
১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর দানবীয় অত্যাচারের ফলে অনেক বাঙালি জীবন দিয়েছিলেন, অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছিলেন আর অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। আর এই নারী নির্যাতনের ফলে জন্ম নেয় অনেক যুদ্ধশিশু। যুদ্ধশিশুর সংখ্যা কত ছিল তার কোনো পরিসংখ্যান কখনো করা হয়নি। এই যুদ্ধশিশুদের অবস্থান আজ কোথায়, তাও নির্দিষ্টভাবে বলতে পারেন না কেউ। স্বাধীনতার পরপর লক্ষ করেছিলাম, বিভিন্ন খ্রিষ্টীয় মিশনারির সহায়তায় বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু শিশু ইউরোপ, বিশেষত নরওয়ে চলে যাচ্ছে। বলা হচ্ছিল যে সামাজিক লজ্জা এড়ানো এবং চিকিৎসার জন্য এসব যুদ্ধশিশুকে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। এ ঘটনায় একটা দুঃখবোধ কাজ করত, কারণ জানতাম যে এই শিশুরা আর কোনো দিন ফেরত আসবে না তাদের স্বদেশে।
২০০৯ সালে আমি গিয়েছিলাম নরওয়েতে। সে সময় সেখানকার জাতীয় আর্কাইভসে যুদ্ধশিশু সম্পর্কে খোঁজ নিই। কিন্তু সেখানে এ সম্বন্ধীয় কোনো নথি পাওয়া যায়নি। আর্কাইভস কর্তৃপক্ষ জানায়, এই শিশুদের সম্পর্কে নথি চার্চে পাওয়া যাবে। তারা এও জানায় যে চার্চ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে খুবই গোপনীয়তা রক্ষা করে, ফলে চাইলেই তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। এর জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। ফলে আমার উদ্যোগ এখানেই থেমে যায়। তবে এদিক দিয়ে ’৭১-এর যুদ্ধশিশু: অবিদিত ইতিহাস বইয়ের লেখক মুস্তফা চৌধুরী ভাগ্যবান। তিনি ১৫ জন যুদ্ধশিশু সম্পর্কে প্রায় সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছেন। এই যুদ্ধশিশুরা ১৯৭১-এর অক্টোবর থেকে ১৯৭২-এর মার্চের মধ্যে জন্ম নিয়েছিল। আর এরা এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানযোগে ১৯৭২-এর ১৯ জুলাই কানাডা পাড়ি দিয়েছিল।
বইয়ের পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘এই গ্রন্থে পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক বাঙালি নারীদের প্রতি নির্দয় বর্বরতার চিত্র উপস্থাপনসহ যুদ্ধশিশুদের জন্মকথা এবং তাদের জন্মপরবর্তী সময়ে করণীয় সম্পর্কে তৎকালীন বাংলাদেশ ও কানাডার প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা এবং উভয় দেশের শ্রেণিবৈষম্যবোধ, বর্ণবৈষম্যবোধ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের খুঁটিনাটি বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।’

’৭১-এর যুদ্ধশিশু: অবিদিত ইতিহাস—মুস্তফা চৌধুরী
প্রচ্ছদ: আবু হাসান
প্রকাশক: একাডেমিক প্রেস অ্যান্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০১৫ l
৪৯৭ পৃষ্ঠা l
দাম ৮০০ টাকা
বইয়ে মোট আটটি অধ্যায় আছে। প্রথম তিনটিতে রয়েছে যুদ্ধশিশুদের জন্মবৃত্তান্তের উল্লেখ। আর পরের পাঁচটি অধ্যায়ে আছে যুদ্ধশিশুদের কানাডা গমন, সেখানে তাদের বেড়ে ওঠা, প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং তাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা। বইয়ের শুরুতে লেখক বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধশিশু সম্পর্কে এ যাবৎকাল কী কী লেখালেখি বা গবেষণা হয়েছে, তার আলোকপাত করেছেন। এখান থেকে বোঝা যায় যে যুদ্ধশিশু নিয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণা হয়নি। সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি একটি মাইলফলক। লেখক প্রতিটি যুদ্ধশিশু সম্পর্কে পৃথক পৃথকভাবে আলোচনা করেছেন। সেখানে যুদ্ধশিশু ও তাদের দত্তক পিতামাতার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে যুদ্ধশিশুদের অতীত ও বর্তমান জীবনের উল্লেখযোগ্য সব ঘটনাই তুলে এনেছেন। এ অংশটি সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক হলেও দুঃখজনক যে বেশির ভাগ যুদ্ধশিশুই দেশের সঙ্গে কোনো প্রকার সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী নন বলে জানিয়েছেন।
লেখক মোস্তফা চৌধুরী ’৭১-এর যুদ্ধশিশু: অবিদিত ইতিহাস রচনা করেছেন মূলত বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থায় সংরক্ষিত মূল নথির সাহায্য নিয়ে। এ ছাড়া লেখক প্রতিটি যুদ্ধশিশু ও তাদের দত্তক পিতামাতার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ফলে বইটির গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত।
এই বইয়ে লেখকের কৃতিত্ব এখানে যে তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের অকথিত ও প্রায় বিস্মৃত একটি অধ্যায় পুনরুজ্জীবিত করেছেন। বইটি রচনায় তিনি কতটা পরিশ্রম করেছেন এবং গভীরে গিয়েছেন তা পাঠক এটি হাতে নিলেই উপলব্ধি করতে পারবেন। উপরন্তু নথি ও আলোকচিত্র সংযোজন করায় বইটি আরও সমৃদ্ধ হয়েছে। যাঁরা ভবিষ্যতে যুদ্ধশিশু নিয়ে গবেষণা করতে চান তাঁদের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। বইটি একটি উন্নতমানের গবেষণাগ্রন্থ হলেও সাধারণ পাঠকও এটি পাঠ করে উপকৃত হবেন।