সময়কে নতুনভাবে দেখা

আসিফ নজরুল তাঁর দোষ উপন্যাসে সচেতন প্রয়াসে ভিন্ন ধরনের গল্প বলতে চেয়েছেন। উপন্যাসটি পড়ে পাঠক খুব সহজেই সমকালীন বাস্তবতায় ডুব দিতে পারেন। ঔপন্যাসিক ঘটনার ঘনঘটা, মোচড়, রূপক-প্রতীকের মাধ্যমে এগিয়ে নেন আখ্যানটি। আর এর মাধ্যমে উপন্যাসে বর্ণিত চরিত্রগুলো ডালপালা ছড়ায়।

বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণী আলিশা বন্ধুদের সঙ্গে ঢাকার আশুলিয়া বিলে ঘুরতে বেরিয়েছে। আকাশে লাল আভা, দূরের কালচে সবুজ আর মাতাল হাওয়ায় বুঁদ হয়ে আছে চার তরুণ—আলিশা, তাহমিদ, আবির ও সাকিব। কিন্তু হঠাৎ ছন্দপতন। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হা রে রে শব্দ করে তাদের নৌকার সামনে তীব্র বেগে ছুটে আসে আরেকটি নৌকা। দস্যুর মতো লাফিয়ে নামে কয়েকটা ছেলে। আলিশাকে তুলে নিয়ে যায়। পুরো একটি রাত নিখোঁজ থাকে সে। এই এক রাতের ঘটনায় তছনছ হয়ে যায় আলিশার জীবন। ফিরে আসার পর এক নতুন পৃথিবীর মুখোমুখি হয় দোষ–এর কেন্দ্রীয় চরিত্র আলিশা। তাহমিদ, আবির অচেনা হয়; সাকিব হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। আলিশার বিশ্ববিদ্যালয়ও চায় না সে পড়ুক সেখানে। আলিশার সেই সময়ের মানসিক সংকটকে সিদ্ধহস্তে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।

প্রধান চরিত্রের বাইরে উপন্যাসটি এক পা-ও বাড়ায়নি। সাকিব, তাহমিদ, জহীর, মীরাসহ অনেকেই এ আখ্যানে এসে ভিড়ে করেছে। সাকিবের খ্যাপাটে আচরণে একসময় আলিশার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। উপন্যাসের ভেতর ঢুকেও—বিশেষ করে সাকিব উপন্যাস থেকে বেরিয়ে গেছে, স্বেচ্ছায়।

আলিশার ঘোরতর অনিশ্চিত জীবনের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ছোটবেলার বন্ধু মীরা। কিন্তু একসময় আলিশা বুঝতে পারে, মীরারও বেশি কিছু করার নেই। অতঃপর আলিশার জীবনে অনুঘটক হিসেবে আসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জহীর স্যার। চরিত্রের এই সহজাত আসা–যাওয়া দোষকে গতিশীল করেছে।

উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জহীর। স্ত্রীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর চরিত্রটি থাকে তার শিশুসন্তানকে নিয়ে। জহীর বুঝতে পারে, পুরো ঘটনাপরম্পরায় আলিশা খুব বাজেভাবে জড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এতে তার কোনো দোষ নেই। তার পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। কঠোর নৈতিক অনুশাসনে জীবন যাপন করা জহীর আলিশার সঙ্গে কিছু দূরত্ব রেখে তাকে সহযোগিতা করতে চায়। কিন্তু একসময় তা সম্ভব হয় না। তার মন অশান্ত হয়ে ওঠে। আলিশা তার ছাত্রী, বয়সেও অনেক ছোট। অথচ জহীর স্বপ্ন দেখে, আলিশা তার স্ত্রী; জহীর ছাড়া এখন কেউ নেই তার পাশে দাঁড়ানোর।

গোটা উপন্যাসে কোনো রূপকথা বর্ণিত হয়নি, পুরো ঘটনাই সমকালীন। এই সমকালীনতাকে লেখক এতটাই মূর্ত করেছেন যে পাঠকের চোখে না পড়েই পারে না। লেখক উপন্যাসটি যে নিবিষ্ট পরিকল্পনায় গড়ে তুলেছেন, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ—তিনি কোনো আদর্শ প্রচার করেননি। কিংবা ঘটনার মীমাংসাও টানেননি। শুধু তা–ই নয়, যেহেতু দোষ–এর চরিত্রকুল, তাদের নানাবিধ ক্রিয়াকলাপ, চলাফেরা ও বিচিত্র সম্বন্ধের মধ্যে লেখক এতে একটা সংযোগ তৈরির চেষ্টা করেছেন, সেহেতু গল্পের প্রয়োজনে সংযোগুলোকে সজীব রাখা কিংবা কখনো কখনো ছেদ ঘটানো লেখকের অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রে দারুণভাবে সফল আসিফ নজরুল।

দোষ উপন্যাসে এই সময়কে নতুনভাবে দেখতে পাবেন পাঠক।

দোষ

আসিফ নজরুল

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন, প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২১, প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল, ১১৯ পৃষ্ঠা

দাম: ২৬০ টাকা।

বইটি পাওয়া যাচ্ছে

prothoma.com এবং মানসম্মত

বইয়ের দোকানে।