শিক্ষকদের শিল্পকর্ম

‘ভালোবাসা’, শিল্পী: জামাল আহমেদ
‘ভালোবাসা’, শিল্পী: জামাল আহমেদ

ছবিগুলো, ভাস্কর্যগুলো শিক্ষকদের। প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়া শিল্পীদের সবাই পেশাগতভাবে শিক্ষকতায় নিয়োজিত। খুলেই বলি তবে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ২০১৬’ উৎসবে হয়েছিল একটি প্রদর্শনী। আর একে ঘিরে রং-তুলিতে বর্ণিল হয়েছিল চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারি। এ প্রদর্শনীর বিশেষত্ব এই যে, এখানে অংশ নেওয়া সব শিল্পীই চারুকলা অনুষদের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক। মোট ৫৮ শিল্পীর ছবি ও ভাস্কর্য দিয়ে সজ্জিত প্রদর্শনীতে আছে বৈচিত্র্যের ছোঁয়াও।
প্রবীণ-নবীন শিক্ষকদের অধিকাংশই এ দেশের শিল্পভুবনের চেনা মুখ। তাই চিত্রজমিন, বিষয়চিন্তা ও আঙ্গিক দেখেই ফরিদা জামান, নিসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্য্য, নাইমা হক, মোহাম্মদ ইউনুস, মোহাম্মদ ইকবাল আলী, জামাল আহমেদ, আবদুস শাকুর শাহ—এই শিল্পীদের দর্শক যেমন অবলীলায় খুঁজে পান, তেমনি সহজেই তাঁদের নজর কাড়ে শারীরিক ও মাধ্যমগত কসরতসৃষ্ট মুকুল কুমার বাড়ৈর ব্রোঞ্জ মাধ্যমে করা ‘ভাইটালিটি: ড্রিম অ্যান্ড রিয়ালিটি’ এবং দেবাশীষ পালের স্টোনওয়ার সিরামিকে করা ‘হারমনি অব বেঙ্গল’ শিল্পকর্ম। বাংলার ঐতিহ্যবাহী সরাচিত্রের গোলাকৃতির আদলে তাঁর ভাস্কর্যে মুকুল কুমার জিনম কোডের প্রতীকী ফর্ম ব্যবহারে জাদুকরি মায়া তৈরি করেছেন বিমূর্ত ধারায়। আর দেবাশীষ পাল বাংলার আবহমান লোকজ ফর্মে বংশীবাদক রাখাল, একতারা বাদক বাউলের মুখ ফ্রেমে বন্দী করে মৃৎশিল্প দিয়ে গীতিকাব্য গড়েছেন বাংলার লোকজ সুরকারদের।
শহিদ কাজীর ‘মানুষ ও কাক’ শীর্ষক ছবির বাস্তবানুগ চিত্রশৈলীর মুনশিয়ানা নজর কাড়ে। ছবিতে দৃশ্যমান অশুভ শক্তির প্রতীক কাকের সঙ্গে সঙ্গে ভয়াল দুশ্চিন্তার অভিব্যক্তি সৃষ্টিতে লাল ও কালো রঙের বিন্যাস প্রশংসনীয়।
কালো রঙের জমিনে দোদুল্যমান রেখার বিন্যাসে হিংস্র প্রাণীর প্রতীকী উপস্থাপনে অশুভ শক্তির বীভৎসতা অনুভূত হলো নিসার হোসেনের চিত্রকর্মে। অপরপক্ষে শান্তির প্রতীক প্রণয়রত যুগল পায়রাকে বৃহৎ সারফেসে ভালোবাসার শক্তিকে প্রকাশ করেছেন জামাল আহমেদ। পায়রা যুগল যে দেয়ালে বসে আছে, সেই দেয়ালের বাস্তবানুগ মায়া তৈরিতে রঙের পরিবর্তে তিনি সেঁটে দিয়েছেন বালির আস্তরণ—মোহনীয় হয়েছে তাঁর এই ব্যবহার।
রেখা দিয়ে ছবি এঁকেছেন শিশির ভট্টাচার্য্য। তাঁর কাজটি নান্দনিকতার মধ্য দিয়ে নতুন এক বার্তা দেয় দর্শককে।
পড়ন্ত গোধূলিবেলায় জোড়া সাদা মেষের অবনত মুখে তৃণভোজের দৃশ্যকে রঙের নমনীয় লেপনে আধা বিমূর্ত ধারায় এঁকেছেন ফরিদা জামান। আবার সাদা-কালোর ক্ষেত্র বিভাজনে আলাদা কয়েকটি দৃশ্য ফ্রেমবন্দী করে মামুন কায়সার চিত্রণ করেছেন ‘পিটার প্যান’ কাহিনি। ফ্যান্টাসিধর্মী এ কাহিনিচিত্রণ দর্শকদের আনন্দ দেবে।
মো. আবদুল মোমেন বাংলার পুতুলের আদলে সাপুড়ে দম্পতি সৃষ্টি করেছেন ভাস্কর্যধর্মী কারুশিল্পে। তিনি তাঁর ভাস্কর্যের গায়ে খোদিত করেছেন বাংলা লিপির বিভিন্ন চিহ্ন।
অন্যদিকে সুমন কুমার বৈদ্য ও অমিত নন্দীর কাজে সমসাময়িক সামাজিক বিষয়-চিন্তার প্রতিফলনে ছলনাময়ী মুখোশধারী মানুষের ফাঁদ এবং খাদ্যে ভেজালের অশনিসংকেত চিত্রিত হয়েছে জলরঙের ওয়াশ পদ্ধতিতে—রেখার ছন্দ, রঙের লাবণ্য, ভারত শিল্পের ষড়ঙ্গ গুণাবলি অক্ষুণ্ন রেখে।
প্রদর্শনীতে মূলত শিক্ষক-শিল্পীরা যে বিভাগে পড়াচ্ছেন, সেই বিভাগের মাধ্যম ব্যবহার করেই উপস্থাপন করেছেন নিজেদের শিল্পকর্ম। অধিকন্তু নিজ নিজ বিভাগের একাডেমিক মাধ্যম চর্চার কাজের বাইরে যেসব শিক্ষক চিত্রকলা রচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে আবদুস শাকুর শাহর ছবিতে পাওয়া যায় বাংলার মানুষের মুখাকৃতি। মোহাম্মদ ইউনুসের চিত্রজমিনে লিপি চিহ্নাকৃতি টেকচার যেন কবিতার শারীরিক উপস্থিতি ও কবিতাপাঠের শব্দচেতনাভূতি জাগ্রত করে।
তবে গ্যালারির দেয়ালজুড়ে ঠাসাঠাসি করে ছবিগুলো প্রদর্শনের ক্ষেত্রে পরিমিতি বোধের অভাব লক্ষণীয়। আর ছবির সংখ্যা গ্যালারির ধারণক্ষমতা অনুযায়ী হলে—এবং বলা যায়, কয়েকজন শিল্পীর কাজ না থাকলে প্রদর্শনীর মান আরও ঋদ্ধ হতে পারত বলেই মনে হয়। গত ২৯ জুন শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি শেষ হয়েছে ১ জুলাই।