বাতাসে লাশের গন্ধ

গ্রাফিকস: মনিরুল ইসলাম
গ্রাফিকস: মনিরুল ইসলাম
একের পর এক ঘটছে জঙ্গি হামলা। বাতাসে লাশের গন্ধ। মানুষ মরছে। গুলশান হামলার ঘটনায় মানুষই তো রক্তাক্ত, শোকাহত আমাদের হৃদয়। কবি-লেখকদের কলমে তাই শোক ও প্রতিবাদ আজ যেন অভেদ

সৈয়দ শামসুল হক

কর্কট চোয়াল

এ কোন কর্কট? আজ দেখছি

বৃক্ষের পাতা ছিঁড়লে

ফোঁটা ফোঁটা রক্ত নয়

গলগল করে আমারই শোণিতের প্রপাত—

পৃথিবীর আঁচল ভেজায়।

সে আঁচল

আমার মায়ের মুখ ঘিরে আছে—

আমি বৃক্ষের নিচে পৃথিবীর গভীর আঘাতে

দুই হাত তুলে

অভিশাপ উচ্চারণ করি—

নিপাত! নিপাত যাও!

রক্ত হোক আগুন-পাখির বীজ—

হৃদয়ের ভেতরে লেখা

স্পন্দন চমকে ওঠে—

মুঠো করে চোয়ালটা চেপে ধরি বিরুদ্ধ আলোয়

কেননা এই যে কবিতার ছন্দটিও

গ্রাস করে নিতে চাইছে

সন্ত্রাসের কর্কট চোয়াল!

২ জুলাই ২০১৬

রয়াল মার্সডেন হাসপাতাল, লন্ডন

জাহিদ হায়দার

বিক্ষত দিন

এ সত্য আমার নয়,

ভয়ের ব্যবসা করে,

বৃষ্টি নয়, বজ্র পাঠায়।

এ যাপন আমার নয়,

শান্তির আকাশ খোঁজে

রক্তের উল্লাসে।

এপথে ওপথে আছে লোক

জোঁকের ব্যবসা করে।

জীবন লজ্জিত

তাহাদের অহম্মন্যতার বন্যতায়।

তুমি কোনদিকে যাবে?

কাঁদছে মানবিকতা।

আমি তো চাইনি তোমার নাম

ঘৃণায় বলবে শিশু জন-আলোচনায়।

মাসুদ খান

উচ্চনিনাদী নীরবতা

জিম্মি-হওয়া মানুষ জানে না ঠিক কোন মুহূর্তে

কী কারণে গুলি এসে লাগবে ঠিক কোথায় কোথায়।

অচেনা রোমাঞ্চে, রোমহর্ষে, ত্রাসে, সর্বোচ্চ সংরাগে

শরীরের প্রতি ইঞ্চি তাই প্রতিস্পর্ধী, টানটান।

যেমন ‘দেহের সবচেয়ে সংরক্ত জায়গা

পোশাকের ফেলে-রাখা ফাঁকা স্থান।’

কোন দিক থেকে তেড়ে আসবে কোন ধারালো ছোবল,

কোন কোপ, কোন কার্তুজ, লেলিহ ফিসফাস—

এই গা-ছমছম ভূতবান্ধব জ্যোৎস্নায়

বুঝতেও পারবে না আর, ওরে নিরুপায়।

এই এখনই শুনবে বহু-বহু ঘোলাটে ভয়ের ঘোলতরঙ্গবাদন

আবার এখনই উচ্চনাদী নীরবতা।

কতশত সশব্দ উচ্চার, ঘুরে-দাঁড়ানো চিৎকার,

অন্তরাত্মা-কাঁপিয়ে-তোলা কান্না, আর্তি, আহাজারি,

বহুমাত্র বিচিত্র আওয়াজ—

স্রেফ দ্বিমাত্রিক কালো টোটেম-অক্ষর হয়ে তারা

একদম খামোশ মেরে থাকে নিঃসহায়

স্তরে-স্তরে-রাখা কল্পপুঁথির ঘোর—গুমসুম নিঝুম পাতায়।

টোকন ঠাকুর

লালকালো কবিতা

লালকে কি কালো বলা যায়?

এত হত্যা, এত রক্ত আমি কীভাবে ধরতে পারি

কালো কালো অক্ষরে ছাপানো বাংলা কবিতায়?

কালো কালো শব্দে আজ কীভাবে বাক্য গড়ে ওঠে—

থাকি সেই অসাধ্য-সংকটে!

একদিন, এই দেশে কত নদী ছিল, সেই নদী কই?

একদিন, এই দেশে কত মাঠ ছিল, সেই মাঠ কই?

ধানের খেতে রৌদ্র-ছায়ার লুকোচুরির গান কই?

তিতির ও পানকৌড়ি ছিল, পাখি কই পাখি কই?

যদি পড়ি আমাদের কবিতার পুরোনো বই—

দেখি, পালতোলা কত নৌকা বয়ে যাচ্ছে

বইয়ের মধ্যে, কালো কালো অক্ষরে

ছিপছিপে কিশোরীর ছন্দ, ঘুঙুর

 ছাপা হয়ে আছে

ব্যথা-ভালোবাসা, পুষ্পঘ্রাণ ছাপা হয়ে আছে

এভাবেই, কবিতার মধ্যে লুকিয়ে কবির স্বপ্ন বাঁচে

কি লেখা হবে কাগজে মাঠহীন, নদীহীন বসন্তহীনে

রক্ত দিয়ে কবিতাকে ছাপিয়ে দাও আজিকার দিনে

পাঠকও পড়তে পড়তে উঠুক নিজেকে চিনে—

কেন সে কবিতা পড়তে চায়!

কী লাভ তার, আহত হয়ে, ব্যাধের শিকারে!

হাহাকার আকার পাচ্ছে, দেখতে দেখতে

কেন যে পরের দিন আরেকটু হাহাকার বাড়ে!

রক্তের কবিতা লিখিত হচ্ছে কালো কালো অক্ষরে

আহমেদ মুনির

কেউ যখন তোমার পাশে নেই

কেউ যখন তোমার পাশে নেই, মৃত্যু রয়েছে তখন। সে-ই পরম বান্ধব। আগরবাতি, শুকনো ডাল, মরাপাতাই তখন সত্য। বাইরেরটা তো খোল। বাদামের। ভুলে যাওয়া প্রেমের গানের মতো তাকে আসতে দাও। খোল ভেঙে দেখো তার শাঁস।

ঈশ্বর আছেন, ঈশ্বর আছেন বলতে বলতে অসহায় হয়ে পানিতে ডুবে যাওয়া তোমার সন্তানের মতো তাকে খোঁজো। কান্নাটা শেষ করো না। শুরুও করো না। কারণ সেটাই পৃথিবীর শেষ ঝরনাধারা। যেখানে কেউ স্নান করেনি। কখনো করবে না। আর কখনো করতে পারে এমন সম্ভাবনার তীর থেকে লাফ দাও। যখন কেউ নেই তোমার পাশে, মৃত্যুই তখন তোমার সন্তান।

আসমা বীথি

সেদিনের পর থেকে

নিজের ছায়া দেখেও

আঁতকে উঠি

মানুষের মুখ,

যেন মানুষের নয়

অবিশ্বাসে ভরা।

সেদিনের পর থেকে

হাইনেক জামা পরলেও

আটকে আসে গলা

ঘর বা অফিস

সবটাই আজ ছাদহীন,

মধ্যরাতে মনে হয়

দরজাটা হাট খোলা।

সেদিনের পর থেকে

প্রতি গ্লাস পানি, সবুজ মাঠ

কালচে রক্তে ভরা,

কোথাও চৌরাশিয়া

বাজাচ্ছে রাগ দুর্গা;

চিরঘুম যারা ঘুমাও

কেউ তো জেগে আছি

রক্তমাখা জুতাই এখন

প্রতিদিন পায়ে ভরছি