দ্র-গদ্যের বিশিষ্টতা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রধানত যেটি রবীন্দ্র-গদ্যের বৈশিষ্ট্য, তা হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের গদ্যের উৎস বুদ্ধি-যুক্তি-তর্ক নয়, উৎস হচ্ছে বোধি। বোধি বলতে আমরা আভিধানিক অর্থে জ্ঞান বুঝে থাকি, কিন্তু বোধির আসল ব্যঞ্জনা জ্ঞানের চেয়ে অনেক ওপরের স্তরের। বোধিও ইন্দ্রিয়জই বটে, কিন্তু অনেক সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়জ। তাঁর গল্প লেখার শুরুর সময়ের কথা, পরিবেশের কথা, রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন নোবেল অভিভাষণে। সেই প্রস্তুতি-প্রকৃতি-পরিবেশ যদি কারও হুবহুও জোটে, তবু তিনি রবীন্দ্রনাথের গদ্য লিখতে পারবেন না। কারণ বোধির ভিন্নতা।
আমরা বলি যে, বাংলা ভাষায় প্রথম সার্থক ছোটগল্প লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। এ কথায় দ্বিমত প্রকাশের অবকাশও নেই। কিন্তু বিতর্ক রয়েছে এটা নিয়ে যে গল্প লেখায় তিনি কি পুরোপুরি ইউরোপের আদর্শই গ্রহণ করেছেন, নাকি বাঙালির আদি কোনো প্রকরণ তাঁকে এসব গল্প লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে? নিজে ছোটগল্প লিখতে শুরু করার অনেক আগে থেকেই ইউরোপের ছোটগল্পের মুগ্ধ পাঠক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর বড়ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশ কিছু ফরাসি গল্প অনুবাদ করেছিলেন বাংলায়। ধারণা করে নেওয়া যায় যে তিনি সেগুলো ছোটভাইকে পড়তে দিয়েছিলেন। এগুলো ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ যে মার্কিন লেখক অ্যালান পো, আর্ভিং, হথর্ন, মার্ক টোয়েন, হ্যামলিন গারল্যান্ড; ফরাসি লেখক মোপাসাঁ, বালজাক, গোতিয়ের, দোদে, ফ্রাঁস; রুশ লেখক গোগোল, চেখভ, তুর্গেনিভ, তলস্তয়, দস্তয়ভস্কি, গোর্কি পাঠ করেছিলেন মনোযোগের সঙ্গে, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বিভিন্নজনের সাক্ষ্য, চিঠিপত্র এবং রবীন্দ্রনাথের লাইব্রেরিতে দাগ দিয়ে পড়া বইগুলোতে। আবার আমাদের বাঙালি সমাজে চলে আসা কথকতা-পাঁচািল-ব্রতকথা-পুঁথির সঙ্গেও তাঁর পরিচয় ঘটেছিল সেই শৈশবেই। ঘনিষ্ঠ পরিচয় ছিল রূপকথা, জাতকের গল্প ও পঞ্চতন্ত্র-হিতোপদেশের সঙ্গে। নিজের গল্প রচনার সময় প্রাচ্য বা পাশ্চাত্যের যেকোনো একটিকে আদর্শ হিসেবে না ধরে দুইয়ের মিলন ঘটানোর চেষ্টা যে তিনি করবেন, এমনটি ধরে নেওয়াই যায়। কারণ হিসেবে বলা যায়, তাঁর সৃষ্ট গল্প কোনো নির্দিষ্ট পাশ্চাত্য লেখক বা পাশ্চাত্যের কোনো দেশের ছোটগল্পের অনুকৃত প্রতিরূপ বলে শনাক্ত করা যায় না। প্রথম থেকেই রবীন্দ্রনাথের গল্প পুরোপুরি বাংলা গল্প, বাঙালিরই গল্প। পোশাকটা বিদেিশ হলেও ভেতরে আছে খাঁটি বাঙালির শরীর আর মন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই দাবি করেছিলেন, এবং সেই দাবি সত্যও বটে, যে তাঁকে ছোটগল্প লিখতে গিয়ে গল্পের জন্য উপযুক্ত ভাষাটিকেও নির্মাণ করে নিতে হয়েছে। তিনি কোনো তৈরি গদ্য পাননি। তো সেই গদ্য তিনি নির্মাণ করবেন কীভাবে? কোনো ইংরেজি গদ্য তো তাঁর ছোটগল্পের বাহন হয়নি। তাঁর ছোটগল্পের গদ্যে রয়েছে তীক্ষ্ণতা, শ্লেষ, সহানুভূতি, আর্দ্র করুণা প্রকাশের উপযুক্ত পরিশীলিত শব্দ, রোজকার কেজো শব্দ, আঞ্চলিক শব্দ, দক্ষিণ কলকাতার মানুষের মুখের বুলি, আরবি-ফারসি শব্দ, হিন্দি-উর্দু শব্দ, ইংরেজি শব্দ। কিন্তু তৎসম শব্দ অনেক থাকলেও সংস্কৃত গদ্যের ধাঁচে কখনোই ব্যবহৃত হয়নি। এই গদ্য নির্মাণে ইংরেজির নকলনবিিশ নেই। আছে পাঁচািল-পুঁথি-কথকতার কাছে হাত পাতার স্পষ্ট চিহ্ন। নিজেদের সম্পদ নতুন করে নিজের মতো করে ব্যবহার করার প্রবণতা এবং সক্ষমতা। রবীন্দ্রনাথ যে কেবল বিশ্বমানের ছোটগল্প লিখেছেন তা-ই নয়, বরং বিশ্বকে ছোটগল্পের কিছু কিছু নতুন পথও দেখিয়েছেন, যেমন চমকের ব্যবহার না করে গল্প শেষ করা—এসবের পেছনে এই সমন্বয়ের অবদানই সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা যায়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা রবীন্দ্রনাথের গল্পগুলোকে ভাগ করেন প্রকৃতিলগ্নতার গল্প, ব্যক্তিসম্পর্কনির্ভর গল্প, পারিবারিক সম্পর্কের গল্প, সমাজ সংস্কারমূলক গল্প, অতিপ্রাকৃত গল্প—এইসব নানা ভাগে। এভাবে শ্রেণীকরণ করে হয়তো পরীক্ষায় নম্বর পাওয়া যায়, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পকে বোঝা যায় বলে কোনো সৃষ্টিশীল ব্যক্তি স্বীকার করবেন না। তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের প্রস্তুতিকালের গল্প, আর পরিণত কালের গল্প। প্রত্যেক লেখকেরই যে প্রস্তুতির দরকার আছে, তিনি যে শূন্য থেকে বা মায়ের পেট থেকে নেমেই একেবারে গটগট করে সাহিত্যের চূড়ায় উঠে যান না, এটি সকল যুগের লেখক-পাঠক এবং সমালোচকদের মনে রাখার জন্য খুব দরকার। এমনকি রবীন্দ্রনাথও তার ব্যতিক্রম নন। ১৬ বছর বয়সে লেখা ‘ভিখািরনী’, আর ২৪ থেকে ৩৬ বছর বয়সের মধ্যে লেখা ‘দেনাপাওনা’ ‘পোস্টমাস্টার’ ‘গিন্নি’ ‘রামকানাইয়ের নিবুর্দ্ধিতা’ ‘সমাপ্তি’ ‘একরাত্রি’ মিলিয়ে দেখলেই এ সম্পর্কে আরও নিঃসন্দেহ হওয়া সম্ভব হবে। লেখক যে হঠাৎ জন্মান না, তিনি প্রতিনিয়ত ‘হয়ে ওঠেন’, এই শিক্ষাটা রবীন্দ্রনাথ থেকে পাওয়া গেলে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়।
একসময় রবীন্দ্রনাথের সকল সৃষ্টির মধ্যে আমার কাছে ছোটগল্পকে মনে হতো সবচেয়ে সমৃদ্ধ, আর তার উপন্যাসগুলোকে মনে হতো সবচেয়ে দুর্বল। ছোটগল্প নিয়ে মনোভাব এখনো প্রায় অপরিবর্তিত। উপন্যাস নিয়ে আগের অবস্থান অনেকটাই টলে গেছে। নৌকাডুবি বা চোখের বালিকে আমার কাছে দুর্বল উপন্যাস মনে হতো। আমার এই মতের সঙ্গে মিলে যেতে দেখেছি অমিয়ভূষণ মজুমদারের মতামতকেও। কিন্তু গোরা নিয়ে আমার মতামত এখন পাল্টেছে। বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে মানতে হয় গোরাকে। কিন্তু তারপরেও অস্বস্তি রয়ে গিয়েছিল অনেক দিন—এই উপন্যাসের সংলাপময়তা নিয়ে। এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো কেবল কথা বলে আর কথা বলে—বলেই চলে। তর্কের নামে কথা বলে, দেশপ্রেমের নামে কথা বলে, সমাজের কূপমণ্ডুকতার নামে কথা বলে, জাতীয়তার সংজ্ঞার নামে কথা বলে, সংস্কারের নামে কথা বলে। শুধু কথা আর কথা। যেন তাদের আর কোনো কাজই নেই। উপার্জনের দায় নেই, সাংসারিকতার দায় নেই, অফিস-কলেজ-বাজারে যাওয়া নেই, বাইরের পৃথিবীর ঝাঁঝালো বাতাসের সঙ্গে দেনাপাওনা নেই, রক্তঘামশ্রমের পৃথিবীর সঙ্গে যোগ দেওয়ার কোনো আবশ্যকতা নেই, এমনকি বৈকালিক ভ্রমণ বা শারীরিক খেলাধুলা বা বিনোদন পর্যন্ত নেই। এই উপন্যাস পড়ে যেকোনো বিদেিশ পাঠকই ভাবতে বাধ্য যে আমাদের দেশের মানুষ কেবল কথাই বলে, কথা বলার অফুরন্ত সময় তাদের। উপন্যাসে ঘটনা কোথায়? অতবড় উপন্যাসের আয়তনজুড়ে কেবল কথা আর কথা। বৃহত্তর মানবসমাজ, সাধারণ মানুষ, কর্মজীবী মানুষের সঙ্গে সংযোগের কোনো চিহ্ন নেই। যদিও তাদের জন্য গোরা, বিনয়, আনন্দময়ী, পরেশবাবু, ললিতা, হারানবাবু—প্রত্যেকেরই রয়েছে বুকভরা ভালোবাসা, করুণা, শুদ্ধ মমতা। এখন জানি যে রবীন্দ্রনাথ এভাবেই নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন তাঁর এই উপন্যাস। ঘটনা-প্রতিঘটনা-সংশ্লেষণ ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে সচরাচর উপন্যাস যেভাবে অগ্রসর হয়, সেভাবে তিনি লিখতে চাননি গোরা। তার পরও রবীন্দ্রনাথের অসামান্য প্রতিভায় গোরা একটি সার্থক উপন্যাস হয়ে উঠতে পেরেছে। উপন্যাস যে বিষয় নিয়েই নির্মিত হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সেখানে ‘ব্যক্তি’ই মুখ্য। আবার একটি আবর্তমান জগৎ না থাকলে সেখানে ব্যক্তিকে তো চেনাই যাবে না। গোরাতে রবীন্দ্রনাথ ছোট হলেও মাকড়সার জালের মতো একটি আবর্তমান পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। সেখানে প্রত্যেককেই ব্যক্তি হিসেবে চেনা যায়। সেই কারণেই গোরা শেষ পর্যন্ত উপন্যাস হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে আমাদের ভাষার অন্যতম প্রধান উপন্যাস।
৮০ বছরের ব্যবধানে রবীন্দ্রনাথের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার ভয় আমাদের লেখকদের অনেকটাই কমে গেছে। রবীন্দ্র-অনুকরণের নামে আত্মহননের পথযাত্রায় যাত্রীর সংখ্যা এখন নেহাত কম। তবে অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও সেই প্রশ্নটা উঠে আসে যে, এই সময়ের লেখককে কি রবীন্দ্রনাথের কথাসাহিত্য পড়তেই হবে? কিংবা পাঠককে বর্তমানের সাহিত্যের রস পেতে হলে কি আগে রবীন্দ্রনাথ পাঠ করে নিতে হবে?
হয়তো না পড়লেও চলে। পাঠকের তো চলেই, লেখকেরও চলে। কিন্তু এমন ভান্ডার অব্যবহৃত রাখলে আখেরে যে তাকে পস্তাতে হবে না, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। বরং উল্টোটাই সত্যি হওয়ার আশঙ্কা ষোলো আনা।