দৃশ্যকলার সমগ্রতা ফুটেছে তাঁর সৃষ্টিতে

সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন উপমহাদেশের খ্যাতিমান চিত্রকর কে জি সুব্রামনিয়ন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা
কে জি সুব্রামনিয়ন (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৪—২৯ জুন ২০১৬), প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল
কে জি সুব্রামনিয়ন (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৪—২৯ জুন ২০১৬), প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

বিশ্বায়নের সর্বগ্রাসী প্রকৃতি ও তথ্যপ্রবাহের অপ্রতিরোধ্যতার এই সময়কালে শিল্পকর্মে নির্দিষ্ট গণ্ডির অবয়ব প্রমাণের আর কোনো অর্থময়তা রয়েছে িক না, সে প্রশ্ন গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক কয়েক দশকে, বিশেষ করে পশ্চিমে, দৃশ্যকলা জগতের ব্যাপক ভাঙচুর, রূপনির্মাণের খোলনলচেসুদ্ধ বদলে যাওয়া আর আমাদের শিল্পে এর ব্যাপক অভিঘাত এ যুক্তিকে পুষ্টি জুগিয়েছে। তা সত্ত্বেও নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হতে সম্ভবত এ উপলব্ধিও হারিয়ে যায়নি যে ভূগোলের মৌলিকতা আর ইতিহাসের গুরুভার পুরোপুরি বিসর্জন দেওয়া সম্ভব নয় এবং একে উপেক্ষা করে শিল্পের জগত্সভায় নিজের স্বতন্ত্র আসন অর্জন করা যাবে না।
প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির সর্বব্যাপ্ত অভিঘাত আমাদের জীবনচর্যা শুধু নয়, মনন ও কল্পনার জগতেও বিস্তৃত হয়েছে। বলা যেতে পারে, প্রযুক্তি আজ আমাদের দেহ ও মন উভয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রায় নিয়ে নিয়েছে আর ঘটিয়েছে এমন এক বিশ্বায়নে আসক্তি, যা আমাদের শেষ পর্যন্ত কোথায় পৌঁছে দেবে তা আমরা জানি না। এমন পরিস্থিতিতে দৃশ্যকলার জগৎ হয়ে উঠেছে টালমাটাল, সংশয় ও দোলাচলে দিশাহীন। প্রথাগত চিত্র-ভাস্কর্যের পাশাপাশি চর্চিত হচ্ছে ইন্সটলেশন-পারফরম্যান্স-ফটোগ্রাফ-ভিডিও-সাইট স্পেসিফিক আর্ট ইত্যাকার নানাবিধ নব্য ধারার শিল্পরূপ। তবে সেসব শুধুই পশ্চিমের অনুকরণ, অনুসরণ বা অনুরণন হয়েই ফুরিয়ে যাচ্ছে িক না, সে প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণই থাকছে। অন্যদিকে সমকাল ও স্থানিক বৈশিষ্ট্যের মেলবন্ধন একবিংশ শতকের পটভূমিতে কোন রসায়নে সম্ভবপর, সেটিও এক জটিল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দৃশ্যকলার জগতে যে বিপুল সংকটের মুখোমুখি আমরা আজ দাঁড়িয়েছি, সেটি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে গিয়ে আমরা সেই মানুষটির দিকে মুখ ফেরাতে পারি, যিনি এ চ্যালেঞ্জের এমন একটি প্রত্যুত্তর নির্মাণ করেছেন, যা একদিকে সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত অন্যদিকে সমকালের জটিলতাকে ধারণে সক্ষম ও সম্ভাবনায় ব্যাপ্ত। তাঁর মৃত্যু উপমহাদেশের দৃশ্যকলাজগতে এক নক্ষত্রপতন। গেল ২৯ জুন ৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন তিনি—কল্পতি গণ্‌পতি সুব্রামনিয়ন।

‘ইন্দ্রানী অ্যান্ড ইব্রাহিম’,শিল্পী: কে জি সুব্রামনিয়ন
‘ইন্দ্রানী অ্যান্ড ইব্রাহিম’,শিল্পী: কে জি সুব্রামনিয়ন

এটি সম্ভব করেছেন তিনি, মোটাদাগে বলতে গেলে উপমহাদেশের, মূলত বাংলার, লোককলা ও আখ্যানকে উপজীব্য করে সমকালের পটভূমিতে নিজস্ব শিল্পভাষায় পরিবেশন, চিত্র-ভাস্কর্যের মতো উচ্চশিল্পের সঙ্গে নিম্নবর্গীয় লোক ও কারুকলার এক স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত মিশ্রণ ঘটিয়ে আর চিত্র-ভাস্কর্যের জগৎকে প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে। এর পাশাপাশি ছিল তাঁর গভীর পঠনপাঠন ও যুক্তিশীল লেখনী, যা প্রতিপক্ষের মতকে অবিরাম পরাস্ত করেছে। কে জি সুব্রামনিয়ন নামে অধিক পরিচিত এ শিল্পী নিজে বাঙালি নন, জন্মসূত্রে কেরলের অধিবাসী। তবে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে অধ্যয়ন তাঁর শিল্পীজীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, বলা যায় এর রেশ সারা জীবনই তাঁর ভেতরে প্রবাহিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী শিক্ষালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মূলত এ আদর্শে যে এর মধ্য দিয়ে সর্বভারত ও বিশ্বের শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞান ও সংস্কৃতির আদানপ্রদানের মাধ্যমে এক বৈশ্বিক সহমর্মিতা গড়ে উঠবে। আর চিত্র-ভাস্কর্য ধর্ম-পুরাণের জগৎ ছেড়ে হয়ে উঠবে প্রাত্যহিক জীবনের নৈমিত্তিক দিনযাপনের প্রতিলিপি। সুব্রামনিয়নকে বলা চলে এ আদর্শের এক সার্থক রূপকার।
কলাভবনে ‘মাস্টারমশাই’ নন্দলাল বসু আর শিক্ষক বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় কে জি সুব্রামনিয়নকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছিলেন। তবে গান্ধীবাদী আন্দোলনে জেলখাটা আর মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতি পড়া, প্রচুর পড়াশোনা করা সুব্রামনিয়ন একটু পরিণত ও ভিন্ন ধাঁচের ভাবনাচিন্তা নিয়েই কলাভবনে এসেছিলেন। হয়তো শান্তিনিকেতনের সমন্বয়বাদী আবহ তাঁকে শিল্পের এক সামগ্রিক চরিত্র ও ভূমিকা বিষয়ে ভাবতে আগ্রহী করে তোলে। নন্দলাল ও বিনোদবিহারীর ভিত্তিচিত্রে আগ্রহ ও অনুশীলন এবং কারুকলার বিকাশ সাধনে শ্রীনিকেতনকে ঘিরে নন্দলালের শ্রম ও উদ্যম এসব বিষয়ে তাঁর ঔত্সুক্য উসকে দেয়। এ সময় নিশ্চয় তিনি যামিনী রায়ের প্রয়াসকে আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ করেছেন। নন্দলাল ও যামিনী রায় প্রায় সমসাময়িক, ওই সময়ে সর্বভারতীয় দৃশ্যকলার জগতে দুজনই খ্যাতির শীর্ষে। সুব্রামনিয়ন তাঁদের পার্থক্য বোঝার চেষ্টা করেছেন। যামিনী রায় সম্পূর্ণ একক প্রয়াসে আধুনিক ভারতশিল্পের জন্য একটি একেবারে নতুন পথের সন্ধান দিলেন, লোককলাকে এনে দাঁড় করালেন আধুনিককালের শিল্প রচনার উত্স হিসেবে। কিন্তু তিনি ব্যর্থ হয়েছেন লোকশিল্পের শক্তি ও স্বতঃস্ফূর্ততার কোনো রূপান্তর ঘটিয়ে তাকে সমকালীন জীবনের ভাষ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে। সুব্রামনিয়ন এটি সঠিক উপলব্ধি করেছিলেন যে লোকশিল্পের অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তির তুলনায় যামিনী রায়ের ছবি নিষ্প্রাণ। তিনি একে বলেছেন মৃত রেশমগুটির মতো, মনোরম কিন্তু পুতুলের মতো আড়ষ্ট।

অন্যদিকে রক্ষণশীল মানসিকতা সত্ত্বেও নন্দলালের মধ্যে তিনি দেখতে পেয়েছেন শিল্পকে তার সমগ্রতায় ধারণের ও জীবনযাপনের অংশ হিসেবে দেখবার দৃষ্টি, যা তিনি প্রতিটি ছাত্রের মধ্যে বপন করবার জন্য নিরলস কাজ করে যেতেন। নন্দলালের সৃষ্ট শিল্প দ্বারা সুব্রামনিয়ন তেমন প্রভাবিত হননি, হয়েছেন তাঁর প্রজ্ঞাপ্রসূত শিল্পদৃষ্টির দ্বারা। কলাভবনে যে শিক্ষকটি সুব্রামনিয়নের ওপর সত্যকার ছায়া বিস্তার করেছিলেন তিনি হলেন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। বিনোদবিহারীর মধ্যে তিনি দেখেছিলেন সৃষ্টির কৃৎকৌশলের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনার প্রয়োগ। একভাবে বলা যায়, সুব্রামনিয়ন হলেন কলাভবন থেকে আধুনিক ভারতশিল্পের যে ধারাটি নন্দলাল-বিনোদবিহারী-রামকিঙ্করের মাধ্যমে সূচিত হয়েছিল তার উত্তর-প্রজন্মের অন্যতম প্রতিনিধি এবং বিশেষ করে বিনোদবিহারীর পূর্ব-পশ্চিম সমন্বয়বাদী প্রয়াসের সফলতম উত্তরাধিকারী। তারপরও সুব্রামনিয়ন নিজের জন্য বেছে নিয়েছেন যে পথটি, বলা যায়, সেটি ক্রমশই সরে গেছে তাঁর পূর্বসূরিদের থেকে।

সুব্রমনিয়নের অভিযাত্রা বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে ক্রমশ বিকশিত হয়েছে। ১৯৪৪ সালে শান্তিনিকেতনের কলাভবনে এসে ১৯৪৮ পর্যন্ত তিনি এখানে অধ্যয়ন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ পরলোকগত হলেও নন্দলাল-বিনোদবিহারী-রামকিঙ্করের মধ্যে তাঁর উদ্দীপনা তখনো বেঁচে ছিল। ফলে কলাভবনের আবহ তাঁকে ক্রমশ রূপান্তরিত করে শিল্পের একজন সাধকে। ছাত্রজীবন শেষে শিক্ষকতাকেই মূল পেশা হিসেবে বেছে নিলেও সুব্রামনিয়ন পাশাপাশি দৃশ্যকলার অন্য নানান অভিব্যক্তি বিষয়ে তাঁর আগ্রহকে সমন্বিত করে তুলতে থাকেন। এসবের অন্যতম হলো আমরা যাকে ‘মাইনর আর্টস’ নামকরণ করেছি-গ্রামীণ ও আদিম জীবন থেকে উত্সারিত জীবন-সম্পৃক্ত শিল্প ও কারুকলা। শিক্ষকতা-জীবনে বিভিন্ন পর্বে তিনি গুজরাটের বরোদায় অবস্থিত এম. এস. বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ ও শান্তিনিকেতনের কলাভবনে অতিবাহিত করেছেন। ১৯৮০ সালে তিনি বরোদা ছেড়ে তাঁর শিল্পশিক্ষার পীঠস্থান কলাভবনে স্থায়ীভাবে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং ১৯৮৯ পর্যন্ত ওখানে শিক্ষকতা করে অবসর গ্রহণ করেন। ওই বছরই তাঁকে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর ইমেরিটাস নিযুক্ত করে। তা সত্ত্বেও ২০০৪ সালে সুব্রামনিয়ন আবার বরোদা ফিরে আসেন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ওখানেই বাস করেন। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিলেও লোককলা ও কারুশিল্প বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ও বিস্তৃত জ্ঞানের কারণে বিভিন্ন সময় ভারত সরকারের নানান প্রতিষ্ঠানে উপদেষ্টা, ফেলো বা সদস্য হিসেবে তাঁকে দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে, কখনো কখনো এ ধরনের আন্তর্জাতিক সংস্থাতেও যুক্ত হয়েছেন তিনি।

সুব্রমনিয়নের শিক্ষকতাজীবনের সূচনা গুজরাটের বরোদায় অবস্থিত এম. এস. বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। বরোদার শিল্পশিক্ষালয়টিকে কেন্দ্র করে আখ্যানমূলক শিল্পরচনার যে একটি নব্য ধারার স্ফুরণ ঘটে তার অন্যতম কান্ডারি হিসেবে তিনজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁরা হলেন এন এস বেন্দ্রে, শঙ্খ চৌধুরী ও কে জি সুব্রামনিয়ন। তাঁদের মধ্যে শঙ্খ চৌধুরী ও কে জি সুব্রামনিয়ন সরাসরি শান্তিনিকেতন কলাভবনেরই জাতক। বেন্দ্রে ১৯৪৫ সালে কিছুদিন অতিথি অধ্যাপক হিসেবে শান্তিনিকেতনে ছিলেন এবং কলাভবনের শিল্পীদের গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও শিল্পকে জীবনঘনিষ্ঠ করবার ভাবনা তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। বেন্দ্রের এই মুগ্ধতা এবং শঙ্খ চৌধুরী ও সুব্রামনিয়নের শান্তিনিকেতনের পশ্চাত্ভূমি বরোদায় কলাভবনের আদলে বর্ণনাত্মক শিল্পধারার একটি নবতর বিকাশ ঘটায়, যা নিজেকে রূপান্তরিত করে নেয় সমকালের আর্তি ও জটিলতার প্রেক্ষাপটে। শিল্পের তাত্ত্বিক পঠনপাঠনকেও নতুন গুরুত্বে সাজানো হয়। ফলে সমকালীন ভারতীয় শিল্পের জগতে বরোদা-প্রশিক্ষিত অনেক শিল্পীই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। সুব্রামনিয়নের শান্তিনিকেতনে থাকবার আগ্রহের বিপরীতে এর ক্ষয়িষ্ণু আবহ, অন্যদিকে বরোদার নবীন উদ্দীপনাময় পরিবেশ—তাঁর সিদ্ধান্তে টানাপোড়েন সৃষ্টি করতেই পারে।

‘বাওল অব ফ্রুট উইথ ব্লাইন্ড মাদার’, শিল্পী: কে জি সুব্রামনিয়ন
‘বাওল অব ফ্রুট উইথ ব্লাইন্ড মাদার’, শিল্পী: কে জি সুব্রামনিয়ন

শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে নিয়ে কর্মজীবনের সূচনা করলেও এটি লক্ষ্য করা যায় যে গতানুগতিক শিক্ষকতা তাঁর অভীপ্সা নয়, শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ককে শান্তিনিকেতনের আদলে আরও আদান-প্রদানমুখী করে তুলবার বিভিন্ন উদ্যোগ তিনি গ্রহণ করছেন। ভিত্তিচিত্রের প্রচলন, শিক্ষক-ছাত্রের অংশগ্রহণে গ্রামীণ মেলার ধরনে বিবিধ শিল্পসম্মত বস্তু নির্মাণ করে কলা-মেলা, ছাপচিত্রের সাহায্যে চিত্রিত-পুস্তক প্রকাশ, শিল্প-সফর ইত্যাকার নানান কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ছাত্রদের দেশজ শিল্পের প্রাণের সঙ্গে পরিচয় ঘটানোর চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি নিজের স্বতন্ত্র¿ শিল্পশৈলী নির্মাণের পথে প্রথমত তাঁর দৃষ্টি পশ্চিমের দিকে। তিনি কিউবিজম-উত্তর ধারার প্রয়াসগুলো পর্যবেক্ষণ করেন এবং ক্রমশ সেসবে নানান বিচ্যুতি ঘটিয়ে নিজস্ব রূপকল্পের দিকে এগোতে থাকেন। দৃশ্যকলার নানা প্রকাশমাধ্যমও তাঁকে আগ্রহী করে, ছাপচিত্র ছাড়াও বিশেষ করে মাটির ভাস্কর্য নির্মাণকলা তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ কুমোরের গড়া মূর্তি ও পুতুল, নানা মাধ্যমে তৈরি ব্যবহার্য বস্তুর সহজ নান্দনিকতা তাঁর দৃষ্টিতে স্থায়ী হয়ে যায়, তাঁর শিল্পরচনার অন্যতম একটি প্রকাশ হয়ে ওঠে মৃত্ফলক বা মাটির রিলিফকাজ—যা বাংলার ঐতিহ্যিক শিল্পের অন্যতম উদাহরণও বটে। লোকশিল্পের—বিশেষ করে পটচিত্র ও লক্ষ্মীর সরা, মাটির পুতুল ও খেলনা, দেবীর প্রতিমারূপ আর কারুশিল্পের সমৃদ্ধ জগৎ হয়ে উঠতে থাকে তাঁর নিজ সৃজনজগতেরও অন্যতম প্রেরণাস্থল। একজন লোকশিল্পীর মতো সৃজনকর্মকে একটি আনন্দময় খেলার মতো অবিরাম সচল রেখে তিনি শিল্পের নানান মাধ্যম ও উপকরণে সৃজনশীলতার স্বকীয় শৈলী গড়ে তুলেছেন। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে ভারতের সমকালীন শিল্পের একটি স্বতন্ত্র¿ধারা নির্মিত হয়েছে, যার আপাত সারল্যের আড়ালে বহুমাত্রিক জটিল জীবনের প্রতিভাস বিম্বিত হয়ে ওঠে।
কে জি সুব্রামনিয়ন পশ্চিমের আঙ্গিকবাদী ধারার অনুসারীদের বিরুদ্ধে বিকল্প ভারতীয় এক আধুনিকতার সন্ধান করেছেন যা অবনীন্দ্রনাথ-নন্দলাল ও শান্তিনিকেতনের ধারা বয়ে বিনোদবিহারী-রামকিঙ্করের মধ্যে প্রতিভাত হতে শুরু করেছিল। এর সঙ্গে তিনি সমন্বিত করেছেন লোকজ শিল্প ও কারুকলার ব্যবহারিক মূল্য, আর চেয়েছেন শিল্প হবে দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে ক্রিয়াশীল ও প্রাসঙ্গিক। তাঁর অন্বেষা ছিল শিল্পের ব্যক্তিক অভিব্যক্তির এমন একটি প্রকাশ, যা সমাজের বহুমাত্রিক বিন্যাসের সঙ্গে আদানপ্রদান করতে সক্ষম। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের পর সমগ্র ভারতবর্ষে আঁকা ও লেখা-উভয়ক্ষেত্রে এমন উচ্চমানের নৈপুণ্য আর কেউ দেখাতে পেরেছেন বলে আমাদের জানা নেই। সুব্রামনিয়ন তাঁর প্রধান চারটি বইয়ে—মুভিং ফোকাস (১৯৭৮), দ্য লিভিং ট্র্যাডিশন (১৯৮৭), দ্য ক্রিয়েটিভ সার্কিট (১৯৯২) ও দ্য ম্যাজিক অব মেকিং (২০০৭)—বলা যায়, পশ্চিম-অনুসৃত আধুনিকতাপন্থী মতের বিরুদ্ধে বিকল্প অঙ্গন নির্মাণের একধরণের লড়াই জারি রেখেছেন।

এভাবে পশ্চিম আর একেবারে স্থানিক লোক-ঐতিহ্যের সমন্বয়ে কে জি সুব্রামনিয়ন গড়ে নিতে থাকেন নিজের জন্য সমকালের এক স্বতন্ত্র¿ রূপবন্ধ, যা যামিনী রায় ও অন্যান্যদের উপরতলস্পর্শী লোক-প্রভাব থেকে একেবারেই ভিন্ন। তাঁর চেয়ে সামান্য বয়োজ্যেষ্ঠ কামরুল হাসানের মধ্যে যে সম্ভাবনা পরিস্ফুট হয়ে উঠছিল, মৃত্যু এসে যার যবনিকা টেনে দিল, হয়তো তার পূর্ণতার রূপ দেখি সুব্রামনিয়নের মধ্যে। সুব্রামনিয়ন লোককলা আর কারুশিল্পের সরলতা, পরিহাস ও রঙ্গব্যঙ্গপ্রিয়তাকেও নিয়ে আসেন তাঁর মৃত্ফলকে, তেলরংচিত্রে, গ্লাস পেইন্টিংয়ে। শান্তিনিকেতনের আখ্যানধর্মী বিন্যাসে তিনি যুক্ত করেন লোককলার সহজিয়া উপস্থাপন আর নিজস্ব নির্মাণের পরিপক্বতা। এভাবে যা বিধৃত হয় তাঁর নানাবিধ শৈল্পিক ক্রিয়াকলাপে তার সমন্বিত চেহারাটি হয়ে ওঠে সমকালের কিন্তু ভারতীয় এক কল্পকথার জগৎ, বিকল্প আধুনিকতার এক স্বতন্ত্র¿ধারা।

শান্তিনিকেতনের কলাভবন সুব্রামনিয়নের শিল্পীসত্তার আদল নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে আর বরোদার চারুকলা অনুষদের বৈশিষ্ট্য নির্মাণের অন্যতম পথনির্দেশক তিনি। তবে শেষ পর্যন্তকে জি সুব্রামনিয়ন এক পূর্ণতাপ্রাপ্ত শিল্পী, যিনি দৃশ্যকলা জগতের বিবিধ সম্ভাবনাকে ব্যবহার করে হয়ে উঠেছেন নিজ স্বকীয়তায় দীপ্র এক কলাকার। এক বিশাল বটবৃক্ষ যেন, শিকড় যার দেশের মৃত্তিকায় গভীরভাবে প্রবিষ্ট, আর শাখাপ্রশাখাসমূহ ছড়িয়েছে বিশ্বময়।