
চাবিকাঠির খোঁজে: নতুন আলোকে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ৰ
আকবর আলি খান
প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কাইয়ুম চৌধুরী
সহযোগী শিল্পী: অশোক কর্মকার
প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা
২২৪ পৃষ্ঠা
দাম: ৩৫০ টাকা
দুর্বোধ্য কবি, পরাবাস্তব কবি, অচেতনার কবি, নির্জনতম কবি, ইমপ্রেশনিস্ট কবি ইত্যাদি তকমা ছিল জীবনানন্দ দাশের। বোধ করি এই ছাপ্পা বা মার্কাগুলো খেলো হয়ে গেছে আকবর আলি খানের চাবিকাঠির খোঁজে: নতুন আলোকে জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ বইটিতে।
তিনটি পর্বে এ বইটি বিন্যস্ত। প্রথম পর্ব ‘পটভূমি’তে কে জীবনানন্দ, কী জীবনানন্দ, কোথায় জীবনানন্দ, কেমন জীবনানন্দ, কীভাবে জীবনানন্দ—এই প্রসঙ্গগুলোর জবাব মিলবে। দ্বিতীয় পর্বে ‘কবিতার নিবিড় বিশ্লেষণ’-এ ৩০টি কবিতার প্রথমে টেক্স, মানে পুরো কবিতাটা, এরপর একে একে ‘রচনাকাল’, ‘টীকা’, ‘চাবিকাঠি’ এবং শেষে ‘সামগ্রিক তাৎপর্য’তে হাজির করছেন কবিতার সারমর্ম। আর শেষ পর্ব ‘সামগ্রিক বিশ্লেষণ’-এ কবির চেতনাজগতের যে দিকগুলো এই কাব্যগ্রন্থে কাজ করেছে তার পর্যালোচনা। এ ছাড়া ‘সারণি’ ও ‘মানচিত্র’ দিয়ে কবি ও তাঁর এই বইটিকে একেবারে ‘গ্রাফিকালি’ হাজির করা হয়েছে। আবার একেবারে শেষে তাঁর কবিতাকে পিচ্ছিল তথা চ্যাং মাছের সঙ্গে তুলনা করা—বইটির তনিষ্ঠ বা সিরিয়াস মেজাজটিকে দুম করে ফাটিয়ে দিয়েছে।
বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের ৩০টি কবিতাকে বুঝে নেওয়ার চাবিকাঠিগুলো খুঁজে বের করেছেন জীবনানন্দের অন্যান্য লেখা, দিনপঞ্জি, জীবনানন্দ সম্পর্কে অন্যদের লেখা, পারিবারিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে। এক ‘বনলতা সেন’ কবিতার চাবিকাঠি ও এর ব্যাখ্যা যেভাবে এসেছে তা অনেককে চমকে দিতে পারে। ‘নাটোরের বনলতা সেন’, ‘দু দণ্ড শান্তি’, ‘অন্ধকার’, ‘হাজার বছর ধরে পথ হাঁটিতেছি’, ‘বিদিশার নিশা’। কিন্তু সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় যেটি তা হলো, বনলতা সম্ভবত একজন পতিতা নারীও হতে পারে, যে তাকে দু দণ্ড শান্তি দিয়েছিল, তুলনীয় পটভূমিতে আছে বিদিশা, প্রাচীন ভারতে যে অঞ্চলটিতে প্রকট গণিকাবৃত্তি ছিল। তেমনি ছিল নাটোরে পতিতালয়। জীবনানন্দ দিল্লিতে বেশ্যালয়ে গিয়েছিলেন। এসব প্রসঙ্গে তিনি অনেক পরে প্রকাশিত কবির ডায়েরি নানান ভুক্তি থেকে হাজির করেছেন। ‘কুড়ি বছর পর’ কবিতার চাবিকাঠি ‘মনিয়া’—কোনো পাখির নাম নয়, যা নিয়ে ভ্রান্তি ছিল পূর্ববর্তী প্রায় সব সমালোচকের, অনুবাদ করতে গিয়েও ‘মুনিয়া পাখি’ বলে ভুল করেছেন কেউ কেউ। এই মনিয়া ছিল পতুর্গিজ পাদরি ও এক ভারতীয় নারীর অবৈধ সন্তান। এই নীলনয়না মেয়েটির প্রতি কবি টান বোধ করেছেন, যার মৃত্যু হয়েছিল জলে ডুবে। নিজের খুড়োতো বোন বেবিকে ‘হাওয়ার রাত’ কবিতায় ‘বেবিলনের রাণী’ শব্দে আড়াল দিয়েছেন কবি।
জীবনানন্দের কবিতায় সুস্পষ্ট বক্তব্য ও দর্শন আছে। বৌদ্ধদর্শন এবং দ্বৈতবাদের আলোকে ভারতীয় ব্যক্তি-সমাজ-সভ্যতাকে দেখে নিতে কবিকে কীভাবে, কতটা তাড়িত করেছিল সেসব দিক পরিষ্কারভাবে তুলে এনেছেন আকবর আলি খান। কেবল তা-ই নয়, এই একটি বইয়ের বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের কিছু দিকের পাঠ হয়ে যাবে। হিন্দু, বৌদ্ধ, পার্সি, ইহুদি, খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মের নানান আচার বিশ্বাসে বিড়াল, শূকরের মতো পশু, নানান গাছপালা সম্পর্কে ধারণা যেমন বটগাছ সম্পর্কিত বিশ্বাস ও সংস্কারের কথা এসেছে। যেসব নারীর নামে কবিতা আছে, সেগুলো কেবল নারী নয়, সমাজ-সভ্যতা ও যুগের প্রতীক, ‘সবিতা’ ও ‘সুচেতনা’র মতো কবিতাগুলোকে সেই মতোই বুঝে নিতে হবে। অন্যদিকে ‘শঙ্খমালা’, ‘শ্যামলী’, ‘সুরঞ্জনা’র মতো কবিতায় কেবল একক কোনো নারীর কথা বলেনি, তার গভীরে কাজ করছে কখনো যৌনতা, কখনো প্রাচ্যে নারীর প্রতিকৃতি, কখনো স্রেফ রূপবতী নারীরা, যারা ধর্ম, সমাজ সংস্কারের সমস্ত বেড়াজাল সত্ত্বেও টিকে আছে।
বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটিকে জীবনানন্দের অনুবিশ্ব বলা যেতে পারে, অন্তত আকবর আলি খানের এই বইটি পড়ার পর এ নিয়ে আর কোনো দ্বিধা থাকে না।